নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টেই মেলে যে কোনও সরকারি আর্থিক সুবিধা। বহু মানুষের অ্যাকাউন্ট থাকে পোস্ট অফিসে। অনেকে করিয়ে রাখেন লাইফ ইনশিয়োরেন্স কর্পোরেশনের জীবন বিমাও। তেমন কোনও গ্রাহকের মৃত্যু হলে ব্যাঙ্ক-ডাকঘর-বিমায় মৃত্যুর শংসাপত্র জমা দিতে হয়। প্রকৃত মৃত ব্যক্তির তথ্য পেতে সে সব জায়গায় দাখিল হওয়া তেমন শংসাপত্রও কমিশনের কাছে এখন অন্যতম হাতিয়ার। কারণ, সংশোধিত ভোটার তালিকায় মৃতদের খুঁজে বার করার কাজে জেলা প্রশাসনের সমান্তরালে মৃত ভোটার খুঁজবে কমিশনের দলও। রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নির্বাচনী আধিকারিকদের একাংশ শ্মশান, সমাধিস্থল, পঞ্চায়েত-পুরসভা বা হাসপাতাল থেকে নথিবদ্ধ মৃত্যুর শংসাপত্র সংগ্রহ করে মৃতদের খোঁজার কাজ কতটা করতে পারবেন, তা নিয়ে নিশ্চিত নয় কমিশনের একাংশ। সে কারণে এই সিদ্ধান্ত।
নিয়ম অনুয়ায়ী, মূল অ্যাকাউন্টধারীর মৃত্যু হলে ব্যাঙ্ক বা ডাকঘরে সেই তথ্য জানাতে হয় সেই পরিবারকে। মৃত্যুর শংসাপত্র দাখিল হওয়ার পরেই সেই অ্যাকাউন্ট চলে যায় নিকটাত্মীয় ‘নমিনি’-র নামে। ফলে যৎসামান্য অর্থ থাকলেও, অ্যাকাউন্ট রক্ষার স্বার্থেই নিয়মটি মান্যতা পায়। আবার কেন্দ্র বা রাজ্যের যে কোনও আর্থিক সুবিধা সরাসরি উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যাওয়ায়, গ্রাহক-সংখ্যা এবং অ্যাকাউন্টের গুরুত্ব বেড়েছে সমান্তরালে। একই কথা ডাকঘরগুলির ক্ষেত্রেও। কারও মৃত্যুর পর ‘নমিনি’র এলআইসি-র টাকা পেতেও লাগে শংসাপত্র। এই ব্যবস্থাগুলি অনলাইন পরিচালিত হওয়ায়, এমন মৃত ব্যক্তিদের শংসাপত্র জোগাড় করা সহজ। এক কর্তার কথায়, “অ্যাকাউন্টের উপর নজরদারি কখনওই নয়, শুধুমাত্র সেখানে জমা পড়া মৃত ব্যক্তির শংসাপত্রই দেখা হবে। এমন জায়গাগুলিতে ভুয়ো তথ্য দাখিল হয় না সাধারণত।”
যদিও অনেক গ্রাহকেরই প্রশ্ন, মৃত্যুর শংসাপত্র দেখার নামে অ্যাকাউন্টে নজরদারি হবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? বা এই পথ ধরে অন্য কেউ প্রতারণার সুযোগ পেয়ে যাবে না তো? গ্রাহকের তথ্য সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই যে ভাবে বাইরে চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে নিশ্চিন্ত থাকার সুযোগ সত্যিই কি আছে? সংবিধানের ধারা অনুযায়ী, বৈধ ভোটাররাই শুধু ভোট দিতে পারবেন এবং কমিশনকে তা নিশ্চিত করতে হবে ঠিকই। কিন্তু নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য রক্ষার দায়-দায়িত্ব কোথায় গেল? আধার-প্যান-ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংযোগের পর আধারকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার পথ যে খুলে গিয়েছে সে তো বাস্তব অভিজ্ঞতা। কমিশন সূত্রের বক্তব্য, ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ অনলাইন ব্যবস্থা দেখতে দেবেন না। কত জন মৃত ব্যক্তি রয়েছেন তা শুধু জানাবেন। একই ভাবে ডাকঘর এবং বিমা সংস্থাও তা জানাবে।
শুরুতেই কমিশন প্রত্যেক জেলা প্রশাসনকে জানিয়েছিল, তাদের মূল লক্ষ্য— এখনকার তালিকায় থাকা মৃত, ভিন্ন ঠিকানায় একই ব্যক্তি, অনুপস্থিত ও ভূতুড়ে ভোটারদের খুঁজে বার করা। কমিশন সূত্রের দাবি, মৃত্যুহারের সঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার সংখ্যার মিল নেই। তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে এনুমারেশন ফর্ম বিলির সময়েও। এখনকার ভোটার তালিকায় থাকা বহু নামে ছাপা ফর্ম হাতে নিয়েই সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলি জানিয়ে দিয়েছে, তাঁদের মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই। এমনকি, ২০০২ সালে এসআইআরের পরে কারও মৃত্যু হলেও, তিনি থেকে গিয়েছেন ভোটার তালিকায়। এই পরিস্থিতির জন্য নির্বাচনের কাজে যুক্ত আধিকারিকদের একাংশের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। আবার পরিবার ছাড়াও এই তথ্য দেওয়ার কথা এলাকার রাজনৈতিক দলের বুথ লেভেল এজেন্টেরও। ঘটনাক্রম প্রমাণ করছে, তাঁরাও অনেক ক্ষেত্রে ছিলেন নীরব। যদিও প্রশ্ন ওঠে, নিয়মিত তালিকা থেকে মৃত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নির্বাচন কমিশন চালায়, এবং নির্ধারিত ফর্ম পূরণ করে নাগরিকেরা সেই তথ্য জানান না এমনও নয়। তা হলে মৃত ব্যক্তিদের নাম থাকার দায় এখন কমিশন এড়ায় কী করে?
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)