• ঊর্মি নাথ
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

অষ্টমীতে বলির পরে ছোড়া হত বন্দুক

Durga of Surul Sarka Bari
সুপ্রাচীন: বড় তরফের দুর্গা প্রতিমা

এই বছর আমাদের বাড়ির দুর্গাপুজো ২৮৫ বছরে পড়ল। তবে সেটা মূর্তিপুজোর বয়স। সম্ভবত তারও দশ-পনেরো বছর আগে ঘটে পুজো হত। এই বাড়িতে পুজো শুরু করেন ভরতচন্দ্র সরকার। তাঁকে আমরা প্রথম পুরুষ হিসেবে ধরি,’’ বলছিলেন নবনীতা সরকার। সুরুলের সরকার বাড়ির দ্বাদশতম প্রজন্ম।

নবনীতা আরও ফাঁস করলেন, সরকার তাঁদের প্রকৃত পদবি নয়। ইংরেজদের থেকে পাওয়া উপাধি।   ‘‘আমরা আসলে ঘোষ। যতদূর জানা যায়, ভরতের ছেলে কৃষ্ণহরি ঠাকুর গড়ে পুজো করেন।’’ 

বিশ্বভারতী থেকে প্রকাশিত ‘সুরুল-নথি-সংকলন’-এর প্রথম খণ্ড নাড়াচাড়া করে জানা গেল, অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বর্ধমানের নীলপুরের ঘোষবাড়ির ছেলে ভরতচন্দ্র সস্ত্রীক চলে আসেন সুরুলে। তাঁর গুরু বাসুদেব ভট্টাচার্যের বাড়িতে। সুরুল ছিল এই বৈষ্ণব ধর্মগুরুর শ্রীপাট। ভরতচন্দ্র  গুরুদেবের শ্রীপাট ছেড়ে আর ফিরে যাননি বর্ধমানে। তাঁর পুত্র কৃষ্ণহরি ও তাঁর ছেলেরা সেই সময় ফরাসি ও ইংরেজ কুঠিয়ালদের সঙ্গে ব্যবসা করে পরিবারের শ্রীবৃদ্ধি করেন। 

সম্পত্তি ও প্রতিপত্তির দৌড়ে কৃষ্ণহরিকে অবশ্য টেক্কা দেন তাঁর নাতি শ্রীনিবাস। পাঁচ খিলানের ঠাকুরদালানে, যেখানে আজও পুজো হয়, সেটি আঠারো হাজার টাকায় তৈরি করেছিলেন শ্রীনিবাস। এই বাড়ির ছেলে বিপিনবিহারী সরকার পরিবারের ইতিহাস লিখতে গিয়ে লিখছেন, ‘কতক  প্রাচীন খাতাপত্র দেখিয়াছি, কতক বিশ্বস্তসূত্রে গুরুজনদের নিকট শুনিয়াছি, কতক নিজে জ্ঞাত করেছি।’ তাঁর লেখা থেকেই জানা যাচ্ছে, তা‌ঁদের পরিবার সুরুলের স্থানীয় বাণিজ্যকুঠিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেসিডেন্ট জন চিপ সাহেবের সঙ্গে ব্যবসা করে ফুলেফেঁপে উঠে। জাহাজের পাল তৈরি হত যে কাপড় দিয়ে সেই গড়াকাপড়, নীল, চিনি ইত্যাদির ব্যবসা ছিল সরকারদের। সেই সময় সরকার বাড়ির অধীনে ছিল প্রায় ২২০০ ধোপা। তাঁরা এই সব গড়াকাপড় ধোলাই করতেন। অতঃপর সেগুলি তৎকালীন ব্রহ্মদেশ, শ্রীলঙ্কা, মিশর, ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় রফতানি হত। ‘‘সুরুলের সরকারবাড়ির সঙ্গে লাঠিয়াল, বাইজি এই শব্দগুলোর সম্পর্ক পাবেন না,’’ স্মৃতিচারণ করছিলেন বড় তরফের প্রবীণ সদস্য শিবপ্রসাদ সরকার। তিনি এও জানালেন, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনের জমি অনেকটাই কিনেছিলেন এই পরিবারের কাছ থেকে। 

বহু জমিদারবাড়ির পুজোর ঠাটবাট আজ ফিকে! ব্যতিক্রম সুরুল সরকার বাড়ি। অর্থ বা পারিবারিক সমস্যা কোনও দিন পুজোয় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি। তবে একেবারেই কি সমস্যা হয়নি? কৃষ্ণহরির মৃত্যুর পরে তাঁর তিন ছেলে যাদবেন্দ্র, মাধবেন্দ্র ও কালীচরণের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে সমস্যা এতটাই তুঙ্গে ওঠে যে জমিদারি ভাগ হয়ে যায়। যাদবেন্দ্র ও কালীচরণ একজোটে থাকেন আদি বাড়িতে। লোকমুখে তাঁরা বড় তরফ। পাশেই বাড়ি করে আলাদা হয়ে যান মাধবেন্দ্র, ছোট তরফের প্রতিষ্ঠাতা। বড় বাড়ির মতো মাধবেন্দ্রও পুজো শুরু করেন। বড়-ছোট দুই তরফেই পুজোর নিয়ম এক। বৈষ্ণব মতে পুজো, অষ্টমীতে ছাগল বলি! ‘‘শুনেছি, আগে বলির পরে বন্দুক ছোড়া হত। সেটাই ছিল গ্রামের জন্য ইঙ্গিত। সরকার বাড়ির বলি শেষ হলে সুরুলের অন্যান্য বাড়িতে পুজোয় বলি হত,’’ বললেন শিবপ্রসাদবাবু। 

এমন আরও তথ্য জানালেন ছোট তরফের কিংশুক সরকার, ‘‘শুনেছি, একসময় ষষ্ঠীর দিন বড় তরফের বয়োজ্যেষ্ঠা মহিলা গ্রামের অন্য পুজো বাড়ির কর্তাদের ডেকে একটি করে ঘট ও ডাব দিতেন। পুজোয় সে ঘট তাঁরা প্রতিষ্ঠা করতেন।’’

আলাদা পুজো শুরু করলেও মাধবেন্দ্র আদি পুজোর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে নিয়ম করেছিলেন, বলি, বিসর্জন, অঞ্জলি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বড় বাড়ির থেকে ছোট বাড়ি পিছিয়ে থাকবে। তাই আজও পুজোর এক মাস আগেই দুটো বাড়ির নির্ঘণ্ট তৈরি করে ফেলা হয়। ভাইয়ে ভাইয়ে রেষারেষি আজ অতীত। পুজোকে কেন্দ্র করে মেতে ওঠেন দুই তরফের আট থেকে আশি।

প্রতিমা তৈরি থেকে বিসর্জন, পুজোর কাজে সরকার বাড়ির সদস্যদের হাত লাগাতে হয় না! সবই করেন কুলপুরোহিতের পরিবার এবং আরও কয়েকটি ব্রাহ্মণ পরিবার। যাঁরা বংশপরম্পরায় সরকার বাড়িতে এই কাজ করে আসছেন, জানালেন নবনীতা। পুজোর কাজে যেমন হাতে লাগাতে হয় না, তেমন দুই সরকারবাড়ির সদস্যদের পুজোর জন্য কোনও ব্যয় নেই। পুরোটাই সামলায় ‘মা দুগ্গা’র ট্রাস্টি বোর্ড। শুধু দুর্গা পুজো নয়, লক্ষ্মী জনার্দনের নিত্যপুজো থেকে সারা বছরের যাবতীয় ধর্মানুষ্ঠান হয় ট্রাস্টির টাকায়। তবে আজও দুই বাড়ির ট্রাস্টি আলাদা। পার্থক্য মায়ের সাজেও। বড় তরফে প্রতিমার ডাকের সাজ। ছোট তরফে বেনারসি। এক সময় বড় তরফের দুর্গাও বেনারসি পরতেন। যে শাড়িতে কাজ হত সোনা-রুপোর সুতো দিয়ে। শোনা যায়, একবার নাকি শাড়িতে খুঁত থাকায় শাড়ি বদলে মাকে সাজানো হল ডাকের সাজে।  সে থেকে শুরু। দুই বাড়ির মা পরেন সোনা ও রুপোর প্রাচীন গয়না। ‘‘দুই বাড়ির মায়ের গয়না রাখবার জন্য নিজস্ব লকারও আছে!’’ গলায় কৌতুক কিংশুকের । 

সপ্তমীর সকালে দুই বাড়িতেই  সানাই ঢোল বাজিয়ে, রঙিন ছাতা মাথায় দিয়ে নবপত্রিকাকে স্নান করাতে নিয়ে যাওয়া হয় শোভাযাত্রা করে। সেই দৃশ্য দেখার জন্য ফোটোশিকারি থেকে বিদেশি পর্যটক—লোকে লোকারণ্য। নারায়ণের জন্য লুচিভোগ হলেও মায়ের অন্নভোগ নেই, আছে শুধুই ফল ও মিষ্টি। পুজোয় সরকার বাড়িতে ঢাক বাজে না। তার জায়গা নেয় ঢোল। সঙ্গতে কাঁসর ও সানাই। তার তালে সন্ধ্যায় বাড়ির ছেলেরা নাচ করেন। এটাও কিন্তু এ বাড়ির রীতি। আজও পুজোয় সন্ধে হলেই জ্বলে ওঠে বনেদি বেলজিয়ান গ্লাসের ফানুস ও ঝাড়বাতি। 

সপ্তমী থেকে নবমী সন্ধেবেলা বড় বাড়ির দালানে যাত্রা হয়। ‘‘আগে যাত্রা দেখার ভিড় উপচে পড়ত। এখন দর্শক কমে পঞ্চাশ-ষাট। ‘যাত্রা’টাও মাকে নিবেদন করা। তাই বন্ধ করে দিতে পারি না,’’ বলছিলেন শিবপ্রসাদবাবু। দশমীতে ছোট তরফে প্রতিমা বিসর্জন হয় আগে। বড় তরফের ছেলেরা নাটমন্দির থেকে মাকে কাঁধে করে নামানোর পরে চতুর্দোলা করে নিয়ে যাওয়ার প্রথা ছিল। এখন অবশ্য লোকের অভাবে আলো-ঝলমল রথ। বিসর্জনের পরে এ বাড়ির বড় মেয়ে ছেলেদের চোখে কাজল পরিয়ে দেন, হাতে বেঁধে দেন অপরাজিতা ফুলের বলয়। মায়ের পুজোয় ভাইফোঁটার আগেই সূচিত হয়ে যায় দিদি-ভাই সম্পর্ক।

সরকার বাড়ির বর্তমান প্রজন্ম আজও ধরে রেখেছেন পুজোর প্রাচীন সব কুলপ্রথা। আজও এখানে পুজোর সন্ধ্যায় নেই ধুনুচি নাচ। নেই বিজয়ার পরে সিঁদুরখেলাও! সরকার বাড়িতে বিশ্বাস, এই দুই ‘ফোটোজেনিক’ আতিশয্যের সঙ্গে মাতৃ-আরাধনার যোগ নেই! 

এই দেখনদারির দুনিয়ায় বিশ্বাস ধরে রাখাটাই তো আসল!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন