হাতির চলাচলের এলাকায় তৈরি হচ্ছে একের পর এক ভিলেজ রিসর্ট, হোম স্টে। হাতি দেখার আকর্ষণ দেখানো হচ্ছে পর্যটকদের। হাতি সম্পর্কে অনভিজ্ঞ পর্যটকদের একাংশ জঙ্গলে চলেও যাচ্ছেন। দু’পয়সা রোজগারের আশায় গ্রামবাসীর কেউ কেউ ‘গাইড’ সেজে পর্যটকদের সঙ্গীও হচ্ছেন। এমনই বিপজ্জনক প্রবণতার মাশুল দিয়েছেন দেবাংশ আগরওয়াল। সোমবার কেঁউদিশোলের জঙ্গলে হাতির হানায় ওই যুবকের মৃত্যুর পরে এমনই দাবি করছেন একাংশ বনকর্মী।
অতিমারিতে মন্দায় পড়া পর্যটনকে চাঙ্গা করতে উদ্যোগী হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। করোনা কালেও ঝাড়গ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্রামীণ ভিলেজ রিসর্ট ও হোম স্টে তৈরি হচ্ছে। কলকাতার বিভিন্ন সংস্থাও বিনিয়োগ করছে। সোমবার ঝাড়গ্রাম ব্লকের নেদাবহড়া অঞ্চলের কেঁউদিশোলের জঙ্গলে দুই বন্ধুর সঙ্গে হাতি দেখতে গিয়েছিলেন কলকাতার বাসিন্দা বছর চব্বিশের দেবাংশ। হাতির ছবি ও নিজস্বী তোলার সময়ই ওই যুবক হাতির হানায় প্রাণ হারান। ঝাড়গ্রাম শহর থেকে কিলোমিটার দশেক দূরে গড়শালবনির একটি ভিলেজ রিসর্টে উঠেছিলেন দেবাংশরা। কলকাতা থেকে আসা ওই তিন তরুণ কী ভাবে কেঁউদিশোলের জঙ্গলে হাতি দেখতে গাড়ি উজিয়ে চলে গেলেন, খতিয়ে দেখছে বন দফতর ও পুলিশ। ঝাড়গ্রামের ডিএফও শেখ ফরিদ বলছেন, ‘‘বনভূমির জঙ্গলে বহিরাগতদের প্রবেশ বেআইনি। কী ভাবে ওই পর্যটকেরা জঙ্গলের ভিতরে ঢুকেছিলেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’
তবে এই ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবসার প্রসারের ভূমিকা চর্চায় উঠে আসছে। প্রাক্তন বনকর্তা সমীর মজুমদার বলছেন, ‘‘পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য অপরিকল্পিত ভাবে জঙ্গলের মধ্যে রায়তি জমিতে রিসর্ট অথবা হোম স্টে হচ্ছে। হাতির গতিপথে পর্যটকদের রাখার ব্যবস্থাটাই বিপজ্জনক। হাতি দেখতে জঙ্গলে যাওয়া বা হাতির সঙ্গে নিজস্বী তোলার চেষ্টাও আত্মহত্যার শামিল।’’ সমীর জানাচ্ছেন, লোধাশুলি ও ঝাড়গ্রাম রেঞ্জের বিস্তীর্ণ খাসজঙ্গলে হাতিরা এখন বছরের অনেকটা সময়ই থাকছে। বর্ষায় ও শীতে এই এলাকায় হাতিদের যাতায়াত বাড়ে।
বন দফতর সূত্রে খবর, সাধারণত, পঞ্চায়েত স্তরে অনুমতি ও ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে গ্রামীণ এলাকার হোম স্টে বা ভিলেজ রিসর্টগুলি হচ্ছে। রায়তি জমিতে হওয়ায় এ ক্ষেত্রে বন দফতরের কিছু করণীয় নেই। সমস্যাটা সেখানেই। বনকর্মীদের একাংশের মতে, উত্তরবঙ্গে হাতির করিডরগুলিতে মাইলের পর মাইল একটানা জঙ্গল। সেখানকার জঙ্গল লাগোয়া রিসর্টের সঙ্গে ঝাড়গ্রামের তুলনা চলে না। কারণ, ঝাড়গ্রামে বহু আগেই থেকেই জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় মাঝে-মাঝে জনপদ গড়ে উঠেছে। ঝাড়গ্রাম জেলা হওয়ার পরে হাতির গতিপথের পরিধি আরও সঙ্কুচিত হচ্ছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, লোকজনের তাড়া খেয়ে হাতিদের স্বভাবও বদলেছে। লোক দেখলে আত্মরক্ষার্থে তেড়ে আসে হাতি। তাই হাতির কাছাকাছি যাওয়াটা অনভিজ্ঞদের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক।
দীর্ঘদিন বন্যপ্রাণীর ছবি তুলছেন ঝাড়গ্রামের বিশ্বরূপ মণ্ডল। তিনি বলছেন, ‘‘পর্যটকদের হাতি দেখানোর প্রলোভন বন্ধ হওয়া উচিত। হাতির করিডরে কোনও রকম অতিথিশালা তৈরি হওয়াটাও বাঞ্ছনীয় নয়।’’ ঝাড়গ্রামের বাসিন্দা রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দেবব্রত সেনও বলেন, ‘‘জঙ্গলে যাওয়াটা যে বেআইনি ও বিপজ্জনক সেটা গোড়াতেই পর্যটকদের জানিয়ে সচেতন করার দায়িত্ব অতিথিশালার কর্তৃপক্ষদেরই নিতে হবে।’’
বেলপাহাড়ির জঙ্গল-পাহাড় এলাকাতেই তৈরি হচ্ছে হোম স্টে। ফাইল চিত্র।
ঝাড়গ্রাম হোটেল ওনার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের আশ্বাস, ‘‘সংগঠনের বৈঠক ডেকে সবাইকে সতর্ক করা হবে।’’ পর্যটন দফতর স্বীকৃত ‘ঝাড়গ্রাম ট্যুরিজম’-এর কর্তা সুমিত দত্তের কথায়, ‘‘প্রতিটি হোম স্টে ও গ্রামীণ রিসর্টের রিসেপশনে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জঙ্গলে না যাওয়ার আবেদন করা হবে। পর্যটকরা জঙ্গলে ঢুকতে চাইলে স্থানীয়রা যাতে বাধা দেন, সেই অনুরোধ করা হবে।’’