দিনটা ছিল ১৫ অগস্ট। ছুটির দিনের আলসেমিকে সরিয়ে রেখে কলকাতা থেকে মাত্র আড়াই ঘণ্টা দূরে চলে গিয়েছিলাম অম্বিকা কালনায়, দুর্গাপুজো দেখতে। শরৎ নয়, শ্রাবণে কালনাবাসী মেতে ওঠেন দেবীর আরাধনায়। দেবী এখানে মহিষাসুরমর্দিনী। প্রাচীন এই পুজোয় আত্মীয়-কুটুমে জমজমাট থাকে কালনার প্রতিটি বাড়ি। সে দিন ছিল সপ্তমী। স্টেশন থেকে টোটো নিয়ে গেলাম গঙ্গার ধারে মহিষাসুরমর্দিনীতলায়। মস্ত ঠাকুরদালানে বিশালাকৃতি আটচালার প্রতিমা। দেবীর চার পুত্রকন্যার বদলে এখানে জয়া-বিজয়া। দর্শনার্থী, ঢাকি, বাজনদার, পুলিশ... সব মিলিয়ে লোকে লোকারণ্য। এত লোকের মধ্যেও দর্শন হয়ে গেল নির্বিঘ্নে। রাস্তার দু’ধারে মেলা। শুনলাম, এখানে বড় করে সরস্বতী পুজোও হয়।
পুজোমণ্ডপ ছেড়ে বেরিয়ে এলাম এই সুপ্রাচীন জনপদের ইতিহাস খুঁজতে। দশ মিনিটের মধ্যে টোটোয় চেপে পৌঁছলাম ১০৮ শিবমন্দিরে। এই রকম স্থাপত্য ভূভারতে একটিই। ১৮০৯ সালে বর্ধমানের রাজা তেজচাঁদের আমলে তৈরি হয় এই মন্দির। ছোট ও বড় দু’টি বৃত্তবিন্যাসে ১০৮টি সাবেকি আটচালা মন্দির। বাইরের বৃত্তে ৭৪টি, ভিতরের বৃত্তে ৩৪টি। বাইরের বৃত্তের মন্দিরগুলিতে একটিতে শ্বেত পাথর ও পরেরটিতে কালো পাথরের শিবলিঙ্গ... এ ভাবেই স্থাপিত। ভিতরের বৃত্তে সব শ্বেত পাথরের শিব। ছুটির দিন হলেও সকালে শিবমন্দির ছিল বেশ ফাঁকা। চার দিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এখানে দু’দণ্ড বসে মন শান্ত হয়ে গেল। সংবিৎ ফিরল পুরোহিতের ডাকে। বললেন, উল্টো দিকের রাজবাড়ির মন্দির প্রাঙ্গণ দেখে নিতে। দুপুর একটার মধ্যে কালনার সব মন্দির বন্ধ হয়ে যায়। খোলে আবার বিকেল চারটের পরে।
রাজবাড়ির মন্দির প্রাঙ্গণে গেট দিয়ে ঢুকে বাঁ দিকে প্রতাপেশ্বর শিবমন্দির। উনিশ শতকে তৈরি এই  মন্দিরের গায়ে সূক্ষ্ম টেরাকোটার কাজ বাক্‌রুদ্ধ করে দিল। এই মন্দিরের পাশে রাসমঞ্চটি আবার ইসলামিক স্থাপত্যরীতি মেনে তৈরি। মন্দির প্রাঙ্গণে আছে দু’টি পঁচিশ রত্ন মন্দির। একটি লালজির, অন্যটি কৃষ্ণচন্দ্র মন্দির। দু’টিরই বিগ্রহ রাধাকৃষ্ণের। দু’টি মন্দির মধ্য আঠেরোশো শতকে তৎকালীন বর্ধমানরাজ তৈরি করেন। কৃষ্ণলীলা, সেনা কুচকাওয়াজ, মুসলমান সৈনিক, পোষ্যকে নিয়ে মেমসাহেব... কী নেই দু’টি মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজে! কৃষ্ণচন্দ্রের বাঁ দিকে রাম-সীতার মন্দির। যেখানে সীতা-লক্ষ্মণ-হনুমান-সুগ্রীব সপার্ষদ রামের দারুমূর্তি দেখার মতো। এখানে রামের হাতে কোনও অস্ত্র নেই। এই প্রাঙ্গণে আছে আরও কয়েকটি ছোট-বড় মন্দির। এ সব কিছু খুঁটিয়ে দেখতে বেশ সময় লাগে। তাই শীতকালই হল এখানে আসার আদর্শ সময়।

মহিষাসুরমর্দিনী: শ্রাবণের দুর্গা

কালনার সঙ্গে অম্বিকা জুড়ে গেল কেন? উত্তর পাওয়া গেল সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে গিয়ে। পূজারি জানালেন, এখানে মা কালী ওরফে মা অম্বিকা। এক কালে অম্বিকা ও কালনা দু’টি আলাদা জনপদ ছিল। ভক্তি আন্দোলনের স্রোতে এক হয়ে যায় দু’টি জায়গা। সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরের কাছেই ছিল অনন্তবাসুদেব মন্দির এবং কালনার তিন নম্বর পঁচিশ রত্ন মন্দির গোপাল জিউমন্দির। মন্দিরপর্ব শেষ করে চলে গেলাম ভবাপাগলার আশ্রমে। আর তার ফাঁকে ভূরিভোজ সেরে নিয়েছিলাম। কালনায় এসে বিভিন্ন ধরনের ছানার মিষ্টি না চেখে দেখা বোকামি।
কালনায় একটা জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টোটো করে যেতে সময় লাগে ৫-১০ মিনিট। সন্ধের সময়ে মায়াবী মৃদু আলোয় সেজে ওঠে রাজবাড়ির মন্দির প্রাঙ্গণ ও ১০৮ শিবমন্দির। আট থেকে আশি... স্থানীয় সব ধর্মের মানুষ বিকেল হতেই এখানে চলে আসেন। মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের পাশাপাশি নিজের প্রাচীন সংস্কৃতি ধরে রাখতে সচেতন এখানকার প্রত্যেকে।