নদীর পারে মেয়েটাকে দেখতে পেল শমীক। ছিপছিপে গড়ন। গায়ের রং মিশকালো। সেই কালো শরীরে গনগনে লাল শাড়ি জড়ানো। এখন সন্ধে ছুঁই-ছুঁই আলোয় দূর থেকে দেখলে হঠাৎ মনে হবে লকলকে আগুনের মাঝে কোনও কষ্টিপাথরের মূর্তি। শমীকের দিকে পিছন ফিরে মেয়েটা দাঁড়িয়ে।

শমীর স্তব্ধ হয়ে খানিক ক্ষণ তাকিয়ে থাকল। চারপাশে অজয়ের বিস্তীর্ণ চর। পায়ের তলায় বালি। যে দিকে চোখ যায় শুধু ছোট-ছোট ঝোপ। কাশফুল। নদী। শমীক আর ওই মেয়ে ছাড়া অন্য কোনও মানুষজন নেই। থাকবে যে না, শমীকের আগেই মনে হয়েছিল। জয়দেবের মন্দির ছাড়িয়ে যখন নদীর দিকে হাঁটা শুরু করেছিল, তখনই দেখেছিল এ পাশ পুরো শুনশান।

তিন দিন হল দুর্গাপুজো শেষ হয়েছে। বছরের এই সময় কে আসবে জয়দেব কেন্দুলিতে? কেনই বা আসবে? বাউল মেলা তো আরও তিন মাস বাদে। শমীকের শান্তিনিকেতনে কিছু করার ছিল না। হাজার বার ঘোরা জায়গা সব। নতুন আর কী দেখবে? ও এসেছে ছুটি কাটাতে। ফিরে গিয়ে তো আবার ফাইভ ডেজ় আ উইকের চক্করে ঢুকে পড়তে হবে। তখন আর নিরিবিলিতে থাকা, দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা কিংবা দুপুরবেলা বারান্দার রেলিংয়ে পা তুলে দূরের ধানখেতের দিকে তাকিয়ে সিগারেট টানার মজা কোথায়? কিন্তু এ বার শান্তিনিকেতনে এসে শমীক অনুভব করল, রোজ ছুটতে-ছুটতে অফিস-বাড়ি করা জীবন আর কিছুতেই এমন শান্ত ছুটি কাটানোর মজা নিতে পারছে না। এ বার ও ভেবে এসেছিল দশ দিন গড়িমসি করবে। টিভি, মোবাইল ঘাঁটবে না। শুধু বই পড়বে। ঘুমোবে। মাঝে-মাঝে বিকেল দিকে আলপথ ধরে হাঁটাহাঁটি করবে। একা।

সেই উদ্দেশ্য নিয়ে ও একগাদা বই এনেছিল। কিন্তু দু’দিন কাটতে না-কাটতেই শমীক বই বন্ধ করে মোবাইল নিয়ে পড়ল। সবার আগে ফেসবুক খুলে দেখল কী-কী নোটিফিকেশন এসেছে। বান্ধবীরা সব কলকাতায় ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছিল। তার ছবি দিয়েছে ফেসবুকে। ইনস্টাগ্রামে। সেই সব ছবি দেখতে-দেখতে আদিম লোভ ওর বুকের ভিতর শিরশির করতে লাগল। কলকাতায় থাকলে মেয়েগুলোকে পাওয়া যেত। শমীক অত মন-টন বোঝে না। বোঝে শুধু শরীর। মেয়েদের শরীর চিরকালই ওকে হাতছানি দেয়। এক শরীর ফুরিয়ে গেলে নতুন শরীর। শরীরের ব্যাপারে কখনও পিছু ফিরে তাকায়নি শমীক। তাই আজ ও অনুভব করল, এ ভাবে ঘরে থাকতে পারবে না। বেরিয়ে পড়তে হবে।

সেই জন্য শমীক গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে। কোথায় যাবে ভাবতে-ভাবতে প্রথম মনে পড়ল জয়দেব কেন্দুলির কথা। শান্তিনিকেতন থেকে গাড়িতে এমন কিছু দূরেও নয়। আবার যাওয়ার পথে ইলামবাজার জঙ্গলটাও পড়বে। ওই শাল জঙ্গল শমীকের খুব পছন্দের। ছোটবেলায় যখন ঝাড়গ্রামে থাকত, তখন দেখেছিল ওখানকার শাল জঙ্গল। এখন তো ঝাড়গ্রামে সেই জঙ্গল নেই। কনকদুর্গার মন্দির চত্বরও ঝাঁ চকচকে। শমীক তাই শাল জঙ্গলের খোঁজে কখনও যায় বাঁকুড়া, কখনও বীরভূম। আর জঙ্গল কিংবা নদীর কাছে গেলেই আদিম লোভ আরও বেশি করে ঝিকিয়ে ওঠে ওর গভীরে।
এখন যেমন মেয়েটাকে দেখে সেই লোভ চিড়বিড়িয়ে উঠেছে।

মেয়েটা কি আদিবাসী? পায়ে-পায়ে এগিয়ে যায় শমীক। অনেক দিন কোনও আদিবাসী রমণীর সান্নিধ্য পায়নি ও। শেষ বার পেয়েছিল বছর চারেক আগে। পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে। ঝরনা ছাড়িয়ে জঙ্গলের গভীরে সেই নারীকে উপভোগ করেছিল শমীক। তার পর আর করা হয়নি। সুযোগই আসেনি। এখন এই নদীর চরে দাঁড়িয়ে হঠাৎ সেই চার বছর আগের স্মৃতি শমীকের মধ্যে জেগে উঠল। শমীক সন্তর্পণে পা ফেলতে লাগল।

মেয়েটা কি শমীকের উপস্থিতি টের পায়নি? যদি পেয়ে থাকে তা হলে কেন ওর দিকে পিছন ফিরে রয়েছে? নাকি মেয়েটা কোথাও যাবে? কিন্তু এ দিকে তো নদী পারাপারের ঘাট নেই! পিছন ফিরে থাকায় মেয়েটার চুল উড়ছে। সেই চুল থেকে কোনও সুগন্ধী তেলের গন্ধ উড়ে এসে ঝাপটা দিল শমীকের নাকে। শমীকের মনে হল, ওই গন্ধ যেন মেয়েটারই গন্ধ।
মেয়েটার দিকে যেতে-যেতে আরও এক বার চারপাশ দেখে নিল ও। কোথাও কেউ নেই। বিকেলের আলো এ বার তেল ফুরিয়ে আসা প্রদীপের আলোর মতো ক্ষীণ হয়ে আসছে। ঝপ করে অন্ধকার নামবে।

মেয়েটার কাছাকাছি গিয়ে শমীক বুঝল, ওর আন্দাজ ভুল হয়নি। মেয়েটার শরীরে ব্লাউজ় নেই। আঁটোসাঁটো শরীর জুড়ে শুধুই শাড়ি। ওর পায়ের শব্দে মেয়েটা এ বার ফিরে তাকাল। দু’জনের চোখাচোখি হল। শমীক খেয়াল করল, মেয়েটার আচরণে কোনও আড়ষ্টতা কিংবা ভয় পাওয়ার ব্যাপার নেই। ঠোঁটে এক চিলতে হাসি। চোখে ইশারা। এই ইশারা শমীকের চেনা। তাই ও গিয়ে দাঁড়াল মেয়েটার মুখোমুখি।

মেয়েটা হাসল। বলল, “নতুন?”

শমীক খেয়াল করল মেয়েটার উচ্চারণে বীরভূমের নিজস্ব টান রয়েছে। 

শমীকও হাসল। বলল, “না। আগেও এসেছি।”

দু’জনের কেউ-ই আর কোনও কথা বলল না। মেয়েটা এ বার ওর চোখের দিয়ে ঠায় তাকিয়ে থাকল। তার পর আলতো করে বলল, “এস।” 

শমীক পা বাড়াতেই চাইল। এমনটাই ও তো চিরকাল চেয়ে এসেছে। তবু এ বার হালকা সংশয় নিয়েই ও বলল, “কোথায়?”
মেয়েটা হাত তুলে নদীর চরের একটা জায়গা দেখাল। শমীক সেই জায়গাটার দিকে তাকাল। কিন্তু অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। সেই অন্ধকারের পিছনেই রয়েছে এক বিশাল বটগাছ। সিংহের কেশরের মতো তার ঝুরি নেমেছে অনেকগুলো।

মেয়েটা এ বার ওর হাত ধরল। শমীক টের পেল, ওই নরম হাতের স্পর্শে ওর মনের সব সংশয় ভেসে যাচ্ছে। দামামা বাজছে বুকের ভিতরে।

শহরে থাকলে কোনও অচেনা মেয়ের এমন আহ্বানে শমীক সতর্ক হত। কিন্তু অন্ধকার আকাশ, এক পাশে হেলে থাকা চাঁদ, কয়েকটা মিটমিটে তারা, তিরতির করে বয়ে যাওয়া অজয় নদী, কাশ ঝোপ, সব যেন শমীককে আশ্বস্ত করল। শমীক বুঝল ওর পক্ষে পিছিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এই টানেই বোধহয় ও আজ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে।

মেয়েটার হাত ধরে শমীক গিয়ে দাঁড়াল নদীর একেবারে পাশে। সেখান থেকে হাত বাড়িয়ে জলকে ছোঁয়া যায়। চাঁদও পড়ে আছে নদীর জলে। ভাল লাগছিল শমীকের। এই ভাললাগার জন্যই তো নারী শরীরের কাছে ছুটে-ছুটে আসা।
মেয়েটা এ বার ওর মুখের দিকে তাকাল। শমীক নিচু হল মেয়েটাকে চুমু খাবে বলে। কিন্তু মেয়েটা পিছিয়ে গেল। বলল, “এখন নয়। আমাদের মাঝখানে আড়াল রয়েছে।”

ইশারা বুঝতে অসুবিধে হল না শমীকের। একটু এগিয়ে ও ধীরে-ধীরে মেয়েটার শরীর থেকে শাড়িটা খুলতে লাগল। আর শাড়ি খুলতে গিয়ে ও উপলব্ধি করল, শাড়িটা যেন ফুলের পাপড়ির মতোই মেয়েটাকে জড়িয়ে ছিল। শাড়িটা খোলা হলেই মেয়েটা হাত বাড়িয়ে সেটা নিল। ভাঁজ করে বালিয়াড়ির উপর পাতল। শমীক তত ক্ষণে খুলে ফেলেছে নিজের টি-শার্ট এবং ট্রাউজার্স।
এ বার অপলক ভাবে মেয়েটার দিকে চেয়ে থাকল শমীক। চাঁদের আলো এসে পড়েছে মেয়েটার শরীর। শরীরের প্রতিটি খাঁজ জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাচ্ছে। সেই শরীরের দিকে তাকিয়ে শমীকের মনে হল, এমন নিটোল নারী শরীর ও আগে কখনও দেখেনি। সত্যিই কি এমন ঘটছে? না কি এটা কোনও বিভ্রম?

মেয়েটা এ বার সেই আগুনরঙা শাড়ির উপর উঠে দাঁড়াল। দু’হাত বাড়িয়ে দিল শমীকের দিকে। পায়ের তলার লাল আবরণ আর তার উপরে এক আদিম নারী শরীর। শমীক নিজেকে সামলাতে পারল না। বালিয়াড়ি থেকে ঝাঁপিয়ে উঠল সেই শয্যায়। জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে। কোনও শরীর যে এমন আগুন ধরিয়ে দিতে পারে, শমীক জানত না। এ বার জানল। মেয়েটার শরীরে যেন জ্বরের উত্তাপ। ঠোঁটে ঠোঁট জড়িয়েই দু’জন একটু-একটু করে সেই শাড়ির বিছানায় এলিয়ে পড়ল। শুরু হল আদিম ভালবাসা। কিংবা লড়াই। শরীরে শরীর মিশিয়ে পরস্পরের দখল নেওয়ার চেষ্টা। কখনও শমীক দখল নিচ্ছিল মেয়েটার। আবার পরক্ষণেই মেয়েটা নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে শমীককেই এনে ফেলছিল ওর দখলে। শমীকের মনে হল, এ এক আশ্চর্য নাগরদোলা।

সেই নাগরদোলায় ওঠানামা করতে-করতে শমীক ভুলে গেল নদীকে। ভুলে গেল আকাশকে। ভুলে গেল খানিক দূরে রেখে আসা নিজের গাড়ি, নিজের ফেরার পথ, নিজের পরিচয়। এবং এক সময় ও আশ্চর্য হয়ে দেখল সুতপাকে। শমীককে নীচে ফেলে ওর উপর চড়ে বসেছে সুতপা। এক ঝটকায় সুতপাকে নীচে ফেলে ও চড়ে বসতেই দেখতে পেল দেবযানীকে। শমীক একটু ঝুঁকে দেবযানী না সুতপা বুঝতে গেল। কিন্তু তার আগেই নাগরদোলা ঘুরে গেল। আর শমীক দেখল, দেবযানী কিংবা সুতপা নয়। শাল্মলীকে জড়িয়ে রয়েছে ও। অদ্ভুত ভাললাগা এবং ভয়ের মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকল শমীক। জীবনে যে সব মেয়েদের শরীর ও উপভোগ করেছে, তারাই এই নদীর পারে ঘুরে-ঘুরে আসছে। মেয়েটার শরীরে যেন সেই মেয়েরা আসা-যাওয়া করছে। তারাও আজ নিজেদের শরীর মিশিয়ে দিয়েছে শমীকের শরীরে। অন্ধকারে নাগরদোলায় ঘুরতে-ঘুরতে এক সময় হাঁপিয়ে পড়ল শমীক। কিন্তু নাগরদোলা থামছে না। শমীকের চারপাশ প্রবল জোর ঘুরছে। লাল শাড়িটা আরও লাল হয়েছে। শমীকের মনে হল, সেই লাল আগুনের লাল। ধীরে-ধীরে শাড়িটা কেমন জ্বলন্ত চিতার আদল নিয়েছে। জ্বলে যাচ্ছে শমীকের শরীর। পুড়ে যাচ্ছে। হাওয়াতেও পোড়া-পোড়া গন্ধ। সেই পুড়ে যাওয়া শরীরের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে মেয়েগুলো।
শমীক ঝটকা মেরে সরে আসতে চাইল। প্রবল ঘূর্ণনে, পোড়া গন্ধে, চিতার আগুনে ওর কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সরতে চাইলেই কি সরা যায়? মেয়েটা কিংবা মেয়েরা যে ওকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে। কোনও কিছুতেই সেই শরীরী বন্ধন কাটানো যাচ্ছে না।
শমীক প্রবল ভাবে ভাবতে চাইল, এটা একটা স্বপ্ন। ভয়ঙ্কর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন থেকে ওকে জেগে উঠতে হবে। এক্ষুনি। কিন্তু অল্পক্ষণেই ও বুঝতে পারল, এটা স্বপ্ন নয়। তবে কি বাস্তব? শমীক সেটা বুঝতে পারল না। বোঝার পরিস্থিতিতেও ও ছিল না। নাগরদোলা যে ঘুরেই চলেছে। তবু এত কষ্টের মধ্যেও শমীক বুঝতে পারল, মেয়েটা ওকে নিঃশেষ করে ফেলেছে। এবং আরও, আরও চাইছে ওর কাছ থেকে।

এক সময় নাগরদোলা থামল। শমীক তত ক্ষণে নীচে আছড়ে পড়েছে। ওর শরীরও নিস্তেজ। নিঃস্ব এবং পরাজিত পুরুষের মতো শমীকের নগ্ন শরীর পড়ে আছে নদীর পারে। সে শরীর পুড়ছে। সে শরীর ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

দূরে কি কোথাও মন্ত্রোচ্চারণ হচ্ছে? আকাশে কি কোনও কাঁসর-ঘণ্টা বাজছে? সেই সব মেয়েরা কি ঘিরে আছে ওর এই আগুনশয্যার চারপাশে? শমীক কিছুই স্পষ্ট করে টের পেল না। শুধু টের পেল ওর সেই শরীর আর শরীরে নেই। পাঁচ ভূতে তাকে লুটেপুটে খেয়ে নিচ্ছে।