ভালো বাঙালির কালো বই অথবা একুশ শতকের বঙ্গ সমাজ।

কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত। ধানসিড়ি।

৫০০.০০

সংবাদপত্রে সেকালের কথা সংকলন করেছিলেন এক ভাল বাঙালি। নাম ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন করেছিলেন তা বলতে গিয়ে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সে বইয়ের ভূমিকায় বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস-রচনার এই উপাদানের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি দিবার সময় আসিয়াছে। পুরাতন বাংলা সংবাদপত্র দুষ্প্রাপ্য হইয়া উঠিয়াছে। যেগুলি পাওয়া যায়, সেগুলিও অনেক সময়েই সম্পূর্ণ নহে। এই অবস্থা সত্বর অবহিত না হইলে এখনও যে-সব পুরাতন সংবাদপত্র সংগ্রহ করা সম্ভব কিছু দিন পরে হয়ত তাহা অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইবে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙালী-জীবন কিরূপ ছিল তাহা আর জানা যাইবে না।’

একুশ শতকে এমন আশঙ্কা নেই। ডিজিট্যাল দুনিয়ায়হারিয়ে যায় না কিছুই, তাই তাকে আগলে বসে থাকার দায়ও নেই। একেবারেই নেই কি?জেট-গতিতে বদলাতে থাকা একটা সমাজের অজস্র চিহ্ন নিয়ে হারিয়ে যায় খবরের কাগজের শ্রেণিবদ্ধ বিজ্ঞাপন বা ছোট ছোট খবরগুলো। তবে,এই একুশ শতকে গল্পের সিধু-জ্যাঠারা বাস্তবেও আছেন। কিছুই তাঁদের নজর এড়ায় না, ভরসার কথা সেটাই। যেমন, কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত। সাংবাদিকতা আর নানা রকম লেখালেখির ফাঁকে বছরের পর বছর ধরে তিনিআগলে রাখছেন রোজকার কাগজের নানা কাটিং। সেগুলোতে ভর করেই তাঁর সন্ধানী চোখ খুঁজে নিতে চেয়েছে একুশ শতকে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির বেঁচে থাকার আঁতের কথাগুলোকে।

বটতলার বইয়ের সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলছে। 

সে সব কথার অনেকটাই, কালো, তথাকথিত অন্ধকার দিকের। জল জমে যেমন বরফ, অন্ধকার জমে জমেই তেমনই ভূত হয়। আর, বাঙালির অদ্ভুত আঁধারের অনেকটা জুড়েই যৌনতা। তাই, অনিবার্য ভাবে, এই কালো বইয়েরও অনেকটাই যৌনতা। আটখানা ভাগ এ বইয়ের। একের নাম ‘জ্বালাময়ী বশীকরণ, সোলেমানী তন্ত্র, জিন-প্রেতাত্মা এবং সরল বিশ্বাস’।আটের নাম ‘বাঙালি চুমুর বাংলা খবর এবং আমরা’। বশীকরণ থেকে এলিট চুমু আন্দোলন, এ বইয়ের ছবির পরতে যে থাকবে সমাজের নানা স্তরই, তার ইশারা সূচিপত্রেই।

কৃষ্ণপ্রিয় বিচিত্রকর্মা লেখক। গল্প-উপন্যাস লেখেন। লেখেন প্রবন্ধও। তবু, লেখকের চেয়ে তিনি পাঠক বেশি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন বটতলার বই আর সংবাদপত্র। কালো বইয়ের ব্লার্ব জানাচ্ছে, তাঁর প্রিয় বিষয় শাক্ততন্ত্র, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ, বটতলার মুসলমানি পুথি এবং হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক। শখ ছবি আঁকা, বাংলা সংবাদপত্রের শ্রেণিবদ্ধ বিজ্ঞাপন জমানো আর ইমন রাগ।

মানুষটির মতো এ বইয়েতাঁর লেখার ধরনটিও অন্য রকম। এক ধরনের ইলাস্ট্রেটেড লেকচার বা উপস্থাপনা-সহ বক্তৃতার ছোঁয়া আছে। খবরের কাগজের খবর, শ্রেণিবদ্ধ বিজ্ঞাপন থেকে পাতার পরে পাতা তুলে আনেন তিনি। সেগুলোকে বুনে দেন বহতা এক গদ্যের সুতোয়। তাই কোনও সরল একরৈখিক আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়া ধারণা তাঁর এই ‘গবেষণা’কে নিয়ন্ত্রণ করে না। মনের জানালা তিনি সিধুজ্যাঠার মতোই খুলে রেখেছেন। বইয়ের ভাগগুলোর শিরোনামও সেই ওপেন স্পেসটাকে তৈরি করে দেয়। যেমন, ছ নম্বরের নাম, বাঙালির ‘শ্রীঘ্রপতন’ এবং তেল জেল যন্ত্র এবং বোল্ড ইন্দ্রিয় এবং তারপর। শীঘ্রপতন সত্যিই ‘শ্রীঘ্রপতন’ বানানে ছাপা হয় বাংলা সংবাদপত্রের শ্রেণিবদ্ধ বিজ্ঞাপন কিংবা সুলভ শৌচালয়ে সাঁটা হ্যান্ডবিলে। ওই ভুল বানানেই সমাজের মতি এবং মতিচ্ছন্নতা লুকিয়ে আছে। তাকে সরাসরি বইয়ে তুলে আনায় বোঝা যায়, কৃষ্ণপ্রিয় কোনও পণ্ডিতি চশমা-আঁটা চোখে একুশ শতকের বঙ্গসমাজকে দেখতে বসেননি।

তাঁর সেই আর এক রকম দেখাটা সম্পর্কে ভূমিকা বলছে, ‘এই বইয়ে একটা ‘দেখা’-তে (ছাপাখানার কালো ভূত মনে হয় ‘-কে’ কেটে ‘-তে’করেছে) প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছি। এইভাবে দেখলে, পাঠক আপনিও ‘অনেকটা’ সংকলন করতে পারবেন। এবং এভাবেই একটা ‘গোটা’ চিত্র গড়ে তোলা যাবে। খণ্ড খণ্ড মিলেই গোটাটাকে পাওয়া যাবে। এ একটা প্রক্রিয়া। চলতেই থাকবে। যতদিন যাবে, ততই এই দেখায় বৈচিত্র্য বাড়বে। আমরা বাঙালিরা পিছনের দিকে এগিয়ে চলেছি নাকি প্রকৃতই সামনে চলেছি, তা বোঝার জন্যও এই দেখাটা চাঙ্গা থাকুক। ব্রজেনবাবু যেমন খাঁটি বাঙালী-জীবনের চিত্র’এঁকেছিলেন, তেমনই আমরাও একুশ শতকের বাঙালি জীবনের চিত্র হাজির করতে পারব।’

একুশ শতকের এই বাঙালি জীবনের চিত্রের প্রধান রং, অন্তত কৃষ্ণপ্রিয়ের দেখায়, যৌনতা। সমগ্রকে দেখার দুঃসাহসী দাবি কৃষ্ণপ্রিয় করেননি। টুকরো টুকরো করেই দেখেছেন তিনি। টুকরো টুকরো ছবি জুড়েই তাঁর বইয়ে তৈরি হয় চমৎকার একটা ছবি। সে ছবি কালো না আলো তার বিচার নীতিবাগীশেরা করবেন, সমাজ-ইতিহাসের উপাদান-সংকলকের সে দায় নেই। কিন্তু পাতার পর পাতা নমুনায় ঠাসা এ বইয়ে লেখকের ভূমিকা কেবল সূত্রধরে এসেছে ঠেকেছে কোথাও কোথাও। পরবর্তী সংস্করণে লেখকের ভাবনাকে আর একটু বেশি করে চায় এই আলোচকের মতো কালো বাঙালি, এই নিবেদন।

 

আশিস পাঠক

(লেখক বিশ্বভারতী গ্রন্থনবিভাগে প্রকাশনা উপ-পরিচালক)