ভোটার তালিকার জল বার করতে এসআইআর করছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু সেই এসআইআরে মিশে গেল সুরা।
তপন সিংহ পরিচালিত ‘আতঙ্ক’ ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের উদ্দেশে সুমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘‘মাস্টারমশাই, আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি!’’ এসআইআরের ‘আতঙ্কে’ বিএলও-র দায়িত্ব পালন করা হুগলির এক মাস্টারমশাই শুধু দেখেননি। যা দেখেছেন, তা-ই লিখিত ভাবে কমিশনকে জানিয়ে দিয়েছেন। এক জন ভোটারের এসআইআরের শুনানিতে অনুপস্থিতির কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে সেই মাস্টারমশাই লিখেছেন, ‘মদ্যপানের ঘোরে ভুলে গিয়েছেন’ (ফরগট ড্রিঙ্কিং ওয়াইন)।
সংশ্লিষ্ট বিএলও কমিশনকে যে লিখিত ভাবে কারণটি জানিয়েছেন, সেই নথি আনন্দবাজার ডট কম-এর হেফাজতে রয়েছে। গোপনীয়তার স্বার্থে হুগলির সংশ্লিষ্ট বিএলও-র নাম, বিধানসভার নাম বা যে ভোটার সম্পর্কে ‘মদ্যপানের ঘোরের’ কথা লেখা হয়েছে, তাঁর তথ্যপঞ্জি এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হল না।
কেন তিনি এমন লিখলেন? বিএলও মাস্টারমশাইয়ের জবাব, ‘‘হয়তো ওই কথাটা লেখা আমার ঠিক হয়নি। কিন্তু আমি রাগের চোটে লিখে ফেলেছি। আমায় পাগল করে দিয়েছে।’’ কী করেছেন সংশ্লিষ্ট ভোটার? বিএলও-র কথায়, ‘‘প্রথম বার শুনানিতে যাওয়ার দিন সকালে উনি খবর পান পাশের গ্রামে এক জন মারা গিয়েছেন। শ্মশানে গেলে ফ্রি-তে মদ পাওয়ার লোভে শুনানিতে না-গিয়ে মড়া পোড়াতে চলে যান!’’ হুগলির যে গ্রামীণ এলাকার এই ঘটনা, সেখানে কেউ মারা গেলে সাধারণত নিয়ে যাওয়া হয় বৈদ্যবাটি হাতিশালা ঘাটে। কাছাকাছির মধ্যে সেখানেই একমাত্র বৈদ্যুতিক চুল্লি রয়েছে। ওই এলাকায় এ কথা সর্বজনবিদিত যে, গ্রাম থেকে মরদেহ এলে শববাহী গাড়ি বৈদ্যবাটি চৌমাথা মোড় বা দিল্লি রোডে নেতাজি মোড়ে দাঁড় করিয়ে প্রথমে শ্মশানযাত্রীরা মদ্যপান করবেন। তার পরে রওনা দেবেন ঘাটের দিকে। সাধারণ ভাবে মৃতের পরিবারের লোককেই সেই ‘শোক সুরা’র খরচ বহন করতে হয়। বিএলও সেটাকেই ‘ফ্রি-তে খাওয়ার লোভ’ বলে উল্লেখ করেছেন।
নিজের যন্ত্রণার কথা বলতে গিয়ে ওই বিএলও বলছিলেন, ‘‘কী আর বলব, যেন আমার দায় পড়েছে ওঁকে শুনানিতে হাজির করানোর! দ্বিতীয় বার আবার ডাকা হল। আবার কোথায় একটা পড়েছিল (মদ্যপান করে)। তৃতীয়বার শুনানির আগে কমিশনকে জানাতে হয়, কেন দু’বার সংশ্লিষ্ট ভোটার শুনানিতে আসেননি। রাগে আমি আসল কথাটাই লিখে দিয়েছি।’’ একই বুথে পরের জনের নামের পাশে শুনানিতে অনুপস্থিতির কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে ‘বমি’। তবে কী কারণে বমি, তা লেখা নেই। তবে এসআইরের কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বিএলও বলেন, ‘‘গত কয়েক মাসের কথা মনে পড়লেই চোখে জল চলে আসে।’’
আরও পড়ুন:
এই বিএলএ-রও বক্তব্য, তৃতীয় বার শুনানিতে মদ্যপায়ী ওই ভোটার অবশ্য হাজির ছিলেন। সংশ্লিষ্ট আধিকারিককে ওই ভোটার জানিয়েছেন, তিনি তারাপীঠে পুজো দিতে গিয়েছিলেন। কাতর গলায় বিএলও বললেন, ‘‘আমি জানি, ওটাও মিথ্যা। ওঁকে আমি রোজ এই এলাকায় দেখেছি। কিন্তু শুনানিতে আসেননি।’’ শুধু একটি ঘটনা নয়। ওই বিধানসভাতেই অন্য একটি বুথে অন্য এক ভোটারের শুনানিতে অনুপস্থিতির কারণ হিসাবে অন্য এক বিএলও কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন, ‘ড্রাঙ্কার’। সাধারণত মদ্যপায়ীদের বোঝাতে এই শব্দ ব্যবহার করা হয়। ‘ড্রাঙ্কার’ লেখা বিএলও-র সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা যায়নি। তাঁর ফোন ক্রমাগত বেজে গিয়েছে।
ঘটনাচক্রে, হুগলির ওই বিধানসভা এলাকায় চোলাই মদের অসংখ্য ভাটি রয়েছে। মাঝে মাঝেই স্থানীয় মহিলারা দল বেঁধে সে সব ভাটিতে ভাঙচুর চালান। প্রশাসনের একাংশের ‘আশীর্বাদে’ই চোলাইয়ের ভাটিগুলির রমরমা বলে দাবি স্থানীয়দের।
বঙ্গ রাজনীতিতে বহু বছর ধরেই সুরা একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। ভোটার আগের দিন সুরা বিতরণের অভিযোগ উঠত বাম জমানা থেকেই। তৃণমূল জমানায় সুরা রাজস্ব আদায়ের অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেন বিরোধীরা। এ বার এসআইআরের সঙ্গেও জুড়ে গেল সুরা।