Advertisement
E-Paper

সিন্ডিকেটের ফাঁসে বিচার বিভাগও, মত বিচারপতির

এত দিন অভিযোগটা করতেন নিজের বাড়ি বানাতে গিয়ে হন্যে হওয়া গৃহস্থ কি প্রোমোটার। অভিযোগ করত বণিক মহল। এবং রাজ্যের রাজনৈতিক বিরোধীরা। এজলাসে বসে এ বার একই কথা বললেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিও।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৪:১৬

এত দিন অভিযোগটা করতেন নিজের বাড়ি বানাতে গিয়ে হন্যে হওয়া গৃহস্থ কি প্রোমোটার। অভিযোগ করত বণিক মহল। এবং রাজ্যের রাজনৈতিক বিরোধীরা। এজলাসে বসে এ বার একই কথা বললেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিও। বুঝিয়ে দিলেন, রাজ্যে সিন্ডিকেটের অত্যাচার থেকে রেহাই পায়নি বিচার বিভাগের নির্মীয়মাণ ভবনগুলিও।

সোমবারের মামলাটি ছিল সিন্ডিকেটের জুলুম নিয়েই। তারই শুনানিতে হাইকোর্টের বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত বলেন, ‘‘সল্টলেক ও আসানসোলে বিচার বিভাগের দু’টি ভবন তৈরির কাজে নিযুক্ত সরকারি ঠিকাদারকেও হুমকি দিচ্ছে সিন্ডিকেটের লোকজন। তারা চাইছে, তাদের দাবি মতো ইমারতি জিনিসপত্র নিতে হবে। না হলে কাজ বন্ধ। রাজ্যের সর্বত্র এই ঘটনা ঘটছে। এমনকী বিচারব্যবস্থার উপরেও এর প্রভাব পড়েছে।’’

সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য রুখতে এর আগে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কখনও সরকারি সভার মঞ্চ থেকে বলেছেন, ‘‘এখন আমায় কনট্র্যাক্ট দিন, ওকে কনট্র্যাক্ট দিতে হবে, এ সব যেন না হয়।’’ কখনও দলীয় বৈঠকে জানিয়ে দিয়েছেন, দলে থেকে সিন্ডিকেট করা যাবে না। কিন্তু বণিক মহলের অভিযোগ, এতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। একে জমির অভাব ও সরকারের কট্টর নীতির জন্য রাজ্যে বড় বিনিয়োগ নেই। তার উপরে সিন্ডিকেট ও তোলাবাজদের উৎপাতে অনেক সংস্থা কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। রাজ্য ছেড়ে পাততাড়িও গুটিয়েছে অনেকে।

এ দিনের মামলাটি যেমন দায়ের করেছিলেন একটি নির্মাণ সংস্থার মালিক মহম্মদ ইসমাইল। দক্ষিণ ২৪ পরগনার মহেশতলায় বহুতল তৈরি করছে তাঁর সংস্থা। ইসমাইলের অভিযোগ, স্থানীয় একটি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত সমাজবিরোধীরা তাঁর কাছে টাকা চেয়ে খুনের হুমকি দিচ্ছে। মহেশতলা থানা এবং পুলিশ সুপারকে জানিয়েও কোনও ফল হয়নি। সরকারি আইনজীবী শাক্য সেন বলেন, পুলিশ মামলা দায়ের করেছে। নির্মাণ সংস্থার আইনজীবী আইনুল হক এবং আবুল মসিয়ুরের কাছে বিচারপতি জানতে চান, এখনও হুমকি দেওয়া হচ্ছে কি না। আইনজীবীরা জানান, হুমকি অব্যাহত। সিন্ডিকেটের লোকজন ইমারতি জিনিসপত্র নেওয়ার জন্যও চাপ দিচ্ছে। বিচারপতি সরকারি আইনজীবীকে নির্দেশ দেন, পুলিশি তদন্তের অগ্রগতি অবিলম্বে জানাতে। এর পরেই বিচার বিভাগের দুই ভবনের প্রসঙ্গ টানেন তিনি।

গত সেপ্টেম্বরে আসানসোলে নতুন আদালত ভবন তৈরির বরাত পেয়েছিল একটি ঠিকাদার সংস্থা। কাজ শুরু হয় অক্টোবরে। প্রথম দিকে দ্রুত গতিতেই কাজ চলছিল। নববর্ষের বিকেলে হঠাৎ পাঁচটি মোটরবাইকে চড়ে হাজির হয় কয়েক জন। ঠিকাদার সংস্থার অভিযোগ, কর্মী ও শ্রমিকদের ওই বাইক-বাহিনী সাফ জানায়, কাজ করতে হলে তাদের থেকে নির্মাণ সামগ্রী নিতে হবে। কিন্তু তাদের মালপত্রের মান মোটেই ভাল নয়। ঠিকাদার সংস্থার দাবি, পরের দিন শ্রমিকেরা কাজ শুরু করতে যেতেই ওই যুবকেরা এসে ধমক দিয়ে কাজ বন্ধ করে দেয়। তারা তৃণমূল কর্মী বলেই অভিযোগ ঠিকাদার সংস্থার। এর দিন তিনেক পরে আসানসোলের মেয়র জিতেন্দ্র তিওয়ারির হস্তক্ষেপে কাজ ফের শুরু হয়।

আর সল্টলেকে যে সিন্ডিকেট-জুলুমের কথা বলেছেন বিচারপতি, সেটি আসলে নিউটাউনের অ্যাকশন এরিয়া ৩ এলাকার ঘটনা বলে হিডকো সূত্রের দাবি। সেখানে তৈরি হচ্ছে জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমি। সিন্ডিকেটের হাত থেকে সেটিও রেহাই পায়নি বলে অভিযোগ। এমনিতে নিউটাউনে নির্মাণকাজ করতে হলে সেখানকার সিন্ডিকেটের থেকে নির্মাণ সামগ্রী নেওয়াটাই অলিখিত নিয়ম। হিডকোর জমিতে ওই অ্যাকাডেমি করছে পূর্ত দফতরের অধীন একটি ঠিকাদার সংস্থা। অভিযোগ, সিন্ডিকেটের থেকে নিম্নমানের ইমারতি দ্রব্য কিনতে চাপ দেওয়া হচ্ছে তাদের। তবে জুডিশিয়াল অ্যাকাডেমির নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি। স্থানীয় বিধায়ক তথা বিধাননগরের মেয়র সব্যসাচী দত্তর দাবি, ‘‘অ্যাকাডেমি নির্মাণে তেমন কোনও সমস্যা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। কেউ অভিযোগ করলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।’’

এই প্রসঙ্গে বিরোধী সব দলই একসুরে বিঁধেছে তৃণমূলকে। বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘‘প্রকৃত অর্থে জঙ্গলরাজ চলছে। তৃণমূল এখন মাফিয়া ও দুষ্কৃতীদের একত্রিত করেছে।’’

কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নানের কথায়, ‘‘তোলাবাজি ও সিন্ডিকেটের এমন রমরমা এ রাজ্যে আগে কেউ কখনও দেখেনি। মাঝে মাঝে লোক দেখানো হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পরে আবার আরাবুল ইসলামকে দলে ফিরিয়ে নিয়ে বুঝিয়ে দেন তাঁরাই দলের সম্পদ।’’ বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘দু’টি শিল্পই চলছে এখন— সিন্ডিকেট আর তোলা!’’

Calcutta High Court syndicate raj
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy