স্ত্রী হেমকুসুমকে ক’দিনই বা কাছে পেয়েছিলেন কবি-সুরকার অতুলপ্রসাদ সেন! অথচ ভালবাসার যে অভাব ছিল দু’জনের, তা’ও নয়। তবু!

এই যন্ত্রণাবিদ্ধ দাম্পত্য অতুলপ্রসাদকে দিয়ে কত যে গান লিখিয়ে নিয়েছে! 

একটি বারের কথা।

পেশায় আইনজীবী অতুলপ্রসাদ গিয়েছেন মফসসলে। উঠেছেন এক ডাকবাংলোয়। সারা দিনের কাজের শেষে ফিরেছেন ডেরায়।

তখন রাত নেমেছে। বর্ষাকাল। আধো চাঁদের আলো, জমাট অন্ধকারের মাঝে মাঝে আঁচড় কেটে দাঁড়িয়ে। একাকী বসে আছেন অতুলপ্রসাদ।

সে দিনের কথা তিনি নিজেই লিখছেন, ‘‘কোনও একটি কেসে গিয়েছিলাম। ডাকবাংলোর বারান্দায় রাতে ডিনারের পর ইজিচেয়ারে গা এলিয়ে একা বিশ্রাম করছি, বাইরে টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। চোখে ঘুম আসছে না। ঝিঁঝিঁ পোকা ও ব্যাঙের ঐকতান শুনছি। মনটা উদাস হয়ে গেল। এই গানটি তখন লিখেছিলাম।— ‘বঁধুয়া নিদ নাহি আঁখিপাতে/আমিও একাকী তুমিও একাকী আজি এ বাদল রাতে’।’’

অতুল-হেম প্রবল ভাবেই ভালবাসতেন দু’জনে দু’জনকে। অশান্তি হত শুধু হেমন্তশশীকে নিয়ে।

হেমন্তশশী। অতুলপ্রসাদের বিধবা মা। মাকে দেখবার কেউ নেই। অতুলের তো অনেক আছে। লখনউ শহরে প্রাসাদোপম বাড়ি। গাড়ি। দাসদাসী। অসংখ্য বন্ধু, অনুরাগী। সেখানে বৃদ্ধা অসহায় মায়ের কি আর জায়গা হবে না?

কিন্তু হেমকুসুম চাইতেন না তাঁর শাশুড়ি-মা তাঁদের কাছে থাকুক। শুধু তিনি কেন, শ্বশুরবাড়ির কারও সঙ্গেই হেম সম্পর্ক রাখতে চান না।

চাইবেনই বা কেন? অতুলের সঙ্গে বিয়েতে যারা প্রচণ্ড বাধা দিয়েছে, তাদের কেন মেনে নেবেন হেম?

বিয়ের পর বহু কাল চলেছিল অর্থের টানাটানি। দিন চালাতে একের পর এক গয়না বিক্রি করে দিতে হয়েছে হেম আর অতুলকে। অর্থাভাবেই যমজপুত্রের একজন নিলীপ, প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেল— তখন কোথায় ছিল ওরা?

আর আজ যখন অবস্থা ফিরেছে, কেন এঁদের সঙ্গে নেবেন হেম?

অতুল এখন ডাকসাইটে ব্যারিস্টার। জনপ্রিয় গীতিকার, সুরকার, গায়ক। সন্ধ্যার পর তিনি বাড়ি ফিরলে লোকে গমগম করে চারপাশ। তাঁদের কারও কাছে তিনি সেনসাব, কারও ভাইসাব, কারও বা শুধুই অতুল।

রূপবতী গুণবতী হেমকুসুম আদরে সোহাগে, সেবা পরিচর্যায় ভরিয়ে তুলেছেন অতুলকে। এই সুখের দিনে তিনি কেন পাশে নেবেন ওদের?

কিন্তু অতুল তাঁর মাকে ভুলবেন কী করে? হেমের আপত্তি অগ্রাহ্য করে মাকে নিজের কাছে নিয়ে এলেন তিনি।

তার পরই শুরু হল অশান্তি।

হেম-হেমন্তের এই যে বিবাদ, তার মাঝে পড়ে অতুল বারবারই ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। তবু না পেরেছেন মাকে ছাড়তে, না স্ত্রীকে।

হেমের এ অসহিষ্ণুতা যে একেবারে যুক্তিহীন ছিল, এমন নয়। তার প্রেক্ষাপটটি একটু বলে নেওয়া যাক।

অতুলপ্রসাদ তাঁর বাবা রামপ্রসাদকে হারান শৈশবে। বাবার একান্ত অনুরক্ত ছিলেন অতুল। রামপ্রসাদের এক ছেলে, তিন মেয়ের মধ্যে অতুলই সবচেয়ে বড়। বাবা মারা যাওয়ার পর বোনেদের নিয়ে ভাটপাড়ার মামাবাড়িতে চলে গেলেন অতুল।

সেখান থেকেই পড়াশোনা চলতে লাগল। প্রবেশিকা পরীক্ষা দিয়ে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংস্পর্শে এলেন। দেশের কাজে নামলেন। দেশেরই ডাকে ঢাকায় গিয়ে হঠাৎ খবর পেলেন তাঁর মা দ্বিতীয় বিবাহ করছেন দুর্গামোহন দাশকে। তিনি ছিলেন আবার চিত্তরঞ্জন দাশের জ্যাঠামশাই।

অতুল মায়ের এই বিয়ে কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। প্রচণ্ড আঘাত পেলেন। প্রাণপ্রিয় বাবা চলে যাওয়ার পর মা-ই ছিলেন তাঁর একমাত্র সহায়। এ বার মা-ও যদি তাঁদের ছেড়ে কলকাতায় চলে যান, তাঁদের দেখবে কে? এক দিকে অভিমান, অন্য দিকে শঙ্কা, অতুলকে কুরে কুরে খাচ্ছিল।

সেই সময়ই হেমন্তশশীর চিঠি পেলেন তিনি—‘‘অতুল, বোনেদের নিয়ে কলকাতায় চলে এসো।’’

কলকাতা গেলেন বটে, কিন্তু থাকলেন না ওখানে। বোনেদের মায়ের কাছে রেখে ফিরে এলেন ভাটপাড়ায়। মামারা তাঁকে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি করে দিলেন। প্রেসিডেন্সির ছাত্র তখন চিত্তরঞ্জনও।

কিছু কাল বাদে দেশ ছাড়লেন অতুল। ব্যারিস্টারি পড়তে চলে গেলেন বিলেতে। ওখানে তখন দ্বিজেন্দ্রলাল, সরোজিনী নাইডুরা ছিলেন। তাঁদের সঙ্গে সময় কাটতে লাগল।

এর মধ্যে মামা কৃষ্ণগোবিন্দ তাঁর মেয়ে হেমকুসুমকে নিয়ে গেলেন বিলেতে। ছোটবেলা থেকে এক সঙ্গে  বড় হলেও হেম-অতুলের ঘনিষ্ঠতা-প্রেমের সূত্রপাত বিলেতের মাটিতেই।

অতুল ব্যারিস্টারি পাশ করলেন। দেশে ফিরলেন। বাবাকে নিয়ে হেমও ফিরলেন দেশে। ওঁরা বিয়ের কথা জানালেন সবাইকে।

কিন্তু এ বিয়ে কেউ মেনে নিতে নারাজ। আপত্তি দু-পক্ষেরই। ভাই-বোনের বিয়েকে ঘিরে শুরু হল প্রবল টানাপড়েন। এমন বিয়ে আবার আইনেও বাধে।

শেষে লর্ড সত্যেন্দ্রপ্রসন্ন সিংহ পরামর্শ দিলেন। জানালেন, স্কটল্যান্ডে গ্রেটনাগ্রিন বলে একটি গ্রাম আছে, যেখানে ভাই-বোনের বিবাহের সম্মতি মেলে।

হেম-অতুল দেশ ছেড়ে চলে গেলেন গ্রেটনাগ্রিন। সংসারও পাতলেন। কিন্তু ব্যারিস্টার অতুল কিছুতেই পসার জমাতে পারছিলেন না। না ইংল্যান্ড, না আয়ারল্যান্ড,  না কোত্থাও। শেষে দেশেই ফিরতে হল তাঁদের।

সব আত্মীয়স্বজন তখন তাঁদের ত্যাগ করেছেন। পেশাও জমছে না। অর্থাভাব চূড়ান্ত। এই অবস্থা থেকে তাঁকে রক্ষা করলেন লখনউয়ের এক ব্যারিস্টার মুমতাজ হুসেন। তাঁরই পরামর্শে লখনউ চলে যান অতুল। তার পর ধীরে ধীরে তাঁর ভাগ্য ফেরে।

এই নিদারুণ পরিক্রমা হেম ভোলেন কী করে! ফলে অতুলপ্রসাদ তাঁর মাকে বাড়িতে ঠাঁই দিতেই যেন দাউ দাউ জ্বলে উঠল সংসার।

এক দিন অতুলপ্রসাদ কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরছেন। গেট পার হয়ে বাগান পেরিয়ে ঢুকতে যাবেন ঘরে, হঠাৎ দেখেন বাগানের এক কোণে আগুন জ্বলছে হু হু করে।

ভাল করে নজর ফেলে হতবাক অতুলপ্রসাদ দূরে দাঁড়িয়ে খেয়াল করলেন, একটি একটি করে তাঁর  সমস্ত জামাকাপড় আগুনে ছুড়ে ফেলছেন হেম।

এ বার আগুন জ্বলে উঠল অতুলের মাথাতেও। বাড়িতে আর ঢোকা হল না তাঁর। ছুটে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি ছেড়ে। গাড়িতে উঠে হুকুম দিলেন, দাদার বাড়ি চল।

দাদা সত্যপ্রসাদ সব শুনলেন। ঠান্ডা মাথায় বোঝাতেও লাগলেন। কোনও ক্রমে রাগ কমিয়ে ভাইকে যদি বাড়ি পাঠানো যায়।

রাগের চোটে অতুল চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘‘যাব না, যাব না, যাব না ঘরে।’’

অনেক পরে যখন মন শান্ত হল, সে এক আশ্চর্য অনুভূতি তখন তাঁর সারা শরীরে খেলে গেল। ঘরে-বাইরে উথালপাথাল ঝড়ে ছিন্নভিন্ন মনটায় তখন কান্না হয়ে গান জমেছে। অতুলপ্রসাদ লিখলেন, ‘যাব না, যাব না, যাব না ঘরে/ বাহির করেছে পাগল মোরে।’

অতুলপ্রসাদ নয়, বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন হেমকুসুম।

ঠিক এমনই এক সময় রবীন্দ্রনাথ এলেন লখনউ। কোনও এক সাহিত্য সম্মেলনে। উঠবেন অতুলেরই বাড়ি।

কবিগুরু আসবেন তাঁর বাড়ি, অতুলের মনে আনন্দ আর ধরে না। কিন্তু সেই সঙ্গে তাঁর চিন্তা, কে কবির  পরিচর্যা করবে? হেম যে বাড়িছাড়া।

কী আশ্চর্য, রবীন্দ্রনাথ যে দিন এলেন, সে দিনই হেমকুসুম ফিরে এলেন স্বামীঘরে। কবির দেখভালের সমস্ত ভার নিলেন নিজেই।

অতুল আনন্দে আত্মহারা। ভাবলেন, হেম যখন নিজে থেকেই ফিরে এসেছে, এ বার নিশ্চয়ই সে থেকে যাবে এ বাড়িতেই।

তা আর হল কই!

কবি যে দিন বিদায় নিলেন, সে দিনই অতুলকে ছেড়ে চলে গেলেন তাঁর হেমকুসুম।

অভিমানে পুড়ে যেতে যেতে অতুলপ্রসাদের মনে হল, হেম যতটাই তাঁর জন্য দরদী, ততটাই যেন নিষ্ঠুর। তিনি লিখলেন— ‘ওগো নিঠুর দরদী এ কী খেলছ অনুখন/তোমার কাঁটায় ভরা বন, তোমার প্রেমে ভরা মন।’

অতুল-রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কটি নিয়েও গল্পের অন্ত নেই।

অতুল যখন একুশ-বাইশের যুবক, সরলাদেবী চৌধুরানী তাঁকে নিয়ে যান কবির কাছে। অতুলপ্রসাদ নিজে পরে বলেছেন, ‘সে ছিল প্রথম দর্শনেই প্রেম’।

দিনে দিনে সে প্রেম এত নিবিড় হয়েছিল যে ‘অতুল আপনি’ থেকে ‘অতুল তুমি’ -তে নামতে বিশেষ সময় নেননি রবীন্দ্রনাথ। প্রতি দিন মধ্যাহ্নভোজের সময় অতুলকে যেতেই হত জোড়াসাঁকোয়। ফিরতেন অপরাহ্নের চা-টা খেয়ে।

আড্ডা হত জোড়াসাঁকোর ছোট্ট একটি ঘরে। যে ঘর থেকে আকাশ দেখা যেত।

এক দিনের কথা বলেছেন অতুলপ্রসাদ। বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। সাদা জলের ধারায় নীলচে ঘোলাটে আকাশটা তোলপাড়। ঘরে বসে নিজের মনে একে একে কবিতা বলেই চলেছেন রবিঠাকুর। তাঁর এক-একটি কবিতার শেষে বন্ধু লোকেন পালিত ভিনদেশি কবিতা আওড়াচ্ছেন, ঠিক যেন কবির বলে যাওয়া ভাবটুকু নিয়ে। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান। সে এক স্বর্গীয় মুহূর্ত যেন!

কুমায়ুনের রামগড়ে বাড়ি কিনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অতুলকে ডেকে পাঠালেন সেখানে। একই ঘরে থাকতেন ওঁরা রাত্রিবেলা। আর প্রতি ভোরেই অতুল দেখতেন, সূর্য ওঠার আগেই বেরিয়ে পড়েন রবীন্দ্রনাথ। খুব কৌতূহল অতুলের। কোথায় যান তিনি?

এক দিন ভোরে রবীন্দ্রনাথের পিছু নিলেন অতুলপ্রসাদ। কিছুটা পেরোনোর পরই দেখলেন, কবি বসেছেন এক শিলাখণ্ডের ওপর। সূর্য উঠল বলে। দূরে ধবলসাদা পাহাড়ের গায়ে সোনালি লালচে আভা ধীরে ধীরে রঙ ছড়াচ্ছে। কবি গান ধরলেন, ‘এই লভিনু সঙ্গ তব সুন্দর হে সুন্দর’। গান শেষে কবি পিছনে চাইতেই দৌড় অতুলের। পরে জেনেছিলেন সে-গান ওই ব্রাহ্মমুহূর্তেই গেঁথেছিলেন কবি।

তখন অতুলপ্রসাদের ভরাট সংসার। সারাদিন কোর্টের কাজ। কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরেও রেহাই নেই। সাক্ষাৎপ্রার্থী অগুনতি। তার মধ্যে গণ্যমান্যরাও যেমন আছেন, আছেন লখনউ শহরের এক্কাওয়ালাদেরও কেউ কেউ। অতুলের দরজা সবার জন্য খোলা।

প্রতি দিন কোর্ট থেকে বাড়ি ফেরার পর গানের মজলিশ বসতই বসত। এমনই এক মজলিশে এক মহিলা এক বার প্রশ্ন করে বসলেন, ‘‘এত যে সুন্দর সুন্দর সব গান বাঁধেন, সময়ই বা পান কখন, কোথায়ই বা বাঁধেন? এ গান তো বাঁধতে কোনও নির্জন সাগরের ধার, নয় ফুলের বাগান চাই। আপনিও কি তেমনই কোথাও যান?’’ 

কথা শুনে অতুলপ্রসাদ যা উত্তর দিলেন, উপস্থিত সবাই শুনে হাঁ।

সহাস্যে বললেন, ‘‘সারাদিন বাড়িতে মক্কেলের ভিড়। আবার কোর্টে যাবার তাড়া। তার মধ্যেই স্নান করতে গিয়েছি। ঘটি নিয়ে বারবার জল ঢালছি গায়ে। ঘটির ওই কল কল শব্দে একটা কলি ভেসে উঠল মনে। কোর্টে যেতে যেতে, কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে গানটি লিখে ফেললাম, ‘জল বলে চল মোর সাথে চল/ তোর আঁখি জল হবে না বিফল।’ 

অতুলপ্রসাদের বহু বিখ্যাত গানের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে এমন অবাক-স্মৃতির গল্প।

‘উঠগো ভারতলক্ষ্মী’র লেখার নেপথ্যকাহিনি বলেছেন তিনি—‘ভেনিসে এক সন্ধ্যায় গান্ডোলায় করে বেড়াচ্ছি। চারদিকে বাড়ির আলো। আকাশের তারা। জলের ঝিকিমিকি। আর এ ধারে ও ধারে গান্ডোলার ছপ ছপ শব্দ। চুপ করে দেখছি, শুনছি। হঠাৎ একটা গান্ডোলা থেকে সুর ভেসে এল। মনে লাগল বেহালায় বাজানো সুরটা। গান্ডোলা দূরে চলে গেলেও সুরটা মনে বাজতে লাগল। ফিরে এসে লিখে ফেললাম ওই গান, উঠগো ভারতলক্ষ্মী।’’

আরও একটি বিখ্যাত গান যেমন।

এক বার এক কমিশনে যাচ্ছেন গোমতী নদী ধরে। নৌকায়। মাঠের ভিতর দিয়ে এঁকে বেঁকে চলেছে নদী। এই সময়েই চোখে পড়ল এক কুমারী মেয়ে নদীর পারে বসে। আনমনা। আশপাশের কিছুতেই যেন নজর যাচ্ছে না তার। ওই উদাসী কুমারীর ছবিটাই অতুলপ্রসাদকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল, ‘কে তুমি বসি নদীকূলে একেলা’।

লখনউ-এর এত বড় ব্যারিস্টার। দেশজোড়া নাম। অর্থ, প্রতিপত্তি কোনওটারই অভাব নেই, তবু নিজের দেশের ঘরবাড়ি, গাঁ-গঞ্জকে কোনও দিন ভোলেননি অতুলপ্রসাদ।

এক বার তিনি লিখছেন, ‘‘সে দিন আমার দেশের কয়েক জন ভাই আমাকে তাদের নতুন পত্রিকার জন্য একটি কবিতা বা গান লিখে পাঠাতে বিশেষ অনুরোধে করেছিলেন। তখন আমার দেশের গ্রামখানির কথা মনে পড়ে গেল।

সেই পদ্মানদীর ধার, সেই খোলা মাঠ। খোলা প্রাণ, পাখির গান, বকুল ফুল। হরির লুটের বাতাসা, মায়েদের ভালবাসা। ছেলেদের সঙ্গে খেলা। খুব মনে পড়ে গেল। আমার সেই মিষ্টি দেশটি আমার চোখের সামনে, আমার প্রাণের সামনে ভাসতে লাগল। ভাল করে মনে হল, আমি ভুলিনি, ভুলিনি আমার দেশমাতাকে… যদিও প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর সে-গ্রামখানিতে যাইনি। দূর দেশে থাকলে কী হবে, মার টান বড়ো টান…।’’

তিনি লিখেছিলেন, ‘প্রবাসী চল রে দেশে চল;/ আর কোথায় পাবি এমন হাওয়া এমন গাঙের জল।’

লখনউয়ের রাস্তায় এক ভিখারিনি গান ধরেছে। ভৈরবীর করুণ সুর তার গলায়। গান শুনে চমকে উঠলেন অতুলপ্রসাদ। লোক পাঠিয়ে তাকে বাড়িতে ডেকে পাঠালেন তিনি। কিন্তু অতুলপ্রসাদকে দেখে ভিখারিনি তো ছুটে পালায় প্রায়।

অতুলপ্রসাদ ততক্ষণে চিনে ফেলেছেন তাকে। লখনউয়ের বিখ্যাত বাঈজি। প্রেমে পড়েছিল সে। প্রেমিকের জন্য সর্বস্ব পণ করেছিল বাঈজি।

বিনিময়ে? প্রতারণা! এখন সে পথের ভিখারি। এর পরই হৃদয়ের সমস্ত ব্যথা নিংড়ে অতুলপ্রসাদ লিখেছিলেন, ‘এত হাসি আছে জগতে তোমার বঞ্চিলে শুধু মোরে/  বলিহারি বিধি, বলিহারি যাই তোরে।’

বন্ধু বিজনবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায় গানটি শুনে লিখেছিলেন, তাঁর গানের বইয়ে এর চেয়ে করুণ গান আছে কিনা সন্দেহ।

অসুস্থ অবস্থায় বোন কিরণের বাড়ি এসেছেন। তখন অমল হোম এলেন তাঁর সঙ্গে দেখা করতে। তাঁর অনুরোধ, সামনেই রবীন্দ্রজয়ন্তী। যদি একটা কিছু লিখে দেন কবি। বা যদি কিছু বলেন।

এ দিকে ডাক্তারের কড়া নিষেধ, শরীরের এই অবস্থায় বাড়ি ছেড়ে বেরনো চলবে না। এমনকী লেখালেখির চাপও নেওয়া যাবে না।

সে কথা শুনলে তো! রবিঠাকুরের জন্মদিন, আর তিনি থাকবেন গৃহবন্দি? এ হয় নাকি?

সবার নিষেধ উপেক্ষা করে হাজির হলেন অনুষ্ঠানে। গাইলেন তাঁর নতুন লেখা গান, ‘গাহো রবীন্দ্রজয়ন্তী বন্দন ভকতজনে আনো পুষ্পচন্দন’।

১৯২৫ সাল। দেহরাদূন। হেমকুসুম তখন ওখানেই। হঠাৎ প্রবলভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। আগেই পা ভেঙেছিল। সেই ভাঙা পা আর জোড়া লাগল না।

তাঁর ইচ্ছে, এ বার চলে যাবেন স্বামীর কাছে। সে-খবর পেয়ে অতুল উচ্ছ্বসিত।

অনেক দুঃখ, অনেক হতাশা ভরা মনে যেন ছোট্ট এক টুকরো আশা তখন— এ বার তাঁর হেমকে তিনি ফিরে পাবেন। অতুলপ্রসাদ লিখলেন, ‘মোর আঙিনায় আজি পাখি গাহিল একী গান?/শুনিনি এমন গাওয়া— হেন মরমভেদী বাণ।’

ফিরলেন হেম। সে-ফেরাও কিন্তু স্থায়ী হল না! আবার সংঘাত! গৃহ ছাড়লেন হেমকুসুম।

জীবনের অপরাহ্নে এ-বিচ্ছেদের, এ-আঘাতের জ্বালা যে কী দুঃসহ!

দাদার সঙ্গে দার্জিলিং চলে গেলেন অতুলপ্রসাদ। বিধ্বস্ত মনে একদিন তিনি গেঁথে ফেললেন গান, ‘তখনি তোরে বলেছিনু যাসনে রে তুই এ বিপথে/মানলি না তখন/দুখের বোঝা লয়ে শিরে চলরে ভোলা চলরে ফিরে/ভরসা তোর এ তিমিরে হরির চরণ।’

জীবন আর গান। গান আর জীবন। এ ভাবেই মিলতে মিলতে চলেছে তাঁর সারাটা ক্ষণ।

একটি চিঠিতে এক বার লিখেছিলেন, ‘‘আমি কী প্রার্থনা করি জানো ভগবানের কাছে? শ্মশানে যে দিন আমাকে নিয়ে যাবে, সে দিন চিতায় শুয়ে হঠাৎ যেন সকলের দিকে চেয়ে এক বার হেসে তবে চোখ মুদি।’’

আজীবন হলাহল পান করেও যিনি এ কথা বলতে পারেন, তিনিই বোধ হয় পারেন গানের এমন সুধারস বিলিয়ে দিতে।

সারাজীবন ধরে এলোপাথাড়ি সময়গুলো চুপিসাড়ে ক্ষয় ডেকে এনেছিল শরীরে। শেষ দিকে এক বার ডাক্তার বললেন, হাওয়াবদলে যেতে।

ব্যাঙ্ক থেকে ওভারড্রাফ্ট নিলেন অতুল। গেলেন পুরী। পুরীতে তখন গাঁধীজিও ছিলেন। তাঁর ডাকে বাপুজির সঙ্গে দেখা করলেন। অনুরোধে গানও শোনালেন, ‘কে আবার বাজায় বাঁশি, এ ভাঙ্গা কুঞ্জবনে,’ হিন্দি তর্জমা করে। দিনটা ছিল এপ্রিলের ১৫, ১৯৩৪।

এর পর পুরী থেকে ফিরেও এলেন। শরীর সারল না এতটুকু। চার দিকে খবর রটে গেল। ‘হেমন্তনিবাস’-এ অসুস্থ অতুলকে দেখতে তখন সবাই আসতে লাগলেন একে একে।

শুধু এলেন না হেম। খবর গেল তাঁর কাছে। তবু না।

অগস্টের ২৬, মধ্য রাতে বিদায় নিলেন অতুলপ্রসাদ সেন।

পৃথিবীর অপর প্রান্তে কি তখন বেজেছিল ওঁর সুর—‘ওগো নিঠুর দরদী এ কী খেলছ অনুখন’!

কে জানে!

 

ঋণ: অতুলপ্রসাদ (মানসী মুখোপাধ্যায়), অতুলপ্রসাদ সমগ্র (সুনীলময় ঘোষ সম্পাদিত), অতুলপ্রসাদের গান (কনক বিশ্বাস)