কাকলি এত দিন জানত না, ওরা নাকি একে বলে ‘পাহাড় বাড়ি’। কাকলিদের এই নন্দনকানন আবাসনকে। পারুল ক্ষয়াটে দাঁতে হেসে কথায় কথায় কাল বলল। “আমাদের শনিমন্দিরের দিক থেনি চুড়োগুনো দ্যাকা যায় গো বৌদিদি। আবচা আবচা— মেঘের মধ্যি পাহাড়ের চুড়ো উঁচিয়ে আচে য্যানো। তাই ওরা বলে পাহাড় বাড়ি।” শুনে মজা লেগেছিল। এখন বত্রিশ তলার ‘পাহাড় চুড়োয়’ দাঁড়িয়ে সে কথা মনে পড়ল আবার। পাঁচটা টাওয়ার আছে এই আবাসনে। পাঁচ ‘চুড়ো’ পাহাড় বাড়ি।

পুজো শেষ। দেওয়ালিও। এই শেষ নভেম্বরের বিকেলে এখান থেকে চারপাশটাকে। এক বৃদ্ধ দার্শনিকের মতোই নির্লিপ্ত আর গম্ভীর মনে হয়। মাটির জীবনযাপনের হুল্লোড় এত উঁচু অবধি পৌঁছায় না। নীচে আবাসনের পার্কিং প্লেস। লাল, নীল খেলনা গাড়িরা যেন দাঁড়িয়ে থাকে। মাঝে মাঝে দম দেওয়া হয় বুঝি! সাঁ সাঁ করে বেরিয়ে যায় কোনওটা। আবার ফিরেও আসে। পুতুল-মানুষেরা চলে ফিরে বেড়ায় যেন!  আরও দূরে এই পাহাড় বাড়ির পাঁচিল পেরিয়ে, রাস্তা, ব্রিজ, সবুজের টুকরো, মন্দির, টালির চালের ঘরের সারি, ক্রমশ আবছা হয়ে মিশে গিয়েছে দূরে। সকলেই বলে ভারী নিরাপদ এ আবাসন। কোনও ভয় নেই এর মধ্যে। 

ওই আবছা রেখার ও পারে পারুলরা থাকে। ওটা নৈঋত কোণ। দক্ষিণ-পশ্চিম দিক। ছেলেবেলায় ছাদে উঠে জেঠুমণি দিক চেনাত। তারাদের নাম বলত। শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল কাকলির । 
সে দিন কোথায় যেন পড়ল, বাস্তুশাস্ত্র মতে নৈঋত কোণ সব চেয়ে শক্তিশালী দিক। এর অধিপতি রাক্ষস নিরিতি। তীব্র চৌম্বকশক্তি বুঝি জমা হয় এ দিকে। আজকাল বাস্তুশাস্ত্র নিয়ে শহুরে মানুষ খুব মাথা ঘামাচ্ছে! কলঘর, রান্নাঘরের অবস্থান বদলের সঙ্গে যে ভাগ্যের ওঠাপড়ার সম্পর্ক জড়িয়ে থাকে, এই বিশ্বাস গভীর শিকড় বিস্তার করছে ক্রমশ, শিক্ষিত মনের মাটিতে। 

দেবরূপ হেসে বলে, ‘‘কাকলি এই সমস্ত বিশ্বাস অবিশ্বাসের ব্যাপারে এক্কেবারে দু-মুখো সাপ। কোথাও এ টপিক এক বার উঠলে হল। আংটি, পাথর, তাবিজ, মাদুলির বিরুদ্ধে ঝান্ডা উঁচিয়েই আছে! অথচ দেখ এদিকে আবার দোলনের অ্যাডমিশন টেস্টের দিন কিছুতেই ডিম খেতে দিল না। কোন কোন দিন যেন নখ কাটা বারণ।” 
কিন্তু কী দোষ কাকলির! ওর সেই যে কোন ফিকে হয়ে আসা ছেলেবেলায় কানে এসেছিল, বড় মাসির শাশুড়ি কাউকে একবার বলেছিলেন, “বৃহস্পতিবারে নখ কেটো না গো। কাটতে নেই। জান না বুঝি সন্তানের অমঙ্গল হয় ওতে।” সেই কথা কেমন করে যে এক্কেবারে শীত ঘুমে চুপচাপ শুয়েছিল বুকের মধ্যে, তা কে জানত! দোলন জন্মাবার পরে আড়মোড়া দিয়ে ঘুম ভেঙে উঠল যে তারা!  

দোলন এই সবে ছয়ে পড়ল। মুখে যে যতই বড় বড় কথা বলুক না কেন, কাকলি বুঝে নিয়েছে মাতৃত্ব আসলে ভয়ঙ্কর একটা উদ্বেগের স্তূপ ছাড়া আর কিচ্ছু নয়। দোলনের সঙ্গে একই দিনে জন্ম নিয়েছে এই উদ্বেগ। দোলনের অসুখে, ঘুমে, স্কুলে যাওয়ায়, দুরন্তপনায়, সব সময়েই জেগে থাকে সে শরীরহীন আতঙ্ক। কাকলির এই ভবঘুরে ভয় মাঝে মাঝে আবার গিয়ে উপস্থিত হয় অনেক দূরের দিনে। 

যে সময়ে, কাকলি নেই, দেবরূপ নেই, এখনকার পরিচিত চারধারের সঙ্গে মেলানো যায় না যে সময়কে। এক অচেনা পৃথিবী, কে জানে কোন প্রান্তে, একলা দোলন নাকি! সম্পর্ক যে কাচের বাসনের মতো কথায় কথায় ভেঙে পড়ে আজকাল! পৃথিবী বড় নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে দিনে দিনে।  কেমন আছে কত্ত বড় হয়ে যাওয়া সেই দোলন! মন হু-হু করে ওঠে। কাকলি আর ভাবতে পারে না।

******
সন্ধে হতে না হতেই সুরেলা পাখির ডাকে বেল বেজে উঠল দরজায়। পারুল আজও আবার সাত তাড়াতাড়ি এসে হাজির হয়েছে। বিরক্তিকর। দু’বার আসে দিনে। বেলা এগারোটায় এক বার। আবার রাত সাড়ে আটটায় আসার কথা। কিন্তু এই সময়টার প্রায়ই এ দিক-ও দিক হয়। তখন পারুলের মতলব এ বাড়ি-ও বাড়ি তাপ্পি দিয়ে যত তাড়াতাড়ি কেটে পড়তে পারে। “কোলেরটা হাপিত্যেশ করে থাকে গো বৌদিদি— সারা দিন মান দ্যাকেনি কি  না...” 

আজ কাকলি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কৈফিয়ত দেওয়া শুরু করে পারুল। “মোটা গিন্নি, বাপের বাড়ি গ্যাচে গো! তাই বাইশ নম্বরের কাজ বাদ। এ হপ্তাটা এমনিই আসব!”

অনুমতির প্রশ্ন নয়, একেবারে ঘোষণা। নিঃশ্বাস ফেলে কাকলি। কিছু করার নেই। সময়টা হিসেব কষেই ঠিক করেছিল। দেবরূপ ফিরলে খুবই তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া সেরে নেওয়ার অভ্যেস ওদের এক সঙ্গে তিনজনে। পারুল সাড়ে আটটায় এলে বাসন একেবারে ধুয়ে যেতে পারে। কিন্তু ওর এই তাড়াহুড়োর চোটে, প্রায়ই সে কাজটা নিজের ঘাড়ে পড়ে। বেলা এগারোটা অবধি আগের রাতের এঁটো রেখে দিলে দুর্গন্ধ হয়। 

সক্কালবেলাতেই এ আবাসনে ঢুকে পড়ে পারুল। সারা দিন ধরে অনেকগুলো ফ্ল্যাটে কাজ করে সন্ধের সময়ে ফিরে যায়। ভারী সুবিধে এখানে। কাজপ্রতি আলাদা করে ভাল টাকা। ছোট ছোট ফ্ল্যাটে খুদে সংসার সব। সময় লাগে না বেশি। 

তবে মানুষটা বিশ্বাসী। কাজ পরিষ্কার! মায়া-মমতাও আছে। গত মাসে কাকলির জ্বর হল। মাথা তুলতে কষ্ট। তখন নিজে থেকে কম সামলায়নি পারুল! কাজের হিসেব করতে বসেনি! তবে ওই কামাই যখন তখন। আর কথার ঝুড়ি। হাত আর মুখ সমান তালে চলে। দেবরূপ নাম দিয়েছে, ‘গসিপ মাস্টার’। কাকলি জানে ঠিক গসিপ নয়, আসলে যা বলতে গিয়ে থামতে চায় না পারুল, তার নাম আত্মজীবনী। 

দুঃখ-কষ্টের কথা প্রথম প্রথম শুনলে মায়া লাগে। কিন্তু দেশে দেশে যুগে যুগে গরিব মানুষের দুঃখের কতগুলো মৌলিক নকশা থাকে। ক্রমশ ভারী একঘেয়ে হয়ে পড়ে, পারুলের ছেলেমেয়েদের অসুখবিসুখের গল্প। চোদ্দো বছরের বড় মেয়েটাকে খিচুড়ি ইস্কুল ছাড়িয়ে কাজে লাগিয়ে দেওয়ার গল্প। রাত জেগে ঠোঙা বাঁধা আর বর্ষায় ঘরের মধ্যে জল থইথই করার গল্প! এমনকি দুশ্চরিত্র বরের, সংসার ছেড়ে অন্য ‘মেয়েছেলের’ সঙ্গে ভেগে যাওয়ার গল্পও! সারা বছর ধরে একটা না একটা বাচ্চা ভোগে। কামাই হবে না তো কী!

পারুলের কাহিনিতে কোনও নতুনত্ব নেই। পারুলের আয় খারাপ নয়, কিন্তু গোটা পাঁচেক ছেলেপুলের কারণে, তার দশাটা দাঁড়িয়েছে সেই অঙ্ক বইয়ের ফুটো চৌবাচ্চাটার মতো। কাকলির হাই ওঠে!

“মল্লির উপর কাজের বাড়ির জোয়ান ছেলেটার নজর পড়েছে গো বৌদিদি!” সকালের শুকোতে  দেওয়া কাচা কাপড়গুলো গোছাতে গোছাতে ভয়ার্ত স্বরে ফিসফিসিয়ে বলছিল আজ পারুল। 

“বখা এক্কেরে। সে দিন খালি বাড়ি পেয়ে জড়িয়ে ধরতি গিইছিল, তা মল্লি আমার ত্যামোন মেয়ে নয়। কোনওক্রমে হাত ছাড়িয়ে দে দৌড়। ইদিকে আমাদের পাড়ার টেকো কাল্লু ঘরে আচে একোন, টিউকলের সামনে বসে দলবল নিয়ে রোজ দিন মদ খাবে। সে কী হাসাহাসি। চিল্লামিল্লি, খিস্তি মারা, নিশুত রাত পোয্যোন্ত। নেশা য্যাতো জমবে ত্যাতো বাড়বে গলাবাজি। কার সাদ্যি দুচোকের পাতা এক করে। বডার পেরিয়ে মাল পাচারের ব্যবসা। লোকে বলে গোটা তিনেক লাশ ফেলি দিয়েচে নাকি! পুলিশই সোমজে চলে তাকে। সাক্ষাৎ বাঘের বাচ্চা। বুক ঢিপঢিপ করে বৌদিদি গো। আমার মল্লির দিকে চোক না পড়ে। এ যানো জলে কুমির ডাঙায় বাঘ।’’

পারুল একতরফা বকে যায় কত কী! ম্যাগাজ়িনের পাতা উল্টোতে উল্টোতে কাকলি হুঁ, হাঁ, সেই তো, কী মুশকিল করতে থাকে ফাঁকে ফাঁকে।

বসার ঘরের শোকেসের উপর পারুল রোজ চার্জ দেয় ওর ধ্যাবড়া মোবাইলটাকে। সেটা বেজে ওঠে হঠাৎ। পারুল এসে ধরে। খ্যারখেরে গলায় বলে, “কী হোলো কী...”

তার পরই গলা দিয়ে উৎকট এক আতঙ্কের স্বর বেরিয়ে আসে ওর। কাকলি চমকে তাকিয়ে দেখে ওর চোখ দুটো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ফোন ছেড়ে হাঁপাতে থাকে পারুল। “মারদাঙ্গা কাণ্ড। পুলিশ এয়েচে গো বৌদিদি। ঘরে বাচ্চাগুনো একা। ভয়ে কাঁদতেচে সব...” সেলাই করা চটিতে পা গলিয়ে উদ্‌ভ্রান্তের মতো বেরিয়ে যায় সে। কাকলি আর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগই পায় না। 

দিনের আলোয় দেখা যায় যে আবছা রেখাটা, সেটা এখন দূরের অন্ধকারে পুরোপুরি মিলিয়ে গিয়েছে। এ দিকে অজস্র আলোর ফুটকি। কালো বেনারসিতে সোনালি জরির বিন্দু কত! ওই দূরের দিকে তাকিয়ে হতবাক হয়ে কত ক্ষণ বসে থাকে কাকলি।

ওখানে ঢাকা রয়েছে একটা কদর্য জগৎ। এই পাহাড় বাড়ির সঙ্গে সমান্তরাল এক বিশ্ব। নিজস্ব লোভ, দুর্নীতি, হিংসা নিয়ে প্রায় অজানা সেই অন্ধকার। পারুলরা ওখান থেকে ছিটকে আসা কিছু টুকরো খবর। গা ছমছম করে কাকলির! 

ঝোড়ো হাওয়া উঠেছে হঠাৎ। দুলছে বাহারি আলোটা। কাচের জানলা বন্ধ করার আগে কাকলি দেখতে পেয়েছে দেবরূপের স্টিল গ্রে ডিজ়ায়ার এসে দাঁড়াল পার্কিং প্লেসে। বেল বাজবে এ বার দরজায়। সাঁ করে বত্রিশ তলায় উঠে আসতে যেটুকু সময় লাগে। দোলন টিভিতে  কার্টুন দেখছে। ছোটা ভীম! বেল বাজলেই ছুট্টে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে বাপির কোলে। বাপ-বেটির আদরের ঝলমলে আলোয়, কাকলির হাসির ঝিলিকে, মিলিয়ে যাবে তখুনি প্রেতলোকের ছায়ারা সব!  

রাতে টিভির খবর শোনা দেবরূপের নেশা। কাকলির কড়া নজরদারি শব্দ যেন না চড়ে। দোলন যে ও ঘরেই ঘুমিয়ে তত ক্ষণে কাদা হয়ে যায়! আরও মায়াবী হয়ে ওঠে ওর টুলটুলে মুখখানা। নীল রাতজামার তলায় ছোট্ট বুক ওঠা-পড়া করে। কাকলি রান্নাঘরের বাকি কাজগুলো সেরে নিচ্ছিল। দেবরূপের আচমকা ডাকে ছুটে যায়। 
“দেখো দেখো কী কাণ্ড... তোমার ওই পারুলের...” রূদ্ধশ্বাসে বসে থাকে দু’জনে। দোলন উসখুস করে ঘুমের মধ্যে।

******
দু’দিন পরে অনেক  বেলা করে পারুল আসে। ক্লান্ত মুখে তৃপ্তির হাসি। 

“হারামিটা তক্কে তক্কে ছিল গো বৌদিদি। দুকুরে মল্লি, মুদির দোকানে ঠোঙা দিতি যাবে বলে বেইরেচে...আরও একটা বন্ধু জুইটে বাইক গাড়ি করে পিচু নিয়েচে। মন্দির তলাটা ত্যাকোন শুনশান থাকে। রাস্তা আটকে দাঁইড়েচে। গাড়ি থিনি নেমে মল্লির হাত ধরে টানামানি।  চিল্লে উটেচে মল্লি। কোতায় ছিল টেকো কাল্লু। ছুটে এয়েচে...তার দলবলও। রাস্তায় ফেলে দিয়েচে এইসান ক্যালানি... অন্যটা বেগতিক দেকে বাইক চাইল্যে হাওয়া... সামনে অন্য কার জানি দুটো বাইক পেয়ে ভাঙচুর করেচে ওরা... সেই বাইকওলাদেরও পিটিয়েচে। আর কেতরে-পড়া আসল বজ্জাতটাকে হাসপাতালে যাওয়ার পতেই অক্কা,” খলখল করে রক্তখাকীর মতো হাসে পারুল। 

“কাল্লু বেপাত্তা। পুলিশ নিয়ম রোক্ষে হাঁকডাক করচে বটে। কিন্তু ওর টিকির ডগাও ছোঁবে না...” বেপরোয়া ভঙ্গি পারুলের। কাকলি খোলা জানলা দিয়ে তাকায় নৈঋত কোণে। নিরিতি রাক্ষস জাগছে। যুগান্তের ক্ষিদেয়, বঞ্চনায়, অপমানে! চুরমার করে দেবেই যা সামনে পাবে। প্রতিহিংসা যুক্তি জানে না। ধ্বংস জানে শুধু! আতঙ্কে কাঁপে পাহাড়চূড়ার উদাসীন ঘরও। কাকলি শিউরে ওঠে। বড় ডেকচির মধ্যে সরু চালের ভাত বসায় কৌটো খালি করে। অনেক ক’টা আলু, ডিম ভাতে! 

“চেহারা দেখেই বুঝছি খাওয়া দাওয়া মাথায় উঠেছিল! খাও তো আগে। বাচ্চাদের জন্যও নিয়ে যাবে! আজ আর কিছু করতে হবে না।”

নিরিতি রাক্ষসের নৈবেদ্য সাজায় সে। বন্যাকে আটকানোর বালির বাঁধের চেষ্টা হয়তো বা। তবু যেটুকু তার সাধ্য! দোলনের পৃথিবী যে বিপন্ন!