বালি নয়, ধুলো। আর বাতাস। সেই বাতাসে ঝড়ের মাতন। ঝালরের মতো ধুলোর সর যেখানে-সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে। বাবলা জাতীয় যে ক’টা গাছ চোখে পড়ে, তাদের শরীরেও ধুলোটে রঙ। ধুলোর পরত ফুঁড়ে আকাশ চোখে পড়ে না বললেই চলে। এই ধুলোময় বিস্তারের নাম শুনলাম ‘বান্নি ঘাসভূমি’।

উট আর ঘোড়ার পিঠে চড়ে, গাধায় টানা গাড়িতে চেপে, পায়ে হেঁটে যারা এই ধুলো আর ঘাস মথিত করছেন, তাঁদের বেদুইন বলে ভ্রম হওয়া স্বাভাবিক।  হাঁটুভর ধুলোর ওপর ঘোড়া, উটের খুর ভোঁতা শব্দ তুলছে। নাকে রুমাল আর চোখে চশমা সেঁটে আমি এই অস্পষ্ট দৃশ্য ও শব্দের তল খোঁজার চেষ্টা করছি। চোখে পড়ছে শামিয়ানার নীচে বেঁধে রাখা সার সার বলিষ্ঠ ‘বান্নি’ মোষ। বেশির ভাগেরই দাম লাখ টাকার উপরে। ধুলোর মাঠের মাঝখানে বাঁশ দিয়ে ঘেরা বৃত্তাকার কুস্তির রিং। এক পাশে ঘেঁষাঘেঁষি তাঁবুর মধ্যে হরেক দোকান— রঙিন শরবত, মাটির বা এনামেলের তৈজসপত্র, গয়নাগাঁটি, গরু ও উটের গলায় বাঁধার ঘণ্টা, ঘোড়ার খুরে বসানোর ধাতব নাল। ধুলোর রাজত্বেই এক প্রকাণ্ড মেলা বসেছে। ‘মালধারী’ সমাজের মেলা। ‘মাল’ অর্থে পশু, যেমন ঘোড়া-গাধা-উট-মোষ-ভেড়া-ছাগল। আর সমাজটা তাঁদেরই, যাঁরা এই পশুদের পালক। যাঁরা নির্ভার, আদ্যন্ত যাযাবর। এখনও।

মেলা বসেছে ভুজ শহর থেকে একশো কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে, গুজরাতের প্রখ্যাত মরুমাটির ওপর। ঘাস থাক বা না থাক, মানুষ আছে। একটা গোটা মেলা জমিয়ে তুলতে পারে, এত মানুষ! ঘোড়দৌড়, গাড়ি-টানা গাধার দৌড়, এই অঞ্চলের নিজস্ব কুস্তি বা ‘ভাগমল আখাড়া’-র রিংসাইড ভিউ পাওয়ার জন্য উত্তেজিত মানুষের দৌড় ক্রমাগত ধুলো এবং আরও ধুলো ওড়াচ্ছে। এই হুল্লোড়ের মধ্যে ধুলোয় প্রায় চাপা পড়ে যাওয়ার জোগাড়। 

রংচঙে ‘পাক্কা’য় ফাকিরানি জাট বালিকা।

চারদিকে পুরুষদের ঘোরাফেরা। খানকয়েক নেহাতই বালিকা ছাড়া গোটা মেলায় কোনও নারী নেই। যুবকেরা প্রত্যেকেই ছ’ফুটের ওপর লম্বা, প্রত্যেকেরই পোড়-খাওয়া শরীর। সবারই পরনে ঢোলা পায়জামা আর কুর্তা, এক খণ্ড কাপড়ে নাকমুখ ঢাকা। বুড়োদের অধিকাংশরই দাড়িতে মেহেন্দির রং, চোখে সুরমা। মানবস্তম্ভ নিয়ে পিক-আপ ভ্যানগুলো বিপজ্জনক ভাবে এক দিকে হেলে রাস্তা ছেড়ে নেমে আসছে ধুলোর ওপর। ছোট ছোট ছেলেরা ছুটন্ত গাধার গাড়িতে অনায়াস ছন্দে উঠে পড়ছে। ইতস্তত ভিড় ছেড়ে উল্কাপাতের মতো ছিটকে বেরোচ্ছে কোনও ঘোড়সওয়ার। বহুত্বের ধারণা মোটামুটি থাকলেও কিছুতেই হতবাক হওয়া ঠেকাতে পারছিলাম না। এত আলাদা, এত বিচিত্র হতে পারে মানুষের মেলা?

গুজরাত ভারতের একমাত্র ভূখণ্ড যার সঙ্গে পাকিস্তান-আফগানিস্তান-ইরান হয়ে ইউরোপের দরজা পর্যন্ত অবিচ্ছিন্ন ডাঙাজমির কোথাও হিমালয়ের পাঁচিল নেই। তাই বহু যুগ ধরে বহু জনগোষ্ঠী স্রেফ হাঁটতে হাঁটতে গুজরাতে ঢুকে পড়েছে, এবং সকলেই যে মহম্মদ ঘোরির মতো চালুক্যদের সঙ্গে মারামারি করতে এসেছে তাও নয়। এই এত জনগোষ্ঠীর ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে নিজের আলাদা অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য গুজরাতের হিন্দু সমাজ আরও রক্ষণশীল হয়ে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে। বাইরে থেকে আসা লোকজনও বাসা বাঁধার বা চরে বেড়ানোর নিজস্ব জমি খুঁজে পেয়েছে। সংমিশ্রণ না হওয়ায় প্রত্যেক গোষ্ঠীই তার সাবেক জীবনযাপন-পদ্ধতি বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে সাতশো বা হাজার বছর পরেও। গোটা রাজ্যটা হয়ে উঠেছে অজস্র ভিন্ন সংস্কৃতির বলয়। যেমন এই মেলার মানুষজনকে একটা বড় বলয়ের মধ্যে ছোট্ট একটা উপবলয় ভাবা যেতেই পারে। এরা ‘জাট’ গোষ্ঠীর এক উপগোষ্ঠী, দানেতা জাট। অনেকে বলেন, একদা জাটদের দেশ ছিল ইরান। এই যাযাবর গোষ্ঠী দাঙ্গাহাঙ্গামা বা অন্য কোনও কারণবশত পঞ্চম শতাব্দী থেকেই আরও পূর্ব দিকে, বালুচিস্তানে, সিন্ধু নদের মোহনার কাছে সরে আসতে থাকে। পরিযানের পাল্লাটা এক বার ভাবুন। তার পর আরও খোলা জমির খোঁজে এরা পাকিস্তানের সিন্ধ ও ভারতের গুজরাতে ভাগাভাগি হয়ে যায়। কচ্ছের পোড়ো জমিতে যাঁরা এসে ঢোকেন, চরে বেড়ানোর মাত্রা অনুযায়ী তাঁরা তিনটে আলাদা উপগোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে যান—গিরাসিয়া জাট, দানেতা জাট, ফাকিরানি জাট। গিরাসিয়ারা টো-টো কাজ ছেড়ে এখন কৃষিকাজ করেন। দানেতা জাটরা থিতু হয়েছেন আধাআধি। জীবিকা এখনও পশুপালন, এবং গরু-মোষ চরাবার জন্য গ্রাম ছেড়ে বেরোতে এঁদের কোনও আপত্তি নেই। আর এখনও সম্পূর্ণ যাযাবর হয়ে আছেন বা হয়ে থাকার চেষ্টা করে চলেছেন ফাকিরানি জাটরা। তিন উপগোষ্ঠী একই উৎস থেকে আসা সুন্নি মুসলমান হলেও মাটিতে নোঙর ফেলার বা না ফেলার জীবনদর্শন এদের তিন আলাদা কিসিমের ধর্ম দিয়েছে। এদের নিজেদের মধ্যে জল চলাচল নেই। জীবিকা, মানে অর্থনীতিই যে সমস্ত দর্শন ও ধর্মের ভিত!

এই অর্থনীতিই বলছে, পরিযান বা মাইগ্রেশন খুব স্থিতাবস্থার পরিচয় নয়। অর্থনীতির প্রধান যে তিন চালিকাশক্তি— ল্যান্ড, লেবার, ক্যাপিটাল—তার কোনও একটি স্থিতাবস্থার শর্ত বিঘ্নিত করে মানুষকে পরিযায়ী করে। জার্মান অর্থনীতিবিদ আর্নস্ট রাভেনস্টাইনের মতে, সভ্যতার প্রথম দিকের ক্লাসিকাল মাইগ্রেশন ছিল ল্যান্ড বা ভূমির খোঁজ। যেমন আর্যদের উর্বরতর জমির খোঁজ, বা জাটদের ফাঁকা চারণভূমির খোঁজ। 

শুনলাম, প্রায় চারশো বছর আগে এক পাল উট সমান দুই ভাগে ভাগ করতে গিয়ে জাটদের মধ্যে বিরোধ বাধে। মোট উটের সংখ্যা বিজোড় হওয়ায় একটা উট বাড়তি বা কমতি হতে থাকে। বিবদমান দুই দল সেই বাড়তি বা কমতি উটটা নিয়ে বালুচিস্তানের এক সুফি সাধক সাভলা পিরের কাছে বিচার চাইতে আসে। একটি দলের প্রায়-নাবালক প্রতিনিধিকে সাভলা পির ওই উটটা অন্য দলকে দিয়ে দিতে বলেন। ছেলেটি বিনা বাক্যব্যয়ে তা-ই করে। কাঙ্খিত সমাধানে খুশি হয়ে অন্য দলের প্রতিনিধি চলে যাওয়ার পর সাভলা পির বাচ্চা ছেলেটিকে মাটির তৈরি একটি উটের পুতুল দেন। পুতুলটা হাতে নিয়ে ছেলেটি নিজের শিবিরের দিকে হাঁটতে থাকে। একটা উট খুইয়ে আসা বালক শিবিরে ঢোকার ঠিক আগে হঠাৎ পিছন ফিরে তাকায়। আর দেখে, যত দূর চোখে পড়ে তত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত এক উটের পাল তার পিছন পিছন হেঁটে আসছে। দেখা যায়, সাভলা পির প্রদত্ত এই মন্ত্রপূত উটেরা এক বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী। এরাই পৃথিবীর একমাত্র উট যারা সাঁতার কাটতে জানে। ফলে বালুচিস্তান ও কচ্ছের মরু অঞ্চল ছাড়াও এরা ভিতরে ঢুকে আসা কচ্ছ উপসাগরের ম্যানগ্রোভ এলাকায় একই স্বাচ্ছন্দ্যে চরে বেড়াতে পারে। এই বিশেষ প্রজাতির উটের নাম হয় ‘খাড়াই উট’। এবং খাড়াই উটের জলপ্রতীতির কারণে তাদের মালিকরা চরে বেড়ানোর আরও অনেকটা বিস্তৃত ভূমি পেয়ে যান। যাযাবর অর্থনীতিতে বিস্তৃততর চারণভূমি মানেই অধিকতর সমৃদ্ধি। সাভলা পির ও তার উত্তরপুরুষদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ধর্মগুরু ও গোষ্ঠীপতি করে এই খাড়াই উটের মালিকরা ফাকিরানি জাট হিসেবে কচ্ছের এক বিশাল অঞ্চল দাপিয়ে বেড়ানো শুরু করেন। 

নিজস্ব অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সাভলা পির ফাকিরানিদের কানে তিনটে মন্ত্র দেন— ‘ঘাঘনে কে ভাকনু নহি/ পাক্কে কে চান্দু নহি/ আনে খের মে নু মাখন কান্দু নহি’। যার সারার্থ —‘মেয়েদের বোনা পোশাক কখনও বিক্রি কোরো না।’ কারণ তোমার পোশাক তুমি সহজলভ্য করলে সবাই তা পরবে, এবং তোমার নিজস্বতা চুরি হয়ে যাবে। দ্বিতীয় বচন, ‘ঘাস ব্যতীত অন্য কিছুতে ঘর বুনো না।’ কাঠ ও ঘাসে তৈরি আশ্চর্য রঙিন এই তাঁবুর মতো ঘরগুলোকে ফাকিরানি জাটরা বলেন ‘পাক্কা’। আধ ঘণ্টার মধ্যে একটা গোটা ‘পাক্কা’ পুরোপুরি গুটিয়ে ও উটের পিঠে চাপিয়ে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে আরও আধ ঘণ্টায় খাটিয়ে ফেলা যায়। গূঢ়ার্থ বলছে, ঘাসের বদলে অন্য কোনও পোক্ত ও স্থায়ী উপকরণে বাসা বুনলে সেই বাসার ভারে নিজেরও স্থায়ী ভাবে মৃত্তিকায় প্রোথিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। তৃতীয় বচনে আসছে খাদ্য—‘মাখন ছেঁকে নিয়ে দুধ খেয়ো না।’ অবশ্যই বোঝানো হচ্ছে উটের দুধ। যাযাবর মানুষকে সর্বতোভাবে হতেই হবে স্বনির্ভর। যেহেতু খাদ্য বলতে ফাকিরানি জাটদের উটের দুধই ভরসা, তাই সেই দুধ থেকে সামান্যতম খাদ্যগুণও বিয়োগ করা মানা। ভুজ-এর এক ট্রাস্ট-এর অনবদ্য উদ্যোগে এখন ভারতের এক বিখ্যাত দুগ্ধ ও দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাত সামগ্রী প্রস্তুতকারী সংস্থা ফাকিরানি জাটদের কাছ থেকে উটের দুধ কিনে নিয়ে গিয়ে তৈরি করছে ‘ক্যামেল মিল্ক চকলেট’। তারা কাঁচা দুধ থেকে ননী-ক্ষীর-মাখন ছেঁকে নিলে ফাকিরানি জাটদের দায়ী করা যাবে না নিশ্চয়ই।

আসলে যা বেঁচে থাকার জন্য মেনে চলা অর্থনীতির সূত্র, তাই ধর্ম ও মন্ত্রের মোড়কে এসে হয়ে উঠল ফাকিরানি জাটদের জীবনদর্শন। বিকাশশীল গুজরাতে উন্নয়নের আঁচড়ে ক্ষতবিক্ষত হতে হতেও এদের বেড়ানো থমকাল না। 

আগা খান সাভলানি তাঁর ‘পাক্কা’ নিয়ে কখন কোথায় থাকবেন তা সম্ভবত তাঁর পূর্বপুরুষ সাভলা পির বেঁচে থাকলেও বলতে পারতেন না। নক্ষত্রানা শহর ছাড়িয়ে পাকিস্তান সীমান্তের আরও কাছাকাছি এসে শুরু হল আমাদের খোঁজ। অবশেষে শেষ দুপুরে এক ধুলোডোবা গ্রামে এক টিলার উপরে তাঁর রংচঙে ‘পাক্কা’ দেখতে পাওয়া গেল। আগা খান সাভলানি ফাকিরানি জাটদের অবিসংবাদী ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা। মানুষটির চোখের দিকে সোজা তাকাতে হিম্মত লাগে। তাঁর উচ্চতা ও কণ্ঠস্বর বলিউডের বিগ বি-র সঙ্গে তুলনীয়, বয়সটাও যা বললেন ও রকমই হবে। তাঁকে নিয়ে ভেসে বেড়ানো অজস্র লোককথা আমাকে সংশয়ী করেছিল। সাক্ষাতে দেখলাম, সে-সব কথার যথেষ্ট ভিত্তি আছে। দুপুরের গনগনে আঁচের মতোই তাঁর ঋজুতা এবং ব্যক্তিত্ব। নেতা পরাশ্রয়ী যাতে না হন সে জন্য সাভলা পিরের বিধান মেনে আগা খান সাভলানি নিজের ‘পাক্কা’ ছাড়া অন্য কোথাও অন্নগ্রহণ করেন না, পানীয় জলও বাড়ি থেকে বয়ে নিয়ে যান। আমাদের জন্য অবশ্য বিশাল ট্রে-তে এল চা, বিস্কিট, চানাচুর, আলুর চিপস, এমনকি এক প্যাকেট সিগারেটও। তাঁর গমগমে কণ্ঠস্বরে জাদুবাস্তবতা মাখানো ফাকিরানি জাটদের গোড়ার গল্প শুনতে শুনতে সমস্ত শরীরে কাঁটা দিচ্ছিল। অতীত থেকে তাঁকে বর্তমানে টেনে আনতে গিয়েই বুঝলাম, কাজটা ভাল করলাম না। তিনি পুরোপুরি  থেমে গেলেন।  ‘পাক্কা’ ছেড়ে বেরিয়ে এলেন বাইরে। আমরাও বেরোলাম। অনুচ্চ টিলার উপর দাঁড়িয়ে তিনি ডান হাত বাড়িয়ে চতুর্দিকের পৃথিবীটা দেখতে বললেন। দেখলাম। তিনশো ষাট ডিগ্রি কোণে দিগন্ত পর্যন্ত বিছিয়ে আছে অগুন্তি তীব্র তড়িৎবাহী তার বহন করা লোহার স্তম্ভ— ইংরাজিতে যাকে বলে পাইলন।

শিল্পের জন্য আরও জমির চাহিদা থেকে গুজরাত সরকার গত কয়েক বছর ধরে নজর দিয়েছে কচ্ছের দিকে। স্নেহবশতই হয়তো, আদানি শিল্পগোষ্ঠীর ওপর তাদের দুর্বলতা একটু বেশিই। আদানিরা মুন্দ্রায় একটা বন্দর খুলেছে, একটা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রও গড়েছে। আর বাড়তি স্নেহের দাবিতে বহু হেক্টর ম্যানগ্রোভ অরণ্য বিলোপ করেছে, ড্রেজিং করে সমুদ্রের গভীরতা বাড়াতে চেয়েছে, নির্বিচারে অজস্র খাঁড়ির মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে যে খাড়াই উট ম্যানগ্রোভ অঞ্চলে বাঁচতে অভ্যস্ত, তাদের বিলুপ্তি অনিবার্য হয়ে উঠেছে। কচ্ছ জুড়ে স্পেশাল ইকনমিক জোন-এর কাটাকুটি ভূগর্ভস্থ জলতলকে এত নীচে নামিয়ে দিয়েছে যে মানুষ তো বটেই, উটের মতো সর্বংসহা প্রাণীও শেষের সে দিন দেখতে পাচ্ছে। আগা খান সাভলানি তাঁর অভিজ্ঞতার জোরে আর একটু বেশি দূর পর্যন্ত দেখতে পান। তাই তাঁর বাক্‌রহিত হওয়ায় আশ্চর্যের কিছু নেই। পোড়ো জমিতে পুঁজির বিনিয়োগ প্রকৃতির ভারসাম্যকে টলিয়ে দেয়। সেই প্রকৃতিকে আশ্রয় করে বেঁচে এসেছেন যাঁরা, তাঁরা তো টালমাটাল হবেনই। পিছনে হাঁটবেন। এ হল বিপরীত পরিযান।

মুন্দ্রা বন্দর থেকে তিরিশ কিলোমিটার দূরে ৭৯টা উটের দল নিয়ে অবশ্য সামনের দিকেই হাঁটছিলেন আয়ুব আমিন। তাঁর চতুর্দিকে ভূপ্রকৃতি কেমন যেন শ্মশানের মতো। বালিতে আধডোবা, ভাঙাচোরা পাক্কার ফাঁকে ফাঁকে দেখলাম সরকারি আবাস যোজনায় তোলা অনেকগুলো কদর্য কংক্রিটের খোপ। যাযাবরদের অস্থায়ী শিবিরে গড়ে উঠছে স্থায়ী গ্রাম। ভীষণ উঁচু জলের ট্যাঙ্ক এ রকম এক-একটা গ্রামের অবস্থান নির্দেশ করে। ট্যাঙ্কগুলো থেকে প্রতি তিন দিনে এক দিন দু’ঘণ্টার জন্য গ্রামবাসীদের জল সরবরাহ করা হয়। পাকা ঘরে বাসা বাঁধবেন না বলে পঁয়ষট্টি বছরের আয়ুব আমিন এবং তাঁর স্ত্রী গ্রামের সবার উট একত্র করে আবহমান কালের নিয়মে চরে বেড়ান। আয়ুবের এক কাঁধে রেডিও ঝোলে, অন্য কাঁধে ঝোলানো থাকে একটা ঘটি। বৃক্ষবিরল হওয়াই মরুভূমির স্বাভাবিক নিয়ম, কিন্তু আয়ুবকে বিরাট উটের দলটা নিয়ে আধুনিক মহাবৃক্ষস্বরূপ একের পর এক পাইলনকে পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। ঘননিবদ্ধ সেই ধাতব বৃক্ষদের ফাঁক দিয়ে আয়ুব আমাকে কুড়ি কিলোমিটারেরও বেশি দূরে রোদ্দুরে কাঁপতে থাকা এক ফালি ডাঙাজমি দেখালেন। শুনলাম ওখানে কোনও লুকোনো খাঁড়িতে এখনও জল থাকতেও পারে। মনে হল এই বিজনে, এই আশ্চর্য শূন্যতায়, কোনও মৃত ডাঙাজমিতে জল পেয়ে বা না পেয়ে আয়ুব আমিন এক দিন ফিরবেন যখন, হয়তো গ্রামে ঢোকার আগে হঠাৎ ফিরে দেখবেন, ৭৯টা উটের একটা উটও তাঁর পিছন পিছন হেঁটে আসেনি।