সেতুর নির্মাণকাজের জন্য দ্রুত আবাসন খালি করতে হবে। সরকারি আবাসনের গেটে এই মর্মে কাগজ সেঁটে দেওয়া হয়েছে। তার নীচে লেখা, ‘আদেশানুসারে: কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ বা কেএমডিএ। অথচ, তাদের নামে যে এমন কাগজ সাঁটা হয়েছে, জানেই না কেএমডিএ। এমন কোনও বিজ্ঞপ্তিই তাঁরা দেননি বলে দাবি কেএমডিএ-র শীর্ষ কর্তাদের। ই এম বাইপাস লাগোয়া আনন্দপুরের ‘পুবালি’ আবাসনের এই ঘটনায় চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে রীতিমতো ক্ষুব্ধ সেখানকার বাসিন্দাদের প্রশ্ন, তা হলে এমন ফরমান দিচ্ছে কারা? কী উদ্দেশ্যেই বা ওই কাগজ লাগানো হল? উত্তর মিলছে না। এর পিছনে অন্য রকম চক্রান্তের ইঙ্গিত পাচ্ছেন ওই আবাসনের বাসিন্দারা। তাঁদের জোর করে তুলে দিতে প্রোমোটিং-চক্র সক্রিয় হয়েছে বলেও মনে করছেন তাঁরা।
বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালের পাশের রাস্তা ধরে আনন্দপুরের দিকে যাওয়ার পথে ডান দিকে রয়েছে পুরনো এই সরকারি আবাসন। এই ঘটনা সম্পর্কে কেএমডিএ-র এক শীর্ষ কর্তার মন্তব্য, ‘‘কেএমডিএ কোনও নোটিস দিলে তাতে তারিখ লেখা থাকে। যোগাযোগের ফোন নম্বরও দেওয়া থাকে। কিন্তু এই কাগজে তার কিছুই নেই। এমন কোনও বিজ্ঞপ্তি কেএমডিএ দেয়নি।’’ তিনি জানান, বাইপাস থেকে ওই এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের পাশের রাস্তায় আনন্দপুর থানার দিকে যাওয়ার পথে যে ছোট সেতু পেরোতে হয়, সেটি দিয়ে উভয় দিকে যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। তাই ওই সেতুর পাশে আর একটি সেতু তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু যেখানে সেতু তৈরি হওয়ার কথা, সেখান থেকে পুবালি আবাসনের দূরত্ব অনেক। মাঝে রয়েছে একটি বাস স্ট্যান্ড, মন্দির, একাধিক দোকান। ফলে, সেতুর জন্য সরকারি আবাসন তুলে দেওয়ার বা খালি করানোর কোনও প্রশ্নই নেই বলে কেএমডিএ-র দাবি। কেএমডিএ-র আর এক কর্তার মন্তব্য, ‘‘ওই এলাকার কিছু দোকান ও ঝুপড়ি সরাতে হতে পারে। শুধু সেখানকার কয়েক জনের সঙ্গেই কথা বলা হচ্ছে। সেতু তৈরির বিষয়টিকে সামনে রেখে অন্য কোনও স্বার্থসিদ্ধির চেষ্টাও হতে পারে এটা।’’
কসবায় ‘ইস্ট ক্যালকাটা টাউনশিপ প্রজেক্ট’-এর অধীনে পুবালি আবাসনটি তৈরি হয় বছর পঁয়ত্রিশ আগে। আবাসন দফতরে আবেদনের ভিত্তিতে সেখানে ভাড়ার ফ্ল্যাটে থাকার সুযোগ পাওয়া যায়। ‘পুবালি আবাসন টেন্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন’ সূত্রে জানা গিয়েছে, ৩২০ বর্গফুটের মোট ১০৬টি ফ্ল্যাট রয়েছে সেখানে। বর্তমানে ৬০ থেকে ৬৫টি ফ্ল্যাটে লোকজন থাকেন। ‘পুবালি আবাসন টেন্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন’-এর সেক্রেটারি শুভাশিস ভট্টাচার্যের মন্তব্য, ‘‘কেন এমন কাগজ সাঁটা হয়েছে, বুঝতে পারছি না। অতীতে এই আবাসন ফাঁকা করাতে বহু চেষ্টা হয়েছে। এখনও এই আবাসনে পুরসভার জলের সংযোগ দেওয়া হয়নি। তেমনই কোনও চক্রান্ত চলছে কিনা, জানি না।’’ ওই চত্বরেরই আর এক বাসিন্দার দাবি, ‘‘এই অঞ্চলের নির্মাণ ব্যবসার রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে প্রায়ই গন্ডগোল হয়। অতীতে বোমাবাজি হয়েছে এবং গুলিও চলেছে। এলাকার একাধিক বহুতলে ঘুরপথে বহু লোকের টাকা খাটে। তিন একর জায়গায় থাকা এই আবাসন ভেঙে দিয়ে সেখানে বহুতল তুলতে পারলে অনেকেরই লাভ।’’ শাসকদলের স্থানীয় নেতাদের গোষ্ঠী সংঘর্ষের চিত্র তুলে ধরে আর এক বাসিন্দার মন্তব্য, ‘‘ভোটের আগে অনেক রকম স্বার্থ চরিতার্থ করতে এমন নোটিস সাঁটা হয়ে থাকতে পারে। নেতা-দাদারাই লোক দিয়ে এমন নোটিস ঝুলিয়ে থাকতে পারেন। অতীতে এই নেতা-দাদাদের মুখেই শোনা গিয়েছিল, সরকারি আবাসন তুলে দিয়ে সেখানে হস্টেল ও বৃদ্ধাশ্রম তৈরির ইচ্ছের কথা।’’
এলাকাটি কলকাতা পুরসভার ১০৮ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানকার পুরপ্রতিনিধি সুশান্ত ঘোষ যদিও বলেন, ‘‘সেতুর জন্য আবাসন ফাঁকা করানোর প্রশ্নই নেই। বিরোধীরা গন্ডগোল করে থাকতে পারে। কারা এমন কাগজ লাগাল, খোঁজ নিচ্ছি।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)