অভিনেত্রী সারা আলি খান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, কৈশোরে তাঁর অতিরিক্ত ওজনের জন্য দায়ী হরমোনের অসুখ পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম। এই রোগে শরীরের ওজন কমানো শক্ত, সঙ্গে অন্যান্য কষ্টও প্রবল। শুধু সারা নন, বর্তমানে বয়সভেদে বহু মহিলাই এই রোগে আক্রান্ত। দাঁত, কান-গলা, ত্বক, মাথা বা পেট ব্যথা নিয়ে যতটা চিন্তাভাবনা, তার এক কণাও পায় না হরমোনের যন্ত্রণা। অথচ প্রথম কৈশোরের ব্রণ, নতুন মায়ের চুল উঠে যাওয়া, শরীরের হঠাৎ ফোলা ভাব, মেয়েদের ঠোঁটের উপরে ও থুতনিতে ঘন রোম— সবেতেই হরমোনের সমস্যা। ওষুধ খাওয়া ও নিয়মমাফিক জীবনচর্যায় হরমোনের ইমব্যালান্স সহজেই সামাল দেওয়া যায়।

 

হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় কেন?

অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি থেকে যে রাসায়নিক বার হয়, তা রক্তের মাধ্যমে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে নানা বার্তা পৌঁছে দেয়। তার ফলেই খিদে পায়, ঘুম হয়, ত্বক নিটোল থাকে, মেজাজ ফুরফুরে লাগে, প্রজননক্ষমতা ঠিক থাকে। কিন্তু জীবনের নানা সন্ধিক্ষণে বা বড় অসুখে এই সব ক্ষরণ কম বা বেশি মাত্রায় রক্তে মেশে। অথবা নির্দিষ্ট অঙ্গে ঠিকঠাক পৌঁছয় না। ফলে কোন কাজটা কখন করতে হবে, শরীরের কলকব্জায় সেই নির্দেশ পৌঁছয় না। তখনই রোগে ধরে। বলা হয় হরমোন লেভেল ঠিক নেই।

স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ ড. চন্দ্রিমা দাশগুপ্ত জানালেন, মেয়েদের বয়ঃসন্ধির সময়ে, সন্তান জন্মের পরে ও প্রৌঢ়ত্বে এই সমস্যা হতে পারে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কিছু ক্রনিক অসুখেও এই কষ্ট ভোগ করেন। ডায়াবিটিস, থাইরয়েড, কিডনির রোগ থাকলেও হরমোনাল ইমব্যালান্স হতে পারে। ‘‘মহিলারা পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি হরমোনের উৎপাত সহ্য করেন। পুরুষদের শরীরে এই ধরনের অসুখের প্রতিরোধক থাকে। মেয়েদের সেটা ততটা নেই,’’ জানালেন এন্ডোক্রিনলজিস্ট ড. শুভঙ্কর রায়চৌধুরী। 

 

নির্বিঘ্নে ঘুমের টোটকা 

• শারীরবৃত্তীয় ও পরিবেশগত কারণে রাতভর ঘুমই হরমোন লেভেলকে বিপন্মুক্ত রাখার জন্য ভাল। কিন্তু পেশার খাতিরে অনেকেই রাত জেগে কাজ করেন। সে ক্ষেত্রে চেষ্টা করুন রোজ অন্তত একই সময়ে ঘুমোতে
• ঘুমের সময় বারবার উঠবেন না। সাত-আট ঘণ্টা টানা পর্যাপ্ত ঘুম যে কোনও অসুখকেই ঠেকিয়ে রাখে
•  জোরে শব্দ, টিভি মোবাইলের আলো স্নায়ু উদ্দীপ্ত করে ঘুমে বাধা দেয়। রাত দশটার পর ‘স্ক্রিন টাইম বন্ধ’ নীতি অবলম্বন করুন। অর্থাৎ টিভি, সোশ্যাল সাইট সব বন্ধ, আলোর সুইচ অফ রাখুন
• একেবারেই ঘুম না এলে চিকিৎসক মৃদু ডোজ়ের ঘুমের ওষুধ দেন। দু’-তিন দিন খেলে আপনা হতেই ঘুমানোর অভ্যেস ফিরবে। ওষুধের কুপ্রভাবও পড়বে না

কোন কোন অসুখ হয়

হরমোনের ভারসাম্যের তারতম্যে বয়সের হেরফেরে নানা রকমের রোগ দেখা দেয়। ‘‘সবচেয়ে পরিচিত ‘পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিওএস’। এটি কিশোরীবেলার রোগ। রোগী এ ক্ষেত্রে প্রতি মাসের বিশেষ দিনগুলোয় অনিয়ম টের পাবেন। কিছু দিনেই তাঁর ওজন বাড়বে, অ্যাকনে হবে। মাথার চুলের গোছ কমবে। অথচ হাতে, মুখে অবাঞ্ছিত রোম দেখা দেবে। এই ধরনের উপসর্গের ভিত্তিতে রক্তপরীক্ষা ও রক্তকণার জৈব বিশ্লেষণ করে এবং আলট্রা সাউন্ড পরীক্ষার মাধ্যমে রোগের প্রকৃতি নির্ণয় করা হয়। তার পরে ওষুধ দিয়ে রোগ কমানোর চেষ্টা চলে। ‘‘সাধারণত ২২-২৩ বছর বয়সের পরে অনেকেরই সমস্যা কমে আসে,’’ বললেন স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ ড. সর্বাণী ঘোষ। 

 

বয়স বাড়লে হরমোনের অন্যান্য অসুখ

গর্ভাশয় সদ্য কাজ করতে শুরু করলে হরমোনের যে রোগগুলি দেখা দেয়, সেগুলি পরে সেরে যায়। না সারলে, পরবর্তী কালে সন্তানধারণে সমস্যা হতে পারে। তারও চিকিৎসা আছে। হরমোনের গোলমালেই সিস্ট হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওষুধেই কাজ দেয়। কখনও কখনও অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন পড়ে। নতুন মায়ের চুল পড়া ছাড়াও মানসিক অবসাদ, অল্পেই কেঁদে ফেলার প্রবণতাও হরমোন ভারসাম্যের দোষে। 

চল্লিশ বা পঞ্চাশ বছর বয়সি মহিলাদেরও হরমোনের অসুখ হয়। রাতে গরম লাগা, হঠাৎ ঘাম, ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়া, কালো ছোপ, খিটখিটে মেজাজ...এ সব দেখা দেয়। ওষুধ দিয়ে, ক্রিম লাগিয়ে সব সমস্যাই আয়ত্তে আনা যায়। প্রয়োজনে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি করা যায়। তবে এর সুফল ও কুফল দুই-ই আছে। আসলে এই সময়ে গর্ভাশয়ের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। তখন হাড় নরম হয়, অস্টিওপোরোসিস হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ক্যালশিয়ামযুক্ত খাবার ও ওষুধের পরিমাণ বাড়াতে হবে, মত ড. সর্বাণীর। ‘‘প্রোল্যাকটিন হরমোনের সমস্যাতেও অনেকে ভোগেন। তারও প্রতিকার সম্ভব,’’ চন্দ্রিমার সংযোজন।

 

সমাধান হল সুস্থ জীবনাভ্যাস

হরমোনের সমস্যা হলে তা সারানো মুশকিল। ওষুধ দিয়ে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। সেই চিকিৎসা কয়েক মাস বা কয়েক বছর ধরে চলে। কিন্তু তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক। পরবর্তী কালে ডায়াবিটিস হতে পারে। হৃদ্‌রোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার প্রভৃতি মারণ রোগের আশঙ্কাও বাড়ে। তাই ওষুধ, থেরাপি, ইঞ্জেকশন, অস্ত্রোপচারের পরিবর্তে স্বাভাবিক নিয়মে দেহে হরমোনের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। স্বাভাবিক নিয়ম অর্থাৎ ডায়েট, কায়িক শ্রম ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনচর্যা। ড. রায়চৌধুরী জানালেন, ‘‘এ সবই ‘প্রিভেন্টেবল ডিজিজ’। চাইলেই এড়ানো সম্ভব। নিয়ম মানলে ঝুঁকি অন্তত অর্ধেক কমিয়ে আনা যায়।’’

 

প্রেসক্রিপশন মাফিক লাইফস্টাইল

• বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী যদি ওজন যথাযথ রাখেন, তবে হরমোনের ঝঞ্ঝাট চট করে বাঁধবে না। গড়পরতা ভাবে মেয়েদের ক্ষেত্রে যত সেন্টিমিটার উচ্চতা, তার থেকে ১০০ বাদ দিলে যা হয়, তত কিলোগ্রামই হল আদর্শ ওজন। অর্থাৎ ১৫৫ সেমি উচ্চতায় আদর্শ ওজন ৫৫ কিলোগ্রামের এ দিক ও দিক (৫২-৫৮ কিলোগ্রাম)। অনুরূপে ১৬৫ সেমি উচ্চতায় ওজনের লক্ষ্য রাখুন ৬৫ কেজির আশপাশে।

• হরমোনের সমস্যা দেখা দিলেই আগে ওজন কমান, ডায়েটে সংযম রাখুন।

• দিনের মধ্যে অন্তত আধ ঘণ্টা জোরে হাঁটুন। সময় না পেলে কিছুক্ষণ স্কিপিং করুন। যখনই পারবেন একটু হেঁটে নিন।

• হরমোন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোমর টানটান রাখুন।

• নিয়মিত হরমোনের রিস্ক ফ্যাক্টরগুলি চেকআপ করান। অর্থাৎ রক্তকণা ও চিনির পরিমাণ, রক্তচাপ, জরায়ু প্রাচীর স্বাভাবিক আছে কি না, খোঁজ রাখুন।

• রাসায়নিক দেওয়া বা প্রসেসড ফুড এড়িয়ে চলুন। প্লাস্টিকের পাত্রে খাওয়া, বা তাতে গরম খাবার রেখে খাওয়া কিংবা খাবার গরম করায় রাশ টানুন।

• তলপেটে আলতো অথচ একনাগাড়ে ব্যথা, মাথা ধরা, মুড অফ বা হঠাৎ রেগে যাওয়া— এমন সব উপসর্গকে ‘ও কিছু নয়’ বলে অবহেলা করবেন না, চিকিৎসককে জানান। এগুলি হরমোন লেভেল ঠিক না থাকার লক্ষণ।

 

স্ট্রেসকে হারান

হরমোনের অসুখ বাধানোর কারণগুলির অন্যতম মানসিক অশান্তি। সমীক্ষায় প্রকাশ, যে কোনও মারণ অসুখকে হঠাৎ ছ’গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে স্ট্রেস। কিন্তু একুশ শতকে স্ট্রেস থাকবেই। সুস্থতার জন্য নিজেকেই শুধরে নিতে হবে। মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ান। মানসিক বিশ্রামের অবকাশ খুঁজে নিন। দেখবেন, হরমোন লেভেল নিয়ন্ত্রণে আসবেই। শরীর থাকবে সুস্থ ও মজবুত।
 

মডেল: হিন্দোলা, তৃণা; ছবি: সুপ্রতিম চট্টোপাধ্যায়, অমিত দাস; মেকআপ: প্রিয়া গুপ্ত, মৈনাক দাস; পোশাক: গ্লোবাল দেশি, লা লঞ্জারি, ফোরাম মল; লোকেশন: আইবিস, রাজারহাট; ক্লাব ভর্দে ভিস্তা, চকগড়িয়া; ফুড পার্টনার: আইবিস, রাজারহাট