Advertisement
০৫ ডিসেম্বর ২০২২
State News

গুলি করল কে? আড়াল করছে পুলিশই! দাবি গিরিশ পার্ক কাণ্ডে বেকসুর খালাস গোপাল তিওয়ারির

যদিও ওই মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসাবে গ্রেফতার হওয়া এবং পরে বেকসুর খালাস হওয়া গোপাল তিওয়ারির ইঙ্গিত, আড়াল করা হয়েছে মূল অভিযুক্তকে। আর সেখানেই প্রশ্ন, তা হলে কে সেই আততায়ী?

পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটে নিজের বাড়িতে গোপাল তিওয়ারি। —নিজস্ব চিত্র।

পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটে নিজের বাড়িতে গোপাল তিওয়ারি। —নিজস্ব চিত্র।

সিজার মণ্ডল
কলকাতা শেষ আপডেট: ১৩ অক্টোবর ২০১৯ ২০:১৩
Share: Save:

কে গুলি করেছিল কলকাতা পুলিশের সাব ইন্সপেক্টর জগন্নাথ মণ্ডলকে? ঘটনার প্রায় সাড়ে চার বছর পরেও অধরা থেকে গেল সেই আততায়ী! কলকাতা পুলিশের ‘সেরা তদন্তকারী দল’-ও খুঁজে বের করতে পারল না তাঁদের সহকর্মীর বুক লক্ষ্য করে যে গুলি চালিয়েছিল তাকে।

Advertisement

যদিও ওই মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত হিসাবে গ্রেফতার হওয়া এবং পরে বেকসুর খালাস হওয়া গোপাল তিওয়ারির ইঙ্গিত, আড়াল করা হয়েছে মূল অভিযুক্তকে। আর সেখানেই প্রশ্ন, তা হলে কে সেই আততায়ী?

২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল কলকাতা পুরসভা নির্বাচনের দিন, গিরিশ পার্ক থানা এলাকার রাজেন্দ্র মল্লিক স্ট্রিট এবং বারাণসী ঘোষ স্ট্রিটের সংযোগস্থলে ডিউটি করার সময়, একটি বুলেট আচমকাই এসে আঘাত করে জগন্নাথ বাবুর বুকের ডানদিকে।

আরও পড়ুন: রাজ্য জুড়ে ‘গাঁধী সঙ্কল্প যাত্রা’ ঘোষণা বিজেপির, বিশেষ নজর যাদবপুর-ডায়মন্ড হারবারে

Advertisement

সেই ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছিল মধ্য কলকাতার ‘কুখ্যাত ডন’ গোপাল তিওয়ারি-সহ ১৩ জনকে। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাস থেকে ওই ১৩ জনের বিরুদ্ধে বিচারও শুরু হয়। প্রায় আড়াই বছর বিচার প্রক্রিয়া চলার পর বিচারক রায় দিয়েছেন, ‘‘তদন্তকারীরা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা কোনও অভিযোগই প্রমাণ করতে পারেননি। তাই সবাইকেই রেহাই দিল আদালত।”

কপালে লাল সিঁদুরের তিলক নেই। পনিটেলও নেই। ন্যাড়া মাথা। মুখে কয়েক দিনের না কামানো দাড়ি। কথা হচ্ছিল পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটে ‘ডন’ গোপাল তিওয়ারির তিন তলার ফ্ল্যাটে বসেই।

কোনও প্রশ্ন করার আগে নিজেই বললেন, ‘‘জেলে থাকতেই মানসিক করেছিলাম। বেকসুর খালাস হলে কামাখ্যা গিয়ে পুজো দেব, মাথা ন্যাড়া করব।” তাই গত মাসের শেষ সপ্তাহে জেল থেকে ছাড়া পেতেই গোপাল পুজো দিতে চলে গিয়েছিলেন কামাখ্যা।

রায়দানের দিন আদালতে জগন্নাথ মণ্ডল। — ফাইল চিত্র।

জগন্নাথ মণ্ডলকে গুলির প্রসঙ্গ তুলতেই মাথার উপর দেওয়ালে টাঙানো মহাদেবের ছবিতে হাত ছুঁইয়ে বলেন, ‘‘ঘটনার দিন থেকে পুলিশ থেকে শুরু করে সবাইকে বলে আসছিলাম যে আমি এর মধ্যে নেই। সেই কথাই আদালতে প্রমাণ হল। কিন্তু মাঝে আমাকে সাড়ে চার বছর জেলে পচতে হল।” জেলে থাকতে থাকতে পঞ্চাশ ছুঁই ছু্ঁই ‘ডন’-এর গ্লুকোমা ধরা পড়েছে। হাঁটেনও একটু খুঁড়িয়ে।

নিজের কপালে হাত ঠেকিয়ে গোপাল বলেন, ‘‘সব আমার নসিব। পার্টির নেতাদের নিজেদের ক্যাচাল আর পুলিশের লবিবাজির বলি হলাম আমি। মাঝখান থেকে আড়ালে থেকে গেল যে গুলি চালিয়েছে।” ফের একবার শিবের ছবিতে হাত ছুঁইয়ে গোপাল বলেন, ‘‘আসল আসামী ধরা পড়ে শাস্তি পেলে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম। আমি চাই— যে গুলি করেছে সে ধরা পড়ুক।” তাঁর অভিযোগ, গোড়া থেকেই পুলিশ আড়াল করছে আসল আসামীকে।

গোপালের সেই অভিযোগের বেশ জোরাল প্রতিফলন দেখা যায় নগর দায়রা আদালতের অতিরিক্ত দায়রা বিচারপতি (দ্বিতীয় ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট) সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের ৪৫ পাতার রায়ের প্রতিটি ছত্রে। রবিবার গোপাল অভিযোগ করেন, ‘‘ঘটনার সময় আমি ওখানে গেলে, এতগুলো রাস্তার কোথাও না কোথাও আমার ছবি ধরা পড়ত সিসি ক্যামেরায়। অথচ পুলিশ কোনও ভিডিয়ো ফুটেজ দিল না কেন?” বিচারকের রায়েও বারে বারে উঠে এসেছে সেই একই প্রশ্ন।

রায়ের ৩১ নম্বর পাতায় খুব পরিষ্কার ভাষায় বিচারক লিখেছেন, সরকার পক্ষের অন্যতম সাক্ষী জিয়াউল কাদের, যিনি ওই ঘটনার সময় গিরিশ পার্ক থানার অফিসার-ইন-চার্জ ছিলেন, তিনি তাঁর সাক্ষ্যে জানিয়েছেন যে— নির্বাচন উপলক্ষে ওই এলাকার প্রতিটা মোড়ে সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিল। বিচারক বিস্ময় প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন, তার পরও তদন্তকারী আধিকারিক বিচারের সময় ওই ঘটনাস্থল বা সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রয়োজনীয় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ প্রমাণ হিসাবে পেশ করা দূরে থাক, বাজেয়াপ্ত পর্যন্ত করেনি!

বিচারকের বিস্ময় আরও বেড়েছে তদন্তকারীদের পেশ করা প্রমাণে। রায়ের ১৮ নম্বর পাতায় বিচারক লিখেছেন, গুলিবিদ্ধ পুলিশ অফিসার জগন্নাথ মণ্ডলের হাসপাতাল থেকে দেওয়া সার্টিফিকেটে দেখা যাচ্ছে, তাঁর রক্তের গ্রুপ এবি পজিটিভ। ঘটনার দিন গুলিবিদ্ধ হওয়ার সময়ে জগন্নাথবাবু যে উর্দি এবং পোশাক পরেছিলেন তাতে তাঁর রক্ত লেগেছিল। সেই পোশাক রাজ্য ফরেন্সিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। সেই রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে রক্তের গ্রুপ বি পজিটিভ। বিচারক বিস্ময় প্রকাশ করে মন্তব্য করেছেন, ‘‘এই পার্থক্য কেন তা নিয়ে কোনও উত্তর দিতে পারেননি সরকারি আইনজীবী!”

বেকসুর খালাস হওয়ার পর আদালতে গোপাল। — ফাইল চিত্র

একই রকম ভাবে জবাব মেলেনি, মূল আততায়ী হিসাবে ধৃত ইফতিকার আলমের কাছ থেকে পাওয়া আগ্নেয়াস্ত্র কেন ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়নি? বিচারক নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন, তদন্তকারীদের দেওয়া তথ্য থেকে স্পষ্ট নয়, ওই আগ্নেয়াস্ত্র থেকেই পুলিশ অফিসারকে গুলি চালানো হয়েছিল কি না?

গোপাল-সহ ১৩ জন অভিযুক্তকে বেকসুর খালাস করার পিছনে বিচারক এ রকম একের পর এক অসঙ্গতি তুলে ধরেছেন তদন্তকারীদের দেওয়া প্রমাণ এবং বয়ানে। তিনি মন্তব্য করেছেন, গুলি করে হত্যার চেষ্টা দূরে থাক, অভিযুক্তরা যে বেআইনি জমায়েত করেছিল ওই দিন তারও প্রমাণ দিতে পারেনি পুলিশ।

কিন্তু কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের মতো একটি ‘অতি পেশাদার’ দল কী ভাবে তদন্তে এত ফাঁকফোকড় রাখল? গোপালের অভিযোগ, শাসক দলের দুই গোষ্ঠীর লড়াই এর পিছনে দায়ী। আর কলকাতা পুলিশের কয়েক জন কর্তার নিজেদের ‘লবি’-র লড়াইয়ের জন্য আসল অপরাধীকে আড়াল করে, পাকড়াও করা হয়েছিল গোপালকে। কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করা এক পুলিশ কর্তা এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য না করলেও মনে করিয়ে দেন, ‘‘গোপালের ঘটনার তদন্ত চলাকালীন একজন খুব দক্ষ অফিসারকে গুন্ডাদমন শাখা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে জানা গিয়েছিল, তিনি আদৌ কোনও দোষ করেননি। এর থেকেই স্পষ্ট, পুলিশের মধ্যেই একটা অংশ চাইছিল কোনও তথ্য গোপন করতে।” অন্য এক আধিকারিক বলেন, ‘‘এর পিছনের রহস্য যাঁরা জানেন তাঁদের একটা বড় অংশই অবসর নিয়েছেন।” অবসর নিয়েছেন সেই জগন্নাথ মণ্ডলও।

গোপাল শাসক দলের অন্তর্দ্বন্দ্বকে দায়ী করলেও, ক্লিনচিট দিয়েছেন তৃণমূল নেতা সঞ্জয় বক্সিকে। ‘‘সঞ্জয়দা আমাকে কোনও ফোন করেননি ওই দিন।” কিন্তু গোপালের মতো ক্লিনচিট দিতে পারেননি বিচারক। তিনি তাঁর রায়ে উল্লেখ করেছেন, ‘‘সঞ্জয় বক্সির সঙ্গে তদন্তকারী আধিকারিক খালি কথা বলেছেন। সেটা কি আদৌ তদন্ত হল?’’

ঘটনার সাড়ে চার বছর পরও পুলিশের তদন্ত জানতে পারেনি কে গুলি চালিয়েছিল। আর এলাকার ‘ডন’ গোপাল তাঁর সোর্স থেকে কিছুই কি জানতে পারেননি? গোপালের দাবি, কে সেদিন গুলি চালিয়েছিল তা নিয়ে তিনি সত্যিই অন্ধকারে। তবে এ প্রসঙ্গে বিচারক সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের রায়ের একটি অংশ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি লিখেছেন, প্রতিটি থানার একটি অস্ত্রাগার থাকে। সেখান থেকে পুলিশ কর্মীরা অস্ত্র নিলে এবং জমা দিলে তার জন্য একটি রেজিস্টার খাতাও থাকে। গিরিশ পার্ক থানারও আছে। অথচ তদন্তকারী আধিকারিক ওই থানার সেই আর্মারি রেজিস্টার বাজেয়াপ্ত করা বা প্রমাণ হিসাবে পেশ করার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি। যেমন তদন্তকারী আধিকারিক জগন্নাথ মণ্ডলের সার্ভিস রিভলবারটিও বাজেয়াপ্ত করেনি। ফলে বোঝা সম্ভব নয়, ওই দিন কোনও পুলিশ আধিকারিক গুলি চালিয়েছিলেন কি না।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.