• দীপান্বিতা মুখোপাধ্যায় ঘোষ ও নবনীতা দত্ত
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

হাত ধরা থাক সন্তানের

সামাজিক চাপ থাবা বসাচ্ছে শৈশব ও কৈশোরেও। তার থেকে বার করে এনে সন্তানকে কী ভাবে দেবেন চাপমুক্ত ভবিষ্যৎ?

mother and daughter

বন্ধুর দেখাদেখি মুকুটেরও চাই মিউজ়িক্যাল পেনসিল বক্স।

আরশির গার্জিয়ান কল হয়েছে। স্কুলে সে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলছে।

সবুজ আবার সারা দিন ব্যস্ত মোবাইল আর ভিডিয়ো গেমে। 

প্রায় প্রত্যেক মা-বাবা এই দৃশ্যের সঙ্গে পরিচিত। বাড়ির খুদেটির ইচ্ছে পূরণে উৎসাহী হলেও তাদের বায়নাক্কায় অস্থির। অন্য দিকে শিশুটিও সামাজিক চাপের শিকার। তার অজান্তেই সে ঢুকে পড়ছে এক প্রতিযোগিতার চক্রব্যূহে। সন্তানকে এই গোলকধাঁধা থেকে বার করে আনার দায়িত্ব কিন্তু মা-বাবারই। সামাজিক চাপ থেকে জন্ম নেওয়া শৈশবের এই ছোট ছোট বায়না বয়ঃসন্ধিতে গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। বয়সের সঙ্গেই চাহিদা বাড়তে থাকে ও ধরন পালটায়। তবে রাশ আপনার হাতেই। তাকে সঠিক ভাবে চালনার দায়িত্বও আপনারই।

মা-বাবাদের যা করণীয়

• সন্তানকে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। তার ভুল সংশোধন করার আগে বরং ভুলের কারণ জানা জরুরি
• বাচ্চাদের সমস্ত চাহিদা কখনওই পূরণ করবেন না। নিজের সাধ্যও সন্তানকে বোঝানো প্রয়োজন 
• আপনার সন্তানের বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করুন। তাদের পরিবার কেমন জানার চেষ্টা করুন। তা হলে বাচ্চা কখন কী করছে বা চাইছে, সেটার কারণ সহজেই বুঝতে পারবেন
• সন্তানের যতটা স্পেস প্রয়োজন, তাকে দিতে হবে। তাতে নাক গলাবেন না। তবে নজর রাখুন তার কাজে

পাঠ শুরু হোক স্কুলজীবনেই

• সাধারণত স্কুলজীবন শুরুর পরেই বহির্জগতের সংস্পর্শে আসে শিশুরা। তখনই বন্ধুদের প্রভাব পড়তে শুরু করে তাদের জীবনে। সেই প্রভাব ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’রকমই হতে পারে। মা-বাবাকে শেখাতে হবে, তার সন্তান কোনটা গ্রহণ করবে আর কোনটা নয়। এই শিক্ষাটাই সকলের আগে জরুরি। সব বাচ্চার এক রকম সমস্যা হয় না। তাই একে একে সমস্যা ধরে এগোতে হবে।

• সন্তানের সবচেয়ে কাছের মানুষ হল তার মা-বাবা। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেই জায়গা দখল করে নেয় বন্ধুরা। ফলে বন্ধুদের দ্বারা তারা বেশি প্রভাবিত হয়। সন্তানকে বুঝতে হলে তার সঙ্গে বেশি করে সময় কাটান। সময়ের অভাব থাকলে ফোনে তার সঙ্গে কথা বলুন। তাই বলে বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে বারণ করবেন না। জীবনে বন্ধুর প্রয়োজনীয়তাও আছে বইকি! বন্ধুর সঙ্গে আপনার সন্তানের ঝগড়া বা মারপিটের মাঝে ঢুকবেন না। সমস্যা ওদেরই মেটাতে দিন।

• বাবা-মা দু’জনেই কর্মরত হলে অনেক সময়েই উপহার দিয়ে তারা বাচ্চাদের ব্যস্ত রাখেন। বয়সের সঙ্গে চাহিদাও বাড়তে থাকে। অন্যের দেখে জিনিস চাওয়ার প্রবণতাও তৈরি হয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অভিরুচি চট্টোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘প্রথমেই দরকার লিমিট সেটিং। সন্তানকে নিজের সাধ্যটা বোঝাতে হবে। সে কত দূর পর্যন্ত চাইতে পারে সেটা বোঝানো দরকার। কিছু বাচ্চার স্বভাব থাকে শুধু চাওয়া। দিনে কত বার ডিমান্ড করছে, তা গুনে রাখুন। তার সঙ্গে চুক্তি করুন। সে যদি চাওয়া কমায়, তা হলে একটা উপহার পাবে। এটাই হল বিহেভিয়র মডিফিকেশন টেকনিক।’’

• রোজকার রুটিনে তার জন্য কিছু কাজ বরাদ্দ করুন। নিজের জামা গোছানো, গাছে জল দেওয়া, বোতলে জল ভরা... বাড়িতে এমন ছোট ছোট কাজ থাকে, যা বাচ্চারা করতে পারে। এমন কাজে তাকে ব্যস্ত রাখুন। তার সময়ও কাটবে। নিয়মানুবর্তিতা শিখবে। মোবাইল বা টিভি দেখার স্ক্রিন টাইমও কমবে।

• আঁকা, নাচ, গান, সাঁতারে অংশ নিতে দিন। এতে সে তার মনের খোরাক পাবে। নতুন জিনিস শেখার জন্য উৎসাহী থাকবে, ফলে কিছুটা সময়ও ভাল কাজে ব্যয় হবে। বড় হয়ে পেশা নির্বাচনে সুবিধে হবে। উঁচু ক্লাসে শুধু পড়াশোনার উপরে জোর দিতে গিয়ে বাকি সব অ্যাক্টিভিটি বন্ধ করে দেবেন না। 

• অনেক সময়ে বাচ্চারা বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলে। সেটা মিথ্যেও হতে পারে। ডা. অভিরুচি চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘বাচ্চারা কল্পনার জগতে থাকে। তা থেকেই বানিয়ে কথা বলার প্রবণতা তৈরি হয়। বাচ্চার মিথ্যে যদি কারও ক্ষতি না করে, ঠিক আছে। কিন্তু সে যদি নিজের সুবিধের জন্য মিথ্যে বলে, তখন বাধা দিন। কিছু বাচ্চা মারপিট করে। অহেতুক কুকুর, বিড়ালকে উত্যক্ত করে। একে বলে কনডাক্ট ডিজ়অর্ডার। তখন বিহেভিয়র মডিফিকেশন টেকনিকের মাধ্যমে শোধরাতে হবে তাকে। না হলে সে বড় হয়ে অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়তে পারে।’’

ছোট বয়সে সন্তানকে ইচ্ছে মতো চালনা করা সহজ। কিন্তু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিজস্ব মতামত এত প্রবল আকার ধারণ করে যে, মা-বাবার আওতার বাইরে চলে যায়। উত্তেজিত না হয়ে মা-বাবাকে ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নিতে হবে। 

 

বয়ঃসন্ধিতে সমস্যাগুলো আরও জটিল

টিনএজাররা এমন অনেক কাজ করে যেগুলো বাবা-মায়ের ধারণার বাইরে। অনেকে বন্ধুদের নিত্যনতুন কিছু কিনে তাক লাগিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ব্যাগ থেকে টাকা সরায়।

টিনএজে অনেক বাধা-নিষেধ উঠে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে একলা বেরোনোর অনুমতি পাওয়া যায়। পেরেন্টিং কনসালটেন্ট পায়েল ঘোষ কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করলেন। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে পার্টিতে যাওয়া, নাইট স্টে, ‘আমারও বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড থাকতে হবে’— এ রকম চাহিদা তৈরি হয়। বাবা-মা সেগুলো মেনে না নিলে অনেক সময়ে সন্তান বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। টিনএজাররা নেশার কবলে পড়ছে, এমন উদাহরণ অজস্র। নেশায় জড়ানো তাদের কাছে বড় হওয়ার একটা ধাপের মতো। বন্ধুদের কাছে স্মার্টনেস দেখাতে কখন যে আসক্তি তৈরি হয়, সেটাই বোঝা যায় না। 

• যে ছেলেটি ছোটবেলায় এক রকম স্বভাবের ছিল, টিনএজে গিয়ে সে বদলে যেতেও পারে। তাই ‘ছোটবেলায় তো তুমি এ রকম ছিলে না!’ এই কথাটি বলা উচিত নয়। কেন ছেলেটি বা মেয়েটি হঠাৎ করে বদলে গেল, সেই কারণটা দেখতে হবে। আপনিই যে সন্তানের সবচেয়ে কাছের বন্ধু, এই ধারণাটা ওদের মধ্যে ছোট থেকেই বুনে দিতে হবে। কিছু হলে তারা আপনার কাছেই আসবে। সন্তানের মনের আন্দাজ পাওয়া খুব জরুরি। 

• যে বাচ্চাটি ছোটবেলায় আত্মীয়দের বাড়ি যাওয়ার নাম করলেই খুশি হত, সে হঠাৎ করে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে জোর করবেন না। যেতে না চাওয়ার কারণ জিজ্ঞেস করুন। যদি দেখেন তার বক্তব্যে যুক্তি আছে, তা হলে জোর না করাই ভাল।

• টিনএজ ব্যক্তিত্ব তৈরির আদর্শ সময়। সন্তানকে বাড়ির কাজে সামিল করুন। কোনও নিমন্ত্রণ বাড়িতে কী উপহার নিয়ে যাওয়া যেতে পারে সে ব্যাপারে পরামর্শ নিন। বাড়ি সাজানো থেকে অন্যান্য কাজেও তাকে যুক্ত করুন। 

• বাবা-মায়ের ব্যাগ থেকে টাকা সরানোর অভ্যেস থাকলে কড়া শাসন করুন। টাকা রোজগার করা কতটা কঠিন সন্তানকে বোঝান। বাড়ির মানি ম্যানেজমেন্টেও তাকে সামিল করতে পারেন। মাঝেমাঝে বাড়ির ফোন বিল, ইলেকট্রিক বিল তার হাত দিয়েই জমা করাতে পারেন। তা হলে সাংসারিক খরচ সম্পর্কেও তার ধারণা তৈরি হবে।

• কেরিয়ারের জন্য এই সময়টা খুব জরুরি। সন্তানকে রোজ পড়তে বসার জন্য, রোজগেরে হয়ে ওঠার জন্য সরাসরি চাপ দেবেন না। বরং তাকে বাজার করার দায়িত্ব দিন। মাসে সংসার খরচের হিসেব করতে দিন। খরচ সম্পর্কে ধারণা হলেই সে কিন্তু রোজগারের গুরুত্ব বুঝে যাবে। 

• বয়ঃসন্ধিতে শারীরিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ জন্মায়। পায়েল ঘোষ বলছিলেন, ‘‘সন্তানের সেক্স এডুকেশন নিয়ে আমাদের ছুতমার্গ রয়েছে। কিন্তু অভিভাবকেরা সন্তানের কাছ থেকে যেটা চেপে যাচ্ছেন, তারা কিন্তু ঘুরপথে সেটা জেনেই যাচ্ছে। সেটাই ক্ষতি করছে। এর চেয়ে আপনি খোলাখুলি কথা বলুন।’’ অপরিণত বয়সে যৌন সম্পর্ক কতটা ক্ষতিকারক হতে পারে সেটা বুঝিয়ে বলুন। আপনার সন্তানের যাতে ক্ষতি না হয় এবং সে যাতে অন্য কারও ক্ষতি না করে, সে দিকেও নজর দেবেন। 

সামাজিক চাপ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে চেহারা বদলায়। কিন্তু এ ভাবে আপনি সন্তানের ব্যক্তিত্বের ভিত্তি সুদৃঢ় করে তাকে দিতে পারেন উজ্জ্বল এক ভবিষ্যৎ।

মডেল: হিন্দোলা, সুস্মেলি, পূজিতা, ঐশিকী; মেকআপ: মৈনাক দাস (হিন্দোলা, ঐশিকী), প্রিয়া গুপ্তা (সুস্মেলি, পূজিতা);  ছবি: অমিত দাস, সুপ্রতিম চট্টোপাধ্যায়;  লোকেশন: আইবিস, রাজারহাট, ভর্দে ভিস্তা ক্লাব, চক গড়িয়া

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন