স্বর্গমর্ত্য ধাম’-এর ছোট ছেলে অনাথনাথ বরাবরই নিজের বংশ পরিচয় এবং তার কৌলীন্য নিয়ে ছোট থেকেই গর্বিত। কিন্তু গর্ব সামান্য হলেও টাল খেয়েছিল যখন তিনি কলেজে ভর্তি হলেন। তরুণ, শ্যামল, কান্তি, সমীর... এই সব সংক্ষিপ্ত স্মার্ট নামের পাশে তাঁর অনাথনাথ সেকেলে ও বেমানান। নিজেকে বন্ধুদের সঙ্গে মানানসই করতে নিজের নাম থেকে নাথ ছেঁটে দিয়েছিলেন। 

 নাম নিয়ে অনাথের এই বিপ্লবে তাঁর বাবা গোলোকবিহারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘‘এইবার তুমি সত্যি সত্যি অনাথ হলে!’’ তার পর নামের মহিমা ও গুণাগুণ নিয়ে একটি ছোট বক্তৃতা দেন যার সারমর্ম হল— এই বাড়ির নাম ‘স্বর্গমর্ত্য ধাম’ কারণ বাসিন্দাদের মধ্যে স্বর্গ মর্ত্যের গুণাবলি আশা করা হচ্ছে। ‘‘আমার নাম গোলোকবিহারী রেখেছিলেন আমার বাবা। অনেক ভাবনাচিন্তা করেই নাম রেখেছিলেন। বিহারী ছেঁটে শুধু গোলোক করার দুর্মতি ভাগ্যিস কোনও দিনই হয়নি! নামের মধ্যে দুটি শব্দের যা জোর তা তোমার বন্ধুদের ওই ফঙ্গবেনে নামের মধ্যে নেই। বুঝলে অনাথনাথ?’’ এর পর অনাথ আর সাহস পাননি নাথহীন থাকতে। অনাথনাথের দিদি মহারানি যাজ্ঞসেনী এই বাড়ির শ্রেষ্ঠ সন্তান। বাবার অবর্তমানে দিদিই  ছিলেন অনাথনাথের অভিভাবক। দিদি এবং বাবার উপদেশ ও তিরস্কার দুটোই শিরোধার্য করে জীবনের পথে এগিয়েছিলেন অনাথনাথ। চাকরি করেছেন, বিয়ে করেছেন, হয়েছেন তিন কন্যার পিতা। 

মোহিনীমায়া, অতসীছায়া, তটিনীতোয়া— গোলোকবিহারী তিন নাতনির শক্তপোক্ত জোরালো নাম রেখে গিয়েছেন, পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে। ভরসা করতে পারেননি অনাথনাথের উপর। অবশ্য অনাথনাথ ছাড়া তিন কন্যাকে সবাই ডাকে মায়া, ছায়া ও তোয়া বলেই। মেয়েদের শিক্ষাও যতটা সম্ভব পারিবারিক ধারা বজায় রেখেই দেবার চেষ্টা করেছেন অনাথনাথ। মেয়েদের প্রতি তাঁর দুটি উপদেশ হল— পাঁচসিকের পাঁঠা হয়ে কখনও পাঁচটাকার মতো ডাকবে না। দু-নম্বর উপদেশ, সস্তায় পুষ্টিকর স্বাদু খাদ্য দিয়ে স্বজনপোষণ করার চেষ্টা করবে আর সংসারের যাতে ভাল হয় সে দিকে নজর দেবে। এতেই মোটামুটি সংসারের সিলেবাসটা তিনি কভার করিয়ে দিয়েছিলেন। 

 

বাবা আর পিসি না থাকলেও তাঁদের উপদেশ মাথায় করে তিন কন্যে জীবনের মধ্য পর্বে পৌঁছেছে। মুম্বই-দিল্লি-কলকাতা... তিন শহরে তিন বোন থাকলেও স্বর্গমর্ত্য ধাম-এর গুণগুলিকে একসঙ্গে সগর্বে বহন করে চলেছে পারিবারিক দামি সম্পত্তির মতো। তাদের বিশ্বাস, এতেই সংসারের মঙ্গল। এই তিন কন্যার নানা গুণাবলির মধ্যে একটি হল গন্ধমাদন বয়ে নিয়ে বেড়ানো। বলা বাহুল্য সেটাও সংসারের মঙ্গলের জন্যই। তিন বোন বছরে এক বার মিলিত হয়। এটাই তাদের প্রমোদ ভ্রমণ। হরেক কিসিমের মালপত্রের জন্য তিনটি শহরের কুলিদের কাছে এই তিন বোন অত্যন্ত আদরের কাস্টমার।

 

এ বারও একসঙ্গে তিন শহরে বাক্স গোছানো চলছে, কিন্তু এ বার ব্যাপারটা একটু জটিল। বড় বোন মোহিনীমায়া মুম্বই থেকে আসবে। ছোট তটিনীতোয়া আসবে কলকাতা থেকে দিল্লিতে মেজ বোন অতসীছায়ার বাড়িতে। কারণ দিল্লি থেকেই তারা সস্তার টিকিট পেয়েছে আমেরিকা যাওয়ার। এ বার তাদের গন্তব্য আমেরিকায় বড়দির ছেলে বিষ্ণুর বাড়ি। এই প্রথম একসঙ্গে তিন জন বিষ্ণুর কাছে যাবে। সেই জন্য বাক্স গোছানো আরও জটিল হয়ে উঠেছে। কত যে মাথা খেলাতে হচ্ছে! ছোটর মেয়েও থাকে দিল্লিতে। মেয়ের জন্য কলকাতার সন্দেশ, ডালমুট, হজমি গুলি। ছায়ার বরের জন্য মুড়ি, গাওয়া ঘি, বড়ি— আরও নানা টুকিটাকিতে ব্যাগ বোঝাই। এ ছাড়া দিল্লির চেয়ে কলকাতায় যে জিনিস সস্তা সে সব নিয়ে যাওয়ার আগে মেজ-র সঙ্গে দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে কথা হয়, তবু ধন্দ দূর হয় না। মাঝে মাঝে তো কনফারেন্স কলে বড়দিও জুড়ে যায় তাদের সঙ্গে। 

আর তার এলে কচকচি তুঙ্গে ওঠে। মেজ একটা বলছে, সঙ্গে সঙ্গে সেটা নস্যাৎ করে ছোট আর একটা বলছে। দিদি মুম্বই থেকে সম্পূর্ণ আর একটা মত চাপিয়ে দিচ্ছে। তিন জন মিলে তিন লাখ কথা খরচ করে, তবু কার মতটা যে শ্রেষ্ঠ এ নিয়ে একটা সন্দেহ থেকেই যায়।

 

মতে মিল হোক বা না হোক, বাক্স কিন্তু বড় হয় এবং সংখ্যায় বেড়ে যায়। মেয়ে আর মেজদির অর্ডার— ছোটদের পাড়ার পরিমলের চা’টা সকালে না খেলে তাদের ঠিক ঘুম ভাঙে না। বাড়ির গিন্নি যদি হাসিমুখে দিনটা শুরু করে, লাভটা কার? সংসারেরই তো? তাই ওই চা’ও আমেরিকা যাবে। 

গতবার সে দেখেছিল দিল্লিতে কাপড় শুকোনোর ক্লিপের কী দাম! পেটিকোটে ভরার দড়ি মিটারে আড়াই টাকা বেশি। সে জিনিসও কি কলকাতা থেকে না এনে পারা যায়? গতবার মেজর ঘরে-পরা চটি বড়দির মেমসাহেব বৌমা লিজ়ার ভারী পছন্দ হয়েছিল। মেজ জন সেই রকম চারজোড়া চটি কিনে ছোটর হাতে পাঠাল কলকাতা। সেখান থেকে গেল মুম্বই। কথা দিল, বছরের মাঝখানে আমেরিকা থেকে আসবে ছেলে ও বৌমা। কিন্তু সে প্ল্যান বাতিল হয়েছে। তাই এ বার সেই চটির পোঁটলা মুম্বই ঘুরে আবার দিল্লিতেই এসেছে। ভারত ভ্রমিয়া অবশেষে সেই পাদুকা এ বার তাদের সঙ্গে যাবে আমেরিকা। সবার মুখে হাসি ফোটাতে গেলে একটু ঝামেলা হবে, কিছু করার নেই। যার মন বড় তার বাক্স বড়— সাফ কথা।

 

কলকাতায় আর কিছু থাক বা না থাক  মাছ আর শাক লতাপাতা আনাজের ছড়াছড়ি। দিল্লি গিয়ে বাক্স খুলে কলকাতা থেকে নিয়ে যাওয়া সেই সব তুচ্ছ অথচ সাতরাজার ধনগুলো দেখাবার জন্য ছোটর ভিতরটা ছটফট করে ওঠে। দিদিরা ছাড়া কেউ বুঝবে না এর মর্ম।

ছোটর একটু মন খারাপ। ভাল পাটালি উঠতে এখনও দেরি আছে। এ বার শুধুই মোচা, থোড়, কচুর শাক কেটেকুটে আলাদা বাক্সে করে নিয়ে যাচ্ছে। গত বার তো সে জ্যান্ত কই নিয়ে গিয়েছিল মাটির হাঁড়িতে করে। জলসুদ্ধ। সকলে তার কাণ্ড দেখে হাসাহাসি করেছিল, কিন্তু খাওয়ার সময় সব্বাই  স্পিকটি নট! হাঁড়ির ভাত কম পড়েছিল!    

 গতবার লিজ়ার খুব ভাল লেগেছিল কলকাতার ঝিরিঝিরি সোনপাপড়ি। ঠিক বিকেল চারটের মধ্যে পার্কে না গেলে সোনপাপড়িওয়ালাকে পাওয়া যায় না। তাই দুপুরে রোদে ছাতা নিয়ে সোনপাপড়িওয়ালার অপেক্ষায় পার্কে দাঁড়িয়ে ছোট।

বিষ্ণুর প্রিয় আমলকী শুকনো আর তার মেজমাসির হাতের তৈরি আনাজের আচার। যে আচার ছাড়া এক সময় বিষ্ণু খেতই না। আচারে  কী আছে খোদায় মালুম। তার সিক্রেট একমাত্র মেজর মৃত্যুর পরেই জানা যাবে। তাই মেজ কোমর বেঁধে নেমেছে বোনপোর জন্য আচার তৈরিতে।

 বোনেদের মার্কিনমুলুকে যাওয়ার প্রস্তুতির বিবরণ শুনে আঁতকে উঠেছে ছোটর স্বামী সিতাংশু। বলেছিল, ‘‘মেজদিকে আচার নিতে বারণ কোরো। ওগুলো নিষিদ্ধ দ্রব্য। একেই এশিয়ানদের ওরা খুবই সন্দেহের চোখে দেখে। তার উপর এ সব দেখলে রক্ষা নেই! আর সত্যি কথা বলতে কী তোমরা তিন বোন একসঙ্গে থাকলেই চারশো চল্লিশ ভোল্ট। একটা বিপদ ঘটে গেলে আশ্চর্য হব না।’’

সিতাংশুর সাবধানবাণী হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে। তিন কন্যা নিজেদের কর্তব্যে অবিচল।  মেজকে সমর্থন করে দিদি বলেছিল, ‘‘মেমসাহেবরা আতেলা আঝালা সব অখাদ্য রাঁধে। বিষ্ণুকে তাই সোনামুখ করে খেতে হয়। আর নাতি মন্ডার তো জিভই তৈরি হচ্ছে না। পুত্র ও নাতিকে এই দুঃখ থেকে বাঁচানোর দাওয়াই এই আচার।’’  

  মেজদিকে সাহস দিতে বড়দিকে সমর্থন করে ছোট মনে করিয়ে দেয় তাদের বন্ধু নন্দিতা আকছার সিঙ্গাপুরে পোস্ত নিয়ে যায়। আস্ত নেওয়া বারণ বলে বেটে বাক্সে ভরে নিয়ে যায়। সুতরাং ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। তিন বোন আবার পুরোদমে জেগে ওঠে।

অনাথনাথ মেয়েদের বলতেন, মিষ্টি খেলে মগজের পুষ্টি হয়। তিন বোন তাই ঠিক করেছেন স্বর্গমর্ত্য ধাম-এর সিগনেচার মিষ্টি মোয়া দিয়ে মন্ডার জিভেখড়ি হবে। সেই জন্য দিদি গুড় আনবে মুম্বই থেকে। খই, চিঁড়ে, মুড়ি যাবে কলকাতা থেকে। বিদেশি এয়ারলাইন্সের কৃপায় ওজন নিয়ে ভাবনা নেই। এ ছাড়া হাতব্যাগের বাড়তি সাত কেজি তো আছেই।

 

নির্দিষ্ট দিনে ছোট আর বড় দু’জনেই দিল্লি পৌঁছল।  

হালকা ও ভারী, গন্ধমাদন ও ঝোলা মিলিয়ে মোট সতেরোটা লাগেজ। এই বার আসল পরীক্ষা। এই সব মালের মহাসমুদ্র থেকে বেছে নির্বাচিত জিনিস নিয়ে তাদের যেতে হবে। কঠিন অঙ্ক। ছেলে বৌ নাতির জন্য যা নেবার তা তো হলই, নিজেদের ঝামেলাই কি কম! বড়র পানের নেশা। বিষ্ণু যদিও বলেছে এখানে বাংলাদেশি দোকানে সব পাওয়া যায়, তবু সঙ্গে এক গোছা পান না থাকলে কী রকম শূন্য মনে হয়। মেজ যেখানেই যাক, পুঁটলি করে নিজের ব্র্যান্ডের চা’পাতা আর নিজস্ব কাপটি কাছছাড়া করে না। ছোট নিজের সাঁড়াশি ছাড়া রান্নার কথা চিন্তাই করতে পারে না। 

জাঁতি আর সাঁড়াশি নেবার কথা বলায় মেজর স্বামী প্রবীর আতঙ্কিত হয়ে বলেছিল, ‘‘খবরদার না। ওরা কিন্তু মধ্যযুগের টর্চার ওয়েপন ভাববে আর তোমাদের চেহারার সঙ্গে ওগুলো এমন খাপ খেয়ে গেছে যে তোমরা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতেই পারবে না।’’  

এত বড় সাবধানবাণীতেও তিন বোনের বিন্দুমাত্র হেলদোল হয়নি। যাওয়ার একদম আগের মুহূর্তে প্রবীরের চোখ এড়িয়ে জাঁতি আর সাঁড়াশি হাতব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছে দুই বোন।  

এয়ারপোর্টে সিকিয়োরিটি চেকিংয়ের সময় মহামূল্যবান ওই ধাতব টুকরো দুটো বাজেয়াপ্ত হওয়া ছাড়া টোকিয়োতে নামা পর্যন্ত সব ঠিকঠাক। প্রিয় জিনিস হারাবার দুঃখ সত্ত্বেও তিন বোন নিজেরাই নিজেদের পিঠ চাপড়েছে, কারণ জাপানি খাবারের আঁশটে গন্ধে এয়ারক্রাফট যখন ভরপুর তখন তারা পুঁটলি খুলে নিজেদের প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি বার করে মহানন্দে পেট ভরিয়েছে। মেজ একটু বেশি খুশি অন্য কারণে। দিল্লি বিমানবন্দরে যখন সাঁড়াশি-জাঁতি নিয়ে যখন তোলপাড় হচ্ছে সেই গোলমালে তার ব্যাগটি আচারের বোতল নিয়ে কী ভাবে যেন নিঃশব্দে সিকিয়োরিটি চেকিংয়ের বিপজ্জনক সুড়ঙ্গটা পার হয়ে তার কাছে পৌঁছে গিয়েছে। বাড়ি থেকে আনা পরোটার সঙ্গে ওই দেবভোগ্য জিনিস দেবলোকের উচ্চতায় বসে আস্বাদন করতে করতে মেজ বলল, ‘‘সবেতে কাছা টেনে ধরা দুর্বল স্বভাবের লক্ষণ। এটা কোরো না। ওটা নিয়ো না, ও দিকে তাকিয়ো না।’’  

বড় বলল, ‘‘জাঁতি সাঁড়াশি তো গেল।’’  

‘‘ওটা একটা অ্যাক্সিডেন্ট। তবে তোরা শুনে রাখ আমার আচার নিলে আমি কুরুক্ষেত্র করতাম।’’

বিষ্ণুর আচারটি রক্ষা পাওয়ায় মা মাসিরা সাঁড়াশি জাঁতি হারানোর দুঃখটা খানিক ভুলে রইল। 

টোকিয়োতে এক রাত থেকে পর দিন আমেরিকা যাত্রা। এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনায় রাতটা হোটেলে কাটিয়ে পর দিন সকালে তিন বোন আবার বিমান বন্দরে। সকলেই ঝাড়া হাত-পা। বড় বড় সুটকেসগুলো বিমান কোম্পানির ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট জায়গায় চলে গিয়েছে। সঙ্গে শুধু হাতব্যাগ। আবার সিকিয়োরিটি চেকিং। 

পরশুরামের ভাষায় উঁচু নিচু টক্করহীন জাপানিবালা ভাবলেশহীন মুখে মেজ-র ব্যাগটা আলাদা করে পাশে রেখে চোখের পাতা নাচাল। বুদ্ধিমানের জন্য ইশারাই যথেষ্ট। মেজ বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে একের পর এক জিনিস বার করতে লাগল। হজমিগুলি, মুড়ির মোয়া, ডালমুট, গজা, নিমকি, গুরুগীতা, ওষুধের পুঁটলি...আরও কত অনন্ত জিনিসের মিছিল। শেষটায় বেরল পুরনো কাপড় জড়ানো সেই সাত রাজার ধন। জাপানিবালা সামান্য একটু ঠোঁট ফাঁক করে জানাল, ওটা ছাড়া মেজ আবার সব কিছু ব্যাগে ভরে নিয়ে যেতে পারে। মেজ তার ইংরেজি শব্দভান্ডার থেকে চোখা চোখা শব্দ চয়ন করে জানাল, এটা তার পক্ষে রেখে যাওয়া সম্ভব নয় কারণ এ তার পুত্রসম নেফিউয়ের জন্য নেওয়া উপহার। জাপানি মেয়ে স্থির চোখে মেজ-র মিনিটে দুশো শব্দের সাঙ্ঘাতিক ভাষণটি শুনে আচারের বোতলটা মেজদির  নজরের আওতার বাইরে রাখার চেষ্টা করতেই স্ট্র্যাটেজি বদল করে মেজ বলল, ‘‘উই আর হাংরি অ্যান্ড উই ওয়ান্ট টু ইট দিস।’’ 

তিনটি নাছোড়বান্দা মহিলাকে নিয়ে জাপানি মেয়ে নাজেহাল হচ্ছে দেখে তার ওপরওলা এগিয়ে এসে হাল ধরল। জাপানি চেহারায় না বয়স, না অভিব্যক্তি কিছুই তো ধরা পড়ে না। সে যত ক্ষণ পাথরের মতো মুখ করে ঘটনাটা শুনছিল, তত ক্ষণে তুমভি মিলিটারি হামভি মিলিটারি মেজাজে বোনেরা ঠিক করেছে, জাপানের কাছে কিছুতেই হার স্বীকার করা চলবে না। এ একেবারে ভারতবর্ষ তথা বাংলার ইজ্জত কি সওয়াল।  

সব শোনার পর ছেলে কিংবা লোকটি রায় দিল, তারা যদি খেতে চায় এখানেই খেতে হবে। বোতল এখান থেকে সরবে না।  

তিন বোন একসঙ্গে এই সিদ্ধান্তে এল, জাপানিরা বাঙালি আচারের রূপ রস গন্ধে উতলা হয়ে ষড়যন্ত্র করে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। পরে নিজেরা খাবে।  

বিষ্ণুর প্রিয় জিনিসটা নেওয়া হল না, 

সেই দুঃখে তার মা মাসি জাপানিদের জব্দ করার জন্য সিকিয়োরিটি জ়োনে দাঁড়িয়েই আচার খেতে লাগল। বোতল কাত হয়ে মেঝেতে তেল পড়তে লাগল ফোঁটা ফোঁটা। কেউ সেটা খেয়াল করেনি, 

যত ক্ষণ না এক সুটেড বুটেড ভদ্রলোক তাতে আছাড় খেলেন। জাপানি ভাষা না জানলেও এয়ারপোর্টের কর্মচারীদের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া ভদ্রলোকের ধোঁয়া-ওঠা কথাগুলো বুঝতে 

কারও অসুবিধে হল না। জাপানি মেয়ে ও তার ওপরওলার ভাবলেশহীন মুখ যথেষ্ট বিচলিত মনে হল। কাঁদো কাঁদো মুখে এক জন টিসু পেপার দিয়ে ভদ্রলোকের দামি সুট থেকে ঘসে ঘসে তেল তুলতে লাগল। অন্য জন মেঝে মুছতে লাগল ভবিষ্যতের দুর্ঘটনা আটকানোর জন্য। নির্বিকার ভাবে মোহিনীমায়া, অতসীছায়া আর তটিনীতোয়া তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল দৃশ্যটা। তাদের হাত বা মুখ কোনওটাই বন্ধ হল না। শক্তিশালী জাপান ভূপতিত পায়ের কাছে, যেন পায়ের তলায় মহাদেবকে কোণঠাসা করে ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে মহাশক্তি মহাকালী হাত চাটছে। রক্তের বদলে আচারের তেলমশলা। তা হোকগে। পতনের ধাক্কা সামলে ভদ্রলোক নিজের সুট শেষবারের মতো ঝেড়ে টাইয়ের নট ঠিক করে চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে তাকালেন অঘটনঘটনপটীয়সী তিন বোনের দিকে। তার দৃষ্টিতে ব্যথা বিস্ময় ও জিজ্ঞাসা। শেষবারের মতো আঙ্গুল থেকে স্বর্গীয় সুধা চেটে নিয়ে নিরুপায় ভঙ্গিতে বোনেরা হাত উল্টে উত্তর দিল, ‘‘কান্ট হেল্প। উই আর ফলোয়িং ইয়োর ইন্সট্রাকশন ওনলি।’’

আচারের খালি বোতলটা জাপান জয়ের চিহ্ন হিসেবে কাউন্টারের ওপর জ্বলজ্বল করতে লাগল।