বাড়ি বাড়ি গণনা-পত্র পৌঁছে দিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিরা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) কাজ শুরু করবেন আজ, মঙ্গলবার। এই সময়ে রাজ্যের মন্ত্রীদের নিজেদের এলাকায় সর্তক নজর রাখার পরামর্শ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর ও তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শহরে মিছিলের ডাক দেওয়া হয়েছে আজই। রেড রোড থেকে জোড়াসাঁকো পর্যন্ত ওই মিছিলে কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলির তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা অংশগ্রহণ করবেন। আর এই পরিস্থিতিতে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের মতো এ রাজ্যেও সরকারের তরফে সর্বদল বৈঠক ডাকার দাবি তুলেছে কংগ্রেস। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতরের কাছে আজ ফের প্রতিবাদের ডাকও দিয়েছে তারা।
এসআইআরের কাজ মাথায় রেখে দূরবর্তী এলাকার বেশ কয়েক জন মন্ত্রীকে বাদ রেখেই সোমবার নবান্নে হয়েছে রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠক। অনেকে অনুপস্থিত থাকার কারণে নিয়মমাফিক ‘কোরাম’ করে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সূত্রের দাবি, সংশ্লিষ্টদের বলে দেওয়া হয়েছিল, মঙ্গলবার থেকে এসআই শুরু হওয়ার কারণে এলাকায় এলাকায় নজর রাখতে হবে। সমন্বয় রাখতে হবে জেলা তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সঙ্গে। অবশ্য দূরবর্তী জেলার মধ্যে এ দিন উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী উদয়ন গুহ বৈঠকে ছিলেন। সূত্রের খবর, বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা জানিয়েছেন, যাঁরা আসেননি, তাঁরা ঠিকই করেছেন। এসআইআরের দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। বাকিরাও যেন নজর রাখেন, সেই নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। এসআইআর-এর প্রেক্ষিতে ‘জোট বাঁধো, তৈরি হও’ ডাক দিয়ে গান লিখে সুরও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কালীঘাটের দফতরে এ দিন এসআইআর নিয়ে ফের সরব হয়েছেন অভিষেকও। তাঁর বক্তব্য, ‘‘অমিত শাহ বলেছেন — যারা এখানে জন্মগ্রহণ করেননি, তাদের এখানে ভোটের অধিকার নেই। তা হলে লালকৃষ্ণ আডবাণী এবং শান্তনু ঠাকুরের মতো নেতাদেরও ভোটের অধিকার থাকবে না? এবং মতুয়া ভাই-বোনেদেরও ভোটাধিকার থাকবে না? নাগরিকত্ব দেওয়ার নামে শিবির করছে বিজেপি। ফাঁদে পা দেবেন না। তা হলে অসমের মতো হবে। সেখানে ‘মানুষকে ডিটেনশন সেন্টারে’ পাঠানো হবে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘বিএলএ-রাও বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্য করবেন। শিবির থাকবে। তৃণমূলের সাংসদ ও বিধায়কেরা রাস্তায় থাকবেন। ভয়ের কারণ নেই। আবারও বলছি, এক জন ন্যায্য ভোটারের নাম বাদ গেলে আমরা দিল্লি যাব।’’ সেই সঙ্গেই তাঁর দাবি, ‘‘এসআইআর-এর পরেও তৃণমূলের ভোট ও আসন, দুই-ই বাড়বে।’’
ভাষা ও জাতের নামে বিভক্ত না-হওয়ার আর্জি জানিয়ে কাকদ্বীপে এ দিন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী এখন বলছেন, বিএলও-দের উপর নজর রাখতে হবে। আমাদের বিএলএ-২ দিতে হবে। ভাইপো বলেছে, প্রকৃত ভোটারদের যদি নাম বাদ যায়, এক লক্ষ লোক নিয়ে দিল্লি যাব আন্দোলন করতে। এর আগে ১০০ দিন ও আবাস যোজনার টাকা চুরি করে বলেছিল, ১০ লক্ষ লোক নিয়ে দিল্লি যাব। তিন হাজার লোক নিয়ে গিয়েছিল! জুতো খুলে দিল্লি পুলিশ ছুটিয়েছে। এ বার জুতো হাতে নেওয়ারও সুযোগ পাবেন না।’’ কলকাতায় মমতার মিছিলের দিনে পানিহাটি-আগরপাড়ায় বিজেপির মিছিলে থাকার কথা শুভেন্দুরও।
এসআইআর-এর জন্য ‘হেল্প ডেস্ক’ খুলল প্রদেশ কংগ্রেস। বিধান ভবনে। — নিজস্ব চিত্র।
এসআইআর-এর সময়ে সাধারণ মানুষকে সহযোগিতার লক্ষ্যে এ দিন দলের সদর দফতর বিধান ভবনে ‘হেল্প ডেস্ক’ চালু করেছে প্রদেশ কংগ্রেস। বিজেপি, তৃণমূল কংগ্রেসের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে প্রয়োজনে আইনি লড়াইও করা হবে বলে জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতৃত্ব। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের প্রশ্ন, ‘‘এসআইআর নিয়ে তামিলনাড়ুতে সর্বদল বৈঠক ডেকে সেখানকার মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টে যাওয়া হবে। কেরল বিধানসভায় প্রস্তাব পাশ হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জানান, এসআইআর প্রসঙ্গে কী আইনি প্রক্রিয়া চলছে। কেন তিনি এখনও সর্বদলীয় বৈঠক ডাকছেন না?”এসআইআর নিয়ে প্রসেনজিৎ বসুর নেতৃত্বে যে কমিটি করা হয়েছিল, তার বাকি সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে এ দিন।
তৃণমূল আবার এ দিন ফের ২০০৩ সালের খসড়া ভোটার তালিকায় (যা তৈরি হয়েছিল ২০০২-এর এসআইআর-এর পরে) কিছু অসঙ্গতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে। দলের নেতা তথা রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ওই চিঠিতে জানিয়েছেন, দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলতলি অঞ্চলের বহু বুথের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয় রয়েছে। এতে নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। তৃণমূলের দাবি, এসআইআর প্রক্রিয়ার মধ্যে অবিলম্বে এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)