শ্রীরামকৃষ্ণ-ভাবতীর্থ বাগবাজার
স্বামী বিমলাত্মানন্দ
১০০.০০  
সূত্রধর

শ্রীরামকৃষ্ণের কথা কলকাতার শিক্ষিত সমাজ প্রথম জানতে পারে কেশবচন্দ্র সেন মারফত, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে। ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম অগ্রণী ও বাগ্মী কেশবচন্দ্র নিজেই দক্ষিণেশ্বরে পরমহংসদেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সে সংবাদ পরিবেশন করেন লোকসমাজে। আস্তে আস্তে তৎকালীন কলকাতার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, চাকুরিজীবী, উকিল-মোক্তার, ডাক্তারদের গন্তব্য হয়ে ওঠে দক্ষিণেশ্বরে রানি রাসমণি প্রতিষ্ঠিত কালীমন্দির প্রাঙ্গণে শ্রীরামকৃষ্ণের ঘর। স্বামী বিমলাত্মানন্দের মতে, এটি শ্রীরামকৃষ্ণের ‘প্রথম কেল্লা’। ভক্তদের সঙ্গে মিলিত হতে শ্রীরামকৃষ্ণ যেতেন বাগবাজারেও, তাঁর ভক্ত বলরাম বসু-র বাড়ি (বর্তমানে বলরাম মন্দির)। স্বামী বিমলাত্মানন্দ লিখছেন, এটিও ‘‘হয়ে উঠল ‘দ্বিতীয় কেল্লা’, ভক্তদের মিলন-মেলা। এই কেল্লাকে কেন্দ্র করে শ্রীরামকৃষ্ণের যাতায়াত বাড়ল ভক্তদের বাড়িতে।’’ সে কালের সুবিখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে যখন সাক্ষাৎ করতে গিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে সমান টক্করে সরল ভাষায় সহজ উপমায় সাবলীল গতিতে কথাবার্তা বলতেন শ্রীরামকৃষ্ণ। ‘‘শ্রীরামকৃষ্ণ ছুটে গেছেন সিমলার রামচন্দ্র দত্ত, সুরেন্দ্র মিত্র (সুরেন), বেনিয়াটোলার অধর সেন, শ্যামপুকুরের কালীপদ ঘোষ, কোন্নগরের মনোমোহন মিত্র, বাগবাজারের বলরাম বসু, গিরিশ ঘোষ প্রভৃতি ভক্তদের বাড়িতে।’’ এই তথ্যাদির পাশাপাশি ‘লীলাপ্রসঙ্গ’ থেকেও উদ্ধৃত করেছেন স্বামী  বিমলাত্মানন্দ, ‘‘কলিকাতায় বাগবাজার, সিমলা ও আহিরীটোলা পল্লীতেই ঠাকুরের অনেক ভক্তেরা বাস করতেন, তজ্জন্য ওই তিন স্থানেই ঠাকুরের আগমন অধিকাংশ সময়ে হইত। তন্মধ্যে আবার বাগবাজারেই তাঁহার অধিক পরিমাণে আগমন হইত।’’ তাঁর এ-বইটি, কলকাতা (এবং অবশ্যই উত্তর কলকাতার বাগবাজার) কী ভাবে হয়ে উঠল শ্রীরামকৃষ্ণের লীলা-তীর্থ, তারই এক সংক্ষিপ্ত অথচ প্রামাণিক ইতিহাস। বিবিধ ছোট-ছোট আখ্যানে স্বামী বিমলাত্মানন্দ পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছেন আমাদের এই স্মৃতিময় শহরে, যেখানে নিজস্ব ভাবপ্রকাশের কথোপকথনে স্বমহিম ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তখন নানা স্থানে নানা ধর্মমতের আলোড়ন ছোট-বড় আকারে গড়ে উঠছিল, পাশাপাশি আবার হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্মের মধ্যে পারস্পরিক রেষারেষি হানাহানি লেগেই থাকত। ঠিক সেই সময়ে ‘‘কলকাতার উপকণ্ঠে পুণ্যতোয়া ভাগীরথী তীরে দক্ষিণেশ্বরে এমন একটি নব জাগরণের সূত্রপাত হয়েছিল, যা মানুষের সকল সংশয় সমাধান করে দিয়ে প্রাণে আনতে পেরেছিল অনাবিল শান্তি। ওই নব চেতনা সকল ধর্মমতের মধ্যে সম্প্রীতির ভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠার সহায়ক হয়েছিল। জগতের কাছে এক নূতন দিগন্ত খুলে গেল।’’ লিখেছেন স্বামী বিমলাত্মানন্দ। দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর ঘরে বসেই যুগবাণী শুনিয়েছিলেন জগৎবাসীকে— ঈশ্বরলাভের সহজ উপায়— ‘শিব জ্ঞানে জীব সেবা’। অর্থাৎ সমাজের মধ্যে অবস্থান করে জাতিধর্মনির্বিশেষে মানুষের সেবা করা ঈশ্বরজ্ঞানে। স্বামী বিমলাত্মানন্দ জানাচ্ছেন ‘‘এই যুগবাণী হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ সংঘের মূলমন্ত্র যা স্বামী বিবেকানন্দ অকুতোভয়ে প্রবর্তিত করলেন। কলকাতাও ‘শিব জ্ঞানে জীব সেবা’র সাক্ষী হয়ে রইল ১৮৯৮-১৮৯৯ সালে যা কলকাতায় রামকৃষ্ণ মিশনের প্লেগ সেবারূপে সুপরিচিত।’’

সূত্রধর প্রকাশনা থেকেই বেরিয়েছে আরও দু’টি বই: দিলীপকুমার রায়ের ত্রি-তরঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণ (সম্পাদনা: সুমন ভৌমিক) এবং রবীন্দ্রকুমার দাশগুপ্ত ও বিমলকৃষ্ণ মতিলাল-এর শ্রীরামকৃষ্ণ-পরিচিন্তন (গ্রন্থনা: পৃথা কুণ্ডু)। জ্ঞান ও সঙ্গীতের সাধক দিলীপকুমারের বইটিতে আছে তাঁর স্বীকারোক্তি: ‘‘শ্রীরামকৃষ্ণদেব হয়ে উঠলেন আমার জীবনের সর্বেসর্বা— তাঁর কথামৃতের সুধার কাছে কাব্য নাটক গানের রস হয়ে গেল বিস্বাদ।’’ দ্বিতীয় বইটিতে গ্রন্থিত হয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবনা নিয়ে মননশীল দুই চিন্তকের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা দু’টি ইংরেজি রচনার অনুবাদ। বিমলকৃষ্ণ লিখছেন ‘‘ভগবানের সেবায় আত্মনিবেদনের অর্থ তাঁর কাছে ছিল আর্তজনের সেবায় আত্মনিবেদন। এই ধরনের সরল আদর্শের মধ্যে যেন ধর্ম ও নৈতিকতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। যেটাই নৈতিক তাই ধার্মিক এবং যা-ই ধার্মিক তা কিছুটা হলেও নৈতিক। এটা আমাদের ধর্ম-র প্রচলিত সংজ্ঞা পাল্টাতে বাধ্য করে।’’ আর রবীন্দ্রকুমারের মতে, ‘‘রামকৃষ্ণের অতীন্দ্রিয়বোধ কোনও ব্যক্তিগত স্বর্গের জন্য জীবন ও জগৎকে অবহেলা করে নাই... মানবের নিয়তির জন্য রামকৃষ্ণের এক মহৎ ও উদার, নিবিড় হিতাকাঙ্ক্ষা ছিল...।’’

ভেঙে যাওয়ার পরে 
জয় গোস্বামী
২৫০.০০  
আনন্দ পাবলিশার্স

‘ভেঙে যাওয়ার পরে’— সে কি কোনও উপন্যাস? না কি সে কোনও দিনলিপি? না কি সে কোনও ‘আত্মজীবনীর অংশ’। হ্যাঁ, ওই নামেই তো জয় তাঁর যৌবনে কবিতা রচনা করেছিলেন আর সেই রচনায় জানিয়েছিলেন— মৃত্যুর পরের মুহূর্তটি।

সে কথা থাক। ‘মনোরমের উপন্যাস’, ‘সেইসব শেয়ালেরা’, ‘সাঁঝবাতির রূপকথারা’, ‘দাদাভাইদের পাড়া’ ইত্যাদি বহুবিধ গদ্যসরণির প্রস্তরফলক ফেলে তাঁর আবারও একটা রচনা (এ ছাড়া আর কী-ই বা অভিধা দেওয়া যায় তাকে!) পড়তে গিয়ে বিস্মিত হতে হয়।— কী পরম আশ্চর্যে অতি সাধারণ থেকে সাধারণতর ভাষায় তিনি একটা কথা কিংবা ঘটনা বা একটা জীবনযাপন বলতে চেয়েছেন। হ্যাঁ, বলেওছেন। আর তা যেন বহতা এক ‘নদী আপনবেগে পাগলপারা’ আর সেখানে পাঠ করতে করতে পাঠক হয়ে থাকেন ‘স্তব্ধ চাঁপাতরু তন্দ্রাহারা’।

অখিলেশ একজন প্রৌঢ় লেখক। সংসারী। তাঁর জীবনে অকস্মাৎই হাতের ওপর হাত রাখা খুব ‘শক্ত’ নয় ধরনের সম্পর্ক এসে পড়ে। অখিলেশ সামাজিক ভাবে বিখ্যাত। এই উপন্যাসে জয় গোস্বামী ‘গদ্যের মাস্তানি’ যা দেখিয়েছেন তার সঙ্গে তুলনা করা যায় খানিক অংশে ‘যোগাযোগ’-এর যেখানে রবীন্দ্রনাথ শুরু করছেন, ‘আজ ৭ই আষাঢ় অবিনাশ ঘোষালের জন্মদিন’। অথচ সে উপন্যাসে অবিনাশ নেই। ঠিক তেমনই অখিলেশের সঙ্গে ত্রিশ বর্ষীয় মেয়েটির যে সম্পর্ক তৈরি হয় তার মধ্যে অখিলেশের স্ত্রী কোথাও কোনও ভাবে এসে পৌঁছন না এ উপন্যাসের সিংহভাগ জুড়ে। নামহীনা। দীর্ঘাঙ্গী। দুটো দাঁত সামান্য উঁচু। তবু হাসলে সুন্দর দেখায়। যত পাতা গড়ায় তত যেন এ উপন্যাসের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যেতে হয়। ১৫৬ পাতার পরিসর, তবু যেন কোথাও কোনও একটা দূর, একটা চেয়ে থাকা, একটা আকাশ হয়ে যাওয়া, একটা বলা-না-বলার প্রেম— সবটাই যেন এই উপন্যাসে বিধৃত করেছেন জয়। প্রেম চলে যাওয়ার, প্রেম ভেঙে যাওয়ার প্রতিটা দিনক্ষণ যে ভাবে এ উপন্যাসে একই সঙ্গে পিরানদেল্লো এবং চন্দ্রশেখরের সঙ্গে মিশিয়েছেন— বোঝা যায় তিনি এলিয়টের ভাষায়— ‘আ গ্রেট রাইটার অব ভার্স।’ তাঁর সমসময় সবসময় তাঁকে কবিতার গণ্ডিতেই রেখে দিতে চেয়েছে। তাঁর পূর্বসূরিরা তাঁকে শুধুমাত্র ‘কবি’ আখ্যা দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন। উত্তরকাল অবশ্যই আসছে যাঁরা তাঁর গদ্যকে চিনে নেবে— হ্যাঁ, এই বিষয়ে কোনও সংশয় নেই।