আনমনে সৃজা পেয়ারার টুকরো মুখে পুরে চিবোতেই আচমকা ব্যথা! তার পর থেকে যে কোনও খাবার চিবোলেই কষ্ট...আবার ত্বরিতার ঘুম থেকে উঠলেই কানের চারপাশে কেমন যেন অসহ্য যন্ত্রণা। অনেক সময়েই কান থেকে মাথা অবধিও যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে।

 

এ ব্যথা কী যে ব্যথা!

ত্বরিতা বা সৃজার মতো আপনিও কি কখনও এ রকম ব্যথার শিকার হয়েছেন? সঙ্গে ‘হাঁ’ করতে সমস্যা? মুখ খুলতে বা বন্ধ করতে কষ্ট হচ্ছে? সব ক’টি লক্ষণ প্রকট হলেই বুঝবেন, সমস্যার শিকড় লুকিয়ে রয়েছে চোয়ালে। মুখমণ্ডলের চোয়ালে ব্যথার কারণ আর্থ্রাইটিস।  ‘‘ব্যথার ধরন ও তা কতক্ষণ ধরে হচ্ছে বুঝেই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হয়, এটা কী ধরনের আর্থ্রাইটিস। ঠিক চিকিৎসার জন্য আর্থ্রাইটিসের প্রকার নির্ধারণ করা জরুরি,’’ জানালেন ডা. পারমিতা গঙ্গোপাধ্যায়।

 

সমস্যার শিকড়

আর্থ্রাইটিসের হরেক প্রকারভেদ। অস্টিও আর্থ্রাইটিসে অস্থিসন্ধিতে যে নরম হাড়ের মতো আবরণ বা কার্টিলেজ থাকে, সেটি ক্ষয়ে যায়। আবার রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হল, অটোইমিউন ডিজ়অর্ডার অর্থাৎ দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অস্বাভাবিক আচরণের দরুন এই সমস্যা দেখা দেয়। এ থেকে পরবর্তী কালে হাড়েরও ক্ষতি হতে পারে। কোনও আঘাত বা সার্জারির কারণে হতে পারে পোস্ট ট্রমাটিক আর্থ্রাইটিস। আবার ব্যাকটিরিয়ার সংক্রমণের দ্বারা হয় সেপটিক আর্থ্রাইটিস। যত ধরনের আর্থ্রাইটিস হয়, তার সব ক’টিই চোয়ালের সন্ধিকে (টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্ট) প্রভাবিত করতে পারে। মাংসপেশি ও হাড় দ্বারা গঠিত টেম্পোরোম্যান্ডিবুলার জয়েন্টের গঠন অত্যন্ত জটিল। এই জয়েন্ট খাওয়া, চিবোনো বা কথা বলার সময়ে মুখ খোলা এবং উপরের ও নীচের চোয়াল একসঙ্গে এনে মুখ বন্ধ করতে সাহায্য করে। আর্থ্রাইটিসের কারণেই চোয়ালের জয়েন্ট নাড়ানোর সময়ে ব্যথা ও আরও নানা সমস্যা প্রকট হয়। এটি চোয়ালের এক দিকে বা উভয় দিকেই হতে পারে। সমস্যা জটিল হলে কোনও অংশে ফোলা ভাবও দেখা যায়। এক্স রে-র সাহায্যে আথ্রাইটিসের ধরন নির্ণয় করার পরেই শুরু হয় চিকিৎসা। কিন্তু এতে কাজ না হলে সিটি স্ক্যান, এমআরআই করারও দরকার হতে পারে। এরই সঙ্গে করতে হয় বেশ কয়েকটি রক্ত পরীক্ষাও।

 

ঝুঁকি কার বেশি 

পরিবারে বাতের ব্যথার ইতিহাস থাকলে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দেন চিকিৎসক। চোয়ালে আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি বেশি কাদের? ডা. গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, ‘‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আর্থ্রাইটিসের সম্ভাবনা বাড়ে। কিন্তু ২০ থেকে ৪০ বছর বয়সেও চোয়ালে বাত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। শারীরবৃত্তীয় ও হরমোনগত কারণে মেয়েরা এই রোগে বেশি আক্রান্ত হন। কখনও জয়েন্টে আঘাত বা অন্য রোগ হয়ে থাকলে পরবর্তী কালে আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। আবার কখনও দাঁতে দাঁত চাপার অভ্যেস থাকলে এই বাতের সমস্যা হতেই পারে। ঠান্ডায় এই যন্ত্রণা বাড়ে।’’ 

 

উপশমের সন্ধান 

দন্ত বিশেষজ্ঞের কাছেই রয়েছে সমস্যার সন্ধান। তিনি জয়েন্ট পরীক্ষা, জয়েন্টের নড়াচড়া স্বাভাবিক কি না ইত্যাদি পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন ব্যথার কারণ। রোজকার জীবনযাপনে পরিবর্তন আনতে পারলে এই রোগের প্রকোপ অনেকটাই কমে যাবে বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা। তার পরে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ নিতে হবে। প্রয়োজনে ফিজ়িয়োথেরাপির সাহায্যও নেওয়া হয়। থেরাপিউটিক এক্সারসাইজ়ের মাধ্যমে চোয়ালের বাত থেকে মুক্তি মেলে। আবার ইনট্রা-আর্টিকুলার ইনজেকশনেরও দরকার পড়ে। কিন্তু এতেও কাজ না হলে জয়েন্ট সার্জারির সাহায্য নিতে হয়। 

চোয়ালের আর্থ্রাইটিস অনেক সময়েই ঠিক চিকিৎসার অভাবে দাঁত ও মাড়িতেও ব্যথা ছড়িয়ে পড়তে পারে। ব্যথা বাড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মাউথ গার্ডও ব্যবহার করতে পারেন।

 

ভাল থাকার দাওয়াই

সুস্থ থাকতে হলে রোগের চিকিৎসাই যথেষ্ট নয়। বরং প্রাথমিক শর্ত হল সচেতনতা। সাধারণত চোয়ালে আর্থ্রাইটিস সম্পর্কে অনেকেই ওয়াকিবহাল নন। তাই রোগ বুঝতেই অনেক সময় লেগে যায়। তবে সমস্যা তৈরি হলে চিকিৎসক বলছেন, ‘‘নিজে থেকে ব্যথা কমানোর ওষুধ খাবেন না। অযথা ফেলে রাখলে বিপদ বাড়তে পারে। চোয়ালের বাত খুব চেনাজানা রোগ নয়। অবশ্যই জটিল চিকিৎসা পদ্ধতি এবং তা সময়সাপেক্ষ। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসা শুরু হওয়াটা জরুরি।’’

মডেল: তৃণা; মেকআপ: পরিণীতা সরকার;  ছবি: অয়ন নন্দী