আয়োজনে যেন কোনও ফাঁক না থাকে। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি দেখে নিতে তাই তুঙ্গে ব্যস্ততা। 

নাটমন্দিরের দিকে নজর রাখছেন স্বয়ং রায়বাহাদুর। একটু পরেই আসতে শুরু করবেন অতিথিরা। ঝুলনের সেই দিন মন্দির চত্বরে পরিবেশিত হবে কীর্তন, যাত্রাপালা, নাটক! সে সব দেখতে প্রতি বছর ভিড় জমান মানুষ, আসেন সাহেবরাও। ঝুলন উপলক্ষে এক মাস ধরে মেলাও বসত জিয়াগঞ্জের সেই নেহালিয়া ম্যানসনের সামনের মাঠে। বিশ শতকের কুড়ির দশকের কোনও এক বছরে সেই ঝুলনের অনুষ্ঠানে প্রকাশ ঘটে এক প্রতিভার। পরবর্তীতে যিনি দীর্ঘ কাল গানের মূর্ছনায় শ্রোতাদের মোহিত করে রেখেছিলেন।

অন্য বারের মতোই কীর্তন-গাইয়ে হরিমাখন দাস দল নিয়ে আসরে হাজির। অনুষ্ঠান শুরুর বেশ খানিকটা পরে সামনে আনলেন শিষ্যা খুদুকে। ছয়-সাত বছরের বালিকার মিষ্টি কণ্ঠের কীর্তন শুনে শ্রোতারা তখন তন্ময়। আসরে উপস্থিত জেলা প্রশাসনের এক সাহেব কর্তা রায়বাহাদুরের কাছে জানতে চাইলেন, ‘কে এই বালিকা!’ পরিচয় জানতে হরিমাখনের খোঁজ পড়ল। আহ্লাদিত কীর্তনিয়া। কারণ প্রতিবেশী দক্ষবালার এই মেয়ের গলায় কীর্তন শুনে তিনিই প্রথম মুগ্ধ হয়েছিলেন! সে দিন রায়বাহাদুর সুরেন্দ্রনারায়ণ‌ সিংহ নেহালিয়াও প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি।

এর পরেই মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জের রাসপাড়ার ছোট্ট খুদুর ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে। বালিকার মাথায় হাত রাখেন রায়বাহাদুর। তাঁরই পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু দিন পর সে যায় লালবাগের নবাব উস্তাদ মঞ্জু সাহেবের কাছ থেকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নিতে। শিক্ষার্থীকে মঞ্জু সাহেব নিজে ঘোড়ার গাড়িতে করে পৌঁছে দিয়ে যেতেন। কখনও উস্তাদও আসতেন খুদুর ভাঙাচোরা বাড়িতে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলত শিক্ষা। গানের ফাঁকে খাওয়াও সারতেন উস্তাদ। সেই সময়ে হিন্দুর বাড়িতে মুসলমানের প্রবেশ নিয়ে সমাজে প্রবল আপত্তি ছিল। খুদুর মায়ের নির্দেশ ছিল, ‘‘ওঁর বাসন তুমিই ধুয়ে তুলবে।’’ খুদু অবশ্য সে কাজ করত আনন্দে। এ ভাবেই চলল কয়েক বছর। তত দিনে বালিকা থেকে কিশোরী হয়ে উঠেছে খুদু।

তাঁর প্রতিভার প্রকাশ ঘটেছিল এই নাটমন্দিরেই

সঙ্গীত শিক্ষার একটা পর্যায়ে এসে মঞ্জু সাহেব রায়বাহাদুরকে জানালেন, এ বার ওর আরও শিক্ষার প্রয়োজন। সে জন্য ওকে কলকাতায় যেতে হবে। রায়বাহাদুরের পরিচিত হরিসাধন নামে এক ব্যক্তির কলকাতার বাড়িতে থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত হল খুদুর। হরিসাধনের তত্ত্বাবধানে শুরু হল খুদুর কলকাতা-পর্ব। সেই পর্যায়ে প্রথম দিকে তাঁর সঙ্গীত সাধনায় হরিসাধনের অবদান ছিল যথেষ্ট। এমনটাই জানাচ্ছেন রায়বাহাদুরের পৌত্র সত্তরোর্ধ্ব সত্যনারায়ণ সিংহ। 

 

গায়কির সঙ্গে অভিনয়ের মেল

এক সঙ্গীতানুরাগী পুলিশ অফিসারের সহায়তায় ১ নম্বর গার্স্টিন প্লেসে, বেতার কেন্দ্রের স্টুডিয়োয় পা পড়ে কিশোরী খুদুর। ‘না কিসি কী আঁখ কা নুর হুঁ, না কিসি কে দিল কা করার হুঁ’... শোনা যায়, প্রথম বার রেডিয়োয় এই গজল গেয়েই ‘রাধারানি দেবী’ হিসেবে পরিচিতি পান খুদু। এর পরে প্রায় পাঁচ দশক ধরে শ্রোতাদের ‘নুর’ হওয়া থেকে রাধারানিকে কেউ আটকে রাখতে পারেনি। একের পর এক গজল, ঠুমরি, ভজন, হিন্দি, ভোজপুরি, ওড়িয়া, নেপালি প্রভৃতি ভাষায় সঙ্গীত পরিবেশনের পাশাপাশি কীর্তন, পল্লিগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদের গান পরিবেশন করেছেন তিনি। পাখোয়াজ, এস্রাজ-সহ বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাতেও জানতেন। সুর ও তালের অভিজ্ঞতায় স্বশিক্ষিত হয়েছিলেন। বছর কয়েকের মধ্যেই আকাশবাণীর নিয়মিত শিল্পীর জায়গা তাঁর পাকা হয়ে যায়। সেই সঙ্গে কলম্বিয়া রেকর্ড, হিন্দুস্থান রেকর্ড থেকে তাঁর একের পরে এক গানের ডালি বেরোতে থাকে। কটক আকাশবাণী কেন্দ্রের সূচনা হয়েছিল তাঁর কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ প্রচারেই।

অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর নামজাদা শিল্পী ছিলেন রতন বাঈ, তিনি রাধারানির গায়কি, উর্দু উচ্চারণ এবং ব্যক্তিত্বময়ী চেহারায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে সিনেমায় অভিনয় করার পরামর্শ দেন। ‘মানময়ী গার্লস স্কুল’, ‘প্রিয় বান্ধবী’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘কাশীনাথ’, ‘মা ও ছেলে’, ‘সাত নম্বর বাড়ি’-সহ বেশ কয়েকটি বাংলা এবং ‘সুনহেরা বাল’, ‘সিধা রাস্তা’, ‘গজ়ল’, ‘রসিলি’, ‘লাজ’-সহ তিরিশটিরও বেশি হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন তিনি। দুই প্রখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রী তুলসী চক্রবর্তী এবং নীহারবালা দেবীর পরামর্শে মঞ্চে অভিনয়ও শুরু করেন রাধারানি। ‘সাজাহান’, ‘ঝড়ের রাতে’, ‘সিরাজদ্দৌলা’, ‘পরিণীতা’, ‘চণ্ডীদাস’, ‘বিন্দুর ছেলে’ ইত্যাদি বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করে খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। নির্বাক চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন এই কীর্তন সম্রাজ্ঞী।

 

ভালবেসে সাহিত্যিকের সঙ্গে বেঁধেছিলেন ঘর

এ শহর যেমন রাধারানিকে শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে, তেমনই মিলিয়ে দিয়েছে তাঁর মনের মানুষের সঙ্গে। তিনি সাহিত্যিক নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়। ‘সাত পাকে বাঁধা’, ‘শাপমোচন’, ‘হারানো সুর’-এর মতো একাধিক বাংলা সিনেমার চিত্রনাট্যকার এই ব্যক্তিত্ব আবার আকাশবাণীতে নাটক, গল্পদাদুর আসর, বিদ্যার্থী মণ্ডলের পরিচালনাও করতেন। অসংখ্য গল্প, উপন্যাসের লেখক ছিলেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ। সাহিত্যিকের সঙ্গে ভালবেসে ঘর বেঁধেছিলেন রাধারানি। 

তবে দীর্ঘ বছর তাঁরা একসঙ্গে থাকলেও বিয়ে করেননি। জিয়াগঞ্জেও একাধিক বার রাধারানির সঙ্গে তাঁর বাড়িতে থেকেছেন নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ। তিনি বিবাহিত হওয়ায় এই সম্পর্ক নিয়ে বিস্তর কথাও উঠত। যদিও কোনও কিছুই তাঁদের ভালবাসায় অন্তরায় হয়ে ওঠেনি। সমাজ যা-ই বলুক, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণের মা, ভাই এবং প্রথম পক্ষের দুই সন্তান রাধারানিকে সম্মান করতেন।

বঞ্চনা আর যন্ত্রণায় বিদ্ধ ছিল রাধারানির শৈশব। যদিও সে সব তাঁকে ইস্পাত-কঠিন করে তুলেছিল। জিয়াগঞ্জের প্রথিতযশা ব্যবসায়ী মহেন্দ্রনারায়ণ চন্দ্র ছিলেন তাঁর বাবা, মায়ের নাম ছিল দক্ষবালা দেবী। শোনা যায়, দক্ষবালাকে বিয়ে করেননি মহেন্দ্র। সে কারণে সমাজ তাঁদের সম্মানের চোখে দেখত না। ফলে শৈশব থেকে অনেক বিদ্রুপ সহ্য করতে হয়েছে রাধারানিকে। ছোটবেলায় বিয়ে বা উৎসব উপলক্ষে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নাচ-গান করে রোজগার করতে হত তাঁকে। নিজের বলতে এক বোন ছিলেন, যিনি রাসপাড়ার বাড়িতেই আমৃত্যু কাটিয়েছেন।

নবাবি আমল থেকে মারোয়াড়ি, রাজস্থানি আর বাঙালি হিন্দুর বাস ছিল জিয়াগঞ্জে। ফলে সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রায় মিশ্র প্রভাব পড়েছিল। সেই সময়ে জিয়াগঞ্জের অন্য পাড় আজিমগঞ্জে দশ-বারো জন জমিদার ছিলেন। ওড়িশার কেওনঝড়, অসমের তুরা, বাংলাদেশের ময়মনসিংহে তাঁদের জমিদারি ছিল। কর্মচারীদের উপরে সেই দায়িত্ব দিয়ে তাঁরা আজিমগঞ্জে ব্যবসা করতেন। কারণ মুর্শিদাবাদের চাল, আম, আমচুর, পাট আর রেশম ছিল মহামূল্য দ্রব্য। বালুচরি শাড়ির জন্মস্থান জিয়াগঞ্জের নাম ছিল ‘বালুচর’। গঙ্গা পেরিয়ে জলপথে সে সবের ব্যবসা হত। যে কারণে বিত্তবান এবং দরিদ্র, এই দুই সম্প্রদায়ই ছিল জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জে। বিত্তবান সমাজ বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ককে প্রশ্রয় দিত। জিয়াগঞ্জে তাঁদের এলাকা রাসপাড়া নামে পরিচিত ছিল।

রাধারানি থাকতেন সেখানে।

 

নেহালিয়া ম্যানসন থেকে রাসপাড়া

রাধারানির শৈল্পিক সত্তার জনক বলা যায় রায়বাহাদুর সুরেন্দ্রনারায়ণকে। এমনটা মানতেন স্বয়ং রাধারানিও। তাই রায়বাহাদুরকে ‘বাবা’ বলে সম্বোধন করতেন তিনি। সুরেন্দ্রনারায়ণদের আদি বাস উত্তরপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ডে। পূর্বপুরুষেরা পেশাদার সৈন্য ছিলেন। যুদ্ধ-রক্তে ক্লান্তি আসে তাঁদের। ব্যবসা করে অর্থ উপার্জনের তাগিদে পাড়ি জমান নবাবি শাসনাধীন মুর্শিদাবাদে। ধীরে ধীরে জমি কেনা-বেচায় মন দেয় এই পরিবার। তৈরি হয় জিয়াগঞ্জের নেহালিয়া ম্যানসন। 

নেহালিয়া ম্যানসন

খুদুর তীর্থস্থানের সমতুল সেই ম্যানসনের আজ একশো তিয়াত্তর বছর। নাটমন্দিরটি একশো পঁচিশ পেরিয়েছে। খুদু থেকে রাধারানির উত্তরণ-পর্বের আজও সাক্ষী সেই প্রাসাদের সামনের জীর্ণ বটগাছটি।

বটের ছায়াঘেরা আশ্রয় ছেড়ে প্রায় সাড়ে চার দশক কলকাতায় থেকেছিলেন রাধারানি। এই দীর্ঘ সময়ে শহরের উত্তর থেকে দক্ষিণে তাঁকে বারবার বাসা বদলাতে হয়েছে। রেডিয়ো শিল্পী হিসেবে তখন সবে নাম হচ্ছে তাঁর, নীহারবালার চণ্ডীবাড়ি স্ট্রিটের বাড়িতে তখন থাকতে শুরু করেন। 

পরে আসেন মসজিদ বাড়ি স্ট্রিটে। সেখান থেকে সেবক বৈদ্য স্ট্রিট, এলগিন রোড এবং সব শেষে ভবানন্দ রোডের ভাড়াবাড়িতে থেকেছেন রাধারানি ও নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ। উপার্জন থাকা সত্ত্বেও কলকাতায় তাঁর বাড়ি না কেনার একমাত্র কারণ মা দক্ষবালার অমত। মা চাইতেন, অবসর জীবনে মেয়ে জিয়াগঞ্জে ফিরুক। হয়েছিলও তাই। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণের মৃত্যুর কয়েক বছর পরে, সত্তরের দশকের প্রথমে তিনি রাসপাড়ায় পাকাপাকি ফিরে যান। 

 

আধ্যাত্মিকতা ও আত্মসম্মান

ছোট থেকেই রাধারানির আত্মসম্মান বোধ ছিল প্রখর। তাঁর স্মৃতিকথায়— ‘‘বাড়ির কাছে ছিল জিয়াগঞ্জ প্রেমকুমারী প্রাইমারি বিদ্যালয়। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি। কীর্তন গান গেয়ে আশপাশে একটু নাম ছড়াচ্ছে, স্কুলেও তা জানত। এক দিন স্কুল পরিদর্শনে জেলা থেকে আসার কথা ইনস্পেক্টরের। প্রধানশিক্ষক ননী মাস্টার আমাকে বললেন, ‘কাল স্কুলে আসতে হবে না।’ জানতে চাইলাম কেন? উত্তর এল, ‘তুমি তো গানবাজনা কর, সে জন্য।’ খুব কষ্ট হয়েছিল। পরদিন থেকে বন্ধ করলাম স্কুলে যাওয়া।’’

রাধারানির চরিত্রের আরও একটি বৈশিষ্ট্য আধ্যাত্মিকতা বোধ। তিনি নিজেই বলছেন, ‘‘নেহালিয়া ম্যানসন থেকে অনুষ্ঠান সেরে রাসপাড়ার বাড়িতে একা ফিরছি। বয়স তখন আট-নয় হবে। পথের দু’ধারে গভীর জঙ্গল, আঁধার। সম্বল বলতে, আসার সময়ে রায়বাহাদুর বাড়ি থেকে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হ্যারিকেন। বুক দুর দুর করছে। কে যেন পিছনে আসছে! সাহস নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, একটা কুকুর! সেই যে পিছু নিল। বাড়ির দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে তবে সরল সে। আমার বিশ্বাস, কৃষ্ণই সে দিন আমাকে আগলাতে এসেছিলেন।’’

আধ্যাত্মিকতা এবং আত্মসম্মান, এই দুই বোধের জোরেই সম্ভবত রাধারানি পরবর্তী সময়ে দু’টি বিপরীত ধারার জীবন যাপন করতে পেরেছিলেন। তাঁর শিল্পী জীবনের দু’টি পর্ব— কলকাতা ও জিয়াগঞ্জ। কলকাতায় বসবাসকালে খ্যাতি, প্রচার, ভালবাসা, সম্মান, সমালোচনা সবই তিনি পেয়েছিলেন। কিন্তু সফল হওয়ার পরেও বরাবরই তিনি ছিলেন মাটির কাছাকাছি। তাই জিয়াগঞ্জের দিনগুলিতে অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ রক্ষায় রিকশা করেই যেতেন‌ তিনি। জিয়াগঞ্জের বাসিন্দা সঙ্গীতশিল্পী বীরেন্দ্রপ্রসাদ হাজারি ওরফে রবিবাবুর কথায় উঠে এল সরস্বতী পুজোর স্মৃতি। পুজো উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হত। রিকশা ভাড়া আর চা-শিঙাড়ার বিনিময়ে ছাত্রদের সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে গাইতে যেতেন কীর্তন সম্রাজ্ঞী। একই দিনে পরপর চারটি অনুষ্ঠানেও গেয়েছেন। এমনকি রাতভর হরিসভাতেও গান গাইতেন তিনি। তা শুনতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসতেন মানুষ। বসার জায়গা না পেলে গাছেও উঠে পড়তেন শ্রোতারা। অথচ তত দিনে গ্রামোফোন রেকর্ড এবং ক্যাসেটে তাঁর বিভিন্ন গানের পাশাপাশি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে কীর্তন।

 

গার্স্টিন প্লেস যেন চাঁদের হাট

জিয়াগঞ্জের তুলনায় কলকাতার দিনগুলি তাঁর শিল্পীজীবনের স্বর্ণযুগ। এক নম্বর গার্স্টিন প্লেস যেন চাঁদের হাট! তখন অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর বিশেষ দায়িত্বে নৃপেন্দ্রনাথ মজুমদার। এ ছাড়াও পঙ্কজকুমার মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল, কাজী নজরুল ইসলাম, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, বাণীকুমার, অহীন্দ্র চৌধুরী, আঙুরবালা, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের উজ্জ্বল উপস্থিতির মাঝে ডুবে থাকতেন রাধারানি। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানেই তাঁর ঘরবাড়ি। চলত খাওয়াদাওয়া, মুড়ি মাখা-সহ আড্ডাও। ওই অবসরে চলত শিক্ষাও। রাধারানিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখিয়েছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। শেখানো বলতে, স্টুডিয়োয় গান তুলিয়ে সঙ্গে সঙ্গে রেকর্ডিং করানো। মহালয়ার ভোর হওয়ার আগেই স্নান সেরে লালপেড়ে গরদ পরে পৌঁছে যেতেন আকাশবাণীতে। ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শুরু হওয়ার কয়েক বছর পর থেকে এক যুগেরও বেশি সময় জুড়ে গান গেয়েছেন রাধারানি।

কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা ছিল অত্যন্ত মধুর। রাধারানির প্রতি ভরসা আর অধিকারবোধ ছিল তাঁর। কখনও আকাশবাণীর স্টুডিয়োয়, কখনও নজরুলের বাড়িতে রাধাকে (এ নামেই ডাকতেন) গান শেখাতেন‌ তিনি। রাধারানি স্মৃতিচারণে বলছেন, ‘‘প্রচুর পান খেতেন কাজীদা। গান লিখেই আমাকে গাইতে বলতেন। মনে পড়ে, এক বার আমাকে গাইতে বললেন, ‘আমি চিরতরে দূরে চলে যাব, তবু আমারে দেব না ভুলিতে।’ পাশে বসে তখন কে এল সায়গল সাহেব। কাজীদাকে থামিয়ে বলে উঠলেন, ‘এ গান রাধা নয়, আমি গাইব।’ তা-ই হল। এক বার আমার খাতায় নিজে একটি গান লিখলেন, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ।’ কাজীদার কথা মতো এই গান আমিই প্রথম গেয়েছিলাম।’’ পরে নজরুলের দীর্ঘ অসুস্থতার সময়ে তাঁর ক্রিস্টোফার রোডের বাড়ির দোতলায় পুরনো কাজীদাকে খুঁজতে বারবার ছুটে গিয়েছেন রাধারানি।

সকলের জন্য তাঁর সাহায্যের হাত বাড়ানোই থাকত। নরম মনের মানুষটি মা-মরা এক ২১ দিনের শিশুকে মায়ের স্নেহ দিয়ে পালন করেন। সেই পালক পুত্রের নাম ব্রহ্মপদ সরকার। পড়াশোনায় মন ছিল না ব্রহ্মপদের। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণের চেষ্টায় এক সরকারি দফতরে তাঁকে কাজ দেওয়া হয়। কম বয়সেই ব্রহ্মপদের বিয়ে দেন রাধারানি। তাঁর চার সন্তান— সমর, হরিপ্রিয়া, শেফালি এবং অরুণ। এঁদের নাতি-নাতনির স্নেহ দিয়ে বড় করেছিলেন শিল্পী। বিনিময়ে কিছুই আশা করেননি তিনি। তবে অবিবাহিতা শেফালি ছিলেন তাঁর সবচেয়ে কাছের। পেশায় শিক্ষিকা শেফালি, শিশু বয়সে রাধারানির কাছ থেকেই গানের প্রথম পাঠ নেন।

 

কাঁচালঙ্কা আর গাওয়া ঘি

‘‘রাধারানি বলতেন, ‘আমি গোটাগুটি গান শিখেছি, ভেঙে ভেঙে নয়।’ গোটাগুটি শেখার অর্থ হচ্ছে, সময় বেঁধে গান না শেখা। মঞ্জু সাহেব এবং কাজী নজরুল ইসলামের কাছ থেকে এই গোটাগুটির শিক্ষা পেয়েছিলেন তিনি,’’ বলছেন জিয়াগঞ্জের শিক্ষক শ্যামল রায়। রাধারানির সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় ওখানকার এক বাজারে, শিল্পী তখন উবু হয়ে বসে সজনে ডাঁটা দর করছেন! সময়টা সত্তরের দশকের মাঝামাঝি। এতটাই সাদাসিধে ছিলেন রাধারানি। আটপৌরে কায়দায় শাড়ি পরতেন। অনুষ্ঠানে যেতেন সবুজ বা কালো চওড়া পাড়ের সাদা খোলের তাঁতের শাড়ি পরে। বাড়িতে পরতেন মিলের ছাপা পাড়ের শাড়ি। গয়না বলতে, দু’হাতে একটি করে সোনার চুড়ি, কানে মাকড়ি। ফাইলেরিয়ার কারণে তাঁর এক পা অস্বাভাবিক ফোলা ছিল। তাই লুটিয়ে শাড়ি পড়তেন।

‘‘শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও মাটিতে বসে মশলা বাটা, আনাজ কোটা, নিমন্ত্রিতদের নিজের হাতে আমিষ-নিরামিষ পদ রেঁধে খাওয়ানো— সবই নিপুণ হাতে করতেন। লালদিদি ছিলেন এক অন্য ধাঁচের মানুষ। এক দিকে অত্যন্ত উদার। অন্য দিকে কিছুটা রক্ষণশীল,’’ তাঁর কথা মনে করতেই চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে শেফালির। দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন বলে নাতি-নাতনিরা তাঁকে ‘লালদিদি’ বলতেন। 

সালটা ১৯৮১। এক দিন মাটিতে পা ছড়িয়ে বসে আনাজ কাটছেন রাধারানি। হঠাৎ রেডিয়োয় তাঁর নাম ঘোষণা, দিল্লির সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমির পুরস্কার প্রাপক হিসেবে তাঁকে মনোনীত করা হয়েছে! শেফালি বলে ওঠেন, ‘‘লালদিদি, তুমি দিল্লি থেকে পুরস্কার পেয়েছ!’’ রাধারানি তখনও উচ্ছ্বাসহীন। ‘‘আসলে প্রতিভার সে ভাবে স্বীকৃতি না পাওয়াটা নিশ্চয়ই ওঁকে কষ্ট দিত, তাই ওই অভিব্যক্তি,’’ বললেন নাতি অরুণ।

খাওয়া নিয়ে খুব বেশি পছন্দ-অপছন্দ ছিল না তাঁর। মিষ্টি মোটেও পছন্দ করতেন না। নোনতা-ঝাল খেতে ভালবাসতেন। রোজ পাতে একটা কাঁচালঙ্কা চাই-ই তাঁর। আর রাতে খাওয়ার শেষে গাওয়া ঘি লাগত। শুতে যাওয়ার আগে বিছানায় বসে সেই ঘি খেয়ে আর খাট থেকে নামতেন না। ওঁর বিশ্বাস ছিল, এতে গলা ভাল থাকে।

লালদিদির কলকাতার সংসারে মাঝেমধ্যেই আসত ছোট্ট শেফালি। দোতলার ঘরে উঁকি মেরে দেখত, বিশাল লম্বা একটা লোক বইয়ের পাহাড়ে ঘাড় গুঁজে সারাদিন কী সব লিখে যাচ্ছে। পরে জেনেছিলেন তিনিই নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ! মায়ের কাছে শেফালি শুনেছিলেন, নৃপেন্দ্রকৃষ্ণের জন্যই কলকাতার বাড়িতে উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, ছায়াদেবী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের আনাগোনা লেগে থাকত।

 

রাজনীতির অন্দরে

দিল্লি রাজনীতির অন্দরেও রাধারানির পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। সেই সূত্রে জওহরলাল নেহরুর শেষ যাত্রায় রামধুন পরিবেশন করেন তিনি। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের শেষ যাত্রাতেও শামিল হয়েছিলেন রাধারানি। রাজনীতিবিদ শচীন চৌধুরী, পরে যিনি দেশের অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন, তাঁর মেয়েকে গান শেখাতেন কীর্তন সম্রাজ্ঞী। সেই সূত্রেই তাঁর রাজনৈতিক যোগ গড়ে উঠেছিল। কেন্দ্রে তখন মোরারজি সরকার। রাজ্যে বামফ্রন্ট। ছাত্র পরিষদের ছেলেরা তাই আন্দোলন চালাতে নিজেদের নামের আড়ালে নতুন সংগঠন গড়েন। মুর্শিদাবাদে সেই সংগঠনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাধারানি উপস্থিত থেকে উৎসাহ দিয়েছিলেন। 

আর্থিক বিষয়ে উদাসীন ছিলেন রাধারানি। দু’হাত উজাড় করে সকলকে সাহায্য করতেন। অথচ তাঁর অর্থসঙ্কটে কাউকে কাছে পাননি। সরকারের কাছে পেনশনের জন্য আবেদন করেও সাড়া মেলেনি। আত্মাভিমানী কীর্তন সম্রাজ্ঞীকে শেষ বয়সে শ্রাদ্ধবাড়িতে পর্যন্ত কীর্তন পরিবেশন করতে হয়েছে! অভাব মেটাতে তাঁর বহু শিল্পস্মৃতি বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। রবিবাবু বলছেন, ‘‘উনি তখন জিয়াগঞ্জের বাড়িতে একা থাকতেন। বড় দাদা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী রাজেন্দ্রপ্রসাদ হাজারি নিয়মিত দিদিকে দেখে আসতেন। দাদার ডাকনাম ছিল লালু। দিদি বলতেন, ‘লালু, আমি হারমোনিয়ামটা তো আর সামলে রাখতে পারছি না! কিন্তু ওটা কাকে বিক্রি করব?’ মেজদা এবং আমার সঙ্গে এ নিয়ে বড়দা আলোচনা করলেন। ওঁর কাছে প্রস্তাব দেওয়ার দায়িত্ব পড়ল আমার উপরে। এক দিন ওঁকে বললাম, ‘আমরা যদি আপনার হারমোনিয়ামটা রাখি?’ খুশি হয়ে বললেন, ‘সুরের পরিবারে যাবে আমার হারমোনিয়াম! আমার বিরাট বোঝা নামল।’ সামান্য প্রণামী দিয়ে ওটা নিয়ে আসি। একে বিক্রি বলা যায় না।

২৩ অগস্ট, ১৯৯৭। মেঘলা দিন শেষে রাতভর বৃষ্টি। সকাল হতেই ছড়িয়ে পড়ল খবরটা, রাধারানি দেবী নেই! বেলা বাড়তেই তাঁর প্রায় জীর্ণ বাড়িতে লোকারণ্য। শেষ যাত্রার আয়োজনের দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন তাঁর জনাকয়েক অনুরাগী। একলা পথিক রাধারানি যাওয়ার বেলায় বাতাসে ভাসিয়ে দিলেন তাঁর গাওয়া কাজীদার সেই গান, ‘যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই কেন মনে রাখো তারে। ভুলে যাও মোরে ভুলে যাও একেবারে।’

 

তথ্য ও ছবি: শ্যামল রায়, বীরেন্দ্রপ্রসাদ হাজারি, সত্যনারায়ণ সিংহ এবং শেফালি সরকার