ছোট ছোট এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে হাত তুলে হিন্দিতে জয়ধ্বনি করছিল। বাঁ হাতে ধরা হাতে-লেখা পোস্টার। কোনওটায় লেখা— ‘শহিদ ক্ষুদিরাম বোস অমর রহে’, কোনওটায় ‘নহি চাহতা হারনা/ নহি চাহতা জিত; রুক কর— সুননে দো মুঝে/ জীবন কা সঙ্গীত।’ একটু আগেই শেষ হল গান-স্যালুট। বিহার পুলিশের মোট এগারো জন সদস্য সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে ছোট্ট পার্কের কোণে। সকাল আটটাতেই জেলাশাসক-সহ কয়েকশো মানুষ মুজফ্ফরপুরের কোম্পানিবাগে সমবেত হয়েছেন। এখন অবশ্য এই পার্কের নাম হয়েছে ‘ক্ষুদিরাম বোস ও প্রফুল্ল চাকি স্মারক স্থল’। ক্ষুদিরামের মূর্তির পাশে পরে প্রফুল্ল চাকিরও মূর্তি বসেছে। নাগরিক মোর্চা হ্যান্ডবিল বিলি করছিল। দেখা গেল, ১১ অগস্টই রেলস্টেশনে সত্যাগ্রহ; দাবি, শহিদ ক্ষুদিরাম বসুর নামে মুজফ্ফরপুর রেলস্টেশনের নাম আর মোকামা রেলস্টেশন শহিদ প্রফুল্ল চাকির নামে করতে হবে। আর আছে জেল চৌহদ্দির মধ্যে ফাঁসিস্থল সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়ার আর্জি। আবেদনে সই তিরিশ জনের, বাঙালি এক জনও নেই। স্লোগান, গান-স্যালুটের গুলির শব্দ, আবার নীরবতা পালনের আবহে পার্কে দাঁড়িয়ে রাস্তার উল্টো দিকের চৌহদ্দিতে চোখ চলে যাচ্ছিল বার বার। এরই কাছাকাছি, ওই রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ১৯০৮ সালে বৈশাখের এক সন্ধ্যায় উনিশ বছরের ক্ষুদিরাম বসু আর সদ্য যুবা প্রফুল্ল চাকি অত্যাচারী ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে মারার চূড়ান্ত অভিযানে নেমেছিলেন। ক্ষুদিরামের বোমায় ভুলক্রমে মারা গেলেন কেনেডিরা। ধরা পড়ে গেলেন ক্ষুদিরাম। আর তার পর বিচারে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম শহিদ মেদিনীপুরের এই বিপ্লবীর ফাঁসি হল মুজফ্ফরপুরেই।

ক্ষুদিরামের চিতাভূমিও এই মুজফ্ফরপুরে। বিহারের এই জেলাসদরের ঘিঞ্জি রাস্তাঘাট, অগোছালো বাড়িঘরের মধ্যে ১০ অগস্ট সন্ধ্যায় চিতাভূমির বেদিতে ১১১টি প্রদীপের বিচ্ছুরিত আলোয় আশপাশের বস্তির ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভিড় করে এসেছে চারপাশে। বুড়িগণ্ডক নদী আরও কিছু দূরে। স্থানীয় যুবক পিন্টু শুক্ল, সাকেত সিংহ বা শশীরঞ্জনের মতো অনেকেই দীর্ঘ দিন যাবৎ এই চিতাভূমি রক্ষণাবেক্ষণ করছেন। তাঁরা জানেন, স্বাধীনতা-প্রত্যাশী উনিশ বছরের একরোখা তরুণ— ধুতি-পাঞ্জাবি পরা ক্ষুদিরাম মুজফ্ফরপুরের মাটিকে গরিমা দিয়েছেন। এই স্বাধীনতার গরিমা মিশে গিয়েছে ক্ষুদিরামের স্মরণ-শ্রদ্ধাঞ্জলিতে। কিংসফোর্ডের সেই বাংলোতেও দেখা হল মাসকয়েক আগে দায়িত্ব নেওয়া জেলাশাসক আলোকরঞ্জন ঘোষের সঙ্গে। বহু শতকের প্রবাসী এই বঙ্গতনয়ও রীতিমতো আপ্লুত।

১১ অগস্ট ভোর তিনটে বাজার আগেই জেলাশাসক পৌঁছেছেন জেল অন্দরে। ভোর রাতে জেলের মধ্যেই হল মূল শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান— ফাঁসির ক্ষণটিকে মনে রেখে। ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রীও। ফুলমালা দিয়ে সাজানো ক্ষুদিরামের কারাবাসের ছোট কক্ষটিও। অজস্র গাঁদাফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মহিলা পুলিশকর্মীরা। একটু আগে জেল চত্বরে ভেসে আসা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’-র পরিচিত সুরের রেশ তখনও ছিল। সেখানে সবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরছিলেন অনুমতি পাওয়া সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা জনাদশেক জেলবন্দিও। এই মুজফ্ফরপুর কারাগার ১৯৯৫ সালে নাম বদলে হয়েছে ‘শহিদ ক্ষুদিরাম বোস কেন্দ্রীয় কারা’। যখন চলছে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব, সে দিনও সেখানে আছেন ২১০৪ জন কয়েদি। এখানে ক্ষুদিরামের স্মৃতিবিজড়িত সংরক্ষিত কক্ষ যেমন আছে, তেমনই প্রফুল্ল চাকির নামেও আছে সংরক্ষিত এলাকা। ভোর তিনটে পঞ্চাশ থেকে চারটে কুড়ি পর্যন্ত হল ফাঁসির মঞ্চের সামনে মাল্যদান অনুষ্ঠান। ফুলের মালা, ধূপ আর প্রজ্বলিত শিখার মধ্যে নীরবতা পালন। একের পর এক বক্তৃতার কোনও ব্যাপার নেই, পুরো সময়টাই নীরব শ্রদ্ধাঞ্জলি। অথচ উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক থেকে জেলাশাসক, বিহার সরকারের মন্ত্রী-সহ রাজনৈতিক নেতারাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত! ফাঁসির মঞ্চের পিছনের চত্বরে বৃক্ষরোপণ করলেন জেলাশাসক। মেদিনীপুর থেকে নিয়ে যাওয়া চন্দন আর তুলসী চারাও রোপণ করা হল এই চত্বরে— মেদিনীপুরের মাটি আর জলের স্পর্শে। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষুদিরাম তাঁর শেষ চিঠিতে মেদিনীপুরে এক বার যেতে চেয়েছিলেন। সে ইচ্ছে অপূর্ণই থেকে গিয়েছে। তাই তাঁর বাসভূমি, স্কুল-সহ স্মৃতিভূমির মাটি নিয়ে গত বছর এখানে প্রথম এসেছিলেন মেদিনীপুরের অরিন্দম ভৌমিক। ইতিমধ্যে অনেক অজানা তথ্য, সরকারি দস্তাবেজের সাহায্য নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘কে ক্ষুদিরাম?’ বই। এ বছর তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন মেদিনীপুরের ছাত্রসমাজের প্রতিনিধি আর ক্ষুদিরামের দিদি অপরূপা দেবীর পৌত্র সুব্রত রায়, সস্ত্রীক। সত্তর বছর আগে ১৯৪৯ সালে শেষ বার পরিবারের পক্ষে ক্ষুদিরামের বন্ধুসম ভাগ্নে তথা অপরূপা দেবীর ছেলে ললিতমোহন রায় ও তাঁর ভাই ভীমাচরণ মুজফ্ফরপুরে এসেছিলেন। গত সাত দশক পরিবার বা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কোনও অংশগ্রহণ না থাকলেও এত কাল ধরে ধারাবাহিক ভাবেই বিহারে সরকারি স্তরে এই স্মরণ-শ্রদ্ধাঞ্জলি মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে।

নাম-মাহাত্ম্য: ক্ষুদিরাম বসুর নামেই নামকরণ হয়েছে মুজফ্‌ফরপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের।

আদতে বঙ্গবাসী জানেই না পড়শি রাজ্যে কী সম্ভ্রমের সঙ্গে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পালিত হয় ক্ষুদিরামের ফাঁসির দিনটি। জেলের মূল সংরক্ষিত ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে জেল চত্বরের পার্কে, ১৯৯৭ সালে উঁচু প্রশস্ত বেদিতে যে আবক্ষ মূর্তি প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, সেখানেও চলছে পুলিশ কর্মীদের স্যালুট আর মাল্যদান। এই বেদির নীচেই সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে সোহনলাল আজাদ। মুজফ্ফরপুর জেলাবাসী সোহনলাল শহিদ সম্মান যাত্রায় দিল্লি পটনা ইলাহাবাদ অমৃতসর ও মেদিনীপুর যাবেন। ১১ অগস্ট সকালেই উপস্থিত হয়েছেন জেল ফটকের বাইরে ক্ষুদিরামের মূর্তির সামনে। স্বাধীনতা সংগ্রামীর তাম্রপদক পাওয়া, নব্বই ছুঁই-ছুঁই মধুসূদন ঝা দেখাচ্ছিলেন শহরের অন্য প্রান্তে ক্ষুদিরামের বিচারালয়ের ভবনে কাঠগড়ার ভগ্নাবশেষ। এমনকি, মেদিনীপুর থেকে ক্ষুদিরামের জন্মভূমির প্রতিনিধিরা যাচ্ছেন জেনে বহু সংবাদমাধ্যম মাঝরাতে রেলস্টেশনেও উপস্থিত।

স্মরণ: কারাকক্ষে সজ্জিত ক্ষুদিরাম বসুর ছবি। 

তবে ক্ষুদিরামের নামে স্টেশনের নামকরণ হয়েছে এই বিহারেই। সমস্তিপুর জেলার পুসা রেলস্টেশন এখন ‘ক্ষুদিরাম বোস পুসা’। মুজফ্ফরপুর থেকে ৪০ কিমি দূরত্বের এই রেলস্টেশনের পাশের এক দোকান থেকেই ক্ষুদিরামকে ধরেছিল পুলিশ। পুসার এই বাজার এলাকার এক পাশে ক্ষুদিরামের আবক্ষ মূর্তিতে জন্ম-মৃত্যুদিন স্মরণ করেন এখানকার মানুষজন।

মুজফ্‌ফরপুর জেল চত্বরের পার্কে তাঁর আবক্ষ মূর্তিতে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন পুলিশকর্মীরা 

কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে মুজফ্ফরপুর আসা ক্ষুদিরাম বসু আর প্রফুল্ল চাকির নিশানা ব্যর্থ হয়েছিল। ঘটনার পর ধরা পড়লে প্রফুল্ল চাকি নিজেকে গুলি করে আত্মবলিদান দিয়েছিলেন। আর  ক্ষুদিরাম ধরা পড়েছিলেন। তার পর মুজফ্ফরপুরে জেলবন্দি। মাত্র মাস চারেকের মুজফ্ফরপুর পর্ব। ১১১ বছর আগে স্বাধীনতার জন্য শহিদ ক্ষুদিরাম, আজও মুজফ্ফরপুরে সরকার থেকে সাধারণ মানুষের স্মরণে শ্রদ্ধায় তর্পণে জাগরূক হয়ে আছেন। কিন্তু এই বঙ্গে তাঁর জন্মভূমিতে, বা সরকারি স্তরে আজ ক্ষুদিরামকে নিয়ে এমন শ্রদ্ধাঞ্জলির আবেগ কোথায়? রাজনৈতিক ছাতার তলায় দুর্গাপুজোর খুঁটিপুজোর হুজুগে প্রথা, ডিজে-র গানের তালে তালে দেবস্থানে যাওয়া, মনীষীকে সামনে রেখে আত্মপ্রচার, কিছুতেই পিছিয়ে নেই বাঙালি। বাঙালি বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে নিয়ে মুজফ্‌ফরপুরের এই জয়গান বঙ্গবাসীকেই লজ্জায় অধোবদন করে তুলবে।