তদন্তকারী অফিসারদের অনুমতি নিয়েই তল্লাশির সময় তিনি আইপ্যাক-এর কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে ঢুকেছিলেন বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি ইডি খারিজ করে দিল। সুপ্রিম কোর্টে ইডি-র দাবি, এর থেকে ‘বড় মাপের সত্যের অপলাপ’ আর কিছু হতে পারে না। আদালতে হলফনামা দিয়ে ইডি জানিয়েছে, তদন্তে হস্তক্ষেপ না করার জন্য ইডি-র অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর প্রশান্ত চান্ডিলা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সুস্পষ্ট ভাবে অনুরোধ করেছিলেন। তার পরেও মুখ্যমন্ত্রী ‘সমস্ত আইনকানুন ভেঙে’ প্রতীকের বাড়িতে ঢুকে ‘জোর করে’ যাবতীয় নথি ও ল্যাপটপ-মোবাইল নিয়ে গিয়েছিলেন। যে সমস্ত নথি, ল্যাপটপ-মোবাইল থেকে তদন্তের জন্য তথ্য উদ্ধার করা চলছিল, সে সবও তিনি নিয়ে যান।
ইডি-র বক্তব্য, কোনও রাজ্যে তল্লাশি চালানোর সময় স্থানীয় পুলিশকে জানানোর কোনও আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে প্রতীকের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশি শুরুর পরে শেক্সপিয়র সরণি থানা ও বিধাননগর পুলিশকে ই-মেল করে জানানো হয়েছিল। উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্তারা একে একে প্রতীকের বাড়িতে এলে তাঁদের ইডি অফিসাররা নিজেদের সচিত্র পরিচয়পত্র দেখিয়েছিলেন। কেন তল্লাশি, তা-ও জানানো হয়েছিল। কিন্তু রাজ্য প্রশাসন ‘আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার’ করে বলে হলফনামায় অভিযোগ করা হয়েছে। এ-ও দাবি করা হয়েছে, রাজ্যের পুলিশ কর্তারা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ব্যক্তিগত স্বার্থ’ রক্ষার জন্য ইডি-র কাজে বাধা দিয়েছিলেন। ইডি ও কলকাতা পুলিশ, দুই নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে ‘শারীরিক সংঘাত’ এড়াতে ইডি-র সামনে তল্লাশি গুটিয়ে ফেলা ছাড়া আর কোনও বিকল্প ছিল না। এই যুক্তিতেই প্রতীক জৈনের বাড়ি, দফতরে তল্লাশির সময় রাজ্য পুলিশ-প্রশাসনের বাধা ও হস্তক্ষেপের ঘটনায় সিবিআই তদন্ত দাবি করেছে ইডি।
সুপ্রিম কোর্টে ইডি-র যুক্তি, রাজ্যের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক ভাবে ‘গুরুতর অপরাধ’-এর মামলা দাঁড়াচ্ছে। যেহেতু রাজ্যের প্রশাসন ও রাজ্যের পুলিশের সর্বোচ্চ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাই রাজ্য পুলিশ নিরপেক্ষ তদন্ত করবে বলে বিশ্বাস করা যায় না। তাই এই ঘটনায় এফআইআর দায়ের করে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হোক।
গত ৮ জানুয়ারি প্রতীক জৈনের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশির সময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তথা রাজ্যের পুলিশ কর্তাদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে ইডি সুপ্রিম কোর্টে এসেছিল। মামলায় রাজ্য সরকারের সঙ্গে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার, কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা, ডিসি (সাউথ) প্রিয়ব্রত রায়কেও অংশীদার করা হয়েছে। ইডি-র অভিযোগ ও সিবিআই তদন্তের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য সরকার, মুখ্যমন্ত্রী ও পুলিশ কর্তাদের বক্তব্য জানতে চেয়েছিল। তার ভিত্তিতে ইডি-র পাল্টা বক্তব্য বা ‘রিজয়েন্ডার’ জমা দেওয়ার কথা ছিল। আজ সুপ্রিম কোর্টে শুনানির আগে ইডি এই ‘রিজয়েন্ডার’ জমা দিতে পারেনি। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, হোলির ছুটির পরে ১৮ মার্চ শুনানি হবে।
ইডি-র হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা সুপ্রিম কোর্টে জানিয়েছিলেন, বুধবারই ইডি নিজেদের পাল্টা বক্তব্য জমা দেবে। তারপরেই ৬৫ পৃষ্ঠার এই ‘রিজয়েন্ডার’ জমা পড়েছে। সেখানেই ইডি মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইন-কানুন ভাঙার অভিযোগ তুলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হলফনামায় বলা ছিল, তিনি ইডি-কে বিনীত অনুরোধ করে প্রতীকের বাড়িতে ঢোকেন। তাঁকে ইডি-ই অনুমতি দিয়েছিল। ইডি পাল্টা জানিয়েছে, মমতাকে ইডি অনুরোধ করেছিল তদন্তে বাধা না দিতে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে তাঁর হলফনামায় দাবি করেছেন, তিনি প্রতীকের ঠিকানা থেকে যে সব নথি নিয়ে গিয়েছিলেন, সে সব তৃণমূলের গোপন রাজনৈতিক তথ্য। কারণ আইপ্যাক তৃণমূলের ভোটকুশলী সংস্থা হিসেবে কাজ করে। ইডি এই যুক্তি খারিজ করে পাল্টা জবাবে জানিয়েছে, একবার সমস্ত নথি নিয়ে চলে যাওয়ার পরে নির্ধারণ করা মুশকিল তার মধ্যে রাজনৈতিক তথ্য ছিল, না কি কয়লা পাচারের তদন্তের সঙ্গে জড়িত তথ্যও ছিল। এই কারণেই রাজ্যের পদাধিকারীদের আইন ভাঙার বিরুদ্ধে ‘যথোচিত আইনানুগ ব্যবস্থা’ প্রয়োজন বলে ইডি যুক্তি দিয়েছে। ইডি-র দাবি, ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক বা ‘ইন্ডিয়ান পলিটিকাল অ্যাকশন কমিটি’-র বিরুদ্ধে তল্লাশি হয়নি। তল্লাশির পরোয়ানা ছিল ইন্ডিয়ান-প্যাক কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেড নামক সংস্থার নামে। এই সংস্থায় কয়লা পাচারের টাকা গিয়েছিল।
রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে যুক্তি দিয়েছিল, ইডি-র সুপ্রিম কোর্টে মামলা ধোপেই টেকে না। কারণ, ইডি নিজের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছে। ইডি যুক্তি দিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট ইতিমধ্যেই এই মামলা খতিয়ে দেখতে রাজি হয়েছে। ইডি এখানে দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অভিভাবক হিসেবে সুপ্রিম কোর্টে এসেছে। ইডি-র তদন্তকারী অফিসারদের অধিকারেও হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। তাঁরাও মামলা করেছেন। আজ সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় রাজ্য প্রশাসনের আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি বলেন, ‘‘ইডি-র মামলা আদৌ ধোপে টেকে কি না, সেই প্রশ্নের এখনও ফয়সালা হয়নি।’’ রাজ্য প্রশাসনের আইনজীবী সিদ্ধার্থ লুথরা অভিযোগ তোলেন, ইডি-কে পশ্চিমবঙ্গে ‘অস্ত্র’ হিসেবে কাজে লাগানো হচ্ছে। ইডি-র হয়ে এএসজি এস ভি রাজু বলেন, ইডি-কে ‘আতঙ্কিত’ করে ফেলা হয়েছে।
ইডি শুনানির আগে ‘রিজয়েন্ডার’ জমা না দেওয়ায় ( এবং শুনানি পিছিয়ে যাওয়ায়) আদালতের বাইরে তৃণমূলের আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তখন বলেছিলেন, ‘‘আমরা তৈরি ছিলাম। ইডি রিজয়েন্ডার-এর জন্য সময় চাইল। আমরা বলেছিলাম, ইডি এই মামলা করতে পারে না। সে দিন (১৮ মার্চ) মামলার গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও শোনা হবে।’’ তাঁর মন্তব্য, ‘‘ওরা সিরিয়াস হলে আজ দিল না কেন রিজয়েন্ডার?’’ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর পাল্টা বক্তব্য, ‘‘আমি ইডি-র মুখপাত্র নই। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, পুলিশ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে চলে যাওয়ার পরে তদন্ত করতে চাইছে।’’ সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর মন্তব্য, ‘‘দিল্লির প্রভুরা কি বলে দিয়েছেন, এই মামলাকে গুরুত্ব দিও না? কারণ, তৃণমূলের সঙ্গে বোঝাপড়া আছে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)