লুচি-পরোটা

পিনাকী ভট্টাচার্য

খানদানি বাঙালি খাবারের লিস্টিতে এক্কেবারে প্রথম দিকে থাকবে লুচি। এক কালে লুচির ভাল নাম ছিল ‘শষ্কুলী’। সুশ্রুতের ভেষজ শাস্ত্রের পুঁথির ওপর প্রথম ভাষ্য লেখেন চক্রপাণিদত্ত। তিনি এই বাংলারই মানুষ। হাজার বছর আগে তাঁর ‘দ্রব্যগুণ’ পুঁথিতে প্রথম লুচি বা শষ্কুলীর কথা পাই। লুচির কথা তবে রান্নার বই থেকে নয়, সবার আগে পাওয়া গেল ডাক্তারির কেতাবে! চক্রপাণিদত্ত লিখেছিলেন, ‘সুমিতায়া ঘৃতাক্তায়া লোপ্‌ত্রীং কৃত্বা চ বেল্লয়েৎ। আজ্যে তাং ভর্জয়েৎ সিদ্ধাং শষ্কুলী ফেনিকা গুণাঃ।।’ (গম-চূর্ণকে ঘি দিয়ে মেখে লেচি করে বেলে গরম ঘিয়ে ভেজে ‘শষ্কুলী’ বা লুচি তৈয়ার হয়, এর গুণ ফেনিকা-র (খাজা) মতো।) তা হলে তো লুচিকে খাঁটি আর আদি বাঙালি খাবারের মুকুট পরানো যেতেই পারে।

তখন লুচি তিন রকমের হত: খাস্তা, সাপ্তা, পুরি। ময়ান দিয়ে ময়দা ঠেসে, লেচি বেলে ঘিয়ে ভাজলে ‘খাস্তা’, ময়ান ছাড়া ময়দার লেচি বেলে ঘিয়ে ভাজলে ‘সাপ্তা’। ময়দার জায়গায় আটা দিলে, তা হবে পুরি।

‘দ্রব্যগুণ’ কচুরি আর ডালপুরির কথাও বলেছে। কচুরির সংস্কৃত নাম ‘পূরিকা’। তার রেসিপি-তে বলা হয়েছে, মাষকলাই বেটে, তার সঙ্গে নুন, আটা আর হিং মিশিয়ে ময়দার লেচিতে পুর ভরে বেলে, তেলে ভেজে পূরিকা বানাতে হয়। এটি ‘মুখরোচক, মধুর রস, গুরু, স্নিগ্ধ, বলকারক, রক্তপিত্তের দূষক, পাকে উষ্ণ বায়ুনাশক ও চক্ষুর তেজোহারক।’ অবশ্য তেলে না ভেজে, ঘিয়ে ভাজলে, তখন পূরিকা ‘রক্তপিত্তনাশক’। ‘ভাবপ্রকাশ’-এও পূরিকার কথা আছে। বোঝা যায়, এর জনপ্রিয়তা শুধু বাংলাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা উত্তর ভারতে। ডালপুরির সংস্কৃত নাম ‘বেষ্টনীকা’। তারও দেখা মেলে সারা উত্তর ভারত জুড়ে। তুলনামূলক ভাবে বেশ কিছু পরে হেঁশেলে এসেছিল রাধাবল্লভি।

বারো শতকে কর্নাটকের তৃতীয় সোমেশ্বরের লেখা ‘মনসোল্লাস’-এ যদিও আটার লেচিতে পুর ভরে বিভিন্ন পদের উপাদেয় সব বর্ণনা আছে, তবে খাঁটি পরোটার নাম বা বর্ণনা কোনওটাই তাতে মেলে না। পরোটা আমাদের ঘরে এসেছে পরে। মুঘলদের মৌরসিপাট্টা কায়েম হওয়ার পর। ইসলাম-ধর্মীরা পশ্চিম এশিয়া থেকে এ দেশে এলেন, সঙ্গে আনলেন রুটি আর তন্দুর। তাঁদের রুটিতে ঘিয়ের লেশও ছিল না। এ দেশে থাকতে থাকতে স্থানীয়দের ঘি-তেলে ভাজা পুরি খেতে দেখে, তাঁরা আটার লেচি বেলার সময় পরতে পরতে ঘি দিয়ে এক বিশেষ খানা বানালেন। পরত আর আটা মিলিয়ে তার নাম হল পরোটা।

প্রথম যুগের পরোটা হল দুধে আটা মেখে বানানো ‘বাকরখানি’। এটা খুব কম দিনেই আমির-ওমরাহ্‌দের ভারী প্রিয় পদ হয়ে উঠল। লখনউ-তে মাহমুদ নামের এক পাচক  বাকরখানি-কে আরও অদলবদল করে বানালেন ‘শীরমল’। অচিরেই তা পরোটাকুলের শিরোমণি হয়ে উঠল। সে কালে শাহি উৎসবে আর পরবে দিনে এক লাখ শীরমল বানানোর দাওয়াতও পেয়েছেন মাহমুদ।

শুরুর দিকে পরোটা খাওয়া হত মাংসের বিভিন্ন পদের সঙ্গে। তাই মুসলিম শাসকদের খুব প্রিয় ছিল। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই পরোটা আমিষ দস্তরখানের বাইরে বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল পুরো উত্তর ভারতে। বিশেষত পঞ্জাব ও সিন্ধ-এ। নিরামিষাশী হিন্দু রান্নাঘরেও সে শুধু সাইড-ডিশ রইল না, এক স্বয়ংসম্পূর্ণ নিরামিষ আহার হয়ে জাঁকিয়ে বসল। আলু পরোটা, গোবি পরোটাতেই আটকে থাকল না সে। নানা সবজি দিয়ে তৈরি নানা কিসিমের পরোটা দাপটে রাজপাট চালাতে শুরু করল উত্তর ভারতের প্রায় সব হেঁশেলেই।

 

pinakee.bhattacharya@gmail.com

রোজ কুকুর আনছেন, স্টাফেরা ভয় পাচ্ছে

তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায়, ভারতে ভারী শিল্প গড়ার জন্যে খনিজ সম্পদ আহরণের ওপর জোর দিল সরকার। দেশের প্রতিটি রাজ্যের রাজধানীতে ‘জিয়োলজিকাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’-র অফিস খোলা হল। হেড অফিস কলকাতা। বহু অল্পবয়সি ভূবিজ্ঞানী যোগ দিয়েছিল, চনমনে মন, বন-পাহাড়-মরুভূমি সব জায়গায় কাজে উৎসাহ। ছ’মাস টানা ফিল্ডে কাজ করে হয়তো অফিসে ফিরেছে। আবার প্রৌঢ় দাপুটে ভূবিজ্ঞানীরাও ছিলেন, যাঁরা সাহেবদের কাছে কাজ শিখেছেন! দুই অসমবয়সি দলের মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ চালু ছিল। এরা বলে ‘হম কিসিসে কম নেহি’, ওঁরা ভাবেন ‘ম্যায় তেরা পিতা লগতা হুঁ।’  

এ সবই শুনেছিলাম চন্দ্রদার কাছে। অবসর সময়ে জমিয়ে আড্ডা হত ওঁর সঙ্গে। একটা গল্প মনে আছে, বসের সঙ্গে ওঁর বনিবনা হচ্ছে না, প্রায়ই গোলমাল। এক দিন ডিরেক্টর জেনারেল ওঁকে ডেকে পাঠিয়ে, কথায় কথায় বললেন, ‘ইয়োর বস ইজ অ্যান অ্যাসেট অব দিস অফিস।’ চন্দ্রদা জবাব দিলেন, ‘ওনলি ফার্স্ট সিক্সটি পার্সেন্ট অব ইওর কমেন্ট আই ডু এগ্রি।’ মানে, ‘ইয়োর বস ইজ অ্যান অ্যাস’ অবধি! 

অলোক মধ্যপ্রদেশ থেকে ট্রান্সফার হয়ে কলকাতায় এল। ডিরেক্টরের সাথে দেখা হতে, তিনি বললেন, ‘কোথায় কাজ করেছেন এর আগে? ও, ফিল্ডে কাজ করেছেন! জানেন তো, যারা মাঠেঘাটে কাজ করে তাদের কাজটাকে ‘ডঙ্কি জব’ বলে? আর এ রকম সফিস্টিকেটেড ল্যাবে কাজ করেন সায়েন্টিস্টরা। আগে দেখেছেন সায়েন্টিস্ট? কী রকম দেখতে বলুন তো?’ অলোক বুঝল, ডিরেক্টর আসলে রসিকতা করছেন। চুপ থাকাই শ্রেয়। মাথা নেড়ে ‘না’ জানাল। ‘দেখবেন, চোখ দুটো ঢুলুঢুলু, চুল উসকোখুসকো। মুখের ভাব এমন, যেন একটু পরেই বিরাট কিছু একটা ডিসকভার করবে, জাস্ট কীসে যেন আটকে আছে। আমি তো দেখেই বুঝতে পারি, আর তিন দিনের মধ্যে পৃথিবীতে হইচই ফেলে দেবে। কিন্তু তিন বছর ধরে সেই ‘তিন দিন’টা আর আসছে না। যান আগে ল্যাবে গিয়ে সায়েন্টিস্ট দেখে আসুন।’ অলোক দরজার দিকে এগোতেই বললেন, ‘শুনুন, একটা জিনিস দু’বার আবিষ্কার হয়? আমি একটা আবিষ্কার করেছি পনেরো বছর আগে, শুনলাম আর এক দল সেটাই আবার নতুন করে আবিষ্কার করে পেপার লিখেছে। একই ক্লাসে দুটো ফার্স্ট বয় থাকতে পারে?’ এ বার অলোক জবাব দিল, ‘হ্যাঁ স্যর, পারে। আনন্দমেলায় পড়েছি। একটা ছেলেকে টিচার জিজ্ঞেস করলেন, একটা উভচর প্রাণীর উদাহরণ দাও। ছেলেটা বলল, ব্যাং। টিচার বললেন, বাঃ, আর একটা উদাহরণ? ছেলেটা বলল, আর একটা ব্যাং!’

                                                                                              ছবি: সুমিত্র বসাক

এই অলোকই পরে এক হাত নিয়েছিল ডিরেক্টরকে। ও মাইক্রোস্কোপে মিনারেল দেখছে, ডিরেক্টর অলোককে পরীক্ষা করার জন্য পিছন থেকে বললেন, ‘আমি সব মিনারেল চিনি, শুধু এপিডোট ছাড়া। একটু শিখিয়ে দেবে?’ অলোক সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘সব মিনারেলই যখন চেনেন, তা হলে যেটা মাইক্রোস্কোপে চিনতে পারবেন না, সেটাই এপিডোট হবে।’ ডিরেক্টর শুনে আর দাঁড়াননি।

গুজরাতে কচ্ছের রানে কাজ করছি। মে মাসের অসহ্য গরমে দুপুর একটা অবধি বাইরে কাজ। হাওয়ার সাথে গরম, জং-ধরা ছোট বালিপাথরের টুকরো উড়ে, গায়ে মুখে লেগে ফোস্কা পড়ে যেত। এ দিকে জলের জন্য হাহাকার। রাত তিনটেয় ট্রেনে করে জল আসে, সকালে গ্রামের ঘর-পিছু দু’বালতি জল রেশন। আমি একা মানুষ, আমার ভাগ্যে তাই এক বালতি, তাতেই চান-বাথরুম। কিন্তু কী করে যেন আমার ক্যাম্পখাটের নীচে আর এক বালতি জল চলে আসত। এ দিকে পঞ্চায়েত, স্টেশন মাস্টার আমাকে গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে অনুরোধ করছে, যাতে আমার জলটা আর এক জন গ্রামবাসী পেতে পারে। আমিও ক্যাম্প বন্ধ করার অনুমতির অপেক্ষায় আছি। এক দিন ভোর চারটেয় হইচই, বাইরে এসে দেখি, ক্যাম্পের চৌকিদারের মেয়েকে এক বালতি জল সমেত ধরেছে কেউ। সকলে হাজির, বিচার চলছে। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই বলছে না, কার জন্য সে জল চুরি করেছে। কয়েকটা বাচ্চার সঙ্গে ওই মেয়েটাকেও সন্ধেবেলা পড়াতাম। বুঝলাম, আমার ‘দুসরা’ জল কোত্থেকে আসত। মেয়েটা আমার সামনে ‘আমি চুরি করিনি’ বলে মাটিতে লুটিয়ে কাঁদতে লাগল। বললাম, তোর কোনও ভয় নেই, বাড়ি যা। ওদের বললাম, আমিই ওকে জল আনতে বলেছি। সকালেই তাঁবু গুটিয়ে ফেলা হল। জিপে মালপত্র চাপিয়ে বেরচ্ছি, পথের দু’ধারে তখন গ্রামের সব লোক জোড়হাতে দাঁড়িয়ে। 

চন্দ্রদার বস-এর চেম্বার থেকে এক দিন কুকুরের আওয়াজ। বিদেশি কুকুর, ফাইল সই করাতে কেউ চেম্বারে ঢুকলেই প্রবল ঘেউঘেউ করে। সাহেব এ দিকে নিজে ক্যান্টিনে গিয়ে কুকুরের লাঞ্চের জন্যে দই-ভাত বানানো শিখিয়ে এসেছেন। ‘ভেজ কুকুর’ এক দিন এক স্টাফকে আঁচড়ে দিল। কর্মীদের মধ্যে প্রবল বিক্ষোভ। চন্দ্রদা সাহেবের ঘরে ঢুকে বললেন, ‘স্যর, আপনি রোজ কুকুর আনছেন, স্টাফেরা ভয় পাচ্ছে। সাহেব বললেন, ‘ভয়ের কী আছে? ও তো চেন দিয়ে বাঁধা। সে জন্যেই বোধহয় চেঁচায়। আসলে আমার স্ত্রী দেশে গেছেন, তাই ওকে নিয়ে আসছি। বাড়িতে একা থাকলে বেচারা মরেই যাবে।’

সোমবার অফিস শুরু হতেই বিকট হাম্বারব। দুটো বিশাল ষাঁড় অফিসের পেছনে একটা গাছের সঙ্গে বাঁধা, দুটোই অবিরাম চেঁচিয়ে যাচ্ছে। ষাঁড়ের আওয়াজে ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে যাচ্ছে কুকুরটাও। হুলুস্থুলু কাণ্ড। বিরক্ত সাহেব চন্দ্রদাকে ডেকে পাঠালেন। চন্দ্রদা বললেন, ‘ওরা আমার ষাঁড়, স্যর। কাল থেকে ওদের খাওয়া হয়নি, তাই বোধহয় চেঁচাচ্ছে। আসলে বাড়িতে তো আর কেউ নেই, তাই নিয়ে এসেছি। সবই তো বোঝেন।’ সাহেবের ফরসা মুখ লাল। চন্দ্রদা বাইরে বেরিয়ে হাসতে হাসতে সব খুলে বললেন। শনিবারই কলিন লেনে গিয়ে ষাঁড়দুটোকে বুক করে এসেছেন, বলে এসেছেন, আগের রাত থেকে ওদের যেন খেতে দেওয়া না হয়। তাই অমন হাঁকডাক। শুনে ক্যান্টিনে হাসির রোল উঠল। ষাঁড় দুটোর জন্য তাড়াতাড়ি এক্সট্রা দইভাত পাঠানো হল।

পর দিন অফিসে কুকুরও নেই, ষাঁড়ও নেই!

 

অমিতাভ বন্দ্যোপাধ্যায়, হরিদেবপুর

amitavabandyo@gmail.com

যেখানেই কাজ করুন, ব্যাংক, রেস্তরাঁ, আইটি, অন্য কোথাও— আপনার অফিসের পরিবেশ পিএনপিসি
হুল্লোড় কোঁদল বস কলিগ ছাদ ক্যান্টিন— সব কিছু নিয়ে ৭০০ শব্দ লিখে পাঠান।
ঠিকানা: অফিসফিস, রবিবাসরীয়, আনন্দবাজার পত্রিকা, ৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০১