পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রবল উৎকণ্ঠায় ছিলেন, ওড়িশা-ফেরত ফণীর আছড়ে পড়ার পূর্বাভাসে। শেষমেশ অবশ্য তেমন কিছু হয়নি, সৌভাগ্যই বলতে হবে। তবে এ কথা সত্যি, অতীতে বহু বার এই ওড়িশা থেকেই ঝড় এসে তছনছ করেছে এ বঙ্গ। ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রবল। যার সাক্ষ্য দেবে ব্রহ্মপুরাণ থেকে শুরু করে মধ্যযুগের বাংলার মঙ্গলকাব্যগুলিও।

অষ্টাদশ মহাপুরাণের অন্যতম ব্রহ্মপুরাণের অনেকটাই ভর্তি ভূগোলের বিবরণে— গোদাবরীর মোহনা থেকে  কলিঙ্গ দেশের বর্ণনায়। এই ব্রহ্মপুরাণের দেশে মনে হয় ঝড় আসত। নইলে আবর্তসঙ্কুল ভূখণ্ডে বজ্রপাতের সময় পাঁচ মুনি জৈমিনি, সুমন্ত্র, বৈশম্পায়ন, পুলস্ত্য ও পুলহের নাম স্মরণ করার নিদান সেখানে উল্লেখ থাকবে কেন? এই পাঁচ মুনি বজ্রনিবারক। এঁদের মধ্যে প্রধান জৈমিনির নাম কলিঙ্গবাসী স্মরণ করেছেন। ব্রহ্মপুরাণে দুটি শ্লোকে জৈমিনির নাম বলা হয়েছে।  

তবে অবাক হতে হয় যখন দেখি বাংলার মঙ্গলকাব্য ‘অভয়ামঙ্গল’-এর কোনও কোনও পুঁথিতে কবি মুকুন্দ চক্রবর্তী উল্লেখ করছেন দেবী মঙ্গলচণ্ডিকার রোষকটাক্ষে কলিঙ্গদেশে দুর্যোগের বিবরণ— অস্থির বাতাস প্রবল ঝড়বৃষ্টি নিয়ে আছড়ে পড়ছে, আর কলিঙ্গসভা তখন স্মরণ করছে কাদের? ব্রহ্মপুরাণের সেই পঞ্চমুনিকে! আশ্চর্য হওয়ার মতোই সমাপতন বটে! 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

কলিঙ্গ তথা ওড়িশার মধ্যযুগীয় ভূগোল নিয়ে আলোচনা করেছেন দীনেশচন্দ্র সরকার। বর্তমান মেদিনীপুরের কেশপুরের কাছাকাছি থেকে গোদাবরী অবধি বা তার দক্ষিণে, একাধিক বার তার সীমা কমেছে-বেড়েছে। ভাষা, ভূগোল ও সংস্কৃতির নিরিখে কাছাকাছি হওয়ায় মধ্যযুগের গবেষকরা অনেকেই  মেদিনীপুরকে কলিঙ্গের উত্তর সীমার অংশ হিসেবেই বিবেচনা করেছেন। চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ও বর্তমান ওড়িশার উত্তর ও মেদিনীপুরের সন্নিহিত এলাকাকে একত্র অঞ্চল ধরেই আলোচনা করেছেন। মুকুন্দের কাব্য তাই কলিঙ্গের নিছক কাল্পনিক বর্ণনা বা কাব্যের সত্য নয়। কলিঙ্গেরই সাময়িক বাসিন্দা কবির জীবনের বাস্তব সত্য। তা বুঝেই ১৯২৫ সালে চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ‘বোধিনী’ গ্রন্থে কলিঙ্গ রাজ্যে ঝড়ের বিবরণ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন উনিশ শতকের মেদিনীপুর গেজেটিয়ারের প্রাসঙ্গিক অংশ, ১৩টি ঝড়ের তথ্য। সেখানে দেখা যাচ্ছে, আট-দশ বছর অন্তর নিম্নচাপ থেকে জন্মানো ঝড়ে তটরেখা বরাবর উত্তর ওড়িশা থেকে মেদিনীপুর বিপর্যস্ত হয়েছে। 

‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে যখন পূর্বসমুদ্রের ঝড়বৃষ্টি দক্ষিণ থেকে সোজা উত্তরে এসে ভাটির মুখে চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যতরীতে আছড়ে পড়ছে, তখন কিন্তু আমরা পঞ্চমুনির নাম শুনি না। বণিকের মুখে তখন উচ্চারিত হচ্ছে তাঁর উপাস্য, সুবাতাসের দেবতা শিবের নাম। কিন্তু শেষমেশ কলিঙ্গ রাজ্যে মুনি, বঙ্গমোহনায় শিবের সব কারিকুরি নস্যাৎ করে পূর্বদেশে শান্তির নিশ্চয়তা নির্ভর করছে দেবীর ইচ্ছার উপরেই। নদীবক্ষে কি সংসারসমুদ্রে তিনিই ধ্রুবা। বাঙালি বণিকের তিনিই আশ্রয়। তিনি মঙ্গলচণ্ডিকা, মনসা। মঙ্গলকাব্যের আখ্যানে মুনি বা শিবকে পরাভূত করে বায়ু নিয়ন্ত্রণের অধিকার ছিনিয়ে নিচ্ছেন তিনি।

শ্রীচৈতন্যদেবের তিরোধানের কমবেশি সত্তর বছরের মধ্যে মুকুন্দ চক্রবর্তী ‘অভয়ামঙ্গল’ লিখছেন, তৎকালীন কলিঙ্গ-বঙ্গের যে অঞ্চলে তিনি আশ্রয় পেয়েছিলেন, তা আজকের কেশপুরের কাছাকাছি। এই অঞ্চলের জনবসতি ‘হাজাইতে’ হবে, দেবী চণ্ডী তাই গঙ্গাকে ডাকলেন। গঙ্গা খাত বদল করে মেদিনীপুর গেলেন না, চণ্ডী তাই আহ্বান করলেন মেঘরাজ ইন্দ্রকে— তাঁরই আশ্রিত কলিঙ্গ রাজ্যকে প্রজাশূন্য করতে। ফল: সমুদ্রের আবর্তে বৃষ্টি, স্ফীত নদীর জলে বন্যা উপকূলবর্তী কলিঙ্গ-বঙ্গের সীমায় তীব্র রূপ ধারণ করল।

মঙ্গলকাব্যের আর এক কবি, মানিক দত্তও কলিঙ্গে বন্যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন। এখানেও গঙ্গা চণ্ডীর বিরুদ্ধচারিণী, ফলে ইন্দ্রকে তলব। ইন্দ্রের ইচ্ছেয় ভীমাকার মেঘ থেকে ঝরল প্রবল বৃষ্টিধারা। কলিঙ্গ উপকূল ধরে বন্যা ও দুর্যোগের খবর মানিক দত্তেরও জানা ছিল।

মুকুন্দের প্রায় দুশো বছর পরে সুপণ্ডিত শাস্ত্রজ্ঞ রামানন্দ যতি কিন্তু বন্যার ঘটনাটিকে কালান্তরিত করেছেন। কালকেতুকে কারাগারে বন্দি করার পরে, কলিঙ্গরাজের শাস্তিদানে ইন্দ্রকে ডেকে বন্যার ব্যবস্থা করেন তিনি। তিনি তাঁর কাব্যের মধ্যেই মুকুন্দকে খণ্ডন করতে ভূগোলের প্রশ্ন তুলেছিলেন। সে প্রসঙ্গে বিশদে না গিয়েও বলা যায়, কলিঙ্গ-বঙ্গ উপকূলে  ঝড়ঝঞ্ঝার উপস্থিতি ছিল বলেই তিনি লিখেছিলেন সে সব। সুকুমার সেন রামানন্দকে বলেছেন ‘দৃষ্টিমান’, যিনি মিথের মধ্যে মিথ বোনেন। ইন্দ্র মেঘের দেবতা, চণ্ডীর আদেশে বাধ্য ছেলেটির মতো বৃষ্টি ঝরাবেন, স্বাভাবিক। কিন্তু আসলে যে তিনি কালকেতুর পূর্বজন্মের পিতা! তাকে সাহায্য করতে যে তিনি রাজ্য ভাসিয়ে দিতে পারেন, রামানন্দ তা ধরিয়ে না দিলে কি বুঝতে পারতাম আমরা?

উনিশ শতকে বাঙালি আধুনিক হল, পা রাখল সংবাদপত্র, গেজেটিয়ারের যুগে। ১৮৮৭ সালের ২৫ মে বঙ্গোপসাগরে এক প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়ে প্রাইভেট স্টিমার ‘স্যর জন লরেন্স’। মারা যান ৭৫০ যাত্রী, পুরীতে তীর্থ করতে যাচ্ছিলেন তাঁরা। এর পরেই নাকি চালু হয় বাংলা থেকে পুরীর রেলপথ। এ তো ঘোর বাস্তব। তা বলে মঙ্গলকাব্যের সত্যকেও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। মঙ্গলকাব্যের আখেটক উপাখ্যানে উপকূল ধরেই ঝড় এগিয়ে আসে। ভবিষ্যতেও হয়তো আসবে।