Advertisement
E-Paper

‘স্কুটি নিয়ে হাঁটছিলাম, গাড়িটা এসে মারল’

‘‘স্কুটিটা তখন চলছিলও না। হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম রাস্তার এ-পার থেকে ও-পারে। আচমকা পিছন থেকে ধাক্কা! আর কিছু মনে নেই। চোখ খুলে দেখি, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি।’’— বুধবার রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানের বি-৬৯ নম্বর শয্যায় বসে বলছিলেন রামভরত যাদব।

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০০:১৬
হাসপাতালের শয্যায় রামভরত যাদব। বুধবার। —নিজস্ব চিত্র।

হাসপাতালের শয্যায় রামভরত যাদব। বুধবার। —নিজস্ব চিত্র।

‘‘স্কুটিটা তখন চলছিলও না। হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম রাস্তার এ-পার থেকে ও-পারে। আচমকা পিছন থেকে ধাক্কা! আর কিছু মনে নেই। চোখ খুলে দেখি, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি।’’— বুধবার রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানের বি-৬৯ নম্বর শয্যায় বসে বলছিলেন রামভরত যাদব। শনিবার রাতে হাজরা রোডের দুর্ঘটনার সময়ে স্কুটির আরোহী ছিলেন তিনি। যে দুর্ঘটনায় অভিজিৎ পাণ্ডে নামে এক যুবকের মৃত্যু এবং মিথিলেশ রায় নামে আরও এক যুবকের মৃত্যুর ভুয়ো খবরে রবিবার তাণ্ডব চলে পণ্ডিতিয়ার অভিজাত আবাসনে।

২২ বছরের রাম জানান, শনিবার রাতে অভিজিৎ ও মিথিলেশের সঙ্গে স্কুটিতে করে হাজরা রোড ধরে যাচ্ছিলেন তিনি। প্যারামাউন্ট নার্সিংহোমের সামনে মিথিলেশের পরিচিত এক ব্যক্তির সঙ্গে হঠাৎ দেখা হওয়ায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলেন তাঁরা। ওই পরিচিতের নাম তিনি জানেন না বলে দাবি করেছেন রাম। প্রসঙ্গত, ওখানকারই বেনেপাড়া এলাকার বাসিন্দা সমীর প্রসাদ মঙ্গলবার দাবি করেছিলেন, অভিজিৎ, মিথিলেশ ও রাম স্কুটি দাঁড় করিয়ে কথা বলেছিলেন তাঁর সঙ্গে। রামের দাবি, ওই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে স্কুটি নিয়ে হেঁটেই এগোচ্ছিলেন তাঁরা। তখনই আচমকা ধাক্কা মারে মার্সিডিজ!

রামের আরও জোরালো দাবি, ঘটনার সময়ে অভিজিৎ ও মিথিলেশের মাথায় হেলমেট ছিল। তাঁরও ছিল, তবে মাথায় নয়। গরম লাগছিল বলে খুলে হাতে রেখেছিলেন তিনি। ‘‘ওরা বরং আমায় বলছিল, হেলমেটটা পরে নিতে। বলছিল, পুলিশ ধরলে কেস দেবে। আমিই ওদের কথা না শুনে হেলমেট হাতে রেখেছিলাম। ওরা কিন্তু পরেই ছিল।’’ গাড়ির ধাক্কার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত কোনও হর্নের শব্দ ছিল না বলেও দাবি করেছেন রাম। ছিল না দ্রুত গতিতে গাড়ি ছুটে আসার শব্দও। ফলে সাবধান হওয়ার বা সরে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ তাঁরা পাননি। রাম বলেন, ‘‘রাস্তার মাঝখানেও পৌঁছইনি তখন, এক পাশেই ছিলাম আমরা। সবে স্কুটির চাকা গড়াতে শুরু করতেই গাড়িটা এসে মেরে দিল!’’

এর পরে আর কিছুই মনে করতে পারেন না রাম। চোখ খুলে দেখেন পরিবারের লোকদের। ‘‘বাঁ কাঁধে, পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। মাথাটা পাথরের মতো ভারী লাগছিল। নাকে নল গোঁজা, হাতেও স্যালাইন। পাশের বেডে তখন মিথিলেশ শুয়ে। অভিজিৎকে দেখতে পাইনি, শুনলাম ও আইসিইউ-তে আছে।’’ — বললেন রাম। অভিজিৎ যে মারা গিয়েছেন, সে কথাও এ দিনই সকালে জেনেছেন। প্রিয় বন্ধুর মৃত্যুসংবাদ এত দিন গোপন রাখা হয়েছিল তাঁর কাছে। এ দিন মিথিলেশ চান, অভিজিতের মৃত্যুর যেন সুবিচার হয়।

ঘটনার কথা বলতে গিয়ে এখনও আতঙ্কে চোখ বুজে ফেলছেন। আর সব চেয়ে কষ্ট পাচ্ছেন অভিজিতের প্রসঙ্গ উঠলে। ছোটবেলা থেকে একই স্কুলে পড়েছেন রাম ও অভিজিৎ। একই সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ কলেজে ভর্তিও হয়েছিলেন। তবে কিছু দিন পরে রাম কলেজ ছেড়ে দেন। বিভিন্ন সংস্থার হয়ে ছোট ছোট বিজ্ঞাপনী ইভেন্ট গঠনের কাজ শুরু করেন তিনি। মিথিলেশও তাঁদের বহু দিনের বন্ধু। ছোটবেলা থেকেই পরস্পরের বিপদে-আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তেন তাঁরা।

শনিবারও ছিল এমনই এক বিপদের দিন। রাম জানালেন, তাঁর দেড় বছরের ভাইঝি সালোনি যাদবের ডেঙ্গি ধরা পড়ে কিছু দিন আগেই। শনিবার খুব বাড়াবাড়ি হয়। মতিলাল নেহরু রোডের বস্তি থেকে ভাইঝিকে ল্যান্সডাউনের রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করেন রাম। বললেন, ‘‘বাচ্চাটার জ্বর নামছিল না। হাসপাতাল থেকে বলল রাতে ওখানে থাকতে। তখনই আমি খবর দিই অভিজিৎ আর মিথিলেশকে। পণ্ডিতিয়া রোড থেকে স্কুটিতে করে নিয়েও আসি ওদের। ভেবেছিলাম, রাতে একসঙ্গে থাকব হাসপাতালে।’’

রামের বক্তব্য, তাঁরা তিন জন হাসপাতালে ফেরার পরে খরচের হিসেব দেন কর্তৃপক্ষ। শুনে তাঁদের মনে হয়, ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে খরচ কম কি না খোঁজ নেওয়া যেতে পারে। স্কুটিতেই যান তিন জন। সেখানে একটি বেডে পাঁচটি করে বাচ্চাকে অ্যাডমিট করা হচ্ছে শুনে ল্যান্সডাউনের হাসপাতালেই ফিরে আসবেন বলে ঠিক করেন তাঁরা। ‘‘তখন প্রায় দু’টো বেজে গিয়েছিল। এক কাপ করে চা খেয়ে ফিরছিলাম। ফেরার পথেই তো...।’’— কথা শেষ করতে পারেন না রাম।

তবে দুর্ঘটনার পরে রবিবার সকালে পণ্ডিতিয়ার ফোর্ট ওয়েসিস আবাসনে ভাঙচুরের বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না বলেই দাবি রামের পরিবারের। উল্টে তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ বাড়ির অন্য একটি ছেলেকেও ধরে নিয়ে গিয়েছে। রামের মাসি ইন্দ্রাবতী দেবী জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ১৯ বছরের ছেলে অমৃতলালকে নিয়ে রবিবার সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ রিষড়া থেকে কলকাতায় পৌঁছন তিনি। ‘‘যখন ভাঙচুর হয়েছে, তখন আমরা পৌঁছইনি। বিকেলে অভিজিতের সঙ্গে শ্মশানে গিয়েছিল অমৃত। ওখান থেকেই ওকে গ্রেফতার করে পুলিশ।’’ — অভিযোগ ইন্দ্রাবতী দেবীর।

রামের দিদি বিদ্যালক্ষ্মীও জানান, সকালে তাঁরা ভাঙচুরের খবর পান। শুনেছিলেন, গাড়িটি ওই আবাসনের, তাই আশপাশের বস্তির বাসিন্দারা চড়াও হয়েছেন সেখানে। তবে তাঁদের বস্তি থেকে কেউ ওই আবাসনে যাননি বলেই দাবি বিদ্যালক্ষ্মীর।

rambharat yadav Panditiya case
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy