E-Paper

চিকিৎসক নেই, প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীকে ওষুধ দিচ্ছেন গ্রুপ-ডি কর্মী

সম্প্রতি বিজয়গঞ্জ বাজার থেকে জয়পুরের দিকে ফেরার সময়ে এক শিশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্থানীয় দুই যুবক তাকে কোলে করে বিজয়গঞ্জ বাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান।

সামসুল হুদা

শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৭
গ্রুপ-ডি কর্মীর থেকে ওষুধ নিচ্ছেন রোগীরা।

গ্রুপ-ডি কর্মীর থেকে ওষুধ নিচ্ছেন রোগীরা। — নিজস্ব চিত্র।

নির্দিষ্ট সংখ্যক অনুমোদিত চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্টের অভাবে ভাঙড় ও সংলগ্ন এলাকার একাধিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কার্যত ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্য পরিষেবা। কোথাও রোগী দেখছেন গ্রুপ-ডি কর্মী, কোথাও তিন জন চিকিৎসক থাকার কথা হলেও রয়েছেন মাত্র এক জন! ব্লক হাসপাতালগুলিতেও চিকিৎসকের ঘাটতি থাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসক তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যার জেরে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পরিষেবা আরও সঙ্কটে পড়েছে। ব্লক হাসপাতালগুলিতেও প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক অনেক কম রয়েছেন বলে অভিযোগ।

সম্প্রতি বিজয়গঞ্জ বাজার থেকে জয়পুরের দিকে ফেরার সময়ে এক শিশু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। স্থানীয় দুই যুবক তাকে কোলে করে বিজয়গঞ্জ বাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান। অভিযোগ, সেখানে কোনও চিকিৎসক না থাকায় এক জন গ্রুপ-ডি কর্মী শিশুটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে প্রাথমিক ওষুধ দেন। পরে ওই স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সেকেন্ড মেডিক্যাল অফিসার তথা হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক সাহিদা পরভিনকে ডাকা হয়। তিনিও শিশুটিকে পরীক্ষা করে একই ধরনের পরামর্শ দেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে কোনও অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক (ফার্স্ট মেডিক্যাল অফিসার) ও ফার্মাসিস্ট নেই। ফলে এক জন নার্সিং স্টাফ ও এক জন গ্রুপ-ডি কর্মীই রোগী দেখা থেকে শুরু করে ওষুধ দেওয়া পর্যন্ত সমস্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশের একটি ঘরে হোমিওপ্যাথি বিভাগে এক জন চিকিৎসক ও ফার্মাসিস্ট রোগীদের দেখছেন।

ভাঙড় ২ ব্লকের জিরেনগাছা ব্লক হাসপাতালের অধীনে রয়েছে বিজয়গঞ্জ বাজার ও টোনা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। টোনা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ১০ শয্যাবিশিষ্ট। অভিযোগ, জিরেনগাছা ব্লক হাসপাতাল ৩০ শয্যাবিশিষ্ট হলেও সেখানে নির্ধারিত সংখ্যক চিকিৎসক নেই। সে কারণে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে চিকিৎসক তুলে নেওয়া হয়েছে। নিউটাউন এলাকায় সরকারি হাসপাতাল না থাকায় সেখান থেকেও প্রচুর রোগী জিরেনগাছা হাসপাতালে আসেন বলে জানা গিয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ফতেমা বিবি ও সুকুমার বিশ্বাস বলেন, “চিকিৎসার জন্য বিজয়গঞ্জ বাজার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে নিরাশ হয়ে ফিরতে হয়। ওখানে নিয়মিত কোনও চিকিৎসক থাকেন না। এক জন হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আছেন। তিনি হোমিওপ্যাথির ওষুধই দেন। কিন্তু ছোটখাটো দুর্ঘটনা বা আঘাতের ক্ষেত্রে ওখানে কার্যত চিকিৎসা হয় না।” চিকিৎসা পরিষেবার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিকাঠামো নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবন জরাজীর্ণ, দেওয়ালে শ্যাওলা ও গাছ জন্মেছে। শৌচালয়ের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। পাঁচিল না থাকায় চত্বরজুড়ে আগাছা, গরু-ছাগলের অবাধ যাতায়াত। সন্ধ্যার পরে সেখানে মদ-গাঁজা, জুয়ার আসর বসে বলে অভিযোগ।

একই ধরনের সমস্যা রয়েছে ভাঙড় ১ ব্লকের নলমুড়ি ব্লক হাসপাতালের অধীনে থাকা ভাঁটিপোতা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। অভিযোগ, সেখানেও কোনও চিকিৎসক নিয়মিত থাকেন না। নলমুড়ি ব্লক হাসপাতাল ৩০ শয্যাবিশিষ্ট হলেও সেখানে ছ’জন চিকিৎসকের বদলে কমসংখ্যক চিকিৎসক কর্মরত।

ক্যানিং ২ ব্লকের মঠেরদিঘি ব্লক হাসপাতালের অধীনে রয়েছে খুঁচিতলা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, যা এক শয্যার। এখানে প্রতি মাসে গড়ে ১৫০-১৬০ জনের প্রসব হয়। মঠেরদিঘি ব্লক হাসপাতালেও প্রতি মাসে প্রায় ১৬০-১৭০ জন প্রসব হয়। নিয়ম অনুযায়ী, খুঁচিতলা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে তিন জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে রয়েছেন মাত্র এক জন। রোগীর চাপ সামলাতে অন্য হাসপাতাল থেকে দু’জন চিকিৎসক আংশিক সময়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। মঠেরদিঘি হাসপাতালে বর্তমানে পাঁচ জন চিকিৎসক কর্মরত, তাঁদের মধ্যে এক জন আগামী মাসে অবসর নেবেন। ওই হাসপাতালের উপরে নির্ভর করেন বাসন্তীর চড়াবিদ্যা, উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁ ও সন্দেশখালির লাউখালি এলাকার মানুষও।

জেলা স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক নিয়োগ বন্ধ থাকায় এই সঙ্কট তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, অনেক চিকিৎসক উচ্চশিক্ষার জন্য অন্যত্র চলে গিয়েছেন। ফলে জেলার অধিকাংশ হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক অনেক কম রয়েছেন।

এ বিষয়ে জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক মুক্তিসাধন মাইতি বলেন, “কিছু চিকিৎসক উচ্চশিক্ষার জন্য গিয়েছেন, এটা ঠিক। প্রতি বছরই এমন হয়। দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকায় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি স্বাস্থ্যভবনকে জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই নতুন চিকিৎসকদের মেধা তালিকা ও ইন্টারভিউ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আশা করা যায়, আগামী মাসের মধ্যেই এই পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হবে।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Health Department medical treatment

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy