গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণুর্গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ

গুররেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।

(গুরু ব্রহ্মা। গুরু বিষ্ণু। গুরু মহেশ্বর। গুরু স্বয়ং ব্রহ্ম। সেই গুরুকে নমস্কার।)

এ হেন পরম পূজ্য গুরুদের নিয়েই অধুনা বেশ ফেঁসে আছে ‘জ্ঞানশ্রেষ্ঠ’ বাঙালি। খবরে, ইন্টারনেটে গুরুবিরোধী আলোচনা অন্যতম কালের চর্চা। 

হবে না-ই বা কেন! দিকে দিকে স্কুল-কলেজে শিক্ষকদের যে চেহারা প্রকট হচ্ছে, তা আর যাই হোক, গুরুসুলভ নয়। বারংবার প্রশ্ন উঠছে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে। সামনে আসছে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ভয়াবহ চেহারা। যেখানে কোথাও শিক্ষককে পিটিয়ে ছাত্র হয়ে উঠছেন নেতা। আবার কোথাও ছাত্রকে পিটিয়ে শিক্ষক যাচ্ছেন শ্রীঘরে। 

গুরুবাক্যে শয্যাশায়ী শিশু। বেত্রাঘাতে ধরাশায়ী কিশোর। গুরুলাম্পট্যে আত্মহননমুখী তরুণী। এ সব খবর যত দিন যাচ্ছে, ততই যেন আরও বেশি দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। টেলিভিশনের লাইভ ফুটেজে মুখে বালিশের ওয়াড় পরে গ্রেফতার হচ্ছেন শিক্ষক। আর সে সব ছবিচাপাটি দেখে ত্রিকালদর্শী বাঙালি বলছে— ‘‘কলি, কলি, ঘোর কলি। সে এক সময় ছেলো, গুরু যখন ছিলেন ঈশ্বর সমান। গুরুস্পর্শে নিতান্ত গোবর মস্তিষ্কেও প্রাণের অঙ্কুরোদ্গম হতো। আহা! কী তাঁর বোধ! কী তাঁর মনুষ্যত্ব! কী 

তাঁর মমত্ব!’’

তাই কী! 

মহাভারত

একুশ শতকের প্রথম দশক। আচমকাই সে বছর প্রেসিডেন্সি কলেজের ক্লাসঘর ২৫ থেকে ৩৫ হল। প্রবল রেগে গিয়ে ইতিহাসের এক পরিচিত বর্ষীয়ান শিক্ষক সিদ্ধান্ত নিলেন, ক্লাসেই আসবেন না। শিক্ষকদের কমন রুমে উষ্মা প্রকাশ করে সহকর্মীদের বললেন, ‘‘৩৫ জন ছাত্রকে সামলে গভীর থেকে গভীরতর বিষয়ের ব্যুৎপত্তিতে পৌঁছনো কখনও সম্ভব? এ ভাবে অনার্সের ক্লাস হয়? এ কি গো-শালা নাকি?’’ (ভাগ্যিস তখন বিজেপি ছিল না! ক্লাসকে ‘গো-শালা’ বলার পুরস্কারস্বরূপ হয়তো সেই চরম ‘লিবারালিজ়ম’পন্থী শিক্ষককে প্রেসিডেন্সি থেকে সরিয়ে দলের সদস্যপদ নিতে বাধ্য করা হত।) 

প্রাথমিক ক্ষোভ কাটিয়ে সেই শিক্ষক ক্লাসে এলেন বটে! তবে ৩৫ জনকে সামলাতে বেশ কিছু দিন বেগ পেতে হয়েছিল তাঁকে। আর শ্রীদ্রোণের কপালে তো জুটেছিল ১০৫। পাণ্ডবীয় পঞ্চ এবং কৌরবীয় শতম্। তদুপরি শান্ত, স্থিতধী বলে তাঁদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই কোনও অভিযোগ ছিল না। ভীম-দুঃশাসনদের নিয়ে গুরুর পক্ষে মাথা ঠান্ডা রাখা স্বাভাবিক ভাবেই যথেষ্ট মুশকিল ছিল। তবু তিনি গুরু দ্রোণ। গুরুশ্রেষ্ঠ। দ্বাপর যুগের কোনও এক সকালে একে একে ছাত্রদের তিনি জিগ্যেস করতে শুরু করলেন, ‘‘গাছের ডালে কী দেখতে পাচ্ছ?’’ শতাধিক বুরবকীয় উত্তর শোনার পর পছন্দের শিষ্য অর্জুন বললেন, ‘‘পাখির চোখ।’’ আলোকবিজ্ঞান এই উত্তরকে সমর্থন করুক ছাই না করুক, দ্রোণের মনঃপূত হল। উল্লেখ্য, অত দূর থেকে কেবলমাত্র পাখির চোখ দেখতে পেলে আজকালকার চক্ষু বিশেষজ্ঞেরা চশমার নিদান দিতেনই। তা যা হোক, ক্লাইম্যাক্স দৃশ্যে অর্জুন বাণ ছুড়লেন। এবং দেখা গেল পাখির চোখ বিদ্ধ করেছে একটি নয়, দু’টি তির।

গল্পে ঢুকলেন একলব্য। আড়ালে থেকে দ্রোণকে গুরু মেনে ছিলেন যে ব্যাধপুত্র। পরবর্তী গল্প সকলেরই জানা। গুরুদক্ষিণা হিসেবে একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ চাইলেন দ্রোণ। একলব্য দিলেন। এবং তার পর খুশি হয়ে দ্রোণ বর দিলেন— এর পর থেকে কোনও ব্যাধকে আর তির ছোড়ার জন্য বুড়ো আঙুল ব্যবহার করতে হবে না। তর্জনী আর মধ্যমার সাহায্যে কী ভাবে তির ছুড়তে হয়, তা জানার জন্য পাঠক ‘মৃগয়া’ ছবিটি দেখে নেবেন। আর এক ‘গুরু’ মিঠুন চক্রবর্তী শিখিয়ে দিয়েছেন।

নব্বই দশকের মাঝমাঝি। কলকাতার উত্তর প্রান্তে এক বঙ্গীয় ইস্কুলে বাংলা ক্লাসে টেবিলে স্কেল ঠুকতে ঠুকতে মহাভারত পড়াচ্ছিলেন এক ধুতি-ফতুয়া পরিহিত শিক্ষক। এলাকায় তিনি মহাপণ্ডিত বলে খ্যাত। বেত এবং প্রেমের এক আশ্চর্য যুগলবন্দি তৈরির জন্য এলাকার মানুষ তাঁকে একাধারে ভয়, ভক্তি করতেন এবং ভালবাসতেন। গুরুপূর্ণিমার দিন গুরুপ্রণামের রীতিনীতি শিখিয়ে দিতেন সেই শিক্ষক। তাঁর প্রগাঢ় জ্ঞানকে কেবল ছাত্ররা নয়, অভিভাবকেরাও ভয় করতেন। সমঝে চলতেন। 

দ্বিপ্রাহরিক ক্লাসে সেই গুরুদেব কাঁপা-কাঁপা কাব্যিক গলায় দ্রোণ-একলব্য পর্ব শেষ করে ততোধিক কম্পিত স্বরে বললেন, ‘‘ধন্য শিক্ষক! কী পরম শিষ্যপ্রেম দেখেছ? এক দিকে যেমন বুড়ো আঙুল নিয়ে শাস্তি দিলেন ব্যাধপুত্রকে, অন্য দিকে তির চালানোর ব্যবস্থাও তো করে দিলেন!’’ 

ক্লাসের ছাত্রেরা সাধারণত হাতের পাঁচ আঙুলের মতো হয়। মেধায় কড়ে আঙুল সমান এক ছাত্রের অর্বাচীন প্রশ্ন ধেয়ে গেল গুরুর প্রতি— ‘‘বুড়ো আঙুল কেটে নেওয়া ইটসেল্ফ কি যথেষ্ট পাশবিক একটা ব্যাপার নয়? যে মাস্টার ছাত্রের আঙুল কেটে নেয়, আপনি তাঁকে সমর্থন করছেন? ওঁকে তো পুলিশে দেওয়া উচিত ছিল!’’

একলব্য তার পরেও দ্রোণকে গুরু মেনেছিলেন। বড় হৃদয়ের পরিচয়। ছাত্রের জীবনে পরবর্তী ঘটনা ওই গুরুকে আর মহান আসন দিতে পারেনি। দ্রোণের মতো শিষ্যের আঙুল কাটতেই যা বাকি রেখেছিলেন তিনি। পুরাণপ্রিয়, ঈশ্বরভক্ত, মহাভারত বিশেষজ্ঞ সেই মাস্টার স্কেল কিনিয়ে ভেঙেছিলেন ওই ছাত্রের পিঠে। একটি নয়, অসংখ্য। বাকি বন্ধুরা গুনেছিল টুকরো স্কেলের সংখ্যা। আর বাড়ি ফেরার পর ছাত্রের মা ছেলের পিঠ দেখে বলেছিলেন, ‘‘এ ভাবেই মানুষ হয়ে উঠতে হবে। এই তো আমাদের আজন্মের গুরু-শিষ্য পরম্পরা!’’

গুরু নইমুদ্দিনকে নিয়ে এখনও চর্চা হয় টেন্টে। ক্রু কাট চুল, কড়া রুটিনের পক্ষপাতী সেই ফুটবল শিক্ষকের নাম শুনলে চমকে ওঠেন আশি-নব্বইয়ে ময়দান কাঁপানো ফুটবলাররা।

ময়দান

কলকাতার মাঠ চেনে আর এক দ্রোণাচার্যকে। গুরু নইমুদ্দিনকে নিয়ে এখনও চর্চা হয় ইস্ট-মোহন-মহামেডান টেন্টে। ক্রু কাট চুল, কড়া রুটিনের পক্ষপাতী সেই ফুটবল শিক্ষকের নাম শুনলে চমকে ওঠেন আশি-নব্বইয়ে ময়দান কাঁপানো কোনও কোনও ফুটবলার। রেস কোর্সে নিয়ে গিয়ে কী ভাবে ঘোড়ার মতো দৌড় করাতেন নইম, তা বলতে গেলে হাঁটু ধরে বসে পড়েন কোনও কোনও ছাত্র। ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে বান্ধবীর সঙ্গে মিনিট কয়েকের জন্য দেখা করতে গেলেও কী ভাবে হেনস্থা হতে হত, তা মনে পড়লে এখনও রেগে যান তৎকালীন এক পাহাড়ি খেলোয়াড়। সরাসরি বলে দেন, ‘ইমোশনাল অত্যাচার’ করতেন ভদ্রলোক। আজকালকার ছেলেরা হলে মেরেই দিত ওঁকে। ময়দানের এক টেন্টের ক্যান্টিন চালকের সহাস্য মন্তব্য, ‘‘ভাগ্যিস রোনাল্ডো, মেসি, নেমাররা ওঁর হাতে পড়েনি। খেলাই ছেড়ে দিত হয়তো!’’ তথাপি নইমকে মনে রেখেছে কলকাতার ময়দান। ওই যে বেত হাতে না থাকলে বাঙালি ‘মাস্টার’ বলে মনেই করে না!

‘মহাস্থবির জাতক’-এ প্রেমাঙ্কুর আতর্থীর চোখ দিয়ে সেই ময়দান দেখেছিল আরও এক ব্রাহ্ম পুরুষকে। স্বাধীনতা-পূর্ব কালে ময়দানে দুই ছেলেকে নিয়ে প্যারেড দেখতে গিয়েছিলেন তিনি শীতের সকালে। তার পর গোরা পুলিশের সঙ্গে তাঁর মারপিট বাংলা সাহিত্য মনে রেখেছে। কিন্তু আমবাঙালির যা মনে থাকেনি তা হল, ছেলেদের ‘মানুষ’ করে তোলার জন্য স্থবিরের বাবা কী কাণ্ডটাই না ঘটাতেন! হাড়-কাঁপানো শীতে ভোর চারটের সময় ছেলেদের কনকনে জলে স্নান করানো থেকে শুরু করে রাত-দিন বইয়ের মধ্যে আটকে রাখার কাহিনি, সবটাই ‘ব্যর্থ’ বাবার ছেলেদের মধ্য দিয়ে স্বপ্ন স্বার্থক করার পরিচিত ছক। 

বছর কয়েক আগে খবর হয়েছিল এক খুনি বাবার। নিজের ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন তিনি দেখতেন ছেলের মধ্যে। ছেলেকে সবক শেখাতে ব্যাট দিয়ে পিটিয়ে তিনি মেরে ফেলেছিলেন পুত্রকে। বাঙালি বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। গেল-গেল রব উঠেছিল। ভুলে গিয়েছিল বাবাদের ছেলে পেটানোর সুদীর্ঘ পরম্পরা।

কানাই মাস্টার

মহাভারতীয় দ্রোণ, ময়দানীয় দ্রোণ, স্কুলশিক্ষক দ্রোণ এবং উপন্যাসের দ্রোণ-সম পিতাকে নিয়ে বাঙালির লাফালাফি অব্যাহত। স্কুলজীবনে রকমারি শাস্তি নিয়ে বাঙালি যে স্মৃতিরোমন্থন করে, তাতে ভক্তিই বেশি, শ্লেষ কম। সকলে তো আর রবিঠাকুর হতে পারেন না! জোড়াসাঁকোর বারান্দাও সকলের থাকে না। বেত দিয়ে গ্রিল পিটিয়ে রবিবাবু বুঝেছিলেন— ‘‘ইহা বেশ দেখিয়াছি, শিক্ষকের প্রদত্ত বিদ্যাটুকু শিখিতে শিশুরা অনেক বিলম্ব করে, কিন্তু শিক্ষকের ভাবখানা শিখিয়া লইতে তাহাদিগকে কোনো দুঃখ পাইতে হয় না। শিক্ষাদান ব্যাপারের মধ্যে যে সমস্ত অবিচার, অধৈর্য, ক্রোধ, পক্ষপাতপরতা ছিল, অন্যান্য শিক্ষণীয় বিষয়ের চেয়ে সেটা সহজেই আয়ত্ত করিয়া লইয়াছিলাম।’’

কবি আয়ত্ত করেছিলেন ছাত্র পেটানো। বারান্দার এক কোণে তৈরি করেছিলেন নিজের স্কুল। রেলিংগুলো ছাত্র। হাতে কাঠি নিয়ে চৌকি পেতে মাস্টারি করতেন তিনি। ভাল রেলিংরা তুলনায় কম মার খেত। দুষ্টু রেলিংদের যে কী দুর্দশা হত, নইমুদ্দিনের ছাত্রেরা নিশ্চয়ই তা অনুভব করতে পারেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ‘ভাল শিক্ষক’ হতে না পারা এক বাংলার মাস্টারমশাই এবং নাট্যকার রবীন্দ্রনাথের এ হেন কাজকে বালক রবির ‘সেফটি ভাল্ভ’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, রবীন্দ্রনাথের মনে স্কুলের শিক্ষকদের আচরণ ঠিক যে ভাবে প্রভাব ফেলত, অন্য শিশুদের মনেও ঠিক সে ভাবেই প্রভাব ফেলে। রবিঠাকুরের বারান্দা ছিল। তাই মনের ভিতর জমে থাকা অসহিষ্ণুতা তিনি রেলিংয়ের উপর দিয়ে বার করতেন। কিন্তু যাদের বারান্দা নেই, নির্জীব গোবর্ধন রেলিং পেটানোর সুযোগ নেই, সেই ছাত্রেরা অচিরেই প্রথমে সহপাঠী, পরে বান্ধবী, এবং আরও পরে বউ এবং পকেটমারকে পেটায়। এটাই ভবিতব্য। এটাই হল পরম গুরুজ্ঞান। আজন্মকাল ধরে বাঙালি 

যা লালন করে চলেছে। এবং অধুনা তার নাম দিয়েছে ‘লিঞ্চিং’।

পরস্ত্রীকাতরতা

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, পরিচিত গুরুদের ‘পক্ষপাতপরতা’র দোষ থাকে। কিন্তু ‘পরস্ত্রীকাতরতা’ও যে নিপাট ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের বিশেষ ‘গুণ’ হতে পারে, কবি বোধ হয় তা ভাবতে পারেননি। অথবা পারলেও প্রকাশ করতে ভরসা পাননি। 

শিবনাথ শাস্ত্রী স্পষ্ট ভাবেই গুরুর সেই স্বভাব তুলে ধরেছিলেন। তখন তিনি গ্রামের পাঠশালায় নীতিশিক্ষার পাঠ নেন। বেত হাতে গুরু মাঝেমধ্যেই অবাক হতেন এই দেখে যে, বালক শিবনাথ আর সকলের চেয়ে খানিক বেশিই পড়া পারে। ফলে বাকি ছাত্ররা যে হারে বেত্রাঘাত খায় এবং প্রতিটি বেতের আঘাতে যে উল্লাস জেগে ওঠে গুরুর চোখেমুখে, শিবনাথের ক্ষেত্রে তার সুযোগ মেলে না। গুরু একদিন জিগ্যেসই করে বসলেন, ‘‘তোরে কে পড়া বলে দেয়?’’ শিবনাথ জানান, তাঁর মা। সে সময়ে অধিকাংশ বাড়িতেই মেয়েরা বিশেষ শিক্ষিত ছিলেন না। টোলের পণ্ডিতের কাছে পড়ালেখা জানা মা খুব উল্লাসের কারণও ছিলেন না। বরং অবজ্ঞা এবং কৌতূহলের কারণ ছিলেন। গুরুমশাইয়ের অবজ্ঞাপূর্ণ প্রশ্ন, ‘‘তোর মা লেখা পড়া জানে?’’ ইতিবাচক উত্তর দেন শিবনাথ। এর পর যা হওয়ার তা-ই হল। গুরুমশাই খবর নিয়ে জানতে পারলেন, শিবনাথের মা ছেলেকে নিয়ে একাই থাকেন। বাবা থাকেন বিদেশে। ফলে ছেলের হাত দিয়ে গুরু চিঠি পাঠালেন মাতাদেবীকে। শিবনাথেরও টোলে যাওয়া বন্ধ হল।

পরবর্তী কালে যে স্কুলে তিনি ভর্তি হলেন, সেখানেও এক শিক্ষকের কথা লিখেছেন শিবনাথ। যিনি তাঁকে ‘আফিংখেকো বামুন’ বলে ডাকতেন। নাদুসনুদুস চেহারা দেখলেই পেট টিপে দেওয়া যাঁর স্বভাব ছিল। ছাত্রের পেট টিপে দিয়ে ভালবাসা প্রকাশ কতটা রুচিপূর্ণ এবং গুরুসুলভ, তা নির্ণয়ের দায়িত্ব থাক পাঠকের হাতেই।

মূর্খ পণ্ডিত

অ্যাদ্দূর পড়েও যাঁরা ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বরের স্তোত্র আওড়াচ্ছেন, তাঁদের জন্য দেওয়া যাক স্বভাবনিন্দক সত্যেন ঠাকুরের লেখা থেকে বাছাই করা কিছু বাক্য। বাল্যকালের টোল পণ্ডিত সম্পর্কে তিনি লিখেছেন— ‘‘সেই উগ্রচন্ডা গুরুমশায় বেত্রহস্তে শেখাতে বসেছেন, কখনো বা সে বেত তাঁর কোন ছাত্রপৃষ্ঠে চালিত হচ্ছে— সে চিত্র মন থেকে কখনো যাবে না...ওরূপ মূর্খ পণ্ডিতের কাছে বেশী কিছু প্রত্যাশা করা অন্যায়।’’

পরবর্তী কালে তাঁর জীবনে এলেন আরও এক গুরুমশায়। যাঁর কাছে তিনি সংস্কৃত অধ্যয়ন করতেন। সত্যেনবাবু লিখছেন, ‘‘এঁর শিক্ষাগুণে সংস্কৃতশাস্ত্রে আমার যে বিশেষ ব্যুৎপত্তি জন্মেছিল তা বলতে পারি না। মুগ্ধবোধ ব্যাকরণের ‘সহর্ণের্ঘঃ চপোদিতা কানিতার্ণঃ’ প্রভৃতি সূত্র ও তস্য বৃত্তিগুলি কণ্ঠস্থ ও আবৃত্তি করতেই সব সময় যেত।’’ বেত্রহস্তে গুরু বারংবার মনে করিয়ে দিতেন, মুখস্থ করতে পারলে তবেই আসল শিক্ষা। আর সত্যেনবাবুর উপলব্ধি, উচ্চারণ ছাড়া সে শিক্ষায় আর কোনওই ব্যুৎপত্তি হয়নি তাঁর।

টিকিটুকু থাক

উদাহরণ সাজাতে থাকলে উদ্ধৃতির লেজ বাড়তেই থাকবে। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন মানুষের কলমে গুরুর কাছে লাঞ্ছিত হওয়ার খবর বিশেষ কম নয়। তবে উল্টোটাও আছে। গুরুশিক্ষার প্রাপ্তিও স্বীকার করেছেন অধিকাংশ কৃতী বাঙালি। বেত পিঠে সয়েই মেনেছেন। লিখেছেন, ছাত্রকে কী ভাবে সম্মান করতে হয়, তা-ও শিখিয়েছেন কোনও কোনও পণ্ডিতমশাই। তেমনই এক গল্পে জানা যায়, স্বাধীনতার আগে ও-পার বাংলার এক স্কুলে পরীক্ষায় গার্ড দিতেন না এক হেডমাস্টার। অনুজ শিক্ষকদেরও দিতে দিতেন না। ছাত্রদের উপর বিশ্বাস রেখে তিনি বলতেন, তাঁর শিষ্যরা যদি সত্যিই তাঁর ছাত্র হয় তাহলে ‘নকল’ করবে না। স্বাভাবিক ভাবেই কোনও কোনও ছাত্র সুযোগের সদ্ব্যবহার করত। খামকা শিক্ষকের নীতিশিক্ষা সকলকে ছুঁতে যাবেই বা কেন? অতঃপর পরীক্ষায় ধরা পড়ে যায় এক ছাত্র। গুরুর নির্দেশে স্কুলের সব ক্লাসের ছাত্রের সামনে অপরাধীর বেত্রাঘাতের নির্দেশ হয়। হেডমাস্টারের এ-ও 

যে কেমন ‘শিক্ষা’র নীতি, তা স্বয়ং ব্রহ্মাই জানেন। 

মনে রাখা দরকার, সময়টা দেশভাগের। এর কিছু দিন পরেই ওই শিক্ষককে লোটাকম্বল নিয়ে চলে আসতে হবে এ পারে। গ্রামে গ্রামে চাপা উত্তেজনা ছড়াচ্ছে। ছাত্রের বেত্রাঘাতে খেপে গেলেন গাঁয়ের মুরুব্বিরা। স্কুলে হাজির হলেন গুরুর ‘মুণ্ডু’ নিতে। কিন্তু বেত্রাহত সেই ছাত্রই গুরুর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন। সেই হেডমাস্টারকে এখনও অনেকে মনে রেখেছেন। কিন্তু এক গ্রাম মুরুব্বিকে এক পিঠ বেত খেয়েও যে ‘শিক্ষা’ দিয়েছিল যে ছাত্র, কালের গভীরে সে কবেই হারিয়ে গিয়েছে!

তবে এখনও আছেন সেই সমস্ত মাস্টারমশাই, বাড়ি বাড়ি ঘুরে, ছাত্রদের জোগাড় করে ইস্কুলে নিয়ে যান যাঁরা। পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত প্রান্তে বিজ্ঞানের ক্লাসে ম্যাজিক দেখিয়ে রসায়নের শিক্ষা দেন যিনি। 

পরম আদরে পিঠে হাত রেখে স্টেশনের নেশাখোর বাচ্চাদের শিক্ষায় ফেরান যাঁরা। 

কিন্তু আমবাঙালির ক্লাসঘরে পিছিয়ে পড়া ছাত্রকে এখনও ‘চৈতন্য’ শাস্তি দেওয়াই রেওয়াজ। দু’হাত তুলে মহাপ্রভুর মতো দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ছাত্র যে ঠিক কী শিখবে, এ প্রশ্নকে এখনও পাপ বলেই মনে করে বঙ্গ সমাজ। শিক্ষা হল, দু’দিন ‘চৈতন্য’ শাস্তি পাওয়া ছাত্র তৃতীয় দিনে রকেট সায়েন্সের মতো পড়া শিখে না ফেললে দু’হাতে চাপিয়ে দাও থান ইট বা অভিধান। বেঞ্চের তলায় মাথা গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকা, নিল ডাউন, দেওয়ালের দিকে মুখ করে স্পাইডারম্যান সাজা, এমন আরও বহু শৈল্পিক শাস্তিতে জর্জরিত হয়েই চলেছে ছাত্রেরা। এমন সব শাস্তি, যা ছাত্রদের শারীরিক ভাবে পর্যুদস্ত তো করেই, ভেঙে দেয় মানসিক ভাবেও। মাস্টারের প্রতি এক অতলান্তিক ক্ষোভ তৈরি হতে থাকে। সেফটি ভাল্‌ভ থাকলে সেই ছাত্রও রবীন্দ্রনাথ হয়ে উঠতে পারে হয়তো। অধিকাংশই পারে না। ‘এ জীবন লইয়া আমি কী করিব’ গোছের এক নিথর মানসিকতা গ্রাস করে তাদের। অথবা উস্কানি দেয় পাগলাদাশুর মতো শিক্ষক পেটানোয়।

পুনশ্চ

শোনা যায়, ঈশ্বরচন্দ্র মহাশয় টিকিতে দড়ি বেঁধে পড়তে বসতেন। ঘুমিয়ে পড়লে টিকিতে যেন টান পড়ে। কালে কালে এমন ছাত্রেরা আসে। পড়াশোনার প্রতি যাদের প্রবল টান। কিন্তু অধিকাংশ ছাত্রই এমন হয় না! দুঃখজনক সত্য হল, যুগ যুগ ধরে অধিকাংশ বঙ্গীয় মাস্টারমশাই সব ছাত্রকেই বিদ্যাসাগর বানানোর ঠেকা নিয়েছেন। টিকিতে দড়ি বেঁধে ছাত্র মানুষ করার এক তীব্র প্রক্রিয়া জারি রেখেছেন। ফল যা হওয়ার, 

তা-ই হচ্ছে। বেত্রাহত বাঙালি গুরুদেবের কাছে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ জমা রেখে টনটনে শিরদাঁড়ায় হাত বোলাতে বোলাতে তৈলমুণ্ডে দফতরের ঊর্ধ্বতনকে তৈলসিক্ত রাখার সর্বশ্রেষ্ঠ করণিক পাণ্ডিত্যে নিজেদের নিমজ্জিত রাখছে।

মাস্টারমশাইকে, ভালবাসায়

মার্ক থ্যাকারে পাকাপাকি ভাবে থাকবে বলে এই স্কুলে আসেনি। একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে দরখাস্ত দেওয়াই আছে, সিদ্ধান্তটা ঝুলে থাকায় কিছু দিনের জন্য পড়ানোর কাজ নিয়েছে এখানে। ইস্কুলটা মোটেই সুবিধের নয়। ছেলেমেয়েগুলো অন্য সব স্কুলের ঝড়তি-পড়তি। বিচ্ছু, বদমাইশ। মার্ক কৃষ্ণাঙ্গ বলে ওদের আরও জ্বলুনি। ইচ্ছে করে পিছনে লাগে। বার্ট নামের ছেলেটা, পামেলা নামের মেয়েটা ওদের নাটের গুরু। মার্ক গোড়ায় মাথা ঠান্ডা রেখেই ক্লাস নিচ্ছিল, এক দিন এমন উৎপাত শুরু করল ওরা ক্লাসে! অন্য পন্থা নিল মার্ক। ছেলেমেয়েরা যেন অল্পবয়সি নয়, পরিণতবয়স্ক— এই ভাবে আচরণ করতে লাগল তাদের সঙ্গে। ওদের জীবনের সমস্যাগুলো মন দিয়ে শুনে, দেখিয়ে দিতে থাকল ভবিষ্যতের পথনির্দেশ। ছেলেমেয়েগুলো পাল্টে গেল আস্তে আস্তে, পাল্টাল মার্কের সঙ্গে ওদের সম্পর্কের সমীকরণ। এই নিয়েই ই আর ব্রেথওয়েট-এর বিখ্যাত বই, আর তা থেকেই সিনেমা ‘টু স্যর, উইথ লাভ’ (১৯৬৭)। মার্কের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা সিডনি পোয়টিয়ের।