Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২১ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

শুধু কলকাতা নয়, ভারতেও অন্য কোথাও হয়ত দেখা মিলবে না এমন স্থাপত্যের

চিরচেনা শহরের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে অচেনা আর এক শহর। রোজ হয়তো চোখাচোখি হয়, কিন্তু ভাল করে দেখা হয় না। চেনা হয় না তার মানুষগুলোকে, জানা হয় না তা

২৬ মে ২০১৭ ২০:৩১
Save
Something isn't right! Please refresh.
—ফাইল চিত্র।

—ফাইল চিত্র।

Popup Close

পরবর্তী পর্যায়ে স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে উত্তর দিকে নতুন করে এর সংলগ্ন আরও একটি ভবন নির্মাণ করা হয় এবং পরবর্তী ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ দিকে হাইকোর্ট ভবনের বর্তমান স্থাপত্যের সঙ্গে সমতা রেখে আর একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে।

শতাধিক বৎসরের প্রাচীন কলকাতার হাইকোর্ট আমাদের কাছে শুধুমাত্র ন্যায় বিচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান নয়, এর স্থাপত্য আমাদের কাছে একান্তই আকর্ষণীয়। ইউরোপীয় গঠনশৈলীর গথিক স্থাপত্যবিশিষ্ট এই ভবন, বলতে গেলে শুধুমাত্র কলকাতা শহর কেন, ভারতের অন্য কোথাও তেমন দেখা যায় না। এক পরিচ্ছন্ন পরিবেশে স্থাপিত ময়দান, ফোর্ট উইলিয়াম ও ইডেন উদ্যানমুখী এই ভবনটির গঠন স্থাপত্যে যে বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে, তা আমাদের আঠারো-উনিশ শতকের ইউরোপীয় গথিক স্থাপত্যশৈলীর পুনরুজ্জীবনের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

আলোচ্য গথিক-স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে আলোচনায় দেখা যায়, ইপ্রেসের ‘ক্লথ হল’-এর মধ্যবর্তী স্থানে যেমন সুউচ্চ ‘বেলফ্রাই’ অর্থাৎ ঘণ্টাঘর রয়েছে, হাইকোর্ট ভবনের মধ্যস্থলেও তার অনুকরণে নির্মাণ করা হয়েছে ১৮০ ফুট উচ্চতাসম্পন্ন চতুষ্কোণ মিনার, যার চারদিকে আরও চারটি চূড়া। প্রধান প্রবেশপথ রাখা হয়েছে এই মিনারের মধ্য দিয়েই। পূর্ব ও পশ্চিমে বসানো হয়েছে দুটি বড় গম্বুজ। কিন্তু আসল পরিকল্পনায় যে ধরনের উচ্চতাবিশিষ্ট গম্বুজ নির্মাণের কথা হয়েছিল তা করা যেতে পারেনি কারণ এই ভবন নির্মাণের সময় মধ্যবর্তী স্থান হঠাৎ ধ্বসে পড়ায় নকশাতে কাটছাঁট করতে হয়। চতুর্ভুজাকার এই হাইকোর্ট ভবন দৈর্ঘ্যে ৪২০ ফুট এবং প্রস্থে ৩০০ ফুট।

Advertisement

দক্ষিণমুখী এই ভবনের সমুখ-নকশার মধ্যেও দারুণ বৈচিত্র্য। মূল প্রবেশপথের দক্ষিণ চত্বরটি আগাগোড়া পাথর দিয়ে তৈরি। নীচের তলায় সামনের দরদালানে সমান সমান ব্যবধানে স্থাপন করা হয়েছে পাথরের স্তম্ভশ্রেণী। স্তম্ভশীর্ষে রয়েছে বেলেপাথরে ভাস্কর্যায়িত বিভিন্ন ধরনের ফুল-লতাপাতার নকশা। সে নকশার মধ্যে শুধু লতাপাতাই নেই, আছে অনেক মানুষের মুখ— হয়তো বা সেগুলি দেবলোকের কোনও দেবদূত, আর আছে প্রতি থামে বিভিন্ন বাদ্যরত মানুষের প্রতিচ্ছবি।

দোতলার গথিক স্থাপত্যশৈলীর অনুসরণে জানালার উপরভাগে নানা অংশে বিভক্ত অলঙ্কারস্বরূপ ‘ট্রেসারি’র কাজ যা তুলনীয় হতে পারে সেকালের প্রথাগত ‘প্লেট ট্রেসারি’ বা জ্যামিতিক ‘বার ট্রেসারির’ নকশার সঙ্গে। ছাদের আলসেতে করা হয়েছে সেকালের স্থাপত্য অনুসারি ক্ষুদ্রাকার চূড়া আকারে অসংখ্য ‘বার্টিজান’। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, হাইকোর্ট ভবনের এই গথিক খিলান আমাদের দেশের গ্রাম্য শিল্পী-স্থপতিদের এমনই প্রভাবিত করেছিল যে, একদা তাঁরা এই খিলানের নামকরণই করেছিল ‘হাইকোর্ট খিলান’।

প্রধান প্রবেশপথ দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলে উত্তরেও দেখা যাবে টানা দরদালান। ভবনের ছাদ নির্মাণেও কড়ি-বরগার খুব বেশি ব্যবহার নেই—পরিবর্তে সেকালের প্রথাগত শৈলী এখানেও অনুসরণ করা হয়েছে। ছাদের উপরে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে ভবনের ছাদ নির্মিত গথিক ‘রিবভল্ট’-এর খিলান দিয়ে—যার নির্মাণ শৈলী একান্তই মুগ্ধ হয়ে দেখতে হয়, কীভাবে বিভিন্ন থামের উপর গথিক খিলান নির্ভর করে ছাদ দাঁড়িয়ে রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গেই স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের দেশেও মধ্যযুগে যে সব ইসলামিক সৌধ নির্মিত হয়েছিল, তার ছাদও এই ভাবে চার দেওয়াল বা স্তম্ভের কোণে উদগত লহরার উপর গম্বুজ বসিয়ে নির্মাণ কৌশলের কথা। মালদহের আদিনা বা গৌড়ের সেইসব পুরাকীর্তিই আজকে যার নির্দশন।

পরিশেষে বলা যেতে পারে, হাইকোর্ট ভবনের এই গথিক কৌশল আমাদের কাছে একান্তই এক শিক্ষণীয় বিষয়। সাধারণ মানুষও বিদেশি স্থাপত্য সম্পর্কে আগ্রহী হলে, এখানে এসে স্থাপত্য বিষয়ে জ্ঞানলাভ করতে পারেন, তেমনি প্রাচীন ইতিহাস ও সংস্কৃতির বা সংগ্রহশালা বিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছেও ইউরোপীয় তথা গথিক স্থাপত্য সম্পর্কে শিক্ষা লাভের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এই হাইকোর্ট ভবন। পুরাকীর্তির স্থাপত্য-ভাস্কর্যের বিচারে কলকাতার প্রাচীন ইতিহাস অনুরাগীদের কাছেও তাই সমান কৌতূহলোদ্দীপক স্থান—শতাব্দীগত এই হাইকোর্ট ভবন।

(উপরের নিবন্ধটি তারাপদ সাঁতরা-র ‘কীর্তিবাস কলকাতা’ থেকে নেওয়া। আজ তার দ্বিতীয় অংশ। সৌজন্যে আনন্দ পাবলিশার্স)



Something isn't right! Please refresh.

আরও পড়ুন

Advertisement