সিঙ্গুরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।
গত কয়েক মাস ধরে এসআইআর নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে চাপানউতর চলছে। তৃণমূলের দাবি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় তাড়াহুড়ো করছে নির্বাচন কমিশন। তারা বিজেপির কথামতো চলতে গিয়ে সাধারণ মানুষের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। সাধারণ মানুষ থেকে বিএলও-র মতো সরকারি আধিকারিক আত্মহত্যা করছেন। অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছেন। সিঙ্গুর থেকে সেই ইস্যুতে বিজেপিকে নিশানা করলেন তৃণমূলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, এ নিয়ে প্রয়োজনে আদালতে লড়াই করবেন। মানুষের অধিকারের কথা দিল্লির কানে তাঁকে তুলতেই হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে অভয় দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান, ভয় পাওয়ার কোনও কারণ নেই। শুনানিতে ডাকলে সকলে যান। সহযোগিতা করুন। বাকি বিষয়টি তিনি দেখবেন। মমতার কথায়, ‘‘ওরা ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে। অহংকার দেখাচ্ছে। সব অহংকার ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করব। শুধু আপনারা পাশে থাকুন। সুস্থ থাকুন।’’
‘‘সবাই আমার লড়াইয়ে থাকবেন তো? আমি কিন্তু জীবন দিয়ে লড়াই করি। অনেক অত্যাচার সহ্য করেছি সিপিএম আমলে। বিজেপি গত ১০ বছর ধরে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাচ্ছে। আমাদের উন্নয়ন দেখছে, আর লুচির মতো ফুলছে।’’
এসআইআর প্রক্রিয়ায় সকলকে সহযোগিতা
করতে বলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। তিনি বলেন, ‘‘চিন্তা করে নিজের শরীর খারাপ করবেন না।
আত্মহত্যা করবেন না। এটা বাংলা। ডাকছে ডাকুক। যাবেন। এটা বাংলা। এখানে ডিটেনশন
ক্যাম্প হবে না। ওরা ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছে, অহঙ্কার দেখাচ্ছে। এই অহঙ্কার ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ
করব।’’
এসআইআর প্রসঙ্গে মমতার অভিযোগ, ‘হিন্দু-হিন্দু করে হিন্দুদের মারছে।’’ তিনি জানান, ‘এসআইআর আতঙ্কে’ অনেক হিন্দুও মারা গিয়েছেন। তার আগে বিজেপিকে তোপ দেগে তিনি বলেন, ‘‘তোমরা বাংলাকে দেখোনি। বাংলা যদি জবাব দেওয়া শুরু করে ক্ষমতা নেই তোমাদের। আমাকে তোমরা ঘেঁচু করবে। তুমি জেলে ভরো, গুলি করো, আই ডোন্ট কেয়ার। আমি জেলে গেলে মায়েরা জবাব দেবে। কৃষক-শ্রমিকেরা জবাব দেবে।’’
বুধবার তাঁর দিল্লি যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যেতে পারছেন না বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী। আনন্দপুরে অগ্নিকাণ্ডের জন্য তিনি ভাবিত। এর পর এসআইআর ইস্যুতে বিজেপিকে তোপ দেগে বলেন, ‘‘আজ না হলে কাল তো আমি যাবই দিল্লি। দরকারে কোর্টে আমিও যাব। আইনজীবী হয়ে নয়, সাধারাণ মানুষ হিসাবে। সব ডকুমেন্ট রেখে দিয়েছি। জ্যান্ত মানুষকে মৃত বানাচ্ছেন!’’
বাংলা ভাষাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা দেওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে তোপ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিনি বলেন, ‘‘সব ঝুট হ্যায়। পাঁচ বস্তা বই পাঠিয়েছিলাম দিল্লিকে। বাংলাকে ধ্রুপদী ভাষার মর্যাদা আপনারা দেননি। আমরা দাবি করেছি। রিসার্চ টিম তৈরি করেছিলাম। আপনারা বাংলায় কথা বললে মানুষকে মারেন।’’
মুখ্যমন্ত্রী আশাকর্মীদের জন্য ঘোষণা করেছেন। কিছু দিন আগেই কলকাতার বুকে আন্দোলন করেছেন কর্মীরা। কিছু দিন আগে ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে স্মার্ট ফোন কেনার জন্য। অপেক্ষা করুন, সবুরে মেওয়া ফলে।’’
মমতা বলেন, ‘‘দেব আমাকে বার বার বলত। বন্যায় বার বার ঘাটালে ছুটে গিয়েছি। ডিভিসির জলে ভাসত। ১০ বছর ধরে কেন্দ্রকে চিঠি লিখেছি। ওরা দেয় শুধু ধোঁকা। ওদের বানিয়ে বোকা আমরা দিলাম টাকা।’’ তিনি জানান, ৫০০ কোটি টাকার কাজ ইতিমধ্যে হয়ে গিয়েছে। বাকি হাজার কোটি টাকার কাজ শেষ হবে শীঘ্রই। তিনি বলেন, ‘‘অনেকে বড় কথা বলেন। রাখেন না। আমি মরে যাব, তা-ও ভাল। আমি কথা রাখি ১০০ শতাংশ। জুমলা করি না। আমি ডবল ইঞ্জিন সরকারের নই। আমি মা-মাটি-মানুষের সরকার।’’
মমতা জানান, ১৬৯৪টি পরিষেবার উদ্বোধন এবং শিলান্যাস ৩৩ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘এক কোটি বাংলার বাড়ি আগেই হয়েছে। কিছু দিন আগে ১২ লক্ষ বাড়ি দিয়েছি। দিল্লি এক টাকা দেয়নি। এই দু’মাসে ৩২ লক্ষ বাড়ির টাকা দেওয়া হবে। টাকা ঢুকলেই বাড়ির জন্য ইট পুঁতবেন। চাই না, কেউ কষ্টে থাকুন। মাথার ছাদ থাকুক সকলের।’’
মমতা বলেন, ‘‘দেব আপনাদের কাছে বললেন। রচনা বললেন। কল্যাণ নেই। কোর্টে কেস আছে। অন্যরা আছে।’’ এর পর উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সমবেদনা জানান, ‘এসআইআর-আতঙ্কে’ মৃতদের পরিবারকে। তিনি সমবেদনা জানান, অজিত পওয়ারের পরিবারকে। বুধবার বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে তাঁর। সিঙ্গুর প্রসঙ্গে মমতা বলেন, ‘‘কেউ চিঁড়ে নিয়ে এসেছিলেন, নাড়ু নিয়ে এসেছিলেন। সিঙ্গুর আন্দোলনে মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে ২৬ দিন অনশন করেছি। যাঁরা পাশে থেকেছেন, তাঁরা আমার প্রেরণা। সিঙ্গুরের পাশেই ফুরফুরা শরিফ। সেখানে উন্নয়ন করেছি। তারকনাথের মন্দির, জয়রামবাটির উন্নয়ন করেছি। ওখানকার রেললাইন আমি করে গিয়েছিলাম। ওরা ফিতে কেটেছে।’’ এর নিজের লেখা কবিতা ‘উপহাস’ আবৃত্তি করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার পর ‘আতঙ্ক’ নামে আরও একটি স্বরচিত কবিতা আবৃতি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘‘এতগুলো লোক মারা গিয়েছেন। আমি সহ্য করতে পারছি না। সেগুলো লেখায় বেরিয়ে এসেছে।’’
‘‘দিদিকে ধন্যবাদ। এত সুন্দর দিন উপহার দেওয়ার জন্য। এর পর রচনার প্রশংসা করে বললেন, কী ভাল বললে। কী দারুণ ডায়লগ। সাংসদ হিসাবে আজ আমার কাছে বড় দিন। ঘাটালের দীর্ঘ দিনের মানুষের স্বপ্নপূরণের দিন। বৃষ্টি এলেই ঘাটালের গ্রামগুলো জলের তলায় থাকে। গত ১২ বছর ধরে এই ছবি দেখছি। সাংসদ হিসাবে সংসদে আমার প্রথম ভাষণে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান নিয়ে ছিল। দিল্লিতে গিয়েছি। কেউ কথা রাখেনি। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে দিদি কথা দেন। আজ উদ্বোধন হল। প্রত্যেকের তরফে হাতজোড় করে আমি দিদিকে হাতজোড় করে নমস্কার করছি। কেউ কথা রাখেনি। যিনি কথা রেখেছেন, তাঁর নাম মমতা।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘যিনি কথা দিয়ে কথা রাখেন, তিনি কেন ভোটে জিতবেন না? জিতবেন তিনি-ই। ২৫০টি আসনে জয়লাভ করবে তৃণমূল।’’
হুগলির সাংসদ রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, যাঁরা বাংলাভাষীদের আক্রমণ করেন, বাংলা বলায় লাঞ্ছনা করে থাকেন, তৃণমূলের লড়াই তাঁদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা বিশ্বাস করি বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যে। আমরা এক হয়ে লড়াই করব। সাংসদ হিসাবে হুগলির মানুষের পাশে থাকছি।’’ বিজেপিকে নিশানা করে রচনা বলেন, ‘‘২০১১ সালে তৃণমূলের আসন ১৮৪ ছিল। বিরোধীরা তৃণমূলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করল। এখন ২০২৬ সাল। বুঝতে পারছেন তো কী হতে চলেছে? রেকর্ড ভোটে জয়ী হতে চলেছে তৃণমূল। আবার আসছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানান, আগামী তিন মাস তৃণমূলের জন্য জরুরি। হুগলির প্রতিটি অঞ্চলে তিনি হাজির হবেন। ডাকলেই পাওয়া যাবে তাঁকে।
গত লোকসভা ভোটের প্রচারে হুগলির আরামবাগ ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান তৈরির ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সে দিন তাঁর পাশে ছিলেন দেব। বুধবার হুগলি থেকেই ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী। বুধবারও পাশে দেব। উল্লেখ্য, তৃণমূল অভিযোগ করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে একাধিক বার আবেদন করা সত্ত্বেও এই প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয়নি। তাই রাজ্য সরকার ১৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের রূপায়ণ করছে। ইতিমধ্যেই সাংসদ দেবের অনুরোধে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০২৭ সালের মধ্যে নদী বাঁধের উচ্চতা বৃদ্ধি হবে প্রায় ৫০ কিমি, খাল এবং নদী খনন হবে ৫০ কিমি পর্যন্ত। ২টি পাম্প হাউস, ৩টি রেগুলেটর, একটি সেতু সম্প্রসারণ এবং ১০৪টি নতুন সেতু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেচ এবং জলসম্পদ দফতরের পক্ষ থেকে। উল্লেখ্য, গত লোকসভা নির্বাচনের আগে দেব দাবি জানিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের বিষয়ে। দেবকে মঞ্চে রেখেই নির্বাচনী প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছিলেন কেন্দ্র সরকার বঞ্চনা করলেও ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান রাজ্য সরকার করবে। সেই মতো প্রথম পর্যায়ে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা সেচ দফতরের এক আধিকারিক জানান, গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই কাজ শুরু হয়েছে।
সিঙ্গুর থেকে বিবিধ প্রকল্পের উদ্বোধন এবং শিলান্যাস করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছাড়াও সরকারি পরিষেবা প্রদান অনুষ্ঠান করছেন তিনি।
ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সিঙ্গুরে অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকেই উদ্বোধন করেন। ঘাটালের জায়ান্ট স্ক্রিনে নজর রাখেন জেলা প্রশাসনের আধিকারিকেরা। ওই প্রকল্পের বাস্তবায়নে উপকৃত হবেন পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ৭টি ব্লক— ঘাটাল, দাসপুর-১ ও ২, চন্দ্রকোনা-১ ও ২, কেশপুর এবং ডেবরা ছাড়াও পূর্ব মেদিনীপুরের ৪টি ব্লক— পাঁশকুড়া-১, কোলাঘাট, ময়না এবং তমলুকের মানুষ। তা ছাড়াও ঘাটাল ও পাঁশকুড়া পুরসভা রয়েছে। প্রশাসনের দাবি, ১০ লক্ষ মানুষকে জল-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যান।
বুধবার হুগলির সিঙ্গুর থেকে ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের উদ্বোধন করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে উপস্থিত ঘাটালের তিন বারের সাংসদ দীপক অধিকারী (দেব)। রয়েছেন রাজ্যের জলসম্পদ মন্ত্রী মানস ভুইয়াঁ। এ নিয়ে কটাক্ষ করেছেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, প্রকল্প রূপায়ণের জন্য ব্যয়ের তালিকা সম্পর্কিত কোনও তথ্য মেলেনি। বিধানসভা ভোটের আগে ‘গিমিক’ তৈরির চেষ্টা করেছে তৃণমূল।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy