গুজরাতের পোরবন্দরের কস্তুর কাপাদিয়া আর রাজকোটের মোহন গাঁধী বা মনিয়ার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের সময়, ১৮৮২ সালে (নাকি ১৮৮১) বধূ ও বর দুজনেই নাবালিকা ও নাবালক, দুজনেরই ১৩ বছর বয়স, কস্তুর কয়েক মাসের (জন্ম এপ্রিল, ১৮৬৯?) বড়ই হবেন। কনের বাবা শেঠ গোকুলদাস সম্পন্ন বানিয়া। কনেরও শরীর-স্বাস্থ্য ভাল, তবে লেখাপড়া শেখেনি, নিরক্ষর। বর মনিয়া বা মোহনদাসের বাবা কাবা গাঁধী স্বগোত্রীয়, রাজকোটের দেশীয় রাজ্যের পদস্থ কর্মচারী। মোহনদাসের আগের দুই বাগদত্তা বিয়ের আগেই মারা গেছে, এ বারে কোনও বিপর্যয় হলে দুর্ভাগ্যের শেষ থাকত না। কস্তুর ও মনিয়ার বিয়ের মাস ও তারিখটাও ঠিক জানা যায়নি। কেউ কেউ বলেন মে, কেউ কেউ বলেন ডিসেম্বর। তবে বিয়ের সময়েও দুর্ঘটনা এড়ানো যায়নি। রাজকোট থেকে পোরবন্দরে আসতে গিয়ে গাড়ি উল্টে বরকর্তা কাবা গাঁধী আহত হন। বিবাহবাসরে চোটগুলির উপর পট্টি বেঁধে তিনি বসে ছিলেন।

অনুষ্ঠানে ত্রুটি হয়নি। খরচ বাঁচাতে ও ঝক্কি এড়াতে মোহনের বিয়ের সঙ্গে তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই ও আর এক তুতো ভাইয়ের বিয়েও সারা হয়। সপ্তপদীর অনুষ্ঠান সাঙ্গ হবার পরে বর-বউ দুজন দুজনকে নিয়মমাফিক মিষ্টি খাইয়ে দিয়েছিল, হাত ধরাধরি করে বিয়ের সভায় বেশ কিছু ক্ষণ বসে ছিল, যেন জমাটি খেলার দুই বাচ্চা জুটি। তবে এই দুটি খুদে বর-বউকে জীবনের রহস্য বোঝাবার জন্য বড়দের অভাব ছিল না।

একেবারে গতানুগতিক উনিশ শতকীয় গুজরাতি বানিয়া পরিবারের বিবাহবৃত্তান্ত, তাতে চমক কিছুই নেই। এই দাম্পত্যকথার কথনে কোনও এক বালিকাবধূর ধীরে ধীরে বড় হওয়ার মিষ্টি আখ্যান নেই। বাল্যপ্রেমে অভিশাপ থাকে, এই রকম ভারিক্কি কথাও শোনা যায়নি। তবে কালের মহিমা। সে দিনের মোহনই হয়ে উঠতে থাকেন মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী তথা মহাত্মা গাঁধী তথা ‘বাপুজি’। আর সে দিনের ছোট কনেকে সবাই পরে চিনতে শুরু করে ‘কস্তুরবা’ বলে। আধুনিক ভারতে ‘বা’ আর ‘বাপু’র দ্বৈত তথা দ্বন্দ্ব কথা এক মানুষ ও এক মানুষীর নিজেদের পারস্পরিক চেনা ও চেনানোর, বোঝা ও বুঝে ওঠার সংঘাতদীর্ণ অসম কাহিনি। 

এক দিক থেকে এই কাহিনি কথনটা একতরফা, কথকটি জবরদস্ত। বাষট্টি বছরের দাম্পত্যজীবনের আদিপর্বটি প্রায় পাঁচ দশক বাদে মোহনদাস তাঁর ‘আত্মকথা’-তে অনেকটা খোলাখুলি লিখেছিলেন, বিশেষ ঢঙে, বিশেষ উদ্দেশ্যে। তাঁর আত্মকথা তো নিজস্ব সত্যান্বেষণ, সত্যকে পাওয়ার জন্য নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিজের সত্তাকে শোধন করার প্রয়াস, আত্মশুদ্ধির যাত্রা। এই যাত্রাপথে সত্য যাচাইয়ের পরীক্ষায় কস্তুরবা এসেছেন নানা ঘটনাসূত্রে, গাঁধী জীবনের নানা দুঃসহ পরীক্ষার যেন তিনি অনুঘটক। বাপুজির সত্য-সাধনার ফ্রেমেই তো তিনি ‘বা’। সত্যসাধক গাঁধীর জবানির শেষ নেই, তাঁর চিঠিপত্র তাড়া তাড়া, আত্মস্খলন, তজ্জনিত ব্রত সাধন ও শুদ্ধির কথা বলতে তিনি কোনও দিন দ্বিধা করেননি। গাঁধী পরিকররাও একরাশ স্মৃতিকথা লিখেছেন, পারিবারিক ও আশ্রমিক জীবন যাপনের বর্ণনার টানে সেই সব স্মরণেও ‘বা’ উঁকিঝুঁকি মেরেছেন। অথচ বাষট্টি বছরের দাম্পত্যজীবনে 

‘বা’-এর নিজের বলা কোনও আপন কথা নেই। তাঁর পক্ষে সাবুদ বলতে আছে অন্যের বকলমে লেখা কয়েকটি ঘোষণা, কয়েকটি ঘটনা-কথা ও কিছু কাজকর্মের খুচরো রিপোর্ট। বাপুর রাশি রাশি কথা ও কাজ, আর তার পাশেই আছে ‘বা’-এর প্রায় নীরব উপস্থিতি। এক জনের আলোর ঔজ্জ্বল্যকে ঘিরে অন্য জনের ছায়াবৃত্ত।

জীবনচিত্র: উপরে বাঁ দিক থেকে ঘড়ির কাঁটার চলন অনুসারে: গাঁধী ও কস্তুরবা; তিন ছেলে রামদাস, মণিলাল ও হরিলাল এবং আর এক আত্মীয় গোকুলদাসের সঙ্গে কস্তুরবা; ১৯৪৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি পুণের আগা খান প্যালেসে কস্তুরবার মৃত্যুর পর গাঁধী; ১৯২২ সালে তোলা কস্তুরবা ও গাঁধীর ছবি। শেষের ছবিটি এবং এই পাতার একেবারের উপরে কস্তুরবা গাঁধীর ছবির সৌজন্য: গেটি ইমেজেস

তবে ওই ছায়ার নিজস্ব আকার আছে। তেরো বছরের কস্তুর রাজকোটের পাড়ায় বেরোতেন, ভয়ডর বেশ কম ছিল। আদরের মেয়ে, বিয়ের প্রথম পাঁচ বছরের তিন বছরই বাপের বাড়ি কাটিয়েছেন, শ্বশুরবাড়িতে টানা ছয় মাসের বেশি থাকেননি। তবে মোহনদাস নাছোড়। ওরই মধ্যে সুযোগ পেলে বউয়ের কাছ থেকে স্বামীর প্রাপ্যটুকু তিনি কড়ায়-গন্ডায় উসুল করতেন, ছাড় দিতেন না, কস্তুরের ইচ্ছা বা অনিচ্ছা নিয়ে মাথাও বড় একটা ঘামাতেন না। ১৮৮৬ সালে এক রাতে অসুস্থ বাবার পাশ থেকে মোহন উঠে এসে অন্তঃসত্ত্বা কস্তুরের শয্যাসঙ্গী হয়েছিলেন, ঠিক সেই অনুপস্থিতির সময়েই কাবা গাঁধী মারা যান। অনুশোচনা ও অপরাধের গ্লানি গাঁধীকে সারা জীবন পীড়িত করেছিল, দাম্পত্যজীবনের লালসা ও অসংযম মরণোন্মুখ পিতার প্রতি পুত্রের কর্তব্যপালনে অন্তরায় হয়েছিল। সত্যের কাঠিন্য মোহন সে দিন ভাল মতোই বুঝেছিলেন। এর পরেই কস্তুর এক অতি দুর্বল সন্তান প্রসব করেন, জন্মের দু-এক দিনের মধ্যেই অসুস্থ সন্তানটি মারা যায়। প্রথম সন্তানের মৃত্যুতে মাত্র ১৬ বছরের মা কস্তুরের কোনও প্রতিক্রিয়াই জানা যায়নি, কেউ কিছু বলে যায়নি, কেউ কিছু লিখে রাখেনি।

মোহন ও কস্তুরের দাম্পত্যজীবন পুরোদস্তুর শুরু হয় ১৮৯৭ সাল থেকে, ডারবানে, দক্ষিণ আফ্রিকায়। তখন কস্তুর ২৮ বছরের যুবতী, দুই সন্তানের জননী, লেখাপড়া বড় একটা এগোয়নি, এত দিনে অল্পস্বল্প গুজরাতি পড়তে ও নাম স্বাক্ষর করতে পারেন। প্রাপ্তবয়স্ক গাঁধী সফল ব্যবহারজীবী, আফ্রিকায় অভিবাসী ভারতীয়দের অধিকার নিয়ে আন্দোলনে নিবেদিতপ্রাণ, বাড়িতে অতিথি আসার বিরাম নেই। একেবারে নিরামিষ আহার কিন্তু তখনও মোহন এক-আধটু খেতে ভালবাসেন, ছুটির দিন সুন্দর পদ তৈরি হত, মোহন কস্তুরবাকে শিখিয়েছিলেন, ‘বা’ রাঁধতেন। তখনও গাঁধী ব্রহ্মচর্য শুরু করেননি, রামদাস ও দেবদাসের জন্ম ওই দক্ষিণ আফ্রিকাতেই হয়। গাঁধী পরিবারে নিজেদের কাজ নিজে করতে হত, কস্তুর উদয়াস্ত পরিশ্রম করতেন, গৃহস্থালি ও পাকশালার দেখভালের দায়িত্ব তাঁরই, পরবর্তী জীবনে সবরমতী সেবাশ্রমেও তিনি ওই তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থেকে রেহাই পাননি। তবে এই গৃহশ্রমের মূল্য কস্তুর বুঝতেন। ডারবানের ভারতীয়রা কস্তুরকে কিছু অলঙ্কার উপহার দিয়েছিল, আর সেগুলো যথাসময়ে জনহিতায় সর্বজনীন তহবিলে দান করার জন্য গাঁধী নির্দেশ দিয়েছিলেন। কস্তুর জানান যে তাঁর গায়েগতরে পরিশ্রমের জন্যই সংসার চলছে, গাঁধী নিশ্চিন্তে জনসেবা করতে পারছেন। অতএব ভারতীয় অভিবাসীদের জন্য তাঁর নিজের সেবাদানও কম নয়। তাঁর নিজের বিয়েতে যৌতুক হিসেবে পাওয়া সব গহনা তো স্বামীকে বিলেত পাঠাবার রাহাখরচ মেটাতে নিঃশেষিত হয়েছে। ভবিষ্যতে পুত্রবধূদের জন্য তিনি উপহার রূপে কিছু গয়না রাখতে চান। এইগুলি তাঁর হকের ধন। একেবারে বিচক্ষণ গৃহস্বামিনীর দায়বোধ ও সাংসারিক যুক্তি, উকিল স্বামীও বক্তব্যের যাথার্থ্য অস্বীকার করতে পারেননি। পারিবারিক চাপাচাপিতে কস্তুর মোহনের দাবি মেনে নেন, কিন্তু দ্বন্দ্ব কথা শেষ হয় না। 

প্রায় তিন দশক বাদে লেখা ‘আত্মকথা’তে ওই ডারবানের বাড়িতেই কস্তুরের সঙ্গে মোহনের মোকাবিলার একটি বৃত্তান্ত মহাত্মা গাঁধী পেশ করেছিলেন। সত্যানুসন্ধানের এক মুহূর্ত, অধ্যায়টির গুজরাতি শিরোনামটি সে ভাবে লেখা, ‘এক পুণ্যস্মরণ নে প্রায়শ্চিত্ত’। গাঁধী গৃহে এক নবাগত কেরানি ছিলেন অন্ত্যজ, তাঁর দেহবর্জ্য সাফ করার দায়িত্ব পড়েছিল গৃহিণী কস্তুরের উপর। মহাত্মা লিখেছেন, ‘আজকের দিনেও চোখ বুজলে স্পষ্ট দেখতে পাই কস্তুরবা কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নামছেন, হাতে তাঁর সেই পট, চোখ থেকে তাঁর লাল আগুন যেন ঠিকরে পড়ছে, গাল বেয়ে পড়ছে মুক্তোর বিন্দুর মতো চোখের জল...’ কান্নাকাটি মোহনের ধাতে সয় না, কর্তব্য কাজ করতে হবে হাসিমুখে। সে রকম আদেশ দিতেই কস্তুর ফেটে পড়লেন, চেঁচিয়ে বললেন, ‘‘বেশ তো, তোমার ঘর নিয়ে তুমি থাকো, আমায় চলে যেতে দাও।’’ রেগে আগুন মোহন তখনই হিড়হিড় করে টানতে টানতে স্ত্রীকে খিড়কির দোর দিয়ে বাড়ি থেকে বার করে দেন আর কী। সাশ্রুনয়না কস্তুর বলেন যে এই বিদেশে তাঁর কোনও স্বজন নেই, যাবেন কোথায়? আর মোহন কি লজ্জার মাথা খেয়েছেন? লোকে যদি স্বামী-স্ত্রীর এই খেয়োখেয়ি দেখে, কী ভাববে?

সবরমতীতে বসে লেখা, সত্যসাধক বাপুজির নিজের স্বীকারোক্তি। তাঁর মতে, ডারবানে স্বামী হিসেবে মোহন ছিলেন যেন নিঠুর দরদি, cruelly kind, খাস গুজরাতি লবজে ‘প্রেমাল তেবো ঘাতকী’, একাধারে প্রেমিক ও নিষ্ঠুর। তখন মোহন একাধারে মোহান্ধ স্বামী ও শিক্ষাগুরু, কস্তুরকে নিজের প্রকল্পের ছাঁচে গড়তে হবে, তাই তাঁর ভেবে রাখা সমাজ সুধারের জন্য পুরুষালি কঠোর শাসনতন্ত্র জারি করা একশো ভাগ সঙ্গত। ১৮৯৮ সালে মোহনের কাছে কস্তুর স্বামীর আজ্ঞাবহ ও বিষয়ভোগের সঙ্গী, সুখদুঃখের সমচিন্তক সহভাগিনী ও সাথী নন।

বোধোদয়ের পালাটা উভয়পক্ষেই বেশ কালসাপেক্ষ হয়েছিল, সমতালেও চলেনি। টানাপড়েনটা ভারতে প্রত্যাগমনের পরেও দূর হয়নি, কস্তুরের সংস্কার ও গাঁধীর সংস্কার এক ছিল না। ১৯১৫-তে আমদাবাদের কোচরাবে মোহনদাসের সত্যাগ্রহ আশ্রমে অন্ত্যজ দুদাভাই সপরিবারে যোগ দেন, গাঁধী পরিকরদের কেউ কেউ বেঁকে বসেন, কস্তুরবাও ঘোর আপত্তি জানান। এ বার গাঁধী মেজাজে শান্ত তবে স্বভাবে কঠোর। তাঁর সিদ্ধান্তে অমত থাকলে আশ্রম থেকে তেইশ বছর ধরে থাকা ঘরনিকে বন্ধুর মতো বিদায় নিতে বলেন। কোনও মূল্যেই বা কারও খাতিরেই দুদাভাই কথিত ‘পূজ্য দেশভক্ত মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী’ অস্পৃশ্যতার মতো পাপ বা অন্যায়কে জীবনে মানবেন না। কস্তুরবা দুদাভাইয়ের মেয়ে লক্ষ্মীকে পালিতা কন্যা হিসাবে স্বীকার করেছিলেন, কোচরাবের আশ্রম ওই একটামাত্র বাচ্চার কলহাস্যে মুখর থাকত। কস্তুরেরও সবার ‘বা’ হয়ে উঠতে সময় লেগেছিল।

দ্বন্দ্ব অহর্নিশ। দ্বন্দ্ব তো বিরোধ আর মিলমিশ দুটোই বোঝায়। গাঁধী রুগির সেবা করতে ভালবাসতেন, স্বাস্থ্য সম্পর্কে তাঁর নিজের তত্ত্ব ছিল, ওই বিষয়ে বইও লিখেছিলেন, ভাল বিক্রি হত। আফ্রিকাতে ছেলে দেবদাসের প্রসব তিনি নিজে করান। একাধিক বার কস্তুর রক্তস্রাবে মৃতপ্রায় হন, নিজের বিধি ও পথ্যে সেবা করে তিনি পত্নীকে সুস্থ করেন। ডালের সুরুয়া দুজনের প্রিয় ছিল, দুজনে একমত হয়ে খাওয়া ছেড়ে দেন। এই নির্ভরতা ও সেবা-সাহচর্যের কথা দাম্পত্যজীবনের ‘মধুরতম’ স্মৃতি বলে ‘আত্মকথা’তে স্থান পেয়েছে। আবার ভারতে ১৯১৮ সালে রক্ত-আমাশাতে গাঁধীর প্রাণসংশয় হয়। কস্তুরের  কথার ফেরেই তিনি ছাগলের দুধ খেতে শুরু করেন, মনে দ্বিধা ছিল কিন্তু প্রাণটা জোর বেঁচে যায়। ছাগলের দুধ আর গাঁধীর দৈনন্দিন জীবনচর্যার অন্যোন্য প্রতিমাকল্পের মূলে বা-এর পরামর্শ ছিল।

স্বীকারোক্তিতে গাঁধীর তুলনা মেলা ভার। ১৯২৭-এ সিংহলের এক জনসভায় বা-এর উপস্থিতিতেই মহাত্মা বলেছিলেন যে কস্তুর একাধারে তাঁর ‘মা, বন্ধু, নার্স, রাঁধুনি, বোতল পরিষ্কারক।’ দাম্পত্যজীবনের ফলের ভাগও শেয়ালের চতুরালিতে ভর্তি, বাপুর বরাতে সব ‘সন্মান’, বা-এর কপালে ‘একঘেয়ে খাটাখাটুনি’। ১৯৩৩-এ এক অনশনের প্রাক্কালে মীরা বেনকে ইয়েরওয়াড়া জেল থেকে বাপু জানান যে কস্তুরের উপর তাঁর বাবা যে গুরুভার বোঝা চাপিয়েছেন, অন্য যে কোনও মেয়ে তার চাপে শেষ হয়ে যেত।

খেয়াল করলে মনে হয় যে এক পাহাড় নয়, একেবারে তিন পাহাড়ের বোঝা কস্তুরের কাঁধে আস্তে আস্তে চেপে বসেছিল। নিজের পরিবারের চাপ বড় কম নয়। ১৯২০-তে স্থিতপ্রজ্ঞ গাঁধী নিজে চল্লিশোর্ধ্বা সরলা দেবী চৌধুরাণীর দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, ‘মুগ্ধা’ সরলাও সবরমতীতে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে মোহনের মেলামেশা নিয়ে আশ্রমিক ও গাঁধী শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে গুঞ্জন ওঠে। ‘আত্মকথা’তে এই সম্পর্ক নিয়ে মোহনদাস রা কাড়েননি। কস্তুরের মনের কথা বলার কেউ নেই, তবে ওই দিনগুলিতে আশ্রমের অতিথিচর্যায় কোনও ত্রুটি হয়েছিল, এমন তথ্যও কেউ জানাননি।

নিজের ছেলেদের কস্তুর বড় ভালবাসতেন, বিশেষত বাউন্ডুলে, পিতৃদ্রোহী, স্বাতন্ত্র্যপ্রিয় ও নেশুড়ে বড় ছেলে হরিলালকে। ছেলে গৃহত্যাগী, মাঝে অল্প দিনের জন্য ধর্মত্যাগও করেছিল, বা-এর বেদনা ও উদ্বেগের অন্ত ছিল না। ১৯৪১-এর ১ মার্চ কাটনি স্টেশনে জব্বলপুর এক্সপ্রেস থেমেছে, বা ও বাপু যাচ্ছেন, প্ল্যাটফর্ম লোকারণ্য। ওই ভিড়ের মধ্যে প্ল্যাটফর্ম থেকে ঘরছাড়া হতশ্রী হরিলাল একটা কমলালেবু বা-এর হাতে তুলে দেয়। লেবুটা এক ফলওয়ালার কাছ থেকে ছেলে ভিক্ষা করে এনেছিল। তাড়াহুড়োয় নিজের ফলের ঝুড়ি থেকে মা দুঃস্থ সন্তানকে কিছু দিতে পারেননি। ট্রেন ছেড়ে দেয়, চারপাশে ‘মহাত্মাজি কি জয়’-এর মধ্যে সে দিন হরিলালের একক ক্ষীণ স্বর শোনা গিয়েছিল ‘মাতা কস্তুরবা কি জয়’।

কস্তুর আশ্রমমাতাও বটে। আশ্রম তো গাঁধীর বৃহত্তর পরিবারবৃত্তের মধ্যে; সব ঝক্কি কস্তুরবার, ‘চুক’ হলেই শেষ কৈফিয়তের দায়িত্ব বা-এর। ওয়ার্ধার সেবাগ্রামে বাপু ও বা-এর একসঙ্গে থাকার জন্য আলাদা কুটির ছিল, প্রায় রাতে গাঁধীর কোনও কোনও পরিকর, বিশেষত মহিলারা এসে শুয়ে পড়তেন, কস্তুরবা এক দিনও আপত্তি করেছেন বলে শোনা যায়নি। বরং সবার আগে উঠে কুটিরটি পরিষ্কার করার দায়িত্ব তিনি স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছিলেন।

তবে বা-এরও নিজের ইচ্ছার জগৎ ছিল। ১৯৩৮-এর মার্চে গাঁধীর সঙ্গে পুরীতে এসেছেন, সঙ্গে মহাদেব দেশাইয়ের স্ত্রী দুর্গাও আছেন। 

দুই অন্তরঙ্গ বান্ধবী পা-চালিতে উঁকিঝুঁকি মারতে মারতে জগন্নাথ মন্দিরে ঢুকে পড়েন। খুব হইচই হয়নি, কেবল কথাটা গাঁধীর কানে পৌঁছয়। মন্দির প্রাঙ্গণ তো পরিত্যাজ্য, কারণ মন্দিরে হরিজনদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। গাঁধীর মতে, সচিব মহাদেব দেশাইয়ের উচিত ছিল, বা ও দুর্গাকে আগেভাগে সাবধান করা। মহাদেব জানান যে কস্তুর বা দুর্গা কোনও শপথ নেননি, ধর্মপ্রাণা রমণী হিসেবেই তাঁরা মন্দিরে ঢোকেন, কোনও মহাভারত অশুদ্ধ হয়নি। বাপুর ‘বা’ হওয়ার অর্থ এই নয় যে মনের অকৃত্রিম ভক্তি প্রণোদিত সব ‘স্বভাব’ আচরণকে বাদ দিতে হবে।

এই ধর্মপ্রাণা কস্তুরবাই তো পয়লা নম্বর সত্যাগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। ১৯১৩, দক্ষিণ আফ্রিকা, জজ ম্যালকম শার্লে রায় দিলেন যে খ্রিস্টীয় মতে বিবাহ বা সরকারি রেজিস্ট্রি ছাড়া অন্য কোনও দেশজ ভারতীয় বিবাহ অনুমোদিত নয়, অর্থাৎ অভিবাসীদের স্বামী-স্ত্রী হিসাবে গৃহস্থ জীবনই বৈধ নয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে গাঁধীর আশ্রমে কস্তুরবা স্ব-উদ্যোগে মহিলা প্রতিবাদী দল তৈরি করলেন, আন্দোলনে নামতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। মোহনদাস তাঁদের শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কস্তুর মোহনকে তাঁদের পরিণতি নিয়ে মাথা ঘামাতে মানা করলেন, সবাই যদি সত্যাগ্রহ করে, তাঁরাও বা কেন পিছপা থাকবেন? তিন জন আশ্রমিকা সমেত ষোলো জন সত্যাগ্রহী নিয়ে ‘বা’ ট্রান্সভাল-এ পারমিট ছাড়া প্রবেশ করেছিলেন, অভিবাসন কর-বিরোধী প্রচারও আরম্ভ হল। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯১৩-তে কস্তুর ও তাঁর সহ-সত্যাগ্রহীদের তিন মাসের সশ্রম কারাদণ্ড হল, সাধারণ কয়েদিদের মতোই তাঁরা স্মাটস-এর জেলে মেয়াদ ভোগ করেন।

১৯১৭, বিহারের চম্পারনে নীলকরদের বিরুদ্ধে চাষিদের সত্যাগ্রহ। গাঁধীর কাছে গণ আন্দোলন শুধু নিছক দাবিদাওয়া মেটাবার নয়, সার্বিক সচেতনতা ও জীবনচর্যা বদলাবার পন্থাও বটে। গরিবগুরবোদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের অবস্থার উন্নতির জন্য গাঁধীর ডাকে জোরালো মহিলা স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী চম্পারনে আসে। দলে শিক্ষিতা অবন্তিকাবাই গোখলে, আনন্দীবাই থেকে স্বল্পশিক্ষিতা দুর্গা দেশাই ও নিছক অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন কস্তুরবাও আছেন, যে যাঁর ক্ষমতামতো গাঁয়ের কিষানদের মহিলামহলে ঢুকে পড়েছেন। স্বচ্ছ ভারতের কথা গাঁধীর মাথায় ঘুরঘুর করছে। ভীতিহরবা বলে ছোট্ট গাঁয়ের সংলগ্ন এক দীন বসতিতে কস্তুরবা মেয়েদের পরনের কাপড় পরিষ্কার করার কথা বলেন। তারা জানায় যে তাদের কুল্লে একটাই পরনের কাপড়, কখনই বা ধোয় বা কীই বা করে? কর্মী কস্তুরবার জবানির মাধ্যমে গাঁধীর সে দিন অভিজ্ঞতা হয়েছিল যে ভারতের গ্রামজীবনের বড় শত্রু দারিদ্র, গ্রামীণ অর্থনীতির স্বনির্ভরতা ছাড়া স্বরাজের সব সামাজিক প্রকল্পই অর্থহীন। 

১৯৩৩-এর অগস্টে গাঁধীকে সরকার জেল থেকে ছেড়ে দিল। তখন কস্তুরবাও আইন অমান্য আন্দোলনে আমদাবাদ জেলে আটক ছিলেন, অল্প কিছু দিনের জন্য স্বামীর কাছে ইয়েরওয়াড়া জেলে এসেছিলেন। ২৫ নভেম্বর কস্তুরবা সরকারকে জানালেন যে সুস্থ ও মুক্ত স্বামীকে দেখভালের দায়িত্ব আপাতত তাঁর নেই। তবে সত্যাগ্রহী হিসেবে তাঁর নিজের মেয়াদি শাস্তি তিনি ভোগ করতে প্রস্তুত। চিঠিটা লেখা ইংরেজিতে, মহাদেব দেশাই বা দেবদাস গাঁধীর মতো কেউ হয়তো মুসাবিদা করেছিলেন, সইটা আঁকাবাঁকা দেবনাগরি অক্ষরে, কস্তুরবার নিজের আখর, ইচ্ছেটা তো তাঁরই। খেড়া যাওয়ার পথে কস্তুরবাকে নায়দাদের জেলা আদালতে তোলা হয়। পেশার জবাবে কস্তুরবা বলেন ‘দেশসেবা’, এলাকার অবস্থা জানাটা তাঁর উদ্দেশ্য, আর যে কোনও জুলুমবাজির আইন ভাঙাই তো তাঁর মতো সত্যাগ্রহীর ধর্ম। এই জবাবের পর জেলে পাঠানো ছাড়া সরকারের গত্যন্তর ছিল না। বাপু নিজে মুক্ত, তবে সত্যাগ্রহী ‘বা’ তাঁর বাকি সাড়ে পাঁচ মাসের পুরো মেয়াদ জেলেই পূর্ণ করলেন।

ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯। রাজকোটে রাজার স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে প্রজা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। মনিবেন ও মৃদুলা সরাভাইকে সঙ্গে নিয়ে রুগ্না কস্তুরবা সত্যাগ্রহে যোগ দিলেন, চরম এক অস্বাস্থ্যকর জায়গায় ঘোর অসুস্থ বা-কে আটকে রাখা হল। সবাই শঙ্কিত। সেবাগ্রাম থেকে গাঁধী সরাসরি জানালেন যে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কস্তুরবাকে দিয়ে কিছু করানো কারও সাধ্যাতীত। তিনি রাজকোটের মেয়ে, ব্যক্তিগত ভাবে তাঁর প্রাণ রাজকোটের আন্দোলনে সাড়া দিয়েছে। ভারতের মানচিত্রে রাজকোট তুচ্ছ জায়গা, কিন্তু বাপু আর বা-এর কাছে তুচ্ছ নয়।

৯ অগস্ট ১৯৪২। মুম্বইতে ভোরে গাঁধী গ্রেফতার হলেন। শিবাজি পার্কে বিকেলে জনসভা। কস্তুরবা একেবারে বলিয়ে-কইয়ে নন। তবু বন্দি অসুস্থ স্বামীর সঙ্গ তিনি নিলেন না। বরং বিকেলের সভায় স্বামীর অনুপস্থিতিতে তিনি বক্তব্য রাখার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।

সরকার কোনও ঝুঁকি নেয়নি। বিকেলের জনসভা নিষিদ্ধ করে কস্তুরবাকে গ্রেফতার করে গাঁধীর কাছে পুণের আগা খান প্রাসাদে পাঠানো হল।

অগস্ট ১৯৪২ থেকে ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪। বা আর বাপু, দুই সত্যাগ্রহীর জীবন কেটে যায় পারস্পরিক সাহচর্যে। সঙ্গী মহাদেব দেশাই বন্দি হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে মারা গেছেন, তখন বা ও বাপুর সঙ্গী সুশীলা নায়ার ও কন্যাসমা মানুবেন। প্রতি বিকেলে দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা গল্প করেন, কথার বিষয় ভূগোল ও ইতিহাস, এক-আধটু বই পড়া, মাঝে মাঝে কস্তুর বাপুর আন্দোলনের স্বরূপ ও সার্থকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন; ছেলেবেলার বকেয়া শিক্ষা সূচি যেন কড়ায় গন্ডায় বৃদ্ধ বয়সে উসুল করে নিতেন। গাঁধী কস্তুরকে দুটি প্রিয় ভজন শিখিয়েছিলেন, রাত্তিরে দুজনে মিলে গাইতেন। সরোজিনী শুনে ঠাট্টা করে বলেছিলেন, এত দিনে বুড়ো বয়সে দুজনে মধুচন্দ্রিমা যাপন করছেন।

এক দিন ওই রাজকীয় বন্দিশালাতে আফ্রিকাবাসী পুত্র মণিলাল ছাড়া তিন ছেলে মাকে দেখতে এসেছিল, পাত পেড়ে একসঙ্গে খেয়েছিল। বা ও বাপু নয়ন ভরে দৃশ্যটা দেখেছিলেন। তবে অবিমিশ্র সুখ কোথায় বা আছে? হরিলাল অপ্রকৃতিস্থ অবস্থায় আর এক দিন এসেছিল, কস্তুরবা শুধু মাথা চাপড়েছিলেন।

ডিসেম্বর ১৯৪৩। বা-এর হার্ট অ্যাটাক। সত্তরোর্ধ্ব কস্তুরবা শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। পেনিসিলিন আনা হয়, শেষ পর্যন্ত দেওয়া হয় না। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৪। ইংরেজ সরকারের বন্দি ৭৪ বছরের এক ভারতীয় সত্যাগ্রহী কস্তুর কাপাদিয়া গাঁধী আর এক সত্যাগ্রহী মোহনদাসের কোলে মাথা রেখে মারা যান। হিন্দু পঞ্জিকা মতে, দিনটা শুভ, শিবরাত্রি।

কস্তুর ‘বা’ আদৌ উজানি মেয়ে নন, সরোজিনী নায়ডু, সরলাদেবী বা সুচেতা কৃপালনির সঙ্গে তুলনা চলে না, সেই শিক্ষা ও পরিবেশই তিনি কোনও দিন পাননি। ১৯১৪-তে লন্ডনে প্রথম সাক্ষাৎকারে সরোজিনী কস্তুরকে একেবারে ঘরোয়া বধূ বলেছিলেন, গৃহস্থালির শতেক কাজে ব্যস্ত। নারীবাদীরা স্বামী গাঁধীর কঠোর পুরুষালি ব্যবহারের তীব্র নিন্দা করেছেন, গাঁধীরও অভিযোগ মানতে আপত্তি ছিল না। ১৯৩২-এ ছেলে রামদাসকে গাঁধী লিখেছিলেন যে কস্তুরের প্রতি তাঁর ব্যবহারের অনুসরণ যেন ছেলে না করে, প্রথম যৌবনে কস্তুরের কাজের কোনও স্বাধীনতা ছিল না, তিনি নিজেই সব ভোগ করেছিলেন।

বাপুর মতে, তাঁদের দাম্পত্যজীবন কোনও মধুর খেলা ছিল না। জেদি কস্তুরের কাছেই একরোখা বাপু শেষে বুঝেছিলেন যে কস্তুরের জেদ আসলে অনমনীয় ইচ্ছাশক্তির নামান্তর, যে কোনও সাধারণ পরিবারেও তো স্বরাজ-এর দরকার হতে পারে। বাষট্টি বছর ধরে সময় গড়িয়েছে, কখনও দুই জনের মত মিলেছে, কখনও বা মেলেনি, আলোচনার সুযোগ অনেক সময় হয়নি। তবে দাম্পত্যজীবন ও গণজীবনের প্রতিচ্ছেদের নানা ক্ষণে দুই জনেরই পারস্পরিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে, অথচ কেউ কারও নিছক প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠেননি। বা-এর মতো অসংখ্য আপাত অ-আলোকপ্রাপ্তা মহিলা গাঁধীর আন্দোলনে এসেছিলেন, তাঁদের স্ব-উদ্যোগ ও সাহসে ভরা সাফল্য ও ব্যর্থতার নানা মুহূর্ত জনজীবনের নানা ঐতিহাসিক ক্ষণে পরিণত হয়েছিল। এই সব সর্বংসহা ও সর্বজয়াদের ছোট ছোট বিস্মৃতপ্রায় জীবনকথাই যেন বা-বাপুর কিছু জানা ও কিছু অজানা দ্বৈতজীবনে মাঝে মাঝে অনুরণিত হয়েছে।