সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

মুকুটটা তো পড়ে আছে, রাজাই শুধু নেই

প্রতিযোগিতা তৈরি করতেন শিল্পীদের মধ্যে, নিজের রান্না খাওয়ানোর জন্য স্ত্রীর উপোস ভঙ্গ করতেন। ছেলেমেয়েদের পৌঁছে দিতেন স্কুলে... তিনি বিখ্যাত সুরকার নচিকেতা ঘোষ। তাঁকে নিয়ে কথা বললেন পুত্র সুপর্ণকান্তি ঘোষ, শুনলেন ঊর্মি নাথ।

Nachiketa Ghosh

সময়টা বিশ শতকের মাঝামাঝি। প্রতি রবিবার ডাক্তার সনৎকুমার ঘোষের শ্যামবাজারের বাড়িতে তাঁর চেম্বার বদলে যেত গানের মজলিশে। সেই সময়ের প্রায় সব বিখ্যাত উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পীই ওই আসরে গান গেয়েছেন। রবিবারের এই মজলিশে সবচেয়ে উৎসাহী ছিলেন তাঁর বড় ছেলে নচিকেতা ঘোষ। ছোট থেকেই সংগীতে তিনি তালিম নিয়েছিলেন উস্তাদ দ্রাবিড় খান এবং সংগীতাচার্য অনাথ বসুর কাছ থেকে। সুর, রাগ, তান নচিকেতার রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তিনি স্বপ্ন দেখতেন, একদিন সুরের জাদুকর হবেন। কিন্তু স্কুলের পর ডাক্তারিটা তাঁকে পড়তেই হল। বাবা, তুতো দাদা, দিদি, জামাইবাবু সকলেই তো ডাক্তার। সুতরাং ডাক্তার তাঁকেও হতে হবে, এমনই ঘোষবাড়ির বিধান! ডাক্তারি পাশ করলেন তিনি। পিতার ইচ্ছাপূরণ হল। এ বার পালা নিজের ইচ্ছে মেটানোর। বাবার সম্পর্কে কথা শুরু করার আগে নচিকেতা ঘোষের পুত্র সুরকার সুপর্ণকান্তি ঘোষ বললেন, ‘‘আপনি ভাবতে থাকুন, নতুন কিছু প্রশ্ন চাই কিন্তু। ততক্ষণে একটা সিগারেট খেয়ে আসি।’’

একটি লেখায় পড়েছিলাম, আপনার বাবা সিগারেট খেলেই আপনি নাকি বেজায় আপত্তি করতেন? প্রশ্ন শুনে ঘুরে দাঁড়ালেন সুপর্ণকান্তি। ঠোঁটের কোণে বিস্ময়ের হাসি। স্মৃতির ঝাঁপির তালা খুলল, ‘‘বাবা ঘনঘন সিগারেট খেতেন। দু’টান দিয়েই ছুড়ে ফেলে দিতেন। খুব দামি সিগারেট খেতেন। আমি তক্কে তক্কে থাকতাম। সিগারেটটা ফেললেই নজর এড়িয়ে সেটা তুলে রাখতাম। পোড়া অংশটা কাঁচি দিয়ে কেটে যত্ন করে রেখে দিতাম! ওইগুলো বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতাম বলে আমার পজিশনটাই অন্য রকম ছিল। কী খাতির!’’ সুপর্ণকান্তির সিগারেট ব্রেক নেওয়া হল না। একটা স্মৃতির হাত ধরে বেরিয়ে এল আর এক স্মৃতি, সেই স্মৃতির শাখা থেকে আর এক শাখায়... নিজের হাতে চা তৈরি করে গুছিয়ে বসলেন তিনি। পেয়ালায় চুমুক দিয়ে সুপর্ণকান্তি বললেন, ‘‘একটা মজার ঘটনা বলি। বাবা তখন সবে স্কুল পাশ করেছেন। শীতের রাতে কলকাতায় তখন অনেক সংগীত সম্মেলন হত। এক সম্মেলনে বাবা তবলা বাজিয়ে অনেক রাতে বাড়ি ফিরলেন। ঠাকুমা ছেলের অপেক্ষায় জেগে। বাবা ঢুকেই তাঁর মাকে বললেন, ‘আজ কার সঙ্গে তবলা বাজিয়েছি, জানো? অভিনেত্রী নার্গিসের মা, জদ্দন বাইয়ের সঙ্গে।’ জদ্দন বাই সেই সময়ের ডাকসাইটে সংগীতশিল্পী। এ দিকে কথাটা বাবার ঠাকুমার কানে গেল। তিনি ছিলেন গোঁড়া হিন্দু। সঙ্গে সঙ্গে তিনি পরিচারিকাকে ডাকলেন। ওই ঠান্ডার রাতে বারান্দায় দাঁড় করিয়ে বাবার মাথায় বালতি বালতি জল ঢালা হল। বাবার শুদ্ধিকরণ হল। তার পর তিনি বাড়ির ভিতর ঢোকার অনুমতি পেলেন!’’

লতা মঙ্গেশকর ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে

ঘুম থেকে উঠেই গৌরী-পুলককে ফোন

আমৃত্যু নচিকেতা ঘোষের অভ্যেস ছিল, ঘুম থেকে উঠেই রেওয়াজ করতে বসা। শ্যামবাজারের বাড়ির তিনতলায় তাঁর বিশাল গানের ঘরে হারমোনিয়াম, তবলা, তানপুরা সাজানো থাকত। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে সংগীত পরিচালনার কাজ শুরু করেছিলেন নচিকেতা। প্রতিদিন দু’বেলা স্নান সেরে পুজো করে, ধুপকাঠি হারমোনিয়ামে ছুঁইয়ে সুর করতে বসতেন তিনি। সরস্বতী পুজোর তিথিতে জন্মেছিলেন তিনি। তাই তাঁর বাড়িতে সরস্বতী পুজো হত ধুমধাম করে। রাতে সুনিদ্রার জন্য তিনি ঘরের কালো ফোনটা খুলে অন্যত্র সরিয়ে দিতেন। সকালে ছেলে আবার যথাস্থানে ফোনটা রেখে দিতেন। ফোনটা রাখতেই, নচিকেতা ছেলেকে বলতেন, ‘গৌরীকে (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার) ধর’ বা ‘পুলককে (বন্দ্যোপাধ্যায়) ধর’। একটা গান তৈরির চিন্তা দিয়েই শুরু হত তাঁর অধিকাংশ দিন।

 মান্না দে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘পেশাদার সুরকারদের অনেক গানের সুর করতে হয়, কখনও কখনও নিজের অজান্তেই কোনও কোনও গানে একই পরদা ব্যবহার করা হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে নচিকেতা ছিলেন অত্যন্ত সচেতন ও স্বতন্ত্র সুরকার, একেবারেই রিপিটেটিভ ছিলেন না। নিজে ভাল তবলিয়া ছিলেন বলেই হয়তো

তাল ও সুরের ছন্দের প্রতি বেশি নজর থাকত।’’

উত্তম-সুপ্রিয়ার সঙ্গে

আমি আজ গজল গাইব

নচিকেতা ঘোষ মানুষটি ছিলেন আদ্যন্ত এক রসিক মানুষ। তিনি সব সময় একটি ছোট খাতা কাছে রাখতেন। নতুন কোনও সুর বা মুখড়ার সন্ধান পেলেই সেই খাতাতে লিখে রাখতেন। তিনি ওই খাতার নাম দিয়েছিলেন ‘ধোপার খাতা’! চল্লিশের দশকে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় এবং নচিকেতা ঘোষ নামকরা গজল গাইয়ের কাছে সবে গজল শেখা শুরু করেছেন। একটা গজলের প্রথম লাইন শেখা হয়েছে। সেই সময় এক পাড়ার জলসায় দু’জনেরই ডাক পড়ল গান গাওয়ার জন্যে। স্টেজে ওঠার আগে দ্বিজেনকে তিনি বলেছিলেন ‘‘আমি আজ গজল গাইব, কিন্তু তুই একদম হাসবি না।’’ শুরু করলেন তিনি, একটাই লাইন ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে গেয়ে গেলেন, আবার একটা লাইন নিজের মতো করে জুড়ে দিলেন। ওই গান শুনে লোক বেজায় হেসেও ছিল, আবার হাততালিও দিয়েছিল।

যদি বলি, একটা মাত্র শব্দ দিয়ে আপনার বাবাকে বোঝান... ‘‘আনপ্রেডিকটেবল!’’ প্রশ্ন শেষ হওয়ার আগেই উত্তর। তার পর একটু থেমে বললেন, ‘‘ধরুন, মাকে বাবা বললেন, রাতে ফুলকপি দিয়ে ভাল করে ভেটকি মাছ রাঁধতে। মা রাঁধলেন। বাবা রাত ন’টার সময় বললেন, ‘চলো চাইনিজ খেয়ে আসি।’ ভেটকি মাছ পড়ে রইল, সদলবল পার্ক স্ট্রিটের এক দামি রেস্তোরাঁয় বসে চাইনিজ খেলাম। ওখানে ফিলিপ নামে একজন ওয়েটার ছিলেন। বাবার মেজাজ ভাল থাকলে তাঁকে তিনি ‘স্টুয়ার্ট ফিলিপ’ বলে ডাকতেন। একদিন বললেন, ‘ফিলিপ, বেকড ফিশ খাব।’ ফিলিপ জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেকড ফিশ উইথ গ্রিন পি’স অ্যান্ড ব্যাম্বুশুট স্যর?’ বাবা উত্তরে বলেছিলেন, ‘ফিলিপ, ব্যাম্বু অন্য কাউকে দিও, আমাকে নয়। আমাকে শুধু পি’স দিলেই হবে!’ মেজাজ খারাপ থাকলে এই ফিলিপকেই ‘ফিলিপ মিল্ক অব ম্যাগনেশিয়া’ বলে ডাকতেন। সংগীতের ক্ষেত্রেও বাবা বিশেষ কোন নোটের পর কোনটা বসাবেন, তা অনুমান করা যেত না। একবার স্টার থিয়েটারে এক সংগীত সম্মেলনে রবিশঙ্করের সেতার শুনতে গিয়েছেন। ভোর তিনটে, রবিবাবু বিলম্বিত থেকে দ্রুতিতে যাবেন। বাবা কানে আঙুল দিয়ে দৌড়ে স্টার থিয়েটার থেকে বাড়ি চলে এলেন। যাতে কানে আর অন্য সুর না ঢোকে। এসেই বাড়ির সকলকে তুলে দিলেন। হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পড়লেন। ফোন করলেন গৌরীকাকুকে। তিনি কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, ‘কী করে আসব! বাস চলাই তো শুরু হয়নি!’ বাবা বললেন, ‘বাস চলা আরম্ভ হলেই চলে আয়। না হলে গানটা অন্য কাউকে দিয়ে দেব।’ তৈরি হল, ‘বনে নয়, মনে মোর পাখি আজ গান গায়।’ তার পর মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়কে বললেন, ‘আয়, একটা হিট গান গাইবি।’

 

দুর্ভিক্ষের সময়ও পাতে চিংড়ি

খেতে ভালবাসতেন যখন, বাজার করতেও নিশ্চয়ই ভালবাসতেন? ‘‘বাবাকে কোনও দিন ব্যাগ নিয়ে বাজারে যেতে দেখিনি। বাবা ছিলেন ঠাকুমার প্যামপার্ড চাইল্ড। শুনেছি, দুর্ভিক্ষের সময়ও বাবার জন্য ঠাকুমা বাজার থেকে গলদা চিংড়ি আনাতেন।’’এক কথায় জমিদারি মেজাজ বলতে যা বোঝায়!

‘‘খুব ভুল বলেননি। শুনেছি ঠাকুমা পূর্ববঙ্গের জমিদার বাড়ির মেয়ে। ছোটবেলায় বাবা মামাবাড়ি গেলে দাদুর মতো বাবার মাথায়ও পরিচারক রুপোর ছাতা ধরত। তবে বাবা শুধু খাদ্যরসিক ছিলেন না, খাওয়াতেও ভীষণ ভালবাসতেন। উনি রান্নাও করতেন চমৎকার। কোনও দিন বাবা রান্না করছেন, অথচ মা’র উপোস, সে দিন বাবার জেদের কাছে মার উপোস ভাঙতে হত। একবার বাবা কোনও একটা ছবির কাজ করছেন। বাড়ি ভর্তি সংগীত জগতের লোক উপস্থিত। বাবা ফোন করলেন বিধান সরণীর নামজাদা এক হোটেলে। বললেন, ‘আজ আপনাদের দোকানে জেনারেল কাস্টমারের কাছে আর ফাউল কাটলেট বিক্রি হবে না। সব কাটলেট আমার বাড়ি পাঠিয়ে দিন।’ প্রায় ৬০-৭০ পিস! বাড়িসুদ্ধ সকলে  সেই কাটলেট খেয়েছিল।’’

 

বায়োলজি পড়িয়েছিলেন

‘‘আমরা তখন মুম্বই থাকতাম। আমার দুই বোন শ্রাবণী ও সম্পূর্ণা আর আমাকে বাবা নিজে ড্রাইভ করে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। সেই রকমই একদিন ফেরার পথে তিনি সিগারেট কিনতে গিয়ে লক্ষ করলেন পাজামা পাঞ্জাবি পরা একজনকে। যেচে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি বাঙালি?’ তিনি ‘হ্যাঁ’ বলে নিজের পরিচয় দিয়ে জানিয়েছিলেন, তাঁর নাম মুকুল রায়। বিমল রায়ের অ্যাসিস্ট্যান্ট। টুকটাক গানও লিখছেন। বাবা তাঁকে সন্ধেয় বাড়িতে ডাকেন। মুকুলবাবু এলেন, তাঁর লেখা একটা গান দেখালেন, ‘তার আর পর নেই, নেই কোনও ঠিকানা।’ বাবা সঙ্গে সঙ্গে হেমন্তবাবুকে ফোন করে বললেন, ‘এসো, একটা হিট গান গাইবে।’ তখনই সুর তৈরি শুরু হল। গানের মাঝে ‘তার পর?’ বলবে একটি মহিলা কণ্ঠ। কিন্তু তখন অত রাতে মেয়ে কোথায় পান!  ঠিক হল, মুকুল রায়ের স্ত্রী, চাঁদ উসমানি ওটা বলবেন। চাঁদ সেই সময়ের নামী অভিনেত্রী। রাত প্রায় ন’টা, মুকুল রায় বাড়ি গিয়ে চাঁদকে নিয়ে এলেন। ওই রাতেই গান তৈরি হয়ে গেল।’’ স্কুলের প্রসঙ্গে টাইম মেশিন করে ছোটবেলার দিনে ফিরে গেলেন সুপর্ণকান্তি, বললেন, ‘‘উনি গান নিয়ে এত মত্ত থাকতেন যে, ওঁর ছেলে-মেয়েরা কোন ক্লাসে পড়ে তা তিনি মনে রাখতে পারতেন না। কিন্তু সেই বাবাই একদিন ঘরে এসে বললেন, ‘কী পড়ছিস?’ বললাম, ‘বায়োলজি।’ উনি বললেন, ‘আয় বইটা নিয়ে আমার কাছে।’ সে দিন তিনি খাতায় এঁকে কর্ণবিদ্যা পড়িয়েছিলেন। আজও আমার প্রতিটি শব্দ মনে আছে। আমাকে পড়া ধরুন, নির্ভুল বলে যাব!’’ বাবার কাছে কখনও বকুনি খেয়েছেন? হেসে ফেললেন সুপর্ণকান্তি, ‘‘তখন মুক্তি পেয়েছে ‘সীতা অউর গীতা’। স্কুল পালিয়ে দেখতে গিয়েছি। ৬৫ পয়সার টিকিটের লাইনে দাঁড়িয়েছি। সেই লাইন কন্ট্রোল করত একজন ষণ্ডামর্ক লোক। বাবা সেটা দেখেছিলেন। বাড়ি আসতেই বাবার বকুনি, ‘এর পর থেকে ৬৫ পয়সার লাইনে খবরদার আর দাঁড়াবে না। আমার কাছ থেকে টাকা নিয়ে, ভাল টিকিট কেটে সিনেমা দেখবে।’ ’’ প্রবল ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলে-মেয়েদের সময় দিতেন তিনি। কখনও তাদের নিয়ে চলে যেতেন জুহু বিচ। বল কিনে দিয়ে বলতেন খেলা করো। এই রকমই একদিন ছেলে–মেয়েদের স্কুলে পৌঁছে দিয়ে ফেরার পথে গাড়ি ড্রাইভ করা অবস্থাতেই হার্ট অ্যাটাক হয় তাঁর। ডাক্তার হওয়ায় নিজেই বুঝতে পেরেছিলেন, কী হতে চলেছে। কোনও রকমে ডাক্তারের কাছে পৌঁছে নিজেই বাতলেছিলেন ওষুধ।

ছেলে সুপর্ণকান্তির সঙ্গে

আজ আর কোনও বির্তক নয় সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে নচিকেতা ঘোষের জীবনকে দুটি অধ্যায়ে ভাগ করা যায়। তিনি প্রথম জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন ‘জয়দেব’ ছবিতে সুর দিয়ে। চল্লিশের দশকের শেষ থেকে ষাটের দশকের শুরু পর্যন্ত এই সংগীতকারের জীবন ছিল স্রোতের মতো। ফিল্মি গানের পাশাপাশি সুর দিতেন বেসিক গানেও। যা পুজোর সময় বা নববর্ষে প্রকাশ পেত। পঞ্চাশের দশকে এমন শিল্পী কমই ছিলেন যিনি নচিকেতা ঘোষের সুরে প্লেব্যাক করেননি। লতা মঙ্গেশকর প্রথম তাঁর সুরে বাংলা গান গেয়েছিলেন। সংগীত শিল্পীদের মধ্যে তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। এই তালিকায় ছিলেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, পিন্টু ভট্টাচার্য প্রমুখ। ষাটের দশকের শেষের দিকে সাত-আট বছর মুম্বইয়ে থেকে তিনি চলে আসেন কলকাতা। মুম্বইয়ে অফিস শেয়ার করতেন অভিনেতা সঞ্জীবকুমারের সঙ্গে। ‘‘একবার সঞ্জীবজির সঙ্গে দেখা, নিজের পরিচয় দিতেই তিনি বাবার নাম শুনে উৎফুল্ল হয়ে জানালেন, বাবা তাঁকে প্রায়ই বাঙালি রান্না করে এনে খাওয়াতেন।’’ কিন্তু বাংলার এক নম্বর সংগীতকার মুম্বইয়ে গিয়ে আঁচড়ই কাটতে পারলেন না। এর কারণ হিসেবে কোনও সদুত্তর পাওয়া গেল না পুত্রের কাছ থেকে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একটি সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে বলেছিলেন, ‘‘নচিকেতা এক্সক্লুসিভ ফর বম্বে কিছু কাজ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর বিশেষ একটা শিল্পীসুলভ ‘মুড’ যা আমাদের চিরচেনা, তা হয়তো অ্যাডজাস্টেড হতে পারেনি বোম্বাই ফিল্ম দুনিয়ার মানুষের কাছে। ফলশ্রুতি:ওই দশ বছর বম্বেও কিছু পেল না, বাংলাদেশও কিছু পেল না তাঁর কাছ থেকে।’’ শোনা যায়, যিনি নচিকেতাকে মুম্বই নিয়ে গিয়েছিলেন, তিনিই বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ‘‘আজ আর কোনও বিতর্কে যেতে চাই না। কাউকে দোষারোপ করতেও চাই না। যাঁর কথা বলছেন, তিনি ছিলেন বাবার অত্যন্ত প্রিয়। সাত-আট বছর বাবা কলকাতায় ছিলেন না, তাতে বাংলার মানুষ ধরে নিয়েছিল, বাবা মারা গিয়েছেন! ’’

 

শান্তাপ্রসাদ তবলা বাজালেন

বাংলা গানের ইতিহাসে নচিকেতা ঘোষের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হল ১৯৬৯ সালে ‘শেষ থেকে শুরু’ ছবি দিয়ে। ওই ছবিতে কিশোরকুমার গাইলেন ‘বল হরি হরি বল’। সারা জীবনে নচিকেতার সুরে ওই একটা গানই গেয়েছিলেন তিনি! ওই বছরই উত্তমকুমার সুপ্রিয়াদেবীর ‘চিরদিনের’ ছবিতে নচিকেতা ঘোষের সুরে মান্না দের কণ্ঠে ‘মানুষ খুন হলে পরে’ এবং ‘ফুলপাখি বন্ধু আমার’ সুপারহিট হয়। বাংলার মানুষের স্মৃতিতে ফিরে আসেন নচিকেতা ঘোষ তাঁর পূর্ব গৌরব নিয়ে। ‘‘আসলে বাবা তো কম্প্রোমাইজ করতেন না। ‘চিরদিনের’ জন্য বারাণসী থেকে তবলাবাদক পণ্ডিত শান্তাপ্রসাদকে নিয়ে এলেন। বাবার জেদ রাখতে ছবিতেও তবলাবাদক হিসেবে তাঁকে দিয়ে অভিনয় করানো হল। কিন্তু এডিটিংয়ের সময় দেখা গেল শান্তাপ্রসাদের আঙুল বাজনার সঙ্গে মিলছে না। এ দিকে পণ্ডিতজিও বারাণসী চলে গিয়েছেন। অবশেষে হাতের মেকআপ, জামা ইত্যাদি মিলিয়ে রাধাকান্ত নন্দীকে দিয়ে আঙুল মিলিয়ে শ্যুট করানো হয়েছিল। ভাল গানের জন্য বাবা বোধহয় মানুষ খুনও করে ফেলতে পারতেন! এতটাই ডেডিকেশন ছিল তাঁর। ভাল লিরিকের জন্য বাবা কী না করতেন! গানের প্রথম লাইন লিখে বাবা তিন-চার জনকে ডেকে বলতেন গান লিখতে। যাঁরটা ভাল হবে, তাঁরটা নেবেন। গীত রচয়িতাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা লাগিয়ে দিতেন। যাতে সেরাটা পেতে পারেন। মনে আছে তখন ‘ফরিয়াদ’ ছবির গান তৈরি হচ্ছে। সেই সময় মিসেস সেন (সুচিত্রা সেন) বাবাকে বললেন, তিনি রেকর্ডিংয়ের আগে একবার গানগুলো শুনতে চান। তিনি শুনলেন। একটা গান ছিল ‘নাচ আছে গান আছে, রূপেরও তুফান আছে ...’ আশা ভোঁসলে গাইবেন। এই গানের মাঝে হাসি ছিল।
মিসেস সেন বাবাকে বললেন, ‘আপনি এক্ষুনি হাসিটা রেকর্ড করে নিন। ওটা আমার গলায় থাকবে।’ বাবা তা-ই করলেন। রেকর্ডিংয়ের আগে মুম্বইয়ে বাবা আশাজিকে গানটা বুঝিয়ে, বলে দিলেন হাসির জন্য কতটা সময় ফাঁকা রাখতে হবে। আশাজি হাসিটা শুনলেন, তার পর বাবাকে বললেন, তাঁকে একবার সুযোগ দেওয়া হোক হাসিটা হাসার জন্য। আশাজি এমন হাসি হাসলেন যে, মিসেস সেনও অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। বাবা আশাজিকে বলেছিলেন, তুমি মিসেস সেনের মতো হাসতে পারবে না। ব্যস! তাতেই কাজ হয়েছিল। ‘ফরিয়াদ’-এ ‘এ ছুরি জানে ভানুমতির খেল’। এই গানটিতে ‘লুটেরা ছুরি’, ‘খুনেরা ছুরি’ এই শব্দগুলো সমরেশ বসুর মাথা থেকে এসেছিল। গানের কথায় অভিনব শব্দের জন্য বাবা সমরেশ বসুর উপর নির্ভর করতেন। বাবা আর সমরেশবাবুর মধ্যে শব্দচর্চা হত পার্ক স্ট্রিটের বিখ্যাত এক বারে।

স্ত্রী শিবানীর সঙ্গে

লেড়ো বিস্কুটের আওয়াজ

‘‘বাবার মতো পারফেকশনিস্ট আমি খুবই কম দেখেছি। ‘ধন্যি মেয়ে’র ‘যা যা বেহায়া পাখি’ গানটায় অনেক পাখির ডাক আছে। সেটা প্রণব মুখোপাধ্যায়ের লেখায় ছিল না। ওটা বাবার ক্রিয়েশন। পাখির ডাকগুলো করিয়েছিলেন হরবোলা মন্টু বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে। ‘ঠাকুরমার ঝুলি’ রেকর্ডিংয়ের সময় হেমন্ত মুখোপাধ্যায় থেকে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়... কে নেই সেখানে! রাক্ষুসির গলায় ‘মুড়মুড় খাই আগে অজিতের মুণ্ডি, কুড়মুড় পরে খাই কুসুমের পিণ্ডি।’ এই কুড়মুড় আওয়াজটা তৈরি করার জন্য তিনি উপস্থিত সকলের হাতে লেড়ো বিস্কুট ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তার পর সকলে মিলে মাইকের সামনে সেই লেড়ো খাওয়ার আওয়াজই ছিল রাক্ষুসির কুড়মুড়ানি।’’

 মাত্র ৫১ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলেন তিনি। বাংলা সংগীতজগৎ নিমেষে থমকে গিয়েছিল! এত কাজের পরও তিনি তেমন কোনও বড় সম্মান বা পুরস্কার পাননি। কিন্তু বাংলা গানের ইতিহাসে তিনি যে রত্নভাণ্ডার রেখে গিয়েছেন, তা আজও সমান উজ্জ্বল। তাঁর কিছু অপ্রকাশিত গান নিয়ে ‘গুরুকৃপাহি কেবলম’ নামে একটি অ্যালবাম রিলিজ করেছেন সুপর্ণকান্তি ঘোষ। বাবাকে নিয়ে আমৃত্যু কাজ করে যেতে চান এই সুরকার।  

তথ্য সহায়তা: নচিকেতা ঘোষ

সম্পাদনা: অশোক দাশগুপ্ত

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন