বড়বাজারে ঢোকার মুখে আবর্জনার স্তূপ। নিকাশি নালা সাফাই হয় না বললেই চলে। জেলখানা মোড়ে তমলুক-পাঁশকুড়া রাস্তার ধারে নালা ভেঙে গিয়েছে।
ছবিটা স্বচ্ছ ভারত অভিযানে দেশে চতুর্থ স্থানাধিকারী পূর্ব মেদিনীপুরের সদর শহর তমলুকের। জেলখানা মোড় শহরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা। পুরসভা থেকে কয়েকশো মিটার দূরে এখানে রয়েছে জেলা আদালত, জেলা সংশোধনাগার। এখানে নিকাশি নালার উপরেই বসে বাজার। বাজারের বর্জ্য পদার্থ জমা হচ্ছে নালায়। স্থানীয় এক দোকানদারের অভিযোগ, ‘‘কাছেই মহাপ্রভু বাজারে দোকান করার মতো জায়গার ব্যবস্থা নেই। তাই বাধ্য হয়ে নিকাশিনালার উপর দোকান দিতে হয়েছে।’’
শহরের ব্যস্ত বাজার বড়বাজারের প্রবেশপথেও প্রায়ই আবর্জনা পড়ে থাকে বলে অভিযোগ। স্থানীয় ওষুধ দোকানের বিকাশ প্রামাণিকের অভিযোগ, ‘‘শহরের এ রকম জনবহুল বাজার এলাকায় প্রায়ই জঞ্জাল পড়ে থাকে।’’ শহরের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ১৪ বছর হল তমলুক জেলা সদর হয়েছে। পুরসভার বয়স দেড়শো বছর পেরিয়ে গিয়েছে। তবে শহরের রাস্তা, নিকাশি ব্যবস্থার হাল তেমন বদলায়নি। তমলুকের পুরপ্রধান রবীন্দ্রনাথ সেনের অবশ্য দাবি, ‘‘শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে নিকাশি নালাগুলি নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। জঞ্জাল পরিষ্কারের ব্যবস্থাপনাতেও বদল আনা হয়েছে।’’
হলদিয়ার রাস্তার ধারের নিকাশি ভরেছে প্লাস্টিকে (বাঁ দিকে)মাঠ ভরে রয়েছে প্লাস্টিকের থালায় (ডান দিেক)। নিজস্ব চিত্র।
হাল কমবেশি একই শিল্পশহর হলদিয়ারও। অভিযোগ, হলদিয়া টাউনশিপ এলাকাতেও যত্রতত্র জঞ্জাল পড়ে থাকে। বিভিন্ন আবাসনের আশেপাশে জমে থাকে আবর্জনা। মাখনবাবুর বাজার এলাকা, রাস্তার ধারের ফুটপাথগুলিতে চলা দায় বলে শহরের বাসিন্দাদের একাংশের অভিযোগ। হলদিয়া মহকুমা হাসপাতাল চত্বর ঘুরলেও আগাছার জঙ্গল চোখে পড়বে। নিকাশি নালাগুলি নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় জমে থাকে জল। হলদিয়ার মহকুমাশাসক পূর্ণেন্দুশেখর নস্কর বলেন, ‘‘পরিস্থিতি আগে আরও খারাপ ছিল। এলাকা এখন অনেক পরিষ্কার হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।’’
বাড়ি বাড়ি শৌচালয় নির্মাণের কাজেও পিছিয়ে হলদিয়া। পঞ্চায়েত এলাকায় কাজ কিছুটা এগোলেও পিছিয়ে পুর এলাকা। পুরসভার এক সূত্রে খবর, দিন কয়েক আগে হলদিয়া পুরসভায় এক বৈঠকে চেয়ারম্যান দেবপ্রসাদ মণ্ডলের কাছে এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেন পুরবিষয়ক মন্ত্রকের সচিব ওঙ্কারনাথ মিনা। ৩০ সেপ্টেম্বরের আগে সব বাড়িতে শৌচাগারের কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন তিনি।
যদিও কোন কোন বাড়িতে শৌচাগার তৈরি বাকি, সেই সংক্রান্ত তালিকাই এখনও পুরসভা তৈরি করতে পারেনি বলে এক সূত্রে খবর। শুক্রবার বিভিন্ন ওয়ার্ডের কাউন্সিলরদের এই তালিকা তৈরি করে কাজ শুরুর নির্দেশ দেন পুরপ্রধান। পুরসভার চেয়ারম্যান দেবপ্রসাদবাবুর অবশ্য দাবি, ‘‘ইতিমধ্যেই হলদিয়া মহকুমায় ১৪০৬টি শৌচালয় তৈরি করা হয়েছে। আরও ১৪০৭টি বাড়িতে শৌচালয় নির্মাণের কাজ
বকেয়া রয়েছে।’’
রাজ্য সমীক্ষক দলের রিপোর্ট অনুযায়ী জেলার ১৫টি ব্লকে এখনও খোলা জায়গায় শৌচকর্ম বন্ধ করা যায়নি। রিপোর্ট অনুযায়ী অবস্থা তথৈবচ তমলুক ও পাঁশকুড়া পুরসভা এলাকাতেও। জেলা স্বাস্থ্য কর্মাধ্যক্ষ পার্থপ্রতিম দাস বলেন, ‘‘শৌচালয় থাকলেও এখনও কিছু মানুষ উন্মুক্ত জায়গায় শৌচকর্ম করতে পছন্দ করেন। এই অভ্যাস বদলে নজরদারি চালানোর জন্য নজরদারি বাহিনীকে বাঁশি ও টুপিও দেওয়া হয়েছে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘অভ্যাসগত কারণে এরপরও যারা উন্মুক্ত স্থানে শৌচকর্ম করবেন তাঁদের রেশন পাওয়া, পঞ্চায়েত থেকে বিভিন্ন শংসাপত্র পাওয়ার সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
শৌচালয় তৈরির কাজে কেন পিছিয়ে জেলা? উত্তরে পার্থপ্রতিমবাবু বলেন, ‘‘জেলায় ৯ লক্ষ পরিবারের মধ্যে মাত্র ৩৫০০ পরিবারে এখনও শৌচালয় গড়া সম্ভব হয়নি। জায়গার অভাব, পরিবার একাধিক ছোট ভাগে ভেঙে যাওয়া ও স্থানাভাবের জন্য সমস্যা রয়েছে।’’ জেলাশাসক রশ্মি কমলেরও বক্তব্য, ‘‘জেলার গ্রামীণ এলাকায় শৌচাগার নির্মাণ, ব্যবহার-সহ পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে আমরা সাফল্য পেয়েছি। শহরগুলিতে এ বিষয়ে কিছু খামতি রয়েছে।’’ তিনি বলেন, ‘‘শহরগুলিকে পরিচ্ছন্ন রাখতে পুরসভা কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে এ বিষয়ে সবরকম সাহায্য করা হবে।’’
(তথ্য: আনন্দ মণ্ডল, সুব্রত গুহ, অপ্রমেয় দত্তগুপ্ত)