Advertisement
০১ ডিসেম্বর ২০২২

আর এক তিব্বতের সন্ধানে বাইলাকুপায়

বেঙ্গালুরু এবং মহীশূর থেকে যথাক্রমে মাত্র পাঁচ ও দেড় ঘণ্টার দূরত্বে টিলাময় সবুজে লুকিয়ে আছে আশ্চর্য এক দেশ। কয়েক হাজার মানুষের এই নিসর্গ এখন বোধহয় তিব্বতের চেয়েও বেশি তিব্বত। আজ প্রথম পর্ব।পালদেন, সোনম, নামগিয়াল ইত্যাদি মনে রাখা কঠিন এমন সব নাম। বয়স অধিকাংশেরই নব্বুই-টব্বুই। তিব্বতে আয়ুটা একটু বেশিই। এখানেও তাই। কারণ অন্য আর একটা দেশে হলেও এই এলাকাটা ঘোর তিব্বত। অথবা হাড়মাস কালি করা পরিশ্রমে ও অশেষ যত্নে গড়ে তোলা তিব্বতের বিভ্রম।

আকাশের কাছাকাছি মাটি।

আকাশের কাছাকাছি মাটি।

জয়দীপ মিত্র
শেষ আপডেট: ১৭ জুন ২০১৭ ১৭:৪৩
Share: Save:

এই বাড়িটার চৌহদ্দিতে পা রাখা মাত্র ঝাঁঝালো মৃত্যুর গন্ধ নাকে আসা উচিত ছিল। কারণ বাড়িটা তেমন জীর্ণ না হলেও বাড়ির বাসিন্দারা জরাজীর্ণ। ক্ষতটা আয়ুর চেয়েও যেন বেশি জীবনের, নি‌র্বাসনের। তবুও, উঠোনের খেলনাকৃতি বৌদ্ধ মন্দিরটায় ধর্মচক্রের ঘোলাটে আবর্তনের শব্দের জন্যই হোক, বা একরাশ তালপাতায় হাওয়ার শিরশির শব্দের জন্য—বাড়িটাকে আদ্যন্ত ধ্বনিময় মনে হতে লাগল। বাড়ির গন্ধটাও কেমন বৌদ্ধ— চিত্রধর্মী হয়েও অচেনা, এমন অক্ষরে ঠাসা পুঁথির স্তূপে যেমন জমে থাকে ধুপগন্ধ। প্রার্থনাপতাকার সুতোর ওপর একগুচ্ছ বিকেলের কাক। তারাও কেউ কু-ডাক ডাকছিল না নিশ্চয়ই।

Advertisement

পাহাড়তলির ঢেউয়ে নিঝুম ভ্রম হওয়া বাড়িটা আসলে একটা বৃদ্ধাশ্রম। তবে এই আশ্রমের আবাসিকদের কারওরই নিবাস এ দেশ নয়। বহু রাজনীতি, দেশত্যাগ, হনন ও দহনের শেষে এঁদের স্মৃতিতে আশ্চর্য সতেজ হয়ে যে দেশটা বেঁচে আছে, তার নাম তিব্বত। সেই অর্থে এঁরা কেউ আমার ও আপনার সমধর্মী নন। সমদর্শী তো ননই। কারণ, আমরা যেখানে কর্নাটকের সবুজে ছাওয়া টিলা দেখছি, তাল-সুপুরির ঘননিবদ্ধ জটলা দেখছি, এঁরা সেখানে হামেশাই হিমেল ঝড় দেখেন, চিনা হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া মেশিনগানের গুলিতে জ্যোৎস্নার পাথুরে প্রান্তরে খই ফুটতেও দেখেন। এঁরাই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র শরণার্থী যাঁদের পা মাটিতে নেই।

জানলাখোলা ঘরে ঘরে মন্ত্রপাঠের শব্দ।

আকাশের কাছাকাছি মাটি। ধুলো ও পাথর। বরফমোড়া পাহাড়। আর ম্যাপে যেমন দেখায় তেমনই অসীমের মাঝখানে ফিতের মতো মেকং নদী। ব্রহ্মপুত্রও। রহস্যে ঠাসা মনাস্ট্রির লুকনো প্রকোষ্ঠে প্রাজ্ঞ সন্ন্যাসীর শরীর অবিকৃত রেখে দেওয়া তিনশো বছর। ধর্ম-অনুসারী সমাজ ও রাজনীতি, বাণিজ্য এবং বসত, শ্রেণিবিভ্রাট কিংবা যৌথচেতনা। যেমন ছিল তিব্বত ১৯৫৯ সালের ১০ই মার্চের আগে। আর এখনও রয়ে গেছে এতগুলো প্রায় থেমে আসা চেতনায়। বুদ্ধের মতো অনির্বাণ, মমি হয়ে থাকা প্রাজ্ঞের মতো অবিকল। চোখের পলক না ফেলে বাঁচার যোগাভ্যাস এঁদের বহু দিন হল রপ্ত হয়ে গেছে।

Advertisement

পালদেন, সোনম, নামগিয়াল ইত্যাদি মনে রাখা কঠিন এমন সব নাম। বয়স অধিকাংশেরই নব্বুই-টব্বুই। তিব্বতে আয়ুটা একটু বেশিই। এখানেও তাই। কারণ অন্য আর একটা দেশে হলেও এই এলাকাটা ঘোর তিব্বত। অথবা হাড়মাস কালি করা পরিশ্রমে ও অশেষ যত্নে গড়ে তোলা তিব্বতের বিভ্রম। বাতাসে সেই ধর্মের কূহকডাক, উপত্যকায় গুম্ফার শিঙা, দিগ্বিজয়ী সঙ্ঘের শরণ। সব হারিয়ে কার শরণ নিয়েছেন এঁরা? বুদ্ধের? সঙ্ঘের? ধর্মের? না কি যে কোনও মানুষের অপাপবিদ্ধ বেঁচে থাকার অতি সহজাত ইচ্ছেটুকুর?

আরও পড়ুন: সুগন্ধী সৌন্দর্যে মোড়া গঙ্গাপারের শহর ফলতা

শরণ নেওয়ার শুরু ১৯৫৯ সালের ১০ মার্চ। লাসায় ওই দিন দখলদার চিনা সৈন্যদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান ঘটে। আজকের চতুর্দশ দালাই লামা, যাঁর বয়স তখন চব্বিশ, এবং অবলোকিতেশ্বরের পুনর্জন্ম হিসেবে যিনি সমগ্র তিব্বতের অবিসংবাদী ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক নেতা তাঁর চার বছর বয়স থেকেই, তাঁকে চিনারা ওই দিন তাদের শিবিরে একটা মামুলি সিনেমা দেখতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে অনুরোধ ছিল তিনি যেন একা আসেন, দেহরক্ষী ছাড়া। কু-অভিপ্রায়ের গন্ধ পেয়ে লাসার তিরিশ হাজার বাসিন্দা দালাই লামাকে তাঁর নরবুলিংকার বাগানবাড়িতে ঘিরে রাখে। একটা মাছিকে হত্যা করাও যাদের অনায়ত্ত থেকে গেছে বহুকাল, সেই কোণঠাসা তিব্বতিরা চিনা শিবিরে শিবিরে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। জবাবে চিনারা লাসার রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামায়। নেহাতই অসম বিপ্লব। চাপানউতোরে সাত দিন কাটে। ১৭ই মার্চ দুপুরে নরবুলিংকা বাগানবাড়ির পুকুরে দু’দুটো গোলা এসে পড়ে। আর ওই দিন মধ্যরাত্রে ঝুড়িনৌকোয় কিচু নদী পার করিয়ে দালাই লামাকে ছদ্মবেশে চিনাশূন্য ‘লাম’ প্রদেশের ওপর দিয়ে ভারতের দিকে রওনা করিয়ে দেওয়া হয়। সঙ্গে আসেন প্রায় সতেরো হাজার মানুষ, বলতে গেলে তিব্বতের অন্তরটাই।

রাস্তার বাঁকে বাঁকে অপূর্ব শিল্প সমাহার।

পুরো দলটাকে পিছনে থেকে কভার করে চিরকালই অতিব্বতীয় রকমের সহিংস ‘খাম’ প্রদেশের শ’পাঁচেক গেরিলা। মাথার ওপর চিনা হেলিকপ্টারের নজরদারি, উঁচু গিরিবর্ত্মে ভয়ানক তুষারঝড়, চুপচাপ মনাস্ট্রিতেও গুপ্তচরের ভয়, টুপটুপ ঝরে পড়া অশক্ত পলাতক শিশিরের মতো— এ সমস্তই পেরিয়ে দলটা অরুণাচলের তাওয়াং সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকে আসে ১৮ই এপ্রিল। সমাজতান্ত্রিক চিন এবং তাদের সাথে স্বাক্ষরিত পঞ্চশীল চুক্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রাখা পণ্ডিত নেহরু নেহাত মানবিক কারণেই দলটাকে ভারতে ঢুকতে দেন। বনেদি তিব্বত ঠাঁই পায় তেজপুরের কাছে মিসামারি-তে। বেআব্রু চট-বাঁশের শিবিরে। ইতিহাসের উল্টোমুখে হেঁটে তিব্বতের আত্মা ঠাঁই নেয় বুদ্ধের সাবেক দেশে। আর তেমন ভাবে বৌদ্ধ হওয়া হয়ে ওঠেনি যাঁদের, মানে ওই ‘খাম’ প্রদেশের পাঁচশো গেরিলার, তাঁদের মধ্যে শুধু চার জন সীমান্ত পেরোন। বাকিরা হারানো ভূখণ্ডের অদৃশ্য ল্যান্ডমার্ক হয়ে ওপারেই থেকে যান। ইতিহাসে যেমন থাকে।

বৃদ্ধাশ্রমের ছ’নম্বর ঘরে প্রথম যার সঙ্গে আলাপ হল তিনি ওই অবশিষ্ট চার গেরিলার এক জন। আলাপ হল বলাটা অবশ্য বাড়াবাড়ি, কারণ শতায়ু বৃদ্ধ চোখে প্রায় দেখেন না, কানে একেবারেই শোনেন না। একদিক অল্প উঁচু করা সিঙ্গল খাটের প্রায় পুরোটা জুড়ে তাঁর প্রকাণ্ড শরীর টানটান। পাশে একটা ফিলিপস রেডিও। দৈববাণী শোনার লোভ নিয়ে প্রাক্তন গেরিলা নাকি সারাদিন বেতারতরঙ্গ হাতড়ান। নিচু টেবিলে রাখা একটা বাঁধানো ছবি। ইয়াকের পিঠে বসা এক তরুণ। চোখে গোল চশমা। এক কাঁধে রাইফেল, অন্য কাঁধে গোটানো তিব্বতের প্রতিপালক দেবী পালদেন লাহমো-র ছবি। এই ছবি দালাই লামার সর্বত্র বহন করা নিয়ম। প্রবাসে এবং নির্বাসনেও।

চিত্রধর্মী হয়েও অচেনা, এমন অক্ষরে ঠাসা পুঁথির স্তূপে যেমন জমে থাকে ধুপগন্ধ।

জানলাখোলা ঘরে ঘরে মন্ত্রপাঠের শব্দ। আবছায়া করিডরে ক্রাচের ঘষটে চলা। সমস্ত বাড়িটায় যেন ইতিহাস চুনকাম করা, কারণ বাসিন্দারা সকলেই সেই প্রথম লপ্তে উজিয়ে আসা মানুষজনের কেউ কেউ। হয়তো একটা বয়সের পর স্মৃতির মালিন্য ধুয়ে যায়। না কি তা ধুয়ে দেওয়ার জন্য মহৎ কিছু লাগে? যেমন শিকড়ের জন্য মনখারাপ? অথবা পূর্বজন্মের নোঙর?

দেশভাগের শিকার আমরা, রিফিউজি সমস্যার ব্যাপারে ঘরপোড়া গরু। অরুণাচল, লাদাখ, সিকিম সীমান্ত দিয়ে তো বটেই, এমনকী, নেপাল ও ভুটানের ভিতর দিয়ে হাজার হাজার তিব্বতি শরণার্থী ভারতে ঢুকতে শুরু করায় নেহরু বিপাকে পড়লেন। ও দিকে, পার্লামেন্ট, কম্যুনিস্টরা চিনের ঘরোয়া কোঁদলে নাক গলানোয়, এবং সোস্যালিস্টরা তিব্বতিদের প্রতি অধিকতর মানবিক না হতে পারায়, সমানতালে তাঁকে বকছে। ১৯০৫ সালের ভয়ানক ভূমিকম্পের পর পরিত্যক্ত হয়ে পড়া ব্রিটিশদের সাধের ম্যাকলয়েডগঞ্জ শহরটায় দলাই লামা তাঁর খাস মন্ত্রী-আমলাদের নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেন। তবে তাঁকে পরিষ্কার জানিয়েও দেওয়া হল ভারতের মাটি থেকে কোনও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা চালানো যাবে না। যেহেতু তিব্বতিরা অতি উচ্চতায় স্বভাবতই সাবলীল, তাই বিভিন্ন অস্থায়ী শিবির থেকে তাঁদের তুলে আনা হল লাদাখ ও কিন্নরের সীমান্তবর্তী এলাকায় রাস্তা তৈরির কাজে। মাথাপিছু দৈনিক এক টাকা মজুরিতে। ’৬২-তে চিনাদের সঙ্গে যুদ্ধের পর নেহরুর মোহভঙ্গ হল, তিব্বতিদের বরাতও কিছুটা ফিরল। সেই খাম প্রদেশের তরুণদের নিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী একটা, যাকে বলে, ক্র্যাক ফোর্স গড়ল— স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স। ওই বিকেলে, ওই বৃদ্ধাশ্রমে, চোদ্দো নম্বর ঘরে বসে স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স-এর অবসরপ্রাপ্ত যোদ্ধা সোনম দোরজে আমাকে শোনাবেন ’৭১-এ বাংলাদেশের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে গিয়ে পাকিস্তানের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি চট্টগ্রাম দখল করার গল্প। একটি-নিটোল-লোম-খাড়া-করা-গল্প।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.