পাহাড়ের কোলে ছবির মতো একটা ছোট্ট গ্রাম। আটপৌরে বাড়িঘরের গায়ে, অপ্রয়োজনে আঁকা অথচ চোখ টেনে-ধরা শিল্পকর্ম। সে শিল্পরীতি ওই অঞ্চলটারই ঐতিহ্য, অনেক শতাব্দী ধরে। ছবিগুলোর যা বিষয়বস্তু, তার পিছনে আছে প্রায় চারশো বছরের একটা পরম্পরা। ভাবতে অবাক লাগে, সে পরম্পরা ৮৮ বছর আগে আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথকে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তা থেকে আমরা তাঁর হাতের এক অবিস্মরণীয় দীর্ঘ কবিতা পেয়েছি। একটুর জন্য পাইনি তাঁর লেখা সিনেমার চিত্রনাট্য। কিন্তু যা পেয়েছি, তার মধ্যে ওই গ্রামটায় তাঁর অভিজ্ঞতা এক নতুন অভিব্যক্তি নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। সেই সৃষ্টির শেষ কথা, ‘জয় হোক নবজাতকের, জয় হোক চিরজীবিতের।’ 

জার্মানির ব্যাভেরিয়া প্রদেশে, আল্পসের গায়ে এই ছোট্ট জায়গাটার নাম ওবেরআমেরগাউ। এমন সুদৃশ্য জনপদ ইউরোপে অনেক আছে, যেখানে জীবন বয়ে যায় অলস মন্থরতায়। প্রশান্ত পরিপার্শ্ব সেই জীবনের তাল ঠিক করে দেয়। ওবেরআমেরগাউ এমনিতে সে রকমই। কিন্তু প্রত্যেক দশ বছরে এক বার করে সেই তাল পাল্টে যায়। তখন সেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হন। শুধু পার্বত্য প্রকৃতি নয়, কাঠের গায়ে আঁকা ছবি নয়, তাঁরা দেখতে আসেন এখানকার সুবিখ্যাত ‘প্যাশন প্লে’। যেমন রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন ১৯৩০ সালের জুলাইয়ে।

গত কয়েকশো বছর ধরে প্যাশন প্লে বলতে বোঝায় জিশুখ্রিস্টের জীবন নিয়ে, বিশেষত মানবকল্যাণের জন্য তাঁর স্বেচ্ছাবৃত যন্ত্রণা নিয়ে গানে-অভিনয়ে সাজানো নাটক। তবে এ জাতীয় নাটকের উৎস আরও দূর অতীতে। খ্রিস্টপূর্ব এক থেকে দুই সহস্রাব্দেও ইউরোপ তথা প্রাচীন মিশরে এ রকম প্রয়াসের কথা জানা যায়। দেবত্ব-আরোপিত অনেক চরিত্রের তিতিক্ষার কাহিনি সেখানে বলা হত। পরে অবশ্য জিশুর জীবনই এর মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে। প্রথমে ল্যাটিনে, পরে ক্রমশ উদ্ভূত নানা ইউরোপীয় ভাষায় এর অভিনয় হতে থাকে, বিশেষ করে জার্মানিতে। মনে করা হয়, খ্রিস্টের প্রতি এই ভাবে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্যে দিয়ে মানুষ তার পাপ স্খালন করে।

প্লেগ রোগ ইউরোপে মহামারী হয়ে বারবার দেখা দিয়েছে। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে এমনই এক আক্রমণের কবলে পড়েছিল ওবেরআমেরগাউ। তখন সেখানকার বাসিন্দারা একটা প্রতিজ্ঞা করেন, দৈবকৃপায় যদি তাঁদের গ্রাম প্লেগ থেকে বাঁচে, তা হলে তাঁরা সবাই মিলে নিয়মিত প্যাশন প্লে অভিনয় করে দেবঋণ শোধ করবেন। এর পর নাকি ওই জনপদে আর কেউ প্লেগের কবলে পড়েননি। যাঁরা পড়েছিলেন, তাঁরাও সেরে ওঠেন। কৃতজ্ঞ গ্রামবাসীরা ১৬৩৪ সালে প্রথম প্যাশন প্লে মঞ্চস্থ করেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি দশ বছরে এক বার করে, ক্রমান্বয়ে দিনকতক ধরে এই অভিনয় চলে আসছে। নানা জায়গায় ছড়িয়ে-পড়া অধিবাসীরা ওবেরআমেরগাউতে জড়ো হন তখন। সুদীর্ঘ পালায় অংশ নেন হাজার দুয়েক মানুষ। এক-একটি অনুষ্ঠান ছ’সাত ঘণ্টা বা তার থেকেও বেশি সময় ধরে চলে। মানুষ ছাড়াও উট, ভেড়া ইত্যাদি জন্তুকে মঞ্চে তোলা হয়। পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রস্তুতি নিয়ে গ্রামের মানুষেরা অভিনয়, মঞ্চসজ্জা— সব কিছু করেন। তবে উপদেষ্টা হিসেবে থাকেন নামকরা নির্দেশক ও সঙ্গীতকারেরা। সমবেত প্রচেষ্টায় ফুটিয়ে তোলা হয় এক আত্মত্যাগী যুবকের দিব্যোন্মাদ দশা। নিস্তরঙ্গ গ্রামটা ওই ক’টা দিন জমজমাট চেহারা নেয়। এমনিতে টিমটিম করে চলা হোটেলে ঘরভাড়া বেড়ে যায় বহু গুণ। 

ওবেরআমেরগাউ গ্রামের প্যাশন থিয়েটার-এর প্রবেশপথ, এখন যেমন

ব্যাভেরিয়ার প্রধান নগর মিউনিখে কিছু দিন থাকতে হয়েছিল। তার মধ্যেই এক রবিবারের সকালে বাসে চড়ে বসা গেল। ওবেরআমেরগাউ প্রায় পৌনে দু’ঘণ্টার পথ। শহর ছাড়িয়ে কিছু দূর সমতলে চলা। তার পরেই পাহাড়েরা ক্রমশ মুখ তুলে দাঁড়ায়। চোখে পড়তে থাকে বরফে ঢাকা সব শৃঙ্গ। পাহাড়ের কোলে বাস উঠে পড়ে, পেরোতে থাকে এক-একটা গ্রাম, আর প্রতি বাঁকের পরেই আল্পস পর্বতমালা দেখা দেয় এক-এক বিভঙ্গ নিয়ে। এই ভাবে বাঁক নিতে নিতেই নেমে পড়ি ওবেরআমেরগাউয়ে।

বাস স্টপ থেকে প্যাশন প্লে থিয়েটার বড়জোর মিনিট দশেকের হাঁটাপথ। পথের দু’ধারে ছড়ানো বাড়িঘর। তার মধ্যে যেমন বাগান-ঘেরা কুটির আছে, তেমনই আছে দোকান বা পুলিশচৌকিও। সব বাড়ির গা জুড়ে কাঠখোদাই করা চিত্রকলা, অধিকাংশই বাইবেলে বর্ণিত কাহিনি নিয়ে। কাঠখোদাইয়ের এই শিল্প এই অঞ্চলটারই উত্তরাধিকার। এ ধরনের ছবিতে আশপাশের গ্রামগুলোও ছেয়ে আছে।

ওবেরআমেরগাউয়ের এমনই একটা বাগান-ঘেরা বাড়িতে আঁকা আছে জিশুকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার দৃশ্য। সেই দণ্ডাদেশ এসেছিলে প্যালেস্তাইনে রোম সম্রাটের প্রতিনিধি পন্টিয়াস পাইলেট-এর থেকে। বাড়ির এক দিকে দেওয়ালের অনেকখানি জুড়ে বিচারশালার দৃশ্য। জিশুর দিক থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের উত্তরে কী বলার আছে, পন্টিয়াস তা শুনতেও চাননি। ছবিটিতে তাঁর আঙুল-তোলা ভঙ্গিমায় জ্বলজ্বল করছে ক্ষমতাশালী শাসকের ঔদ্ধত্য।

নাট্যশালা:  ১৯৩০ সালের মঞ্চ ও কয়্যারের ছবি। নীচে, প্যাশন প্লে-তে ব্যবহৃত পোশাকের নমুনা সংরক্ষিত আছে সংগ্রহশালায়

এ রকম আরও অনেক বাড়ি, গুটিকতক গির্জা— এই সব কিছুর মধ্যে, গ্রামের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ‘প্যাশন থিয়েটার’। সপ্তদশ শতকে শুরু হওয়ার প্রথম দিকে এখানকার সমাধিক্ষেত্রের উপরে মঞ্চ বেঁধে অভিনয় চলত। অতীতে যাঁরা প্লেগের শিকার হতেন, এই সমাধিক্ষেত্রে তাঁদের দেহাবশেষ সমাধিস্থ করা হয়েছে। ১৮২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে এই অভিনয়ের জন্য বিশেষভাবে এক নাট্যশালা তৈরি হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত সেখানে অনেক অদলবদল, পুনর্নির্মাণ।

নাট্যমঞ্চ ছাড়াও বাড়িটায় একটা সংগ্রহশালাও রয়েছে। সেখানে দেখা যায় অভিনয়ের সময় ব্যবহৃত পোশাক আর কিছু সাজসরঞ্জামের নমুনা। সাম্প্রতিক কিছু অভিনয়ের অংশ চলচ্চিত্রের আকারেও ধরে রাখা আছে, একটা নির্দিষ্ট ঘরে গিয়ে বোতাম টিপে তা আংশিক বা সম্পূর্ণ দেখে নেওয়া যায়। অভিনয়ের স্বাভাবিকতা চোখে পড়ার মতো। ভেড়ার পালের মাঝখানে মেষপালকের বিচরণই হোক, আর কাঁটার মুকুট মাথায় জিশুকে যখন মারতে মারতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন তাঁর মুখের অভিব্যক্তিই হোক— বানিয়ে তোলা কিছু দেখছি বলে মনে হয় না। সংগ্রহশালা জুড়ে পর পর বড় বড় পোস্টার। তাতে প্রায় চারশো বছরের মঞ্চায়নের সালতামামি। নাট্যরূপ, আঙ্গিক, সঙ্গীত, এ সবের ক্রমবিবর্তন কী ভাবে হয়েছে— তার কাহিনি পড়া যাবে।

প্রতি দশকে এক বার প্যাশন প্লে মঞ্চস্থ হয়। তখন অনেকগুলো করে শো হয়ে থাকে। সেই সব মঞ্চায়নে কোন কোন বিশিষ্টজন কবে উপস্থিত থেকেছেন তার বিবরণ রয়েছে। আর সেই বিবরণের মধ্যে দেখা যাচ্ছে, ১৯৩০ সালে দর্শকদের মধ্যে ছিলেন ইংল্যান্ডের শিল্পপতি হেনরি ফোর্ড এবং ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এঁরা অবশ্য এসেছিলেন জুলাই মাসের আলাদা আলাদা দিনে। সে বার সব মিলিয়ে ৮১টি শো হয়েছিল। এক-এক বারে দেখতে পেরেছিলেন ৫,২০০ জন দর্শক। সেবারকার উপস্থাপনার কিছু আলোকচিত্রও সংগ্রহশালায় রয়েছে।

এই নাটক দেখার অভিজ্ঞতা সত্তর-ছোঁয়া রবীন্দ্রনাথের কাছে একটা নতুন সৃষ্টির উৎসমুখ খুলে দেয়। তিনি তার পরেই মগ্ন হয়ে পড়েন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের এক দীর্ঘ গদ্যকবিতা লেখায়। সংগ্রহশালার সে বারের অভিনয়ের যে কাহিনির আভাস পাওয়া যায়, কবিতাটি ঠিক তা নিয়ে লেখা নয়। কিন্তু সে নাটকের মূল অনুভূতি বিধৃত আছে লেখাটির ছত্রে ছত্রে।

আগেই বলেছি, একেবারে আদিপর্বকে বাদ দিলে প্যাশন প্লের বেশির ভাগটাই জিশুকে ঘিরে। এ ছাড়া বাইবেল-বর্ণিত মোজ়েস প্রমুখ স্মরণীয় চরিত্রেরা সেখানে স্থান পান। ১৯৩০-এ অভিনীত কাহিনিতে তাঁদের প্রসঙ্গও দেখা যাচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর গদ্যকবিতার বিষয়কে ব্যাপ্ত করে দিলেন সমগ্র মানবজাতির বিবর্তন তথা অনুবর্তনের বর্ণনায়। যুগ যুগ ধরে মানুষ বারবার দিগ্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়েছে, হিংসা আর অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছে, আবার সেখান থেকে বেরোবার রাস্তা খুঁজে পেয়েছে এক-এক জন সত্যদ্রষ্টার হাত ধরে। আবার পথ ভুলেছে, কখনও বা যাঁরা পথ দেখাচ্ছেন তাঁদেরই ধ্বংস করতে চেয়েছে। এই আরোহণ-অবরোহণের মধ্যে দিয়েই কিছু জ্ঞানী মানুষ আমাদের নিয়ে চলেন এমন গন্তব্যে, যেখানে নতুন প্রাণ জন্ম নিচ্ছে, নতুন আশা নিয়ে সূর্যোদয় হচ্ছে। খড়ের বিছানায়, মাতৃক্রোড়ে জিশুর আবির্ভাব এমনই এক নতুন আলোর দিশা।

এ ভাবেই এগোয় গদ্যকবিতা ‘শিশুতীর্থ’, যার আরম্ভ ‘রাত কত হল?/ উত্তর মেলে না’ দিয়ে, আর সমাপ্তিবাক্য ‘জয় হ’ক মানুষের/ ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের’। এ কবিতা কিন্তু প্রথমে বাংলায় লেখা হয়নি। ওবেরআমেরগাউয়ের অভিজ্ঞতার ঠিক পরেই কবি এটা লিখেছিলেন ইংরেজিতে। প্রথমে নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য বেব’, তার পর ‘দ্য চাইল্ড’ নামে লেখাটা বেরোয় ‘অ্যালেন অ্যান্ড আনউইন’-এর প্রকাশনায়। ‘শিশুতীর্থ’ তারই প্রায় অবিকল অনুসরণ। কিছু বদল অবশ্য হয়েছে, ইংরেজি লেখার একেবারে শেষ বাক্যটি বাংলায় বাদও গেছে। তার থেকেও দরকারি কথা হল, ইংরেজি লেখাটার একটা টাইপ-করা রূপান্তর পাওয়া যায়, যার নাম ‘দ্য নিউকামার’। সেটায় কবিতার আকারে লাইন ভাঙা হয়নি, সেটা নিছক গদ্য। মাঝে মাঝেই সেখানে দৃশ্যপট নিয়েও নির্দেশ দেওয়া আছে। শোনা যায়, ‘ইউএফএ অ্যান্ড কোং’ নামে জার্মানির এক চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থা কবির থেকে একটি সিনেমার চিত্রনাট্য চেয়েছিলেন। গদ্য লেখাটা সম্ভবত তারই প্রাথমিক খসড়া। যে কারণেই হোক ছবিটি শেষ পর্যন্ত তোলা হয়নি। তবে ১৯৩০-এর ডিসেম্বর মাসে নিউইয়র্কের কার্নেগি হল-এ এক সভায় কবি ইংরেজি কবিতাটি পড়েছিলেন, এমন উল্লেখ পাওয়া যায়।

‘শিশুতীর্থ’কে কবি তাঁর জীবদ্দশাতেই বেরোনো ‘সঞ্চয়িতা’র পর পর সংস্করণের একটিতেও রাখেননি। কিন্তু তাঁর নিজের কথাতেই, ‘এটা ভালো কাজ’। অবশ্য ‘আধুনিক বাংলা কবিতা’র দুটি সংস্করণে (প্রথমে হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও আবু সয়ীদ আইয়ুব এবং তার পর বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত) তা স্থান পেয়েছিল। স্থান পেয়েছে শঙ্খ ঘোষ সম্পাদিত ‘সূর্যাবর্ত’তেও। এ সব অনেকেরই জানা। যা চমক জাগায় তা হল, সত্তর ছুঁই-ছুঁই কবি যখন এক দিকে ছবি আঁকার তুলি হাতে নিচ্ছিলেন, সেই সময়েই তাঁর হাত দিয়ে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও বেরিয়ে আসত, আর একটু হলেই। আর সেই সৃষ্টির উৎস হত জার্মানিতে দেখা প্যাশন প্লে। 

ওবেরআমেরগাউতে নিসর্গশোভা, কাঠখোদাই করা ছবির সম্ভার আর থিয়েটারের মঞ্চ দেখলে তাই একটা অদ্ভুত অনুভূতি জাগে। আমাদের সাংস্কৃতিক ধারা থেকে এত ভিন্নমুখী, অথচ আমাদেরই আহৃত সম্পদের মধ্যে এত জীবন্ত!