• জাগরী বন্দ্যোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

বম্বে টকিজের বংশধর

মেলবোর্নের বাড়িতে বিবর্ণ এক ফটো থেকে পিটার ডাইট্জ জানলেন, তাঁর দাদু এক বাঙালি পরিচালক। হিমাংশু রায়। তাঁর স্টুডিয়ো থেকেই অশোককুমার, মধুবালার উত্থান। আর ছিলেন প্রজাপতি এক নারী, দেবিকারানি। পিটার আরও জানিয়েছেন, উত্তরাধিকারসূত্রে দেবিকা-হিমাংশু-বম্বে টকিজের সাত বাক্স নথি এখন তাঁর।

Devika Rani and Himanshu Rai
জুটি: দেবিকারানি ও হিমাংশু রায়। হিমাংশুর এই ছবিই পাওয়া গিয়েছিল চিলেকোঠার ঘরে।

Advertisement

একটা পুরনো ফটোগ্রাফ থেকে যে গল্পের শুরু, সেটা গিয়ে পৌঁছল সাত-সাতটা বাক্সে। যে গল্পটা তার মূল পর্বে ছড়িয়েছিল  ভারত, জার্মানি আর ব্রিটেনে, তার সঙ্গে জুড়ে গেল অস্ট্রেলিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও। এ কোন গল্প? মেলবোর্ন-এর পিটার ডাইটজ়-এর সঙ্গে আলাপ হলে সে ধোঁয়াশা কেটে যাবে। বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্র তথা বাঙালির ইতিহাসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সংরক্ষক তিনি। হিমাংশু রায় আর দেবিকা রানির হাতে গড়া ‘বম্বে টকিজ’-এর অমূল্য নথিপত্র উত্তরাধিকার সূত্রে এখন তাঁর জিম্মায়। 

উত্তরাধিকার? অবশ্যই! জীবননাট্যের উত্তরাধিকার, যার শ্রেষ্ঠাংশে হিমাংশু রায়, দেবিকা রানি, নিরঞ্জন পাল এবং জার্মান অভিনেত্রী মেরি হাইনলিন। 

বাবা-মা ও দুই ভাই, ওয়াল্টার আর পলের সঙ্গে বরাবর মেলবোর্নেই আছেন পিটার। বাড়িতে একটা চিলেকোঠার ঘর ছিল। পিটারের মা মাঝে মাঝে সে ঘরে যেতেন টুকিটাকি কিছু আনতে। পিটারও যেতেন, নানা পুরনো জিনিসপত্র ঘেঁটে দেখতে। বিশেষ করে বিশের দশকের জার্মানির ছবি। পিটাররা তো আদতে জার্মান। পিটারের মা বিয়ের পরে অস্ট্রেলিয়া আসেন। এটা সেটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎই এক বিকেলে বেরিয়ে পড়ল একটি অপরিচিত লোকের ছবি। ‘‘কে মা ইনি?’’ কিছুক্ষণ ইতস্তত করে মা বললেন, ‘‘উনি তোমার দাদু, আমার বাবা। হিমাংশু রায়।’’ 

১৯৮৫ সাল সেটা। পিটার তাঁর ৩১ বছর বয়সে এসে প্রথম শুনলেন, তাঁর দাদু এক জন ভারতীয়। মা তো আগে কোনও দিন বলেননি! কেন? কী কারণে এই নীরবতা? আস্তে আস্তে বেরোল সব। পিটারের দিদা, মেরি হাইনলিন ছিলেন হিমাংশুর প্রথম স্ত্রী। ওঁদের একটি কন্যাসন্তানও হয়। হিমাংশু তার নাম রেখেছিলেন নীলিমা। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয়নি সে বিয়ে। হিমাংশু জড়িয়ে পড়লেন দেবিকার সঙ্গে, মেরির জীবনও অন্য খাতে বয়ে গেল। কিন্তু নীলিমার মনে বাবাকে নিয়ে একটা কষ্ট আর অভিমান থেকেই গিয়েছিল। যে কারণে তিনি ওই পর্বটা নিয়েই আলোচনা করতেন না। তা ছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনের ক্ষেত্রে জটিলতা এড়ানোর জন্যও নিজের ভারতীয় বংশপরিচয় তাঁকে গোপন রাখতে হয়েছিল। একটা ছবি খানখান করে দিল এত দিনের নৈঃশব্দ্য। 

ছেলেরা কিন্তু চুপ করে থাকলেন না। ক্রমশই হিমাংশু সম্পর্কে আগ্রহ বাড়তে লাগল তাঁদের। হিমাংশু, দেবিকা, বম্বে টকিজ— সবই তাঁরা খোঁজ নিয়ে জানলেন। দেবিকার দ্বিতীয় স্বামী, রুশ চিত্রকর স্বেতোস্লাভ রোয়েরিখের (১৯০৪-১৯৯৩) কথাও জানলেন। মৃত্যুর দু’বছর আগে, ১৯৯৫ সালে, ছেলেদের সঙ্গে ভারতে এলেন নীলিমা। প্রথমে ওঁরা কলকাতাতেই পা রাখেন। তার পর খোঁজখবর করে দেখা করেন হিমাংশুর এক বোনপো, আর দেবিকার অন্যতম নায়ক অশোককুমারের সঙ্গে। আনন্দবাজারকে লেখা ই-মেলে পিটার জানাচ্ছেন, ভারতে এসে মন অনেক হালকা হয়ে গিয়েছিল মায়ের। পিতৃভূমিকে বড় ভাল লেগেছিল তাঁর। দেবিকা তখন বেঁচে নেই।

এর পরের চমকটা এল ২০০১-এ। পিটারের কথায়,  ‘‘সে বছর আমি একটা কাজে নিউ ইয়র্ক গিয়েছি। হাতে সময় থাকায় এক দিন কৌতূহলবশত রোয়েরিখ গ্যালারিতে গেলাম। কিউরেটরের সঙ্গে অনেক কথা হল। সব শুনে তিনি আমায় চমকে দিয়ে বললেন, ‘‘পিটার, আমার মনে হয়, আমার কাছে একটা জিনিস আছে, যেটা আসলে তোমার জিনিস।’’ একটা বাক্স নিয়ে এলেন উনি, উপরে দেবিকার ছবি। আর একটা বাক্স, বম্বে টকিজ-এর কিছু কাগজপত্র তার মধ্যে। এক মাস পরে মেলবোর্নের ঠিকানায় আরও একটা বাক্স পেলাম, তার পর আরও একটা। এই ভাবে সব মিলিয়ে মোট সাত বাক্স নথিপত্র আমার হাতে এল।’’ 

কালের কক্ষপথেই একদিন হিমাংশু-মেরি-দেবিকা কাছাকাছি এসেছিলেন। সময় নিজেই যেন রাস্তা খুঁজে নিয়ে বিচ্ছিন্ন বিন্দুগুলোকে ফের জুড়ে দিয়ে গেল। বছর দুয়েক আগে অস্ট্রেলিয়ায় বম্বে টকিজ নিয়ে একটা প্রদর্শনী করলেন পিটাররা। মেরি-নীলিমা-পিটারদের নিয়ে লেখালিখির শুরু মূলত তখন থেকেই। এর মধ্যে ফের মুম্বই ঘুরে গিয়েছেন পিটার, দেখে গিয়েছেন মালাডের বম্বে টকিজকেও। এখন ওঁদের ইচ্ছে, পরের বছর ভারতে একটা অনুষ্ঠান করার। সেই অবসরে হিমাংশু-মেরি-দেবিকার কাহিনির আদলটা বোঝার চেষ্টা করা যাক। 

 

হিমাংশু ও মেরি হাইনলিন। পিটার ডাইটজ়-এর সৌজন্যে

হিমাংশুর জীবন যাঁকে বাদ দিয়ে পড়া যায় না, তিনি নিরঞ্জন পাল (১৮৮৯-১৯৫৯)। জাতীয়তাবাদী নেতা বিপিনচন্দ্র পালের পুত্র। বিলেতে ডাক্তারি পড়তেন। বিলেতে বসেই সিনেমা দেখার নেশা তৈরি হল। নিরঞ্জন দেখলেন, বেশির ভাগ ছবিতেই ভারতীয়দের খুব খারাপ ভাবে দেখানো হয়। ভারতীয় সংস্কৃতিকে যথাযথ ভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। এডউইন আর্নল্ডের কবিতা থেকে ‘লাইট অব এশিয়া’ নামে বুদ্ধের জীবনীচিত্র তৈরি করার চেষ্টা চালাতে লাগলেন তিনি। মাঝপথে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বেধে সব ভেস্তে গেল। তবে চলচ্চিত্র জগৎ আর ব্রিটিশ রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে একটা সম্পর্ক গড়ে উঠল তাঁর। জার্মানির এমেলকা স্টুডিয়ো-র সঙ্গেও কথাবার্তা হল। নিরঞ্জন ডাক্তারি পড়া ছেড়ে সিনেমা-থিয়েটারে ঝুঁকলেন। এর মাঝখানে আইরিশ কন্যা লিলি বেল-এর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়ে গিয়েছে। 

সালটা ১৯২০। লন্ডনে এসেছেন ওয়েস্ট এন্ড-এর বিখ্যাত পরিচালক গাই ব্র্যাগডন। নিরঞ্জনের ‘দ্য গডেস’ নাটক পড়ে ব্র্যাগডন মুগ্ধ। নাটকটা করতে আগ্রহী তিনি। অভিনয়টা ভারতীয়দের দিয়েই করাতে পারলে ভাল হয়। কোথা থেকে পাওয়া যাবে? নিরঞ্জনের পরিত্রাতা হয়ে এলেন মেবেল পালিত, স্যর তারকনাথ পালিতের পুত্র লোকেন পালিতের স্ত্রী। মেবেলের বোর্ডিং হাউসে থাকা ভারতীয় পড়ুয়াদের মধ্যে থেকে সহজেই কুশীলব জোগাড় হয়ে গেল। এই নাটকেই নায়কের ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করলেন হিমাংশু রায় (১৮৯২-১৯৪০)। নিরঞ্জনের জীবনে হিমাংশু এবং হিমাংশুর জীবনে নিরঞ্জন এর পর থেকে প্রায় নিয়তিনির্দিষ্টের মতো একে অপরের পরিপূরকের ভূমিকা পালন করে চললেন।

হিমাংশুর বাবা হেমেন্দ্রকুমার রায় বিহার ও ওড়িশার রাজাদের এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন। হিমাংশু পড়তেন শান্তিনিকেতনে। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বিলেত গিয়ে আইন পড়তে ঢোকেন। কিন্তু সে তাঁর ভাল লাগছিল না। ‘দ্য গডেস’ হিট করে যেতেই তিনি আইন পড়ার পাট চুকিয়ে ফেললেন। এর মধ্যে অবশ্য ব্র্যাগডন-এর সঙ্গে বিচ্ছেদ হল। কারণটা চমকপ্রদ। ব্র্যাগডন নিয়ম করেছিলেন, মেয়েদের ড্রেসিং রুমে ছেলেরা ঢুকবে না। অভিনেতারা তা মানতে নারাজ!  

কিছু দিন পর হিমাংশু ভাবতে থাকলেন, নাটকটা ভারতে নিয়ে এলে কেমন হয়! কথাবার্তা চালানোর জন্য ভারতে পাড়িও দিলেন তিনি। ইতিমধ্যে নিরঞ্জনের প্রথম পুত্র জন্মেছে। আর, দেবিকা চৌধুরী (১৯০৮-১৯৯৪) নামে একটি মেয়ে লন্ডনে টেক্সটাইল ডিজাইন আর স্থাপত্যবিদ্যার ছাত্রী হয়ে এসে নিরঞ্জনের বাড়িতে থাকতে শুরু করেছে। তার বাবা মন্মথনাথ চৌধুরী মাদ্রাজের সার্জেন জেনারেল। প্রমথ চৌধুরী, আশুতোষ চৌধুরীদের ভাই। দেবিকার মা রবীন্দ্রনাথের বড়দি সৌদামিনী দেবীর দৌহিত্রী। 

এ দিকে বেশ কিছু দিন হিমাংশুর পাত্তা নেই। ১৯২৪-এর এক রাতে দরজায় কড়া নড়ল। নিরঞ্জন দেখলেন, একগাল হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে হিমাংশু। ‘‘এক্ষুনি আমার হোটেলে চলো, অনেক কথা আছে।’’ না, ‘দ্য গডেস’ ভারতে করানোর মতো প্রযোজক পাওয়া যায়নি। কিন্তু ভারতের কাগজেও নাটকটা নিয়ে লেখালিখি হয়েছে, নিরঞ্জনের ছবি বেরিয়েছে। সেই সব নিয়ে হিমাংশু দেখা করে এসেছেন লাহৌর হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি মতি সাগরের সঙ্গে। হিমাংশু-নিরঞ্জন ছবি করলে মতি টাকা ঢালতে রাজি! ‘লাইট অব এশিয়া’ করে ফেলতে আর বাধা নেই। এমেলকা স্টুডিয়ো থেকে টেকনিকাল সহায়তাটা পেলেই হয়! পরের দিনই দু’জনে মিউনিখ চলে গেলেন। 

মিউনিখে কয়েক সপ্তাহ থেকে নিরঞ্জন চিত্রনাট্য চূড়ান্ত করে ফেললেন। ঠিক হল, ভারতে শুটিং করার বন্দোবস্ত এবং অভিনেতা-অভিনেত্রী জোগাড় করার দায়িত্ব নিজেদের। এমেলকা দেবে যন্ত্রপাতি, ফিল্ম স্টক, পরিচালক আর টেকনিশিয়ান। নিরঞ্জন লিখছেন, তিনি যখন চিত্রনাট্যে ব্যস্ত, হিমাংশু সে সময়টা মিউনিখ চষে ফেলেছেন এবং বেশ কয়েক জন জার্মান বান্ধবীও জুটিয়েছেন। হিমাংশুর রঙিন মেজাজ নিরঞ্জনের বরাবরই জানা ছিল। এই সময়েই কি মেরি হাইনলিনের সঙ্গে হিমাংশুর দেখা হল? অনুমান তা-ই বলে। পিটার জানাচ্ছেন, ১৯২৪-এই মেরিকে বিয়ে করেন হিমাংশু। বিয়েটা অবশ্য গোপন ছিল। নিরঞ্জনের লেখায় দেখা যাচ্ছে, বেশ কিছু দিন পরে হিমাংশু তাঁকে বিয়ের কথাটা জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন কাউকে না বলতে। অনেক পরে নিরঞ্জন-পুত্র কলিনের কাছ থেকে শুনে শচীন ভৌমিক লিখেছিলেন, এমেলকার সঙ্গে হিমাংশুদের যোগাযোগের মূলেও নাকি মেরি। নিরঞ্জনের আত্মজীবনী, ‘সাচ ইজ লাইফ’ পড়লে মনে হয়, তা ঠিক নয়। মেরির ভূমিকা পরে আসবে। 

মেরি হাইনলিন (১৯০৬-১৯৫৬) ছিলেন মিউনিখের ডয়েশ থিয়েটারের অভিনেত্রী। নাচতেনও খুব ভাল। পিটার শুনেছেন, নাটকের সূত্রেই হিমাংশুর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ। এমনও হতে পারে, লন্ডনে হিমাংশুর নাটকের দলে তিনি কোনও সময় কাজ করেছেন। তখনই প্রণয়। মিউনিখে সেটাই গাঢ় হয়। তবে লন্ডনে মেরি এসে থাকলে, নিরঞ্জনের তা জানার কথা। নিরঞ্জনের লেখায় সে আভাস কিন্তু নেই। ১৯২৫-এর প্রথমার্ধে ‘লাইট অব এশিয়া’র শুটিং হল ভারতে। পরিচালক ফ্রান্জ অস্টেন-সহ জার্মান টিমকে নিয়ে আসার দায়িত্ব নিরঞ্জনের। হিমাংশু পৌঁছে গিয়েছেন আগেই। সিদ্ধার্থের ভূমিকায় অভিনয় করবেন তিনি। কিন্তু গোপার চরিত্রের জন্য অজস্র অডিশন নিয়েও লাভ হচ্ছে না। শেষমেশ কলকাতা থেকে নির্বাচিত হলেন রেনি স্মিথ। বিজ্ঞাপনে লেখা হল, ‘রক্ষণশীল অভিজাতবংশীয়া হিন্দু পরিবারের বিদুষী কন্যা— সীতা দেবী।’ দু’টি অন্য চরিত্রে সরোজিনী নায়ডুর দুই বোন সুনলিনী আর মৃণালিনী অভিনয় করেন। রেনির মায়ের সঙ্গে সুনলিনীই ইউনিটের বাকি সব মেয়ের দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। নিরঞ্জন মজার ছলে লিখেছেন, এ যাত্রা হিমাংশুর আর কোনও নতুন বান্ধবী হতে পায়নি। 

ঘরোয়া: পিটারের দুই ভাই ও মা নীলিমার সঙ্গে অশোককুমার। ছবি সৌজন্য: পিটার ডাইট্‌জ়

এই শুটিংয়েই হিমাংশুর ইউনিটে যোগ দিলেন ভবিষ্যতের নামী পরিচালক, ‘আলিবাবা’-খ্যাত মধু বসু (১৯০০-১৯৬৯)। হিমাংশুকে তিনি ডাকতেন ‘গোলাপদা’। গোলাপদা ফিরে যাবার আগে বলে গেলেন, মধু জার্মানি গেলে সিনেম্যাটোগ্রাফি শেখার ব্যবস্থা করে দেবেন। মধু অল্প দিন পরেই মিউনিখ পৌঁছলেন। হিমাংশু এবং অস্টেনের সহযোগিতায় শিক্ষানবিশ হয়ে যোগ দিলেন এমেলকা-তেই। 

মধুর স্মৃতিচারণে (‘আমার জীবন’) কিন্তু কোথাও মেরির কথা নেই। বস্তুত হিমাংশু যে বিবাহিত, সে উল্লেখটুকুও নেই। মধুর অভিজ্ঞতায় হিমাংশু কাজপাগল বড়দা। যিনি বারবার সতর্ক করছেন, এমেলকা-র এক ডিরেক্টরের স্ত্রী, হিলডা নামে একটি মেয়ের সঙ্গে মধুর জড়িয়ে পড়া নিয়ে। স্পষ্ট বলছেন, ‘‘সাবধানে চলো! বিদেশ বিভুঁই, কেলেঙ্কারি বাধিয়ে বোসো না!’’ ক’দিন পরেই হিলডা-র স্বামী মধুকে সরাসরি বললেন, ‘‘হয় তুমি ওকে বিয়ে করো, নয় ওর জীবন থেকে সরো।’’ প্রস্তাব দিলেন, মধু রাজি থাকলে তিনি বার্লিনের উফা স্টুডিয়োতে মধুর কাজের ব্যবস্থা করে দেবেন। হিমাংশু বারবার মধুকে বোঝাতে লাগলেন, হিলডাকে বিয়ে করার ভুলটি না করে তাঁর বার্লিন চলে যাওয়াই উচিত। সেটাই হল। উফা-তে তখন ফ্রিৎজ লাং তাঁর বিখ্যাত ছবি ‘মেট্রোপলিস’-এর শুটিং করছেন। ফ্রিৎজ-এর ক্যামেরাম্যানের কাছেই মধু কাজ শিখতে শুরু করলেন। পরবর্তী কালে এই উফা-র সঙ্গে কাজ করবেন হিমাংশু-দেবিকারাও। কারণ পাওনাগন্ডা নিয়ে খিটিমিটির জেরে এমেলকা-র সঙ্গে সম্পর্কটা তেতো হয়ে আসছিল। 

বস্তুত ‘লাইট অব এশিয়া’র লাভের গুড় বেশিটাই গিয়েছিল এমেলকা-র পকেটে। অথচ তারা ছবিটা ব্রিটেনে রিলিজ করাতে আগ্রহ দেখাচ্ছিল না। হিমাংশু আর নিরঞ্জন প্রায় জোর করে লন্ডনের ফিলহারমনিক প্রেক্ষাগৃহে ছবিটা দেখানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু বিজ্ঞাপনের পয়সা নেই। লোককে জানানো যাবে কী করে? ওঁরা উইন্ডসর কাস্‌ল-এ গিয়ে রাজা-রানিকে ছবিটা দেখালেন। সে খবর কাগজে বেরোতেই ম্যাজিক! ‘গোল্ড রাশ’, ‘বেন হার’ আর ‘থিফ অব বাগদাদ’-এর সঙ্গে রমরম করে চলতে লাগল ‘লাইট অব এশিয়া’!

মেরি আর হিমাংশুর কী হল? সম্ভবত তাঁরা কিছু দিন লন্ডনে থেকে আবার জার্মানি ফিরে যান। মিউনিখেই ১৯২৬-এর ১৫ মে নীলিমার জন্ম হয়। পিটারের বক্তব্য, মেরিই উফা-র সঙ্গে হিমাংশুর পরিচয় করিয়ে দেন। হিমাংশুদের পরের দু’টো ছবি ‘সিরাজ’ আর ‘থ্রো অব ডাইস’ উফা-র সঙ্গেই করা। ‘থ্রো অব ডাইস’ ছবিতেই হিমাংশুর জীবনে দেবিকার পাকাপাকি আগমন। 

কী ভাবে? সূচনা-মুহূর্তটা স্পষ্ট নয়। এই ক’বছরে হিমাংশু-নিরঞ্জন যখন ছবির কাজে ব্যস্ত, দেবিকা তখন নিজ উৎসাহে লন্ডনের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব ড্রামাটিক আর্ট-এ ভর্তি হয়েছেন। স্লেড স্কুল অব ফাইন আর্ট-এ মঞ্চসজ্জা শিখেছেন। বিউটিশিয়ানের কাজও শিখছেন। নিরঞ্জন লিখেছেন, ‘থ্রো অব ডাইস’ তখন হব-হব, এক দিন উফা-র পার্টিতে দেবিকাকে দেখে তিনি চমকিত। দেবিকা আর 

ফ্রক-পরা মেয়েটি নেই। পরনে হাল ফ্যাশনের শাড়ি, এক হাতে ককটেলের গেলাস, অন্য হাতে সিগারেট। উফা-র সাহেবরা হিমাংশুকে বলছিল, দেবিকাকেই নায়িকা করা হোক! হিমাংশু রাজি হননি, কারণ নবাগতা এণাক্ষী রামা রাও নায়িকা হবেন ঠিক হয়ে গিয়েছে। 

নিরঞ্জন আরও লিখছেন, তিনি সে সময় ভাবছিলেন হিমাংশুর তুতো-ভাই প্রমোদনাথ রায়ের সঙ্গে হয়তো দেবিকার একটা সম্পর্ক হতে যাচ্ছে। কারণ দেবিকাকে ফিল্মে আনার ব্যাপারে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছিলেন প্রমোদই। দেবিকা তাঁর কাছেই ‘ডাইস’-এর সহকারী শিল্প নির্দেশকের দায়িত্ব নিয়ে ভারতে আসেন। ‘সিরাজ’ আর ‘থ্রো অব ডাইস’, কোনও শুটিংয়েই নিরঞ্জন হাজির ছিলেন না। 

মধুর লেখায় পাচ্ছি, ১৯২৮-এর সেপ্টেম্বরে মধু আর হিমাংশুই দিল্লি আর রাজস্থান ঘুরে ‘ডাইস’-এর প্রি-প্রোডাকশন সারলেন। তখন থেকেই হিমাংশুর মুখে দেবিকার কথা শুনতে থাকলেন মধু। পরের একটা দিন— ‘গোলাপদার ঘরে বসে কিছু চিঠিপত্র টাইপ করছিলাম। এমন সময় গোলাপদা হঠাৎ বলে উঠলেন, ও মধু, তোকে এক বার স্টেশনে যেতে হবে। আজ দেবিকা আসছে। আমার একটা খুব জরুরি কাজ আছে, নইলে আমিই যেতাম। আমি বললাম, আমি তো কখনও তাকে দেখিনি, চিনব কী করে? গোলাপদা মৃদু হেসে আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, ইট ইজ ইম্পসিবল টু মিস হার!’ 

রাজস্থানে শুটিং শেষ হয়ে দিল্লিতে শুটিং শুরু হল। ডিসেম্বর মাস। মধুই তখন ফ্রান্জ অস্টেনের প্রধান সহকারী। এক দিন দেখা গেল, সকালে হিমাংশু সেটে আসেননি। মধু তাঁকে ডাকবাংলোয় খুঁজে বার করতে হিমাংশু বললেন, ‘‘আজ তো যেতে পারব না।’’ দেবিকা যোগ করলেন, ‘‘আজ যে আমরা এনগেজড হয়েছি!’’ সম্ভবত শুটিং শেষ হওয়ার পরেই ওঁদের বিয়ে হয়। ওঁরা সকলে যথারীতি জার্মানি ফিরে গেলেন। হিমাংশুর পরামর্শে দেবিকা উফা-তেই পরিচালক এরিক পমার-এর ইউনিটে শিক্ষানবিশ হয়ে ঢুকলেন। সেখানে তখন কাজ করছেন এমিল জেনিংস, জোসেফ স্টার্নবার্গ, ফ্রিৎজ লাং, মার্লেনে ডিয়েট্রিশ। ছবি শেষ করে হিমাংশুও যোগ দিলেন। তত দিনে সিনেমায় শব্দ এসে পড়ছে। সে সব কাজ দ্রুত শিখে নেওয়া প্রয়োজন। ও দিকে নিরঞ্জন একাই ভারতে এসে স্বাধীন ভাবে কাজ করছেন। বিশেষ করে কলকাতায় অরোরা কোম্পানি-র সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে। 

এ সবের মধ্যে মেরি কোথায়? পিটার জানাচ্ছেন, দেবিকার সঙ্গে বিয়ের অনেক আগেই হিমাংশু আর মেরির বিচ্ছেদ হয়েছিল। তবে যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি। জার্মানিতে হিমাংশু, মেরি আর দেবিকা তাঁকে নিয়ে একসঙ্গে যাতায়াত করছেন, এমন স্মৃতি নীলিমার ছিল। নীলিমা, হিমাংশু আর দেবিকার একসঙ্গে ছবিও আছে। দেবিকা আর মেরির মধ্যেও আপাত-বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল বলে জানাচ্ছেন পিটার। এই ‘বন্ধুত্বে’র কথা লিখেছেন শচীন ভৌমিকও। কিন্তু প্রথম বিয়ের কথা লুকিয়ে দেবিকাকে বিয়ে করা এবং পরে ঘটনাচক্রে মেরি-দেবিকার দেখা হয়ে যাওয়ার যে কাহিনি তিনি বলেছেন, পিটারের বয়ান এবং সাল-তারিখের হিসেব তার সঙ্গে মেলে না। শচীন সম্ভবত এও জানতেন না যে, কিছু দিন পরে মেরি নিজেও জার্মান গায়ক-অভিনেতা ফার্ডিনান্ড ওয়েইশটিঙ্গার-কে (১৮৮৩-১৯৪৯) বিয়ে করেন, যিনি এমনিতে ‘হোয়াইট ফের্ডল’ নামেই বেশি পরিচিত। নাৎসি-ঘনিষ্ঠতার জন্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এই ভদ্রলোককে কিছুটা ভুগতে হয়। 

বিশের দশকের শেষ থেকেই জার্মানির পট দ্রুত পাল্টাচ্ছিল। উফা-র মালিকানা তখন যাঁর হাতে, তিনি হিটলারের অন্যতম সহযোগী। নাৎসিদের দাপট ক্রমবর্ধমান। হিমাংশু-দেবিকা ঠিক করলেন, ভারতে চলে আসবেন। ১৯৩৩-এ ওঁদের সঙ্গে এল জার্মানদের একটা দলও। যেমন ফ্রান্‌জ অস্টেন, ক্যামেরাম্যান জোসেফ উইরশিং। জোসেফ আগেও হিমাংশুর ইউনিটে কাজ করেছেন। এ বারও হিটলারের প্রচার-ছবি বানানোর চেয়ে ভারতে কাজ করাটাই পছন্দ করলেন। অস্টেন পরে ফেরত গেলেও জোসেফ সপরিবার ভারতেই থেকে যান। বম্বে টকিজ-এর ছবি তো বটেই, ‘দিল অপনা অউর প্রীত পরায়ি’, ‘পাকিজা’র মতো ছবিও তাঁরই তোলা। 

ভারতে এসে— সকলেরই যা জানা— হিমাংশু-দেবিকা গড়ে তুললেন তাঁদের বিখ্যাত ‘বম্বে টকিজ’ (১৯৩৩-১৯৫৪)। হিমাংশুর ডাকে নিরঞ্জনও এসে যোগ দিলেন, আর আবিষ্কার করলেন এই ক’বছরে হিমাংশু অনেক পাল্টে গিয়েছেন। কোথায় সেই উদ্দাম জীবন! হিমাংশু এখন দেবিকা ছাড়া কিছু বোঝেনই না। স্টুডিয়োতে সুন্দরী মেয়েদের দিকে তাকিয়েও দেখেন না। দিবারাত্র তাঁর ধ্যানজ্ঞান, বম্বে টকিজকে কী করে একটা সম্মাননীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানো যায়। হিমাংশু ক্রমশ থিতু হচ্ছেন, আর এ বার পাপড়ি মেলছেন দেবিকা! চারদিকে তাঁর মুগ্ধ ভক্তের দল। ‘জীবন নাইয়া’র শুটিংয়ে তো নায়ক নাজমুল হাসানের সঙ্গে কলকাতায় পালিয়েই গেলেন। নিউ থিয়েটার্সে ঢুকবেন শোনা গেল। অনেক কাণ্ড করে দেবিকাকে ফেরানো হয়। নাজমুলকে বাদ দেওয়ার তাগিদেই নায়কের ভূমিকায় ‘অশোককুমার’ নাম দিয়ে আনা হল কুমুদলাল গঙ্গোপাধ্যায়কে। পরের ছবি ‘অচ্ছুত কন্যা’ (১৯৩৬) থেকেই তাঁদের জুটি সুপারহিট!

বক্স অফিসে একের পর এক ঢেউ তোলা বম্বে টকিজের পুরো পর্বটাই অত্যন্ত ঘটনাবহুল। যেমন, ১৯৩৭-এ নিরঞ্জন সরে যাওয়ায় সে জায়গায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের যোগদান। ১৯৪০-এ হিমাংশুর মৃত্যু। দেবিকার সর্বময় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা। শিশুশিল্পী ‘বেবি মুমতাজ’ নামে মধুবালার আত্মপ্রকাশ (১৯৪২)। বম্বে টকিজ ছেড়ে বেরিয়ে শশধর মুখোপাধ্যায়দের ‘ফিল্মিস্তান’ (১৯৪৩) গড়া। দেবিকার ছত্রচ্ছায়ায় নায়ক হিসেবে দিলীপকুমারের আত্মপ্রকাশ (১৯৪৪) এবং এর পরেই ১৯৪৫-এ চিত্রশিল্পী রোয়েরিখকে বিয়ে করে দেবিকার প্রস্থান। 

দেবিকা-রোয়েরিখের কোনও সন্তান হয়নি। তাঁদের বিপুল সম্পত্তির মীমাংসাও হয়নি! শুধু বম্বে টকিজের কাগজপত্রগুলো দেবিকা নিজেই নিউ ইয়র্কে পাঠিয়ে রেখেছিলেন। হিমাংশুর নাতি হিসেবে সেগুলোই পিটারের কাছে গিয়ে ‘ডাইটজ় ফ্যামিলি আর্কাইভ’-এর রূপ নিয়েছে। চিলেকোঠায় পড়ে থাকা সামান্য একটি ফটোগ্রাফের সূত্র ধরেই ‘বম্বে টকিজ’ খুঁজে পেয়েছে তার উত্তরাধিকারীকে।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন