তারাতলার দুর্ঘটনার পরের দিন, বৃহস্পতিবার সকালেও হদিস মিলছিল না রানিগঞ্জের লায়েকবাঁধের বাসিন্দা নবীন সিংহের। তবে দুপুর ২টো নাগাদ এসএসকেএম হাসপাতালে উপস্থিত এক জনের ডান হাতে আঁকা উল্কির দিকে নজর পড়তেই মেসোমশাইকে চিনতে ভুল করেননি সিমরণ সিংহ। বুঝতে পারেন এটি তাঁর মেসোমশাই নবীনের দেহ। অদূর ঈশ্বরের ভরসায় বসে থাকা মাসিমা, নবীনের স্ত্রী নেহাকে সে কথা জানান তিনি। সব আশা শেষ মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন নেহা।
সিমরণ নবীনের বড় শ্যালিকার মেয়ে। তাঁর শ্বশুরবাড়ি ডানকুনিতে। সিমরণ জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর পৌনে ২টো নাগাদ মাসিমা ফোনে জানান, তারাতলায় দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন মেসোমশাই। পরে জানতে পারেন, দুর্ঘটনায় মৃত ও জখমদের এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিকেল ৩টে নাগাদ তিনি এসএসকেএমে হাসপাতালে পৌঁছে সেখানে টাঙানো তালিকা দেখেন। তিন জন মৃত এবং ১৯ জন জখমের নাম লেখা থাকলেও, নবীনের নাম নেই।
নেহা জানান, বুধবার দুপুর দেড়টা নাগাদ ঠিকা সংস্থার তরফে ফোন করে দুর্ঘটনার খবর দেওয়া হয় এবং তাঁকে কলকাতায় আসতে বলা হয়। তিনি বড় ছেলেকে নিয়ে রাত সাড়ে ৭টা নাগাদ হাসপাতালে পৌঁছন। এর পর সারারাত হাসপাতালের বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেও স্বামীকে হদিস পাননি। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টা নাগাদ তাঁরা দুর্ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়েও স্বামীর খোঁজ না সকাল ১০টা নাগাদ ফের হাসপাতালে ফিরে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, একের পর এক শ্রমিককে নিয়ে আসা হচ্ছে। কিন্তু নবীন নেই। তিনি বলেন, “এরই মধ্যে হাসপাতালের এক কর্মী আমাদের কাছ থেকে আধার কার্ড এবং অন্য পরিচয়পত্র দেখতে চান। সে সব দেখে বলেন, আর একটি দেহ আসছে।” সিমরণ বলেন, “সেই দেহের মুখ থেঁতলে যাওয়ায়, তিনি কে, চেনা যাচ্ছিল না। হঠাৎ দেহের ডান হাতের উল্কি দেখে বুঝতে পারি, তিনি মেসোমশাই। মাসিকে ডেকে এনে দেখাতেই সব স্পষ্ট হয়ে যায়।”
পরিবার সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ৯টা নাগাদ হাসপাতালের তরফে ব্যবস্থা করে দেওয়া অ্যাম্বুল্যান্সে করে রানিগঞ্জের বাড়িতে পৌঁছয় নবীনের দেহ। রাত ২টো নাগাদ দেহ আসে বাড়িতে। শুক্রবার সকালে বল্লভপুরে দামোদর নদের ধারের শ্মশানে দাহ করা হয়।
নেহা বলেন, “যার রোজগারে সব চলত, সে আর ফিরবে না। এই অবস্থায় কী করে সবার ভরণপোষণের দায়িত্ব নেব, ভেবে পাচ্ছি না।” তাঁর দিদি সরস্বতী জানান, দেহ দাহ করার জন্য আসানসোল পুরসভার পক্ষ থেকে ২০০০ টাকা সরকারি অনুদান তাঁরা পেয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মৃত এবং জখমদের পাশে থাকার কথা ঘোষণা করেছেন। ঘোষণা কার্যকর হলে এমন অনেকের সংসার বেঁচে যাবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)