Advertisement
E-Paper

‘ক্ষমা নয়’, শাস্তি হলেই স্বস্তি

স্বামীর খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্তদের জামিনের আর্জি খারিজ করে দিয়েছে সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। নিম্ন আদালতের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ই বহাল রাখল নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। বোলপুরের মুলুক গ্রামে সে খবর পৌঁছতেই স্বস্তি ফিরল নিহতের পরিবারে। বোলপুর থানার মুলুক গ্রামে ১৯৮৭ সালের ১৯ নভেম্বর সিপিএম দুষ্কৃতীরা ৪ নকশালপন্থী কর্মীকে বিনা প্ররোচনায় হত্যা করে বলে অভিযোগ।

মহেন্দ্র জেনা

শেষ আপডেট: ১০ জুলাই ২০১৫ ০০:৫৪
মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সে দিনের কথা বলছেন আশালতাদেবী। ছবি: বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী

মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে সে দিনের কথা বলছেন আশালতাদেবী। ছবি: বিশ্বজিৎ রায়চৌধুরী

স্বামীর খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্তদের জামিনের আর্জি খারিজ করে দিয়েছে সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ। নিম্ন আদালতের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায়ই বহাল রাখল নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি। বোলপুরের মুলুক গ্রামে সে খবর পৌঁছতেই স্বস্তি ফিরল নিহতের পরিবারে।
বোলপুর থানার মুলুক গ্রামে ১৯৮৭ সালের ১৯ নভেম্বর সিপিএম দুষ্কৃতীরা ৪ নকশালপন্থী কর্মীকে বিনা প্ররোচনায় হত্যা করে বলে অভিযোগ। খুন হয়েছিলেন, শেখ জিয়াউদ্দিন(৪০), শেখ বুড়ো (২৮), সুধীর ঘোষ(৬৩) ও নির্মল ঘোষ (২৮)। নিহতদের মধ্যে সুধীর ঘোষ ও নির্মল ঘোষ, বাবা-ছেলে। এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে ২১ নভেম্বর বোলপুরে বন্ধ সর্বাত্মক পালিত হয়। রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদে সরব হন মানুষ এবং হয় প্রতিবাদ সভাও। সেই মামলার অভিযোগকারী মুলুক গ্রামের আদর্শ পল্লির বাসিন্দা মধুসূদন ঘোষ। তিনি তাঁরই বাড়ির সামনে খুন চার জন খুন হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করেছিলেন।
খুনের ঘটনায় গ্রামের এবং আশেপাশের সিপিএম কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে বোলপুর থানায় লিখিত অভিযোগ হয়। এলাকার নকশাল নেতা তথা জেলা সভাপতি শৈলেন মিশ্র বলেন, “নিহতরা চারজন আমাদের দলের কর্মী ছিলেন। বিরোধী রাজনীতি করার অপরাধে সিপিএম দুষ্কৃতীরা তাঁদেরকে হত্যা করে। নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত ব্যাক্তিরা অনেকেই ২০১১ সালে শাসক দল তৃণমূলে ভিড়ে যায়। আসলে দুষ্কৃতীরা শাসক দলে থাকতেই পছন্দ করে।’’

কী হয়েছিল প্রায় পঁচিশ বছর আগে খুনের দিন?

নিহত সুধীর ঘোষের স্ত্রী আশালতা ঘোষ এবং নিহতের মেয়ে সন্তোষী ঘোষ রায়ের কথা শুনেছিলেন এলাকায়। মুলুক আদর্শপল্লির ঘোষপাড়ার বাসিন্দা আশালতাদেবী ঘটনার দিনের কথা উঠতেই কেঁদে ফেলেন। চোখের জল মুছতে মুছতে তিনি বলেন, ‘‘কি ভাবে ভুলব ওই অভিশপ্ত সকালের কথা। পাশের পাড়া থেকে মেয়ে জামাইয়ের বাড়িতে চা খাবে বলে সকালে বেরিয়েছিল। তার পর যা দৃশ্য দেখলাম, নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারিনি। কি হয়েছে জানতে চেয়ে বড় ছেলে নির্মল এসেও আর ফিরল না।”

মেয়ে সন্তোষীদেবী বলেন, ‘‘আমার আর মায়ের বুকে যেন কেউ বিরাট পাথর চাপা দিল। তেমনটাই মনে হয়েছে। চোখের সামনে আমার বাবাকে ওরা কুপিয়ে কুপিয়ে মারছে। আদর্শ পল্লি ঘোষ পাড়ার ফুটবল মাঠ এলাকায় একটি নালার কাছে ফেলে দিয়ে যায়। বাবাকে উদ্ধার করতে গিয়ে দাদাকেও ওরা নির্মম ভাবে মারল। এত নিষ্ঠুর যে এক বারের জন্যও গ্রামের প্রায় একই পাড়ার চার চার জনকে কুপিয়ে খুন করতে এক বারের জন্যও হাত কাঁপল না।” সন্তোষীদেবী জানান, তাঁকেও টাঙ্গি বল্লম নিয়ে খুনের জন্য দোষীরা ছুটে আসে। কোনও মতে দৌড়ে গিয়ে থানায় খবর দেন তিনি। তখনও তাঁর দাদা বেঁচে রয়েছেন। সন্তোষীদেবীর কথার মাঝেই আশালতাদেবী বলেন, “সে দৃশ্য দেখা না বাবা! মুখে ১৪ বার কোপানো হয়েছে। মুখটাই চেনা যাচ্ছিল না। কিছু পরেই কেঁপে কেঁপে দেহটা নিথর হল। বাবার দেহের কিছুটা দূরে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ছেলে। জল পর্যন্ত দেওয়ার সাহস হল না। যারা খুন করল, তাদের আজও ক্ষমা করিনি। ক্ষমা নয়। নিরপরাধ মানুষগুলোকে কী ভাবেই না খুন করল!’’ তাঁর কথায়, ‘‘ সে দিন থানায় খবর দেওয়ার পুুলিশ এলো ঠিকই। দেহ তুলে নিয়ে গেল। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হল না! ছেলেটাও চলে গেল।’’ প্রায় পঁচিশ বছর ধরে ওই স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন মা-মেয়ে। সন্তোষীদেবী বলেন, ‘‘নিম্ন আদালতে রায় হয়েছিল যাবজ্জীবনের। ঘটনার পর অনেকেই মারা গিয়েছেন। শুনছি, কলকাতা হাইকোর্টে গিয়েছিল। ওখানকার বিচারপতিরাও নিম্ন আদালতের রায় পুনর্বহাল রেখেছেন। এতে স্বস্তি তো মিলছেই। খুনিদের আবার ক্ষমা কেন?”

মুলুকের শহিদবেদী।

ঘটনার ২১ বছর পর সাক্ষ্যদান শুরু হয়। ওই সময়ে আবার নানা রকমের প্রলোভন, হুমকি দেও্যা হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে সিউড়ি জেলা জজ কোর্টে চার্জ গঠন হয়। বিচার শেষ হতে লাগে ২২ বছর। ২০০৯ সালের ৩১ মার্চ জেলা জজ দীপক সাহা রায়ের আদালত ৪৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেন। তারপরই জামিন হয়ে যায়। জেলে থাকতে থাকতে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চে আবেদন করে সাজা প্রাপ্ত দোষীরা। সেই মামলায় ৬/৭/২০১৫ তারিখে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের বিচারপতি নাদিরা পাথেরিয়া ও ইন্দ্রজিৎ চট্টোপাধ্যায় জেলা জজের রায়কে পুনর্বহাল রাখেন। আসামিদের জামিন খারিজ করে দেন। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সকল সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে জীবিতদের সিউড়ি সিজেএম আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথা তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হবে। শুধু তাই নয়, নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশও দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।

শৈলেন মিশ্র বলেন, “১৪ মাসের মধ্যে কলকাতা হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বাড়ি ফেরেন অভিযুক্তরা। তবে বিচার বিলম্ব হলেও, আমরা সুবিচার পেলাম। যে ডিভিশন বেঞ্চ নিহত পরিবারের লোকদের দু’লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।”

সিপিএমের বোলপুর জোনাল কমিটির সম্পাদক উৎপল রুদ্র বলেন, ‘‘কেউ কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। যেহেতু দলে এখনও কেউ কেউ রয়েছেন, তাঁদেরকে আমরা বলেছি, যে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা দেবে দল।’’

সিপিএমের প্রাক্তন উপপ্রধান তথা এই মামলার অন্যতম দোষী সব্যস্ত ব্যক্তি সেখ আখতার বলেন, ‘‘সুবিচার পাওয়ার জন্য আমরা উচ্চ আদালতে যাব। সে নিয়ে তৈরি হচ্ছি।’’

life term no mercy nazalite murder muluk murder bolpur village bolpur murder
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy