সৌদি আরব থেকে মুর্শিদাবাদের বাড়িতে ফেরার পরের দিনেই মৃত যুবক জিনারুল হকের (৩৩) লালারসের নমুনায় করোনাভাইরাসের কোনও প্রমাণ মেলেনি বলে স্বাস্থ্য ভবন সোমবার জানিয়ে দিয়েছে। যদিও অতিদ্রুত নমুনা পরীক্ষা শেষ হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে। পরীক্ষাকারী সংস্থা নাইসেডের তরফে জানানো হয়েছে, প্রাণহানির ঘটনা বলেই ওই যুবকের লালারসের নমুনা আলাদা ভাবে দ্রুত পরীক্ষা করার ব্যবস্থা হয়েছিল।
নবগ্রামের বাসিন্দা জিনারুলকে জ্বর, সর্দি, শ্বাসকষ্টের লক্ষণ নিয়ে শনিবার রাতে মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছিল। পরের দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হওয়ায় অল্প হলেও উদ্বিগ্ন ছিলেন স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারা। উদ্বেগ নিরসনে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের জন্য করোনা-পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত কলকাতার নাইসেডে (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কলেরা অ্যান্ড এন্টেরিক ডিজ়িজ়েস) মৃতের লালারসের নমুনা পাঠানো হয়। এ দিন ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চের (আইসিএমআর) বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সোমবার ভোর ৩টে নাগাদ নমুনা পায় নাইসেড। নমুনা সংগ্রহের আড়াই ঘণ্টা পরে ‘রিয়েল টাইম পলিমিরেজ় চেন রিঅ্যাকশন’ পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট পরীক্ষা (‘নেগেটিভ ফর সার্স-সিওভি২ টেস্ট’) শেষে জানা গিয়েছে, ওই যুবকের দেহে করোনাভাইরাসের কোনও চিহ্ন নেই।
রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তী রবিবার জানিয়েছিলেন, জিনারুলের রক্তে শর্করার পরিমাণ ছিল ৫৫০ মিলিগ্রামের বেশি। ডায়াবেটিক কিটো অ্যাসিডোসিসের জেরে দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় তাঁর। সেটিই ওই যুবকের মৃত্যুর কারণ বলে স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের খবর। আইসিএমআরের বিজ্ঞপ্তিতেও ডায়াবেটিক কিটো অ্যাসিডোসিসের পাশাপাশি জিনারুলের শ্বাসনালিতে সংক্রমণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই যুবকের সংস্পর্শে আসায় যাঁদের মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ ও নবগ্রামে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল, তাঁদের এ দিন ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকায় ছিলে জিনারুলের চিকিৎসক, অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর কৌশিক ঘোষ এবং তাঁর দুই সঙ্গী জুনিয়র চিকিৎসক। জিনারুলের ভায়রাভাই রহমান শেখ এবং তাঁর বন্ধু মনোয়ার শেখকেও আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল। মৃতের পরিবারের বাকি ১২ জন নবগ্রাম ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যবেক্ষণে ছিলেন। সোমবার সকালে জিনারুলের দু’ভাই উৎপল শেখ ও সাজ্জাদ শেখকে নবগ্রাম ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁদের সকলকেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: জিনারুলের গ্রামে শোকের মধ্যেই স্বস্তি
প্রশ্ন উঠছে, মাত্র আড়াই ঘণ্টায় জিয়ারুলের লালারসের নমুনা পরীক্ষার কাজ শেষ হল কী ভাবে? স্বাস্থ্য আধিকারিকদের একাংশের বক্তব্য, আগে ওই যুবকের যে-নমুনা নাইসেডে পরীক্ষা করা হয়, তাতে তিন ঘণ্টা সময় লাগে। গত শনিবার একটি নমুনার রিপোর্টে দেখা যায়, পরীক্ষা শুরু হয়েছে বেলা ১২টা ২০ মিনিটে, শেষ হয়েছে বিকেল পৌনে ৪টেয়। ২৪ ঘণ্টা পরে রিপোর্ট আসার নজিরও আছে। সেই নিরিখেই আড়াই ঘণ্টায় জিয়ারুলের লালারসের নমুনা পরীক্ষা শেষ হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে। নাইসেডের ডিরেক্টর শান্তা দত্ত বলেন, ‘‘সাধারণত নমুনা পরীক্ষা করতে তিন ঘণ্টা লাগে। ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য দফতর দ্রুত পরীক্ষা করতে অনুরোধ করেছিল। আলাদা ভাবে নমুনা পরীক্ষার খরচ অনেক বেশি। সেই জন্য একসঙ্গে বেশ কয়েকটি নমুনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। ওই যুবকের মৃত্যু হওয়ায় তাঁর নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে পৃথক ভাবে।’’
বিমানবন্দরে নামার পরে বাস ও নৌকায় নবগ্রামের পলাশপুকুরের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন জিয়ারুল। স্বাস্থ্য অধিকর্তা অজয়বাবু বলেন, ‘‘যে-হেতু অনেকেই ওই যুবকের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাই দ্রুত তাঁদের চিহ্নিত করার দরকার ছিল। সেই জন্য দ্রুত ওঁর লালারসের নমুনা পরীক্ষা করতে অনুরোধ করেছিলাম। নাইসেড সেটা খুব ভাল ভাবেই করেছে।’’