এই বার খুঁটি পাল্টি দিব
১৯৬২ সালের ভোট কি আমাদের ভবানীপুর এলাকায় তেমন উত্তেজনাপূর্ণ ছিল না? স্মৃতিতে তেমন কোনও ছাপ খুঁজে পাচ্ছি না।
Voters

গণতান্ত্রিক: স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচন, ১৯৫২। কলকাতায় ভোটারদের লাইন।

স্বাধীন ভারতের প্রথম লোকসভা নির্বাচন, ১৯৫২। আমার মতো অল্পবয়সিদের মনে সে কী উত্তেজনা! সারা পৃথিবীতেও কৌতূহল, কী ভাবে বিশাল এই দেশ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন পরিচালনা করবে! ভাবলে অবাক লাগে, ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি লোকসভা নির্বাচন প্রত্যক্ষ করেছি এবং ভোটও দিয়েছি। এখন চলছে সপ্তদশ লোকসভার নির্বাচন।

ভুল বললাম। প্রথম লোকসভায় ভোট দিতে পারিনি। তখন বয়সসীমা ছিল একুশ বছর। সদ্য একুশ হয়েছিলাম, দেখা গেল ভোটার তালিকায় যখন নাম তোলা হয়েছিল তখন বয়স কম। হতাশ হলাম। মামাতো, মাসতুতো দাদারা খেপালেন, ‘‘নাবালকদের বুদ্ধি হয় না, বুঝলি তো?’’ পাঁচ বছরের অপেক্ষা, আমি প্রথম ভোট দিলাম ১৯৫৭ সালে।

ব্যক্তিগত জীবনে ওই পাঁচ বছরে অনেক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে, পিতৃগৃহ ছেড়ে আমি তখন উডবার্ন পার্কে শ্বশুরগৃহে। ভোটকেন্দ্র রয়ে গেছে বালিগঞ্জে, আমি সেখানে গিয়ে আমার পুরনো ইস্কুলবাড়িতে ভোট দিলাম। বাড়ির অন্যদের ভোটকেন্দ্র ছিল এলগিন রোডে। সেখানে নির্বাচনের উত্তেজনা ছিল অনেক বেশি। সে কালে লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচন একই সঙ্গে হত। পশ্চিম বাংলার বিধানসভায় কংগ্রেস প্রার্থী ছিলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। অবশ্য মানুদা (সিদ্ধার্থশঙ্কর) পরের বছর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে পদত্যাগ করলেন। তার পর তিনি বাম-সমর্থিত প্রার্থী হয়ে উপনির্বাচনে দাঁড়ালেন। এই উপনির্বাচনে আমার ভোট দেওয়া হয়নি। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত, উডবার্ন পার্কের বাড়িতে রোগশয্যায় শুয়ে আছি। মানুদা আর মায়াবৌদি নির্বাচনী প্রচারে এলেন। মানুদা বললেন, ‘‘কৃষ্ণা তুমি কষ্ট করে উঠে গাড়িতে চড়ে আমাকে একটু ভোটটা দিয়ে এস।’’ মায়াবৌদি তাঁর মেমসাহেবি উচ্চারণে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বললেন, ‘‘গেটিং ওয়েল ইজ় মাচ মোর ইম্পর্ট্যান্ট’’— অসুখ থেকে সেরে ওঠা ঢের বেশি জরুরি। অবশ্য আমার ভোট ছাড়াই মানুদা হইহই করে জিতেছিলেন।

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

১৯৬২ সালের ভোট কি আমাদের ভবানীপুর এলাকায় তেমন উত্তেজনাপূর্ণ ছিল না? স্মৃতিতে তেমন কোনও ছাপ খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু ১৯৬৭ সালের নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনাচক্রে সেই নির্বাচনে আরামবাগ এলাকায় আমি এবং শিশিরকুমার বসু ভোটের প্রচারে এবং অন্যান্য কাজে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে পড়েছিলাম। প্রার্থীর জন্য কাজ করতে আসা শিশিরকুমারকে দেখার জন্য এলাকায় তখন প্রবল উৎসাহ। স্বাধীনতা সংগ্রামী, নেতাজির মহানিষ্ক্রমণের সারথি, দিল্লির লালকেল্লায় আর পঞ্জাবের লাহৌর ফোর্টে নির্যাতিত শিশিরকুমারকে দেখার জন্য মানুষ ব্যগ্র ছিলেন। আজকাল গ্ল্যামার-জগতের ‘তারকা’ প্রার্থীদের দেখার জন্য ‘প্রবল উন্মাদনা’র কথা খবরে দেখি। সে কালে ব্রিটিশ আমলে নির্যাতিত বিপ্লবীদের দেখার জন্য মানুষের মনে ছিল শ্রদ্ধামিশ্রিত কৌতূহল। ভোটের কাজে এই কৌতূহলকে কাজে লাগাতে প্রার্থীর পরিচয়পত্রের সঙ্গে আলাদা করে শিশিরকুমারের জীবনী ছাপানো হল, প্রচারও করা হল। একটি ঘর এবং তক্তপোশের ব্যবস্থা হওয়ার পর কলকাতার সব কাজকর্ম ছেড়ে শিশির বসু ওই এলাকার অধিবাসী হলেন। আমি মাঝে মাঝে বালক পুত্রকে নিয়ে যাওয়া-আসা করি।

১৯৮৭ সালে দেশপ্রিয় পার্কে রাজীব গাঁধী।

বিশেষ করে মনে পড়ে ভোটের দিনের কথা। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে আমরা ভোট পরিদর্শনে বেরিয়ে পড়লাম। আমার দলে আমি, শিশির বসু এবং এক নিতান্ত বালক ভাসুর-পুত্র। গ্রামের এক কৃষক-বাড়িতে ঢুকে দেখলাম, বাড়ির মেয়েরা স্নান করে, ছাপা শাড়ি পরে, সাজগোজ করে ভোট দিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছেন। আমাকে দেখে তাঁরা দাওয়ায় মাদুর পেতে বসতে দিলেন। বাড়ির ছোটরা আমার চশমাটা, হাতঘড়িটা ছুঁয়ে দেখছিল, মায়েরা তাঁদের বকাবকি করলেন। আমার সঙ্গী বালকটিকে তাঁরা আদর করে বললেন, আহা, চাচিকে কত ভালবাসে, সঙ্গে এসেছে! ইতিমধ্যে বাড়ির কৃষক কর্তা বেরিয়ে এলেন। তিনি আমাকে বললেন, পর পর কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছি, এই বার কিন্তু ‘খুঁটি পাল্টি দিব’। সত্যিই তাঁরা পাল্টে দিয়েছিলেন। ১৯৬৭ সালের নির্বাচন দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হয়ে রইল।

ভোটের ফল প্রকাশের দিন আরামবাগে অজয় মুখোপাধ্যায়ের অফিসে বসে আছি, সঙ্গে শিশির বসু ও আমার বালক পুত্র। যুক্তফ্রন্টের জয়ের খবর আসছে, চারদিকে পটকা ফাটছে। অজয়বাবু বললেন, ‘‘রাস্তায় গন্ডগোল হতে পারে, সঙ্গে ছেলে রয়েছে, তোমরা তাড়াতাড়ি কলকাতা ফিরে যাও।’’ শহরে ঢুকতে দেখলাম, কলকাতার সব গাছপালায় লাল টুনি বাল্‌ব জ্বলছে, আর ল্যাম্পপোস্ট থেকে ঝুলছে বেগুন! বেগুন হল পশ্চিমবঙ্গ কংগ্রেসের সভাপতি অতুল্য ঘোষের প্রতি এক অভব্য ইঙ্গিত। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের ক্ষমতায় সেই প্রথম পদক্ষেপ ও তার পরবর্তী বিচিত্র ঘটনা এখন ইতিহাস। ১৯৬৭ সালের পর থেকে লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হতে লাগল। দিল্লিতে ক্ষমতায় আসীন হলেন ইন্দিরা গাঁধী।

এখন সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন চলছে। ১৯৫২ সালের প্রথম নির্বাচন থেকে আজ পর্যন্ত কত ভোটরঙ্গই না দেখলাম! বড় বড় ঘটনা মনে ছাপ ফেলে গেছে। ইমার্জেন্সির পর ১৯৭৭-এর নির্বাচনে ইন্দিরা গাঁধীর পরাজয়, জনতা পার্টির বিপুল জয়। বাগানের মালি, গাড়ির চালক, বাড়ির পরিচারক, যাকেই জিজ্ঞাসা করি, সকলেই বলে, জনতা পার্টিকে ভোট দেবে। ক্ষমতাসীন শাসক দল নিজের জনপ্রিয়তা কতখানি হারিয়েছে, অনেক সময় বুঝতে পারে না। তবুও রাজনারায়ণের মতো হাস্যকর প্রার্থীর কাছে ইন্দিরার পরাজয় দেশবাসীর কাছে ছিল অবিশ্বাস্য।

ইন্দিরার হত্যার পর, রাজীব গাঁধী কলকাতায় প্রচারে এসে দেশপ্রিয় পার্কে ভাষণ দিচ্ছেন। আমি পার্কে সাধারণ জনতার সঙ্গে ঘাসের উপর বসে শুনছি। রাজীব কেবলই আনন্দপুর সাহিব ইত্যাদি বলে যাচ্ছেন। মনে ভাবছি, এ সব কথা বাংলার মানুষ তো বুঝবে না। কিন্তু কানে এল, আমার পাশে বসা বেশ কয়েক জন নিতান্ত দরিদ্র মহিলা বলাবলি করছেন, আহা, মায়ের জন্য কত দুঃখু করছে গো, মা-মরা ছেলেটাকেই ভোট দেব।

নব্বইয়ের দশকে দর্শকের ভূমিকা ছেড়ে আকস্মিক ভাবে আমি নিজে সংসদীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ভাবে এসে পড়লাম। একাদশ, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ সংসদে আমি সাংসদ ছিলাম। খুব কাছ থেকে নির্বাচনী প্রচার এবং পরবর্তী সংসদীয় কার্যকলাপের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হল। কলকাতার উপকণ্ঠে সংগ্রামপুর নামে একটি গ্রাম থেকে আমার পার্লামেন্টারি জীবনের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে তখন শাসক দল সিপিএম এবং তার শরিকদের প্রচণ্ড প্রতাপ। আমি দাঁড়িয়েছি বৃহত্তর কলকাতার যাদবপুর কেন্দ্রে। এই কেন্দ্র বামফ্রন্টের লালদুর্গ বলে পরিচিত। আমার পরাজয় যে অবশ্যম্ভাবী সে বিষয়ে আমার শত্রু-মিত্র সকলেই একমত ছিলেন। কিন্তু সংগ্রামপুরে এক কালবৈশাখী-সন্ধ্যার জনসভা থেকেই এক অন্য ধরনের সুর ধ্বনিত হতে থাকল। আমার মতো এক অপরিচিত, রাজনীতিতে বহিরাগত প্রার্থীর জন্য রাস্তার উপরে ছোট ছোট আয়োজন, তক্তপোশের উপরে তিনটি টিনের চেয়ার। অথচ বিশাল ভিড় রাস্তা ছাপিয়ে সামনে রেললাইনের ও পারে চলে গেছে। দলীয় কর্মীরা বললেন, আপনার জন্য এত লোক হবে ভাবিনি, তা হলে ইস্কুলের মাঠে সভা করতাম। সভা চলাকালীন বছরের প্রথম কালবৈশাখী ধেয়ে এল, মাইকের তার ছিঁড়ে পড়ল। তবুও একটি মানুষও সভা ছেড়ে গেলেন না। সকলকে বিস্মিত করে আমি জয়ী হলাম।

দিল্লির পথে বিমানে মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, ‘‘তুমি যে জিতবে তা তো ভাবিনি। যাকগে, জিতে যখন গিয়েছ, কনগ্র্যাচুলেশনস।’’ শুকনো অভিনন্দনের পরেই কিন্তু আমাকে পাশের সিটে বসিয়ে অনেক স্নেহালাপ করলেন। জিজ্ঞাসা করলেন শিশির কেমন আছে, আমার পিতৃদেবের (চারুচন্দ্র চৌধুরী) কথা উল্লেখ করে বারবার বললেন, ‘‘হি ওয়াজ় আ ভেরি লার্নেড ম্যান।’’ আন্তরিকতা ও সৌজন্যে পূর্ণ সেই কথোপকথন মনে গেঁথে আছে।

দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ সংসদে যাদবপুর কেন্দ্রে আমাকে আবারও জয়ী করে পাঠানোর পর নানা সংসদীয় অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে গিয়েছি। ২০০১ সালের ডিসেম্বরে পার্লামেন্টে পাকিস্তানি জঙ্গি হামলার অভিজ্ঞতা ভোলার নয়। পার্লামেন্টে বিতর্কের মান খুবই নেমে গেছে। ভাল বক্তা বলতে হিন্দিতে অটলবিহারী বাজপেয়ী আর ইংরেজিতে ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত তখনও আছেন। কখনও কখনও বিধিভঙ্গকারী ঘটনা ঘটলেও সাধারণ ভাবে একটা সৌজন্যবোধ ও সুরুচি কিন্তু তখনও ছিল। তাঁর দলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করে বক্তৃতা করার পরে বাজপেয়ীজি হাসিমুখে এগিয়ে এসে হ্যান্ডশেক করেছেন। লালকৃষ্ণ আডবাণীর মতবাদের সঙ্গে প্রচণ্ড অমিল থাকা সত্ত্বেও দেখা হলেই তিনি নমস্কার করে দাঁড়িয়ে যাবেন, পরিবারের সকলের কুশল জিজ্ঞাসা করবেন। আমি বক্তৃতা করতে উঠলে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় নানা রকম খোঁচা দেবেন, পরে উঠে এসে বলবেন, আজ খুব ভাল বলেছেন। সনিয়া গাঁধী নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে প্রয়োজনে হাত ধরে বসিয়ে দেবেন। সে সময়ে আমার হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। ভিন্ন মত, ভিন্ন দল হওয়া সত্ত্বেও সুমিত্রা মহাজন বা সুষমা স্বরাজ ‘কৃষ্ণাজি’ বলে জড়িয়ে ধরবেন। সেই সব দিন কি হারিয়ে গেল?

২০১৪ সালে ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনে আবার ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িয়ে পড়লাম। কারণ পুত্র সুগত আমার পুরনো কেন্দ্র যাদবপুরে প্রার্থী। নির্বাচনী প্রচারে বেশ সমারোহ দেখলাম, তৃণমূল তখন রাজ্যে শাসক দল। আমাদের সময়ে কর্মীরা প্রাণ হাতে করে কাজ করত। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরতে হবে, নয়তো পথে বিপদ হতে পারে। বামফ্রন্টের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নির্বাচনী মেশিনারি নিপুণ ভাবে কাজ করে যায়। আমাদের ছিল ছোট দল, নেত্রীর নিজের হাতে অনেক কষ্টে গড়ে তোলা। আমাদের অর্থবল, লোকবল নেই, মানুষের ভালবাসাই ভরসা। দলের শ্রীবৃদ্ধি দেখে আনন্দ যেমন হল, চিন্তাও একটু হল: যা সহজলভ্য, মানুষ তার মূল্য বোঝে না।

আজ সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের সময় একটা কথাই মনে হচ্ছে। সকল পক্ষেই যে ধরনের অভব্যতা ও কুকথার প্লাবন দেখছি, তা কি সংযত করা যায় না? এখন অবশ্য দেশে-বিদেশে গণতন্ত্রের উপযোগিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে পড়েছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত রাষ্ট্রনায়কেরা একনায়কতন্ত্রের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিও মসৃণ নেই, ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ কথাটা কি শুধুই পরিহাস?       

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল