মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার ইডির আইপ্যাক অভিযান সংক্রান্ত বিষয়ে শুনানি চলছে সুপ্রিম কোর্টে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
মধ্যাহ্ন বিরতির পরে দুপুর ২টোয় ফের এই মামলাটি শুনবে সুপ্রিম কোর্ট।
ইডির হয়ে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল রাজুর সওয়াল, “এই মামলা একেবারেই ব্যতিক্রমী। কারণ, এখানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নিজেই অভিযুক্ত। চুরির কাজটি মুখ্যমন্ত্রীই করেছেন। আর এই ঘটনা ঘটেছে পুলিশ কমিশনার ও রাজ্য পুলিশের ডিজিপির উপস্থিতিতে। অর্থাৎ, পুলিশের শীর্ষ কর্তারা এই ঘটনায় জড়িত। এই ঘটনার কোনও এফআইআর নথিভুক্ত হলেও, তা সঠিক ভাবে তদন্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এই মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।”
রাজ্য এবং ডিজিপির হয়ে সিঙ্ঘভি আরও বলেন, “কিছু অচেনা লোক ওই জায়গায় ঢুকেছে এই খবর শুনে সেখানে গিয়েছিলেন ডিজিপি। মুখ্যমন্ত্রী জ়েড প্লাস নিরাপত্তা প্রাপ্ত। এই ধরনের তথ্য পেলে ডিজিপির সেখানে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।” ইডির অপর আইনজীবী এসভি রাজু সওয়াল করেন: “এখানে ভয় দেখানো, ডাকাতি বা লুটপাটের মতো ঘটনা ঘটেছে।”
আইনজীবী সিঙ্ঘভির সওয়াল, “তল্লাশি শুরু হয়েছিল ভোর ৬টা ৪৫ মিনিটে। আর ইমেল পাঠানো হয়েছিল তার অনেক পরে, সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে। ওই ইমেল পাঠানোটা ছিল আসলে পরে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা। ইডি অফিসাররা অনেক দেরিতে নিজেদের পরিচয় দেন।”
বিচারপতি মিশ্র বলেন, “শুনানিকে কেন্দ্র করে এই হাই কোর্টে এমন হয়, কাল অন্য কোনও হাই কোর্টেও এমন হতে পারে— এ ধরনের ঘটনা কোনও ভাবেই হওয়া উচিত নয়। আমাদের সেই দিকটিও দেখতে হবে।” তখন সিঙ্ঘভি বলেন, “ইডির পঞ্চনামায় ভুল তথ্য আছে, না হলে ইডির পিটিশনে ভুল তথ্য আছে। দুটোর মধ্যে একটি হবে।” রাজ্যের আধিকারিকদের তল্লাশির বিষয়ে জানানো প্রসঙ্গে তাঁর সওয়াল, “এক বার জানানো হয়েছিল। একটি খুবই সাধারণ ভাবে ইমেলের মাধ্যমে।” এই সওয়ালের বিরোধিতা করেন ইডির আইনজীবী। সলিসিটর জেনারেল মেহতা বলেন, “ইমেল কখনও ‘ক্যাজ়্যুয়াল’ বা গুরুত্বহীন হতে পারে না। ইমেল করা হয়েছে মানেই তা আনুষ্ঠানিক ভাবে জানানো হয়েছে।”
রাজ্য সরকার এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি রাজীব কুমারের হয়ে আইনজীবী মনুসিঙ্ঘভির সওয়াস, “ইডি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টে এসে মামলা করতে পারে শুধু ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে। যখন তাদের সামনে কার্যত আর কোনও উপায় থাকে না। এখন এই মামলার শুনানি হাই কোর্টে হওয়া উচিত। এই মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর আপত্তি রয়েছে। হাই কোর্টে ইতিমধ্যেই প্রায় একই আবেদন করা হয়েছে। এখানে ফোরাম শপিং করা হয়েছে।”
সিব্বলের উদ্দেশে বিচারপতি মিশ্র বলেন, “আপনাদের দাবি পরস্পরবিরোধী। যদি সত্যিই তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্য থাকত, তবে ইডি বাজেয়াপ্ত করত। কিন্তু বাস্তবে কিছুই বাজেয়াপ্ত করা হয়নি।” বিচারপতি আরও বলেন, “সলিসিটর জেনারেলের কথা মতো নির্বাচনের সময় যদি টাকা পাচার হয়, তা হলে ইডির দোষ কোথায়?” সলিসিটর জেনারেল মেহতা অবশ্য বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে এখন কোনও নির্বাচন নেই।” তখন সিব্বল পাল্টা বলেন, “যদি এটাই সলিসিটর জেনারেলের ধারণা হয়, তবে আর কী বলার থাকতে পারে।” বিচারপতি মিশ্র তাতে মেহতার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “আসলে এখনও নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশ হয়নি। এটাই বোঝাতে চেয়েছেন।” সিব্বলের বক্তব্য, “সেখানে যা যা ঘটেছে তা নিয়ে ইডির উচিত ছিল রাজ্য সরকারকে তদন্ত করতে বলা।”
সিব্বল আরও বলেন, “দলের চেয়ারম্যানের সেখানে যাওয়ার পূর্ণ অধিকার ছিল। যদি ভিডিয়ো দেখানো হয়, তবে কে মিথ্যে বলছে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। কেন ইডি একটি রাজনৈতিক দলের অফিসের সেই অংশে ঢুকল, যেখানে দলের সব তথ্য সংরক্ষিত থাকে? মুখ্যমন্ত্রী নাকি সব ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে গিয়েছেন— এই অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। ইডির নিজের তৈরি পঞ্চনামা দিয়েই প্রমাণ হয়ে যায়। এই ধরনের কথা বলা হচ্ছে শুধু আদালতের মনে পক্ষপাত তৈরি করার জন্য। দুপুর ১২টা ০৫ মিনিট পর্যন্ত কোনও কিছুই বাজেয়াপ্ত করা হয়নি—এ কথা পঞ্চনামাতেই লেখা আছে। মুখ্যমন্ত্রী শুধু একটি ল্যাপটপ, একটি আইফোন নিয়েছিলেন—এর বাইরে আর কিছুই নেওয়া হয়নি। তল্লাশির সময় কোনও বাধা তৈরি করা হয়নি।”
সিব্বলের সওয়াল, “আইপ্যাক-এর কাছে রাজনৈতিক দলের বিপুল পরিমাণ তথ্য থাকে। যখন ইডি সেখানে গিয়েছিল, তখন তারা জানত যে দলের বহু গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল তথ্য সেখানে থাকবে। নির্বাচনের ঠিক মাঝখানে সেখানে যাওয়ার প্রয়োজন কী ছিল? কয়লা পাচার মামলায় শেষ বয়ান নেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। তারপর এত দিন ইডি কী করছিল? হঠাৎ করে নির্বাচনের সময় এত তৎপরতা কেন? ইডি ওই সব তথ্য নিলে আমরা নির্বাচন লড়ব কী ভাবে?”
হাই কোর্টের ঘটনা প্রসঙ্গে সিব্বল মন্তব্য নিয়ে বিচারপতি মিশ্র বলেন, “আমাদের মুখে কোনও কথা বসাবেন না। আমরা এমন কিছু ধরে নিচ্ছি না।” অপর আইনজীবী অভিষেক মনুসিঙ্ঘভিও বলেন, “কোনও রকম উত্তেজনা বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই, গতকাল ইডি নিজেই শুনানি পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করেছিল।”
রাজ্যের তরফে আইনজীবী কপিল সিব্বল সওয়াল করেন, “হাই কোর্ট এই বিষয়টি শুনতে পারে, তাই এই মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে শোনার প্রয়োজন কেন?” তখন বিচারপতি মিশ্র বলেন, “হাই কোর্টে যা যা হয়েছে তা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন!” ওই ঘটনার আর পুনরাবৃত্তি হবে না বলে সুপ্রিম কোর্টকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন সিব্বল। বুধবারই যে হাই কোর্টে এই মামলার শুনানি হয়েছে, তা-ও সুপ্রিম কোর্টে জানান তিনি। তাঁর সওয়াল, “যদি এই আদালত মামলাটি শোনে, তবে ধরে নিতে হবে যে হাই কোর্ট এই মামলা শুনতে অক্ষম। এই ধারণা তৈরি হবে।”
ইডির সওয়াল, “আইপ্যাক নিজে কখনও কোনও অভিযোগ, মামলা করেনি। তাদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হয়েছে এমন অভিযোগ নেই।”
ইডির সওয়াল, “আইপ্যাক নিজে কখনও কোনও অভিযোগ, মামলা করেনি। তাদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করা হয়েছে এমন অভিযোগ নেই।”
ইডির আইনজীবী আরও সওয়াল করেন, “এমন কী ছিল, যা লুকোনোর জন্য মুখ্যমন্ত্রী পুরো পুলিশবাহিনী নিয়ে সেখানে ঢুকে পড়লেন? পুলিশ অফিসারদের পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলার সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সেখানে প্রবেশ করেন। তাঁকে হস্তক্ষেপ না করার অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি তা মানেননি। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন। এই মামলায় সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।”
মেহতা আদালতে বলেন, “ইডি আগেই ইমেল করে রাজ্যের আধিকারিকদের জানিয়ে দিয়েছিল। আমাদের কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল না।” ওই দিনের ঘটনার ছবি দেখতে চান বিচারপতি।
বিচারপতি মিশ্র জানতে চান, এই আইপ্যাক কি সেই একই সংস্থা, যার সঙ্গে আগে প্রশান্ত কিশোর যুক্ত ছিলেন।
ইডির সওয়াল, “ওরা বলছে আমরা নাকি সেখানে গিয়েছিলাম এসআইআর-এর তথ্য সংগ্রহ করতে। কিন্তু যে কেউ বুঝবে—এসআইআর-এর তথ্য তো ওয়েবসাইটেই পাওয়া যায়। সেটা আনতে সেখানে যাওয়ার কোনও মানে নেই। এমন কাজ কোনও বোকা লোকও করবে না। অবৈধ কয়লা পাচার মামলার তদন্তে আইপ্যাক-এ তল্লাশি করতে গিয়েছিল। কয়লা কেনাবেচার টাকা নগদে লেনদেন করা হত। ইডি যে সমন পাঠিয়েছিল, তার কোনও জবাব দেওয়া হয়নি। তদন্তে দেখা গিয়েছে, একটি হাওয়ালা চ্যানেল মারফত প্রায় ২০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে।”
ইডির তদন্তকারী দল আইপ্যাক কর্ণধারের বাড়ি এবং দফতরে কেন গিয়েছিল, তা জানতে চাইল সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতি মিশ্রের প্রশ্ন, “আপনারা সেখানে কেন গিয়েছিলেন? ঠিক কী বিষয় নিয়ে তদন্ত চলছিল?”
ইডি বলে, “রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং পুলিশের তরফে ইডির বিরুদ্ধে তিনটি এফআইআর করা হয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে যে ইডি বেআইনি কাজ করেছে, মানুষকে ভয় দেখিয়েছে ইত্যাদি। এই এফআইআরগুলির ভিত্তিতেই নাকি ইডি অফিসের সিসিটিভি ক্যামেরা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।”
ইডির হয়ে সলিসিটর জেনারল মেহতার সওয়াল, “পিএমএলএ আইনের ৮ নম্বর ধারা অনুসারে, ইডি শুধু সরকারের একটি সাধারণ দফতর নয়। ইডির একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য আছে। ইডি অবৈধ ভাবে উপার্জিত সম্পত্তি চিহ্নিত করে, তা বাজেয়াপ্ত করে এবং দখলে নেয়।”
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy