সুপ্রিম কোর্টে শুরু হল আই-প্যাক মামলার শুনানি। — ফাইল চিত্র।
বিচারপতি বলেন, ‘‘সংবিধান এবং আইনের ব্যাখ্যা সময়ের সঙ্গে বদলাতে থাকে। এখন তো ব্যাখ্যার ক্ষেত্রেও নতুন নতুন পরিবর্তন হচ্ছে। না হলে আমরা আগের রায়গুলি কেন বাতিল করি? কারণ, নতুন পরিস্থিতি আসে।’’
‘‘আগামী কাল আবার নতুন কোনও পরিস্থিতি তৈরি হবে, তখন আবার এই প্রশ্নগুলি নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। একবারেই সব কিছু চিরতরে ঠিক হয়ে যায় না।’’
বিচারপতি বলেন, ‘‘এটা কোনও রাম বনাম শ্যামের সাধারণ মামলা নয়। এটা একেবারে ব্যতিক্রমী মামলা। আমরা সব সময় বলি, সংবিধান একটি জীবন্ত নথি। প্রতিটি নতুন পরিস্থিতি আদালতের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলে ধরে এবং আদালতকে সেই প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে হয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আদালতকে মাথায় রাখতে হয়।’’
বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘‘আপনার মতে, তা হলে ইডির ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যাওয়া উচিত ছিল? আমরা বার বার এই বিষয়ে মন্তব্য করেছি।’’
‘‘আপনারা অনেক আইনি নীতি নিয়ে যুক্তি দিতে পারেন। কিন্তু আমরা বাস্তব পরিস্থিতি থেকেও চোখ সরাতে পারি না, যা রাজ্যে ঘটেছে। আগামী কাল এটা সংবাদে প্রকাশিত হবে, তার পরে আপনারাই বলবেন আদালত এই ধরনের মন্তব্য করেছে।’’
আইনজীবী সিদ্ধার্থ লুথরা সওয়াল করছেন। তিনি বলেন, ‘‘ইডি ইতিমধ্যে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা করেছে, তখন সুপ্রিম কোর্টে মামলা করা উচিত নয়। একই বিষয়ে দু’বার সুযোগ নেওয়া যায় না।’’
বিচারপতি মিশ্র বলেন, ‘‘আমরা এখানে কোনও আপিল আবেদন শুনছি না। আমরা শুধু এই পিটিশনটা (ইডির) আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না, সেটাই ঠিক করব। এই মুহূর্তে মামলায় আর কিছু নেই।’’
মেনকা বলেন, ‘‘সংবিধানের ১৪৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেন্দ্র এই বিষয়টি আরও সঠিক এবং আইনি দিক থেকে বেশি শক্তিশালী ভাবে সামনে আনতে পারত। কিন্তু তারা যে পথটি বেছে নিয়েছে, সেটাই সবচেয়ে দুর্বল উপায়, যার মাধ্যমে তারা তাদের অভিযোগ এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।’’
‘‘ঘটনাগুলি নিয়ে সওয়ালের সময় বলব, ইডি যে পরিস্থিতির কথা বলছে, আসলে তেমন কিছুই ঘটেনি। সম্পূর্ণ সচেতন হয়ে বলছি, এখানে কোনও অপরাধমূলক কাজ হয়নি। কোনও ভয় দেখানো বা চাপ ছিল না। এমনকি, কোনও অফিসারের অধিকার লঙ্ঘিত হয়নি।’’
‘‘এই মামলায় ইডি এমন এক নতুন ধরনের আইনি বিষয় নিয়ে এসেছে, যা আগে কখনও তোলা হয়নি।’’
বিচারপতি বলেন, ‘‘এই মামলা গ্রহণ করা হবে কি না, আমরা সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারি? এর জন্য পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে মামলা পাঠানোর কী প্রয়োজনীয়তা রয়েছে?’’
‘‘এর পরে তো সব মামলার গ্রহণযোগ্যতার জন্য সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠাতে বলবেন।’’
বিচারপতি বলেন, ‘‘এটা মূলত কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে কোনও বিরোধ নয়। বরং, একজন ব্যক্তির কাজ, যিনি কাকতালীয় ভাবে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। এবং এতে পুরো প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা হচ্ছে।’’
‘‘একজন মুখ্যমন্ত্রী তদন্তে হস্তক্ষেপ করে গণতন্ত্রকে বিপদের মুখে ফেলতে পারেন না।’’
‘‘কেউই কখনও কল্পনা করতে পারেননি যে, এই দেশে এমন একটা দিন আসবে, যখন কোনও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী অন্য একটি তদন্তকারী সংস্থার কাজে হস্তক্ষেপ করবেন।’’
‘‘আপনি যে সব মামলার উদাহরণ দেখাচ্ছেন, তারাও এটা ভাবতে পারেননি।’’
‘‘আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিন যে, সিবিআই তদন্ত সংবিধানের ১৩১ অনুচ্ছেদে করা যেতে পারে কি না?’’
কেন্দ্রের আইনজীবী তুষার মেহতা বলেন, ‘‘এমন ঘটনায় গুরুতর অপরাধ সংক্রান্ত তথ্য সরিয়ে ফেলার সম্ভাবনা থাকে।’’
বিচারপতি বলেন, ‘‘আপনি কী ভাবে সরাসরি আদালতে এসেছেন? যদি কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চলমান তদন্তের মাঝে এসে বলেন যে, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ, তা হলে কি সেটা মেনে নেওয়া যায়?’’
‘‘যদি কোনও মন্ত্রী হঠাৎ করে একটি চলমান তদন্তের মধ্যে ঢুকে পড়েন এবং সেটাকে সমান্তরাল ভাবে গণতন্ত্রের মতো চালাতে চান, আর তার পর বলেন—এটা নাকি কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিরোধ—তা হলে কি সেটা গ্রহণযোগ্য?’’
মেনকাকে বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র: ‘‘এখানে রাষ্ট্রের কোন অধিকার জড়িত? এটা তো কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে কোনও বিরোধ নয়। কেন ১৩১ অনুচ্ছেদের কথা তুলছেন?’’
রাজ্যের আইনজীবী মেনকা বলেন, ‘‘এখানে কেন্দ্র যা করতে চাইছে, তা হল প্রতিষ্ঠিত ধারণাটাকেই বদলে দেওয়া। এটা শুধু আমাদের প্রায় ৭৫ বছরের সাংবিধানিক আইনগত বোঝাপড়ার বিরোধী নয়, বরং সারা বিশ্বে স্বীকৃত নীতিরও বিরুদ্ধে, বিশেষ করে সেই সব দেশে, যেখানে ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। নাগরিকদের সব সময় রাষ্ট্রের হাত থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। সেই কারণেই ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে।’’
বিরতির পরে দুপুর ২টো আবার শুনানি।
মেনকার সওয়াল, ‘‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্ব জুড়ে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে, প্রত্যেক দেশের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রাষ্ট্র দ্বারা লঙ্ঘিত বা পদদলিত করা যাবে না। অর্থাৎ, এই অধিকারগুলোর মূল উদ্দেশ্য হল নাগরিকদের রাষ্ট্রের হাত থেকে সুরক্ষা দেওয়া।’’
মেনকা বলেন, ‘‘৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য তৈরি, রাষ্ট্রের নিজের জন্য নয়।’’ মেনকা আরও বলেন, ‘‘কেন্দ্র এবং রাজ্যের বিরোধ হলে ১৩১ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করতে হবে। ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ নয়। তা ছাড়া এই মামলায় বড় সাংবিধানিক প্রশ্ন রয়েছে, তাই সাংবিধানিক বেঞ্চে যাওয়া দরকার।’’
মেনকা সওয়াল করে বলেন, ‘‘সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য। ইডি অফিসারেরা যদি অফিসার হিসাবে ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করেন, তা হলে সরকার নিজেই নিজের বিরুদ্ধে এই ধারা ব্যবহার করছে। এর ফলে ওই অনুচ্ছেদের আসল উদ্দেশ্য নষ্ট হবে। নাগরিকদের জন্য এই অধিকার দুর্বল হয়ে যাবে।’’
তিনি বলেন, ‘‘সরকার নিজেই যদি ভিক্টিম সেজে এই অধিকার ব্যবহার করে তবে তা হবে সংবিধানের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী।’’
কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার সওয়াল, ‘‘এটা থেকে স্পষ্ট যে ঘটনাটি তাদের পক্ষে যাচ্ছে না। তাই অতীতের বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে মামলা খারিজ করতে চাইছে। তারা ওই দিনের ঘটনাটি নিয়ে কিছু বলছেন না।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘স্বাধীনতার আগের বিষয়ে সওয়াল করবেন বলছেন। অথচ ঘটনাটি নিয়ে কোনও সওয়াল নেই।’’
মামলাটি গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয় বলে সওয়াল করেন আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। তাঁর বক্তব্য, ‘‘১৯৪৮ সালে সংবিধান প্রণয়ন সভার বিতর্ক দিয়ে সওয়াল শুরু করতে চাই।’’
সিঙ্ঘভির সওয়াল, ‘‘তদন্তের সময় একজন ইডি অফিসার হিসাবে তিনি এমন কোনও আলাদা অধিকার দাবি করতে পারেন না, যা তাঁর দফতরের নিজেরই নেই। ইডি নিজে রাষ্ট্রের শক্তিশালী সংস্থা। তাই ইডি বলতে পারে না, তার রাষ্ট্রের সুরক্ষা চাই। ইডির মতো সংস্থা কোনও মৌলিক অধিকারের ভিত্তিতে আদালতের কাছে সিবিআই তদন্তের অনুরোধ করলে এবং আদালত তাতে অনুমতি দিলে তা অত্যন্ত অবাস্তব বিষয় হবে।’’
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy