মস্কোর সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি বেশ ক’দিন। ব্যাটারি ফুরিয়ে এসেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ হয়েছে আগেই। ভিতরে দ্রুত বাড়ছে কার্বন ডাই অক্সাইড। উপরে একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ। ধাক্কায় চারপাশ কেঁপে উঠছে। এমনই এক অবস্থায় সমুদ্রের অনেক গভীরে, সোভিয়েত নৌসেনার ডিজেল চালিত সাবমেরিন বি-৫৯’এর মধ্যে তর্কে জড়িয়ে পড়েছেন ক্যাপ্টেন ভ্যালেন্টিন গ্রিগরিভিচ সাভিতস্কি আর ক্যাপ্টেন ভাসিলি আলেকজান্দ্রোভিচ আর্খিপভ। পারমাণবিক টর্পেডো ব্যবহার করা হবে কি না তা নিয়ে তর্ক। 

২৭ অক্টোবর ১৯৬২। বিশ্বে টানটান উত্তেজনা। এক দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কেনেডি, অন্য দিকে সোভিয়েতের সর্বময় কর্তা নিকিতা ক্রুশ্চেভ। কিছু দিন আগেই নিজেদের নাকের ডগায় কিউবায় এক নির্মীয়মাণ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির কথা জানতে পেরেছে আমেরিকা। অভিযোগ, তা তৈরি করছে সোভিয়েত ইউনিয়ন। এই ঘাঁটি তৈরি হলেই পুরো আমেরিকা সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লায়। সেই ছবি তুলতে গেলে একটি মার্কিন গুপ্তচর বিমানকে গুলি করে নামায় কিউবা। জানতে পেরে কেনেডির নির্দেশে মার্কিন নৌবহর জলপথে অবরুদ্ধ করে কিউবাকে। ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির নির্মাণ বন্ধের জন্য নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় সময়সীমা। নয়তো কিউবার দিকে অগ্রসর হবে আমেরিকা। যার অর্থ দুই মহাশক্তির সংগ্রাম, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। হুমকির মুখে তখনও অবিচল সোভিয়েত ইউনিয়ন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকটি সাবমেরিনকে ওই অঞ্চলে পাঠানো হয়েছে, তারই একটি পরমাণু অস্ত্রবাহী সাবমেরিন বি-৫৯।

ওই সময়ে কিউবার কাছেই আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছিল সে। লুকিয়ে লক্ষ করছিল মার্কিন নৌসেনার গতিবিধি। কোনও ভাবেই যাতে সাবমেরিনগুলোর খোঁজ আমেরিকা জানতে না পারে, সেই নির্দেশ দেওয়া ছিল। ফলে বেশ কিছু দিন সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল বি-৫৯ সহ একাধিক সাবমেরিনকে। কিন্তু ভাগ্য মন্দ, আমেরিকার এয়ারক্র্যাফ্ট ক্যারিয়ার ইউএসএস র‌্যান্ডলফ-এর নেতৃত্বে ১১টি ডেসট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ বি-৫৯’এর অবস্থান বুঝে ফেলে। খবর যায় মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে। 

সমুদ্রের তলদেশ থেকে বি-৫৯কে সমুদ্রপৃষ্ঠে তুলে আনতে ডেপ্থ চার্জ ব্যবহার শুরু করে মার্কিন নৌবাহিনী। যদিও সাবমেরিনের ক্ষতি করার ক্ষমতা তার ছিল না। সমুদ্রের আরও গভীরে নেমে যায় বি-৫৯। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, মুহুর্মুহু নেমে আসছে ডেপ্থ চার্জ। তবে কি অঘটন ঘটে গেল? যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল? ক্যাপ্টেন সাভিতস্কির মত তা-ই। সহমত সাবমেরিনের পলিটিক্যাল অফিসার ইভান মাসলেনিকভও। নিয়ম অনুযায়ী, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে হলে ক্যাপ্টেনকে পলিটিক্যাল অফিসারের অনুমতি নিতে হবে। কিন্তু আর্খিপভের উপস্থিতি সব পাল্টে দিল। আর্খিপভ বি-৫৯’এর দ্বিতীয় প্রধান অফিসার হলেও, বি-৪, বি-৩৬, বি-১৩০-সহ কয়েকটি সাবমেরিনের কম্যান্ডার। পদমর্যাদায় সাভিতস্কির সমান। এ ক্ষেত্রে পারমাণবিক টর্পেডো ব্যবহার করতে হলে তিন জনকেই সহমত হতে হবে। কিন্তু আর্খিপভ নারাজ। 

১৯৬১-র জুলাইয়ে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন কে-১৯’এর ডেপুটি কম্যান্ডার ছিলেন আর্খিপভ। গ্রিনল্যান্ডের কাছে মহড়া দিতে গিয়ে দেখা যায়, সাবমেরিনের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ঠান্ডা করার ব্যবস্থায় বড় গলদ। মস্কোর সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, সাহায্য করতে আসার কেউ নেই, এই অবস্থায় কে-১৯’এর ক্যাপ্টেন কম্যান্ডার জ়াভিয়েভ সাত ইঞ্জিনিয়ারের একটি দলকে সমস্যা সমাধানের ভার দেন। অতিতেজস্ক্রিয়তার মধ্যে কাজ করে তাঁরা রিঅ্যাক্টর শীতল রাখার বিকল্প ব্যবস্থা চালু করেন। ভয়াবহ দুর্ঘটনা এড়ালেও, তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান-সহ সব সদস্য এক মাসের মধ্যে মারা যান। এক বছরের মধ্যে মৃত্যু হয় কে-১৯-এর আরও ১৫ নাবিকের। পরিস্থিতি সামলেছিলেন আর্খিপভ। সোভিয়েত উচ্চমহলে প্রশংসিত হয়েছিল তা। এর পরেই বি-৫৯’এ পাঠানো হয় তাঁকে।

তর্ক যত গড়াচ্ছিল ততই মেজাজ হারাচ্ছিলেন সাভিতস্কি। কাছেই থাকা অন্য একটি সাবমেরিনে ছিলেন আনাতোলি আন্দ্রিভ। প্রতিদিনের ঘটনা লিখে রাখতেন তিনি। লিখেছেন, ‘জমে থাকা বাতাসে মাথা ব্যথা করছে। প্রচণ্ড গরমে আজ তিন জন অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়েই চলেছে। তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গিয়েছে।’ বি-৫৯-এর অবস্থাও একই রকম। এর মধ্যেই ওই তর্ক। বছর চৌত্রিশের আর্খিপভ নিজের কথায় অনড়। শেষে পারমাণবিক টর্পেডো ব্যবহার না করে ভেসেই ওঠে বি-৫৯। ফিরে যায় স্বদেশে। নিজেদের অবস্থান লুকোতে না পারার ব্যর্থতা বি-৫৯ অফিসারদের লজ্জার কারণ হয়ে উঠেছিল। তবে আর্খিপভ কাজ চালিয়ে যান।

ইতিহাস বলছে, আর্খিপভের ওই সিদ্ধান্ত পৃথিবীকে পারমাণবিক যুদ্ধ থেকে রক্ষা করেছিল। সে দিন বি-৫৯’এর উপরে হামলা চালানোর সময়ে মার্কিন নৌবহরেরও ধারণা ছিল না, বি-৫৯ পারমাণবিক টর্পেডো বহন করছে। বি-৫৯ সে দিন তা ব্যবহার করলে, পাল্টা জবাবে কী হত সহজেই অনুমেয়। নোয়াম চমস্কির মতে, পৃথিবীকে নিশ্চিহ্ন হওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলেন আর্খিপভ।