• Charlie Chaplin
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

উই ফিল টু লিটল অ্যান্ড থিংক টু মাচ

দশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবেই

মুম্বই মনতাজে মিলন মুখোপাধ্যায়

Charlie Chaplin
  • Charlie Chaplin

Advertisement

নবীন তথা অর্বাচীন ও প্রাচীনদের নির্বাচন-নৃত্য শেষ হয়েছে। ফলাফল হাতে নিয়ে কাছাকোঁচা সামলে জয়ীরা সব দলে দলে ধাওয়া করেছেন মসনদ অবধি। কী? না, সকলেই দেশের ও দশের উন্নতির জন্য সেবা করবেন। সমগ্র ভারতের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করবেন।  উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ? হা-হা!

মহান দেশের গোটা চেহারার কথা হলফ করে বলা যায় না। তবে অর্থনৈতিক রাজধানী তথা ধনী এই অসার শহর মুম্বইয়ের পুব পারের একটি অঞ্চলে যেতে হয়েছিল ভিন্ন কাজে। অ্যান্টপ হিল-এ। বেলা হেলে পড়েছে। রোদের তাপ কমেনি। কোত্থেকে একটা কটু গন্ধ ভেসে আসছে দমকা বাতাসে। প্রয়োজনমত নাকে রুমাল চাপা দিচ্ছি এবং হাঁটছি। খিলখিল হাসির উচ্ছ্বাসে চোখে পড়ল, সামান্য দূরে খানিকটা খোলা জায়গায় এক ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’ প্যারাম্বুলেটরে চড়ে হাওয়া খাচ্ছে ও নিষ্পাপ হাসিতে বাতাসকে খুশি করে দিচ্ছে। নিষ্পাপ, পবিত্র, অকপট, সহজ—শিশুদের ব্যাপারে এই সব কথা কী সুন্দর ভাবে খাপ খেয়ে যায়! আর তার পরেই ধাক্কা লাগে বাস্তবের সঙ্গে। সে ধাক্কায় ঘুমে দেখা স্বপ্ন খানখান হয়ে যায়। জলজ্যান্ত চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’-এর বৃহত্তর ছবি। যেমন হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল।

কাঁচা এবড়োখেবড়ো হাঁটাপথের বাঁ দিকে সামান্য নিচুতে খোলা নর্দমা বা নালা। অসম্ভব নোংরা জল বইছে। বইছে না অবশ্য, একেবারেই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। উঁচু জমি থেকে ঠাহর পাওয়া মুশকিল। তবে কটু গন্ধের যে আভাস এতক্ষণ দূর থেকে পাচ্ছিলুম, এখানে তার ভয়ংকর ঝাঁঝে গা গুলিয়ে ওয়াক উঠে আসে। নালা সাফাই হচ্ছে। ‘ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে’র আগমনবার্তা পৌঁছে গিয়েছে শহরের কর্তৃপক্ষের আপিসে-কাছারিতে। মাথার ওপরে ‘গুরুগুরু’ গর্জন ও মাটিতে শান্তিজলের মতন বৃষ্টির ছিটেফোঁটা। দিকে দিকে ম্যানহোল-আঁটা নর্দমা কিংবা খোলা নালা সাফাইয়ের হিড়িক পড়ে গিয়েছে। সারা বছর ধরে শহরের যা কিছু জঞ্জাল-ক্লেদ-কলুষ-পুঁজ-রক্ত-পাপ জমে জমে এ রাজ্যের একমাত্র নদী মিঠি থেকে আরম্ভ করে তার খাল বিল নালা সব ভরাট হয়ে গিয়েছে। ফলে তিরতিরে জলস্রোতও ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে এখন প্রায় নিথর নিরেট হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সামনের তিন-চার মাস যে নাগাড়ে জলপ্রপাতের মতো বৃষ্টি হবে, সেই জলস্রোত বেরুবে কোথা থেকে? সমুদ্রেই বা পৌঁছবে কোন উপায়ে? কয়েক বছর আগের সেই ২৬/৭-এর বন্যার কথা ভেবে তটস্থ কর্তৃপক্ষ। ত্রাহি ত্রাহি রবে তাই ঝাঁপিয়ে পড়েছে তাঁদের লোকজন বদ্ধ নালা-নর্দমায়!

না, না, একটু ভুল বললুম। নর্দমা সাফাইয়ের জন্য তো লোক নামানো হয়েছে—নিজেরা নামবেন কচু! তাঁরা তো শাসকদল। নেতা-মন্ত্রীমণ্ডলের সব ভায়রাভাই! রুমালে বিলিতি সেন্টের শিশি উল্টে নাকে চেপে ধরে, চতুর্দিকে ঢাকঢোল পিটিয়ে বড়জোর একবার পরিদর্শন করতে যাবেন নালা নদী নর্দমা! নইলে ‘গন্ধ শুঁকে মরতে হবে, এ আবার কী আহ্লাদ!’

অ্যান্টপ হিল-এর এমনই একটি অকুস্থলের (অকুস্থলই বটে!) পাশ দিয়ে সে দিন যেতে যেতে চোখে পড়ল আমাদের ‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’! উঁহু,প্যারাম্বুলেটরে হাসিখুশি বসে হাওয়া-খাওয়া স্বপ্নের শিশু নয়, রীতিমতন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়ানো.. না, মাটিতে নয়, নর্দমায় নেমে যাওয়া দশ-বারো বছরের নাবালক তিন জন!

সবচেয়ে কচিটির নাম গণেশ দেবেন্দ্র। ‘মিউনিসিপ্যাল ইস্কুলে ছয় কেলাসে’ পড়ে। মিউনিসিপ্যালিটির কর্তাব্যক্তিদের ক’জন এসেছিলেন সে দিন পরিদর্শনে। তাঁরাই খোঁজখবর নিচ্ছিলেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাজে লাগানো তো বেআইনি! আলোচ্য তিনটি ‘ভবিষ্যৎ’ ছাড়া আরও জনা-কয়েক নোংরা সাফাইয়ের কাজে নেমেছে। কারও হাতেই দস্তানা বা গ্লাভস নেই। পায়ে গামবুটের বদলে নিজ নিজ হাওয়াই চটি।

‘‘আজকে নিয়ে আমার চার দিন। পঞ্চাশ টাকা রোজ। সকাল ৮টা থেকে সন্ধে অবধি। আর সাব বলেছেন, হপ্তা হলে একসঙ্গে টাকাটা পাব।’’

অন্য দুটি ছেলের নাম হরি কুমার (১৩) ও অশোক ওয়লভাদে (১২)। এরআও কই ইস্কুলে পড়ে। এখন গরমের ছুটি। সহসা ‘পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা’র মতন হপ্তায় সাড়ে তিনশো টাকার ফুরনে কাজ পাওয়া কি চাট্টিখানি কথা!

এ ছাড়া লেখাপড়া, খেলাধুলোর বয়সে থাকা ছেলেরা জনসাধারণের অস্বাস্থ্যকর জঞ্জাল, মলমূত্র, পুঁজরক্ত, স্যানিটারি ন্যাপকিন ইত্যাদি কলুষের ভেতর ভয়ংকর তথা মারাত্মক সব রোগজীবাণুর উপস্থিতি সম্পর্কে কতটা আর সজাগ, সচেতন থাকতে পারে! ফলে টাকা রোজগার হবে ভেবেই এরা নির্দ্বিধায় নির্বিচারে ওই ভয়ানক রোগজীবাণু-ঠাসা পচা নোংরা খোলা নর্দমার আবদ্ধ ক্বাথের ভিতরে ঝাঁপিয়ে পড়েছে! এদের খালি হাত-পা ঢাকার মতোও কোনও ব্যবস্থা নেই! গত চার দিনে কত রকমের রোগ যে রোমকূপ দিয়ে এদের শরীরে ঢুকে পড়েছে, তার হিসেব কে রাখে?

কর্তৃপক্ষ? ছাই!

তাঁদের যখন এই সব অবহেলার কথা জানিয়ে এ প্রসঙ্গে সচেতন করা হল, তাঁরা খুব মনোযোগ দিয়ে সব শুনেটুনে ‘আহ্ কী অন্যায়! ছিঃ! ছিঃ! ইশ্!’ ইত্যাদি সব অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে বললেন, ‘‘খুবই যাচ্ছেতাই কাণ্ড! শুধু অপ্রাপ্তবয়স্কদের কাজে লাগানোর মতো বেআইনি ব্যাপারই নয়—বোঝার উপর শাকের আঁটির মতো ওদের স্বাস্থ্য সংরক্ষণের কোনও রকম বন্দোবস্তই করেনি লেবার কনট্রাক্টর। খুবই অবহেলার ব্যাপার!’’

—তা, প্রতিকারের ব্যবস্থা কী নেওয়া হবে?

ঘোরতর চিন্তাবিদ, বিজ্ঞ এবং সর্বশক্তিসম্পন্নের তূরীয় কণ্ঠে জবাব এল প্রায় দৈববাণীর মতোই, ‘‘হবে, হবে! ভাববেন না। ব্যবস্থা  হবে।’’

এই শহর, এ রাজ্য, এমনকী এ মহান দেশের জনসাধারণের চোখের সামনে এ জাতীয় শৈশব-হরের দৃশ্যাবলি একেবারে গা-সওয়া হয়ে গেছে। ইলিশ মাছ ভাজা চিবোতে চিবোতে টিভির পর্দায় আমরা শৈশব-বিহীন শিশুদের ছবি দেখি চ্যানেল পাল্টে পাল্টে। স্রেফ আট মাসের শিশুকে ধর্ষণের খবর আমরা নির্বিবাদে শুনি। নাবালক ছেলে মদ খেয়ে তার নতুন গাড়ির তলায় একাধিক মাথা গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। কচিকাঁচা ছেলেমেয়েদের ধর্ষণ করে মেরে ফেলছে। দেনার বোঝা সহ্য করতে না পেরে কর্তা তার স্ত্রী ও চারটি সন্তানকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলছে। খিদের জ্বালায় দু’বছরের বোনের কান্না থামছে না দেখে সাত বছরের দাদা তাকে খুন করে চুপ করাচ্ছে। শুনে চমকে উঠি তৎক্ষণাৎ। শুনে শুনে দেখে দেখে আমাদের সহ্যশক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে। বেড়ে গেছে অম্লানবদনে হজম করার শক্তি। অথচ ভাবতে পারি আমরা। নানা ধরনের চিন্তাভাবনা তর্কাতর্কি কাজ করে আমাদের মাথার ভিতরে। চিন্তা আমরা করি ঠিকই অবরে-সবরে। কিন্তু অনুভব করি কি কিছু? কোনও বোধ কি কাজ করে হৃদয়ের ভিতর? কে জানে! যদ্দুর বুঝি, হয়তো করে না। প্রসঙ্গত, বহু দশক আগেই চার্লি চ্যাপলিন বলে গেছেন, ‘‘উই ফিল টু লিটল অ্যান্ড থিংক টু মাচ!’’

তাই বলছিলুম, নতুন মন্ত্রীরা এলেন। পুরনো দলবল ভেঙেচুরে নতুন মন্ত্রিসভা হল এবং আরও হবে। শহরের, রাজ্যের, দেশের ওপরতলায় নেক অদলবদল হচ্ছে, হবে। ‘শৈশব’ শব্দটির সঠিক অর্থ আজকালকার দেশচালকরা খুঁজে বের করবেন কি? দেশের-দশের বড় বড় কথায় না গিয়ে এই রাজ্য বা শহরের অথবা পশ্চিম বঙ্গের যে কোনও শহরের শিশুদের মুখ চেয়ে আমরা কি সগর্ব বলতে পারব—‘উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ’! 

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন