Advertisement
E-Paper

আমরা খুঁজে পেলাম, আর স্বাস্থ্যকর্তাই পাচ্ছেন না এই মায়েদের!

স্বাস্থ্য ভবনে বসে রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন, মেডিক্যাল কলেজের ওয়ার্মারে শিশুমৃত্যুর তদন্ত থমকে রয়েছে। কারণ মৃত দুই শিশুর মায়েদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! সুশান্তবাবুর কথায়, ‘‘এ বার বোধহয় পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজ শুরু করতে হবে। কারণ মায়েদের না-পাওয়া পর্যন্ত তদন্ত এগোবে না।’’

সোমা মুখোপাধ্যায় ও পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৪:১৯

সোমবার দুপুর সাড়ে তিনটে।

স্বাস্থ্য ভবনে বসে রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করলেন, মেডিক্যাল কলেজের ওয়ার্মারে শিশুমৃত্যুর তদন্ত থমকে রয়েছে। কারণ মৃত দুই শিশুর মায়েদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না! সুশান্তবাবুর কথায়, ‘‘এ বার বোধহয় পুলিশ পাঠিয়ে খোঁজ শুরু করতে হবে। কারণ মায়েদের না-পাওয়া পর্যন্ত তদন্ত এগোবে না।’’

সোমবার সন্ধে পৌনে ছ’টা।

মধ্য কলকাতার বেনিয়াপুকুর রোডে নিজের বাপের বাড়িতে বসে এক শিশুর মা, আফরিন খাতুন প্রায় আকাশ থেকে পড়লেন। ‘‘সে কী কথা! আমি কোথায় যাব? গত শুক্রবারই তো আরজিকর হাসপাতালে আমাদের ডেকে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে দু’ঘণ্টা ধরে স্বাস্থ্য-কর্তাদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়ে এলাম।’’

সোমবার দুপুর আড়াইটে।

সুশান্তবাবুর বক্তব্য জানার আগেই মৃত আর এক শিশুর বাবা অষ্টম বাগদিকে ফোন করা হয়েছিল। তিনি চাপা গলায় জবাব দেন, ‘‘আরজিকর-এ তদন্ত কমিটির সামনে বসে আছি।’’ আপনার স্ত্রী সোনম সঙ্গে আসেননি? অষ্টমবাবুর উত্তর, ‘‘সোনম খুব অসুস্থ। বাড়ি থেকে বেরোতে পারছে না। ঘরেই শুয়ে আছে।’’ অর্থাৎ তিনিও ‘নিখোঁজ’ নন!

সোমবার রাত সাড়ে আটটা।

উত্তরপাড়ার মাখলা সবুজ কলোনিতে বাপের বাড়িতে বসে সোনম বাগদি বলেন, ‘‘খুব অসুস্থ ছিলাম। মেডিক্যালে আবার ভর্তি হয়েছিলাম। পরশু বাড়ি ফিরেছি। এখন অপেক্ষায় আছি, কবে আমার ছেলের মৃত্যুর বিচার হয়।’’

তদন্ত কমিটির সামনে হাজির থাকার জন্য দিন কয়েক আগে এই দুই পরিবারের কাছেই স্বাস্থ্যসচিবের চিঠি পৌঁছেছিল। তা হলে স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা কেন এই মায়েদের ‘নিখোঁজ’ তকমা দিচ্ছেন? প্রশ্ন উঠছে, তবে কি এক সপ্তাহ যাবৎ স্বাস্থ্যভবনে যে কথাটা সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে, সেটাই ঠিক? অর্থাৎ যেনতেন প্রকারে ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে অভিযুক্তদের বাঁচিয়ে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চলছে?

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ওয়ার্মারে পুড়ে দুই শিশুর মৃত্যুর তদন্ত নিয়ে শুরু থেকেই নানা অভিযোগ উঠছে। ২৩ নভেম্বর তৈরি প্রথম তদন্ত কমিটিতে যাঁরা অভিযুক্ত তাঁরাই সদস্য ছিলেন। ২৭ নভেম্বর রিপোর্ট পেশের এক সপ্তাহের মধ্যে নজিরবিহীন ভাবে দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গড়া হয়। বলা হয়, সেই কমিটিও অতি দ্রুত রিপোর্ট পেশ করবে। কিন্তু তার পর ১২ দিন কেটে গিয়েছে। দফতরের শীর্ষ কর্তা এ দিন দাবি করেছেন, তদন্ত থমকে রয়েছে। কারণ মৃত শিশুর মায়েরা নাকি উধাও।

অথচ আনন্দবাজার কিন্তু সহজেই খুঁজে পেয়েছে মায়েদের।

তালতলায় ৮/৩, আব্দুল হালিম লেনে দেখা মিলল মৃত এক শিশুর দাদু-দিদা ও বাবার সঙ্গে। তাঁরাই জানালেন, মা আফরিন রয়েছেন এন্টালিতে বাপের বাড়িতে। তাঁরাই সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন সেখানে। সরু গলির এক চিলতে ঘরে খাটে শুয়ে ছিলেন আফরিন। শরীর ভাল নেই। ক্ষীণ কণ্ঠে জানালেন, গত বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য দফতরের চিঠি এসেছিল। সেই মতো তিনি তাঁর স্বামী ও শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে শুক্রবার আরজিকর-এ তদন্ত কমিটির সামনে হাজির হয়েছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘বোর্ডের সদস্যরা আমাকে একটা কাগজে সই করতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি বলি, যা বলার মৌখিক ভাবে জিজ্ঞাসা করুন। ওঁরা তাই করেছেন।’’ তদন্ত কবে শেষ হবে, কমিটিকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন আফরিন। তাঁর কথায়, কমিটি তাঁকে জানিয়েছিল, আর একটি শিশুর পরিবারে চিঠি পৌঁছতে দেরি হয়েছে। তাই কিছুটা সময় লাগছে।

এ দিন আনন্দবাজারের তরফে আফরিনকে জানানো হল, স্বাস্থ্য দফতর থেকে বলা হচ্ছে, মায়েদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে তদন্ত এগোচ্ছে না। শুনেই তাঁর মন্তব্য, ‘‘কোথাও একটা গোলমাল হচ্ছে, আমরা আঁচ পাচ্ছি।’’ কী রকম? আফরিন বলেন, ‘‘আমরা সে দিন ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে যাইনি। তাই ডাক্তারবাবুরা ওটা পাঠিয়ে দিতে বলেন। এ দিনই তো ডেথ সার্টিফিকেটের কপি পাঠিয়েছি। তার পরেও এমন কথা উঠছে কেন?’’

সোমবার সন্ধে সাড়ে ছ’টা।

তদন্ত কমিটির সামনে হাজিরা দিয়ে বেরিয়ে অন্য শিশুটির বাবা অষ্টম বাগদি জানালেন, প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে তাঁর সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তার পর পুরো ঘটনাটি লিখিত ভাবে জানাতে বলা হলে তিনি তা-ই করেছেন। অষ্টমবাবু জানান, গত শনিবার ১২ ডিসেম্বর তাঁরা স্বাস্থ্যসচিবের চিঠি হাতে পান। তাতে চিঠি পাঠানোর তারিখের জায়গায় ১৪ ডিসেম্বর লিখেও সেটা কেটে ১১ ডিসেম্বর লেখা ছিল। চিঠি পেয়ে তিনি স্বাস্থ্য দফতরে ফোন করেন। তাঁকে সোমবার আসতে বলা হয়। সেই মতোই এ দিন তিনি গিয়েছিলেন।

তা হলে তদন্ত শেষ হতে দেরি হওয়ার ‘আসল’ কারণটা কী? স্বাস্থ্য ভবনের কর্তাদের একাংশের দাবি, মেডিক্যালের সিক নিউবর্ন কেয়ার ইউনিটের (এসএনসিইউ) ইনচার্জ তাপস সাবুইকে আড়াল করার জন্য নানা ভাবে তদন্ত কমিটির সদস্যদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন মা ও শিশুমৃত্যু রোধে গঠিত টাস্ক ফোর্সের চেয়ারপার্সন ত্রিদিব বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু এখন অবস্থা পাল্টেছে। স্বাস্থ্য ভবনের এক কর্তার অভিযোগ, এ বার তাপসবাবুই ত্রিদিববাবুর ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছেন। তিনি যে রিপোর্ট স্বাস্থ্যসচিবকে জমা দেওয়ার জন্য তৈরি করেছিলেন, তাতে বলা ছিল, ত্রিদিববাবুর চাপেই তিনি পরিকাঠামো না-থাকা এসএনসিইউ-এর দায়িত্ব নিয়েছিলেন। অভিযোগ, এই রিপোর্টটিও ‘চাপতে’ চান ত্রিদিববাবু।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ত্রিদিববাবু বলেন, ‘‘এখন আবার এ সব বলা হচ্ছে নাকি? সাবুই আমার বিরুদ্ধে লিখেছে? আপনারা যা পারেন, লিখুন।’’

তাপস সাবুইয়ের মন্তব্য, ‘‘সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আমার কোনও কথা নেই।’’ ফের ফোন করা হল স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তাকে। প্রশ্ন করা হল, মায়েদের খোঁজ মিলেছে? সুশান্তবাবুর জবাব, ‘‘না, এ বার তো পুলিশের সাহায্য নিতে হবে। ভাবছি আমরা পুলিশের সঙ্গে কথা বলব।’’ কেন মায়েরা হঠাৎ আড়ালে চলে গেলেন বলে আপনার মনে হয়? চটজলদি জবাব এল, ‘‘বোধহয় ওঁরা বিষয়টায় ‘ইন্টারেস্ট’ হারিয়েছেন।’’

স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা কি জেনেশুনে ভুল বলছেন? নাকি দফতরে কোনও সমন্বয় না-থাকায় তদন্তের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না?

উত্তর মেলেনি।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy