Advertisement
E-Paper

আকাশ থেকে নেমে আসা নীল বরফ আসলে কী?

ইস্স্স্! ছ্যা, ছ্যা! এ মা...! দ্বাদশীর রাতে এমনই সব শব্দ বেরোচ্ছিল শাসনের পাকদহের টালির ঘর, বাঁশবন, পুকুরের ধার থেকে। আকাশ থেকে বরফ পড়লেই যাঁরা তুলে মুখে নেন, সাবধান। যাঁরা হাতে তুলে দেখেন, তাঁরাও। ‘ইয়ে’ও হতে পারে!

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০১৬ ০৩:০৫
‘ব্লু আইস’। — নিজস্ব চিত্র

‘ব্লু আইস’। — নিজস্ব চিত্র

ইস্স্স্!

ছ্যা, ছ্যা!

এ মা...!

দ্বাদশীর রাতে এমনই সব শব্দ বেরোচ্ছিল শাসনের পাকদহের টালির ঘর, বাঁশবন, পুকুরের ধার থেকে।

আকাশ থেকে বরফ পড়লেই যাঁরা তুলে মুখে নেন, সাবধান। যাঁরা হাতে তুলে দেখেন, তাঁরাও। ‘ইয়ে’ও হতে পারে!

বৃহস্পতিবার পাকদহের বাসিন্দারা শুধু সেই বরফ হাতে তুলে, মুখে দিয়েই ক্ষান্ত হননি। বাড়ি নিয়ে গিয়ে ফ্রিজেও ঢুকিয়ে দিয়েছেন। সাতসকালে আকাশ থেকে শুধু তো সাধারণ শিলা পড়েনি, ইয়া বড় নীল-বরফ! গ্রামে হই হই। দৌড়ঝাঁপ। এল পুলিশ। খবর গেল ‘জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া’য় (জিএসআই)। বিশেষজ্ঞদের মত মেলেনি। তবে, দিনের শেষে পুলিশ জানিয়েছে, জিএসআই সূত্রে জানানো হয়েছে, ওই নীল-বরফ (ব্লু-আইস) অনেক উঁচু দিয়ে যাওয়া বিমানের শৌচাগারের মল-মূত্রও হতে পারে। শৌচাগারের কমোড সাফাইয়ের নীল কীটনাশকের সঙ্গে মিশে তা কোনও ভাবে বিমান থেকে বেরিয়ে ঠান্ডায় জমে কঠিন বরফের চেহারা নিয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় জানান, পরীক্ষার পরে জিএসআই পুরোপুরি নিশ্চিত ভাবে বস্তুটি সম্পর্কে জানাতে পারবে।

তার আগেই অবশ্য উত্তর ২৪ পরগনার ওই গ্রামে ছিছিক্কার! কেউ কেউ জানিয়ে দিলেন, ভাত আর গলা দিয়ে নামবে না। ফ্রিজ পরিষ্কারেও ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কেউ কেউ!

তখন সকাল সাড়ে ৭টা। ঘটনাস্থল ওই গ্রামের সাকিনা বিবির বাড়ির দাওয়া। ব্যাগ সেলাই করছিলেন সাকিনা। তখনই প্রবল শব্দে বরফ-পতন! পড়েই বেশ কয়েক খণ্ডে সেই নীল-বরফ ছিটকে যায়। তার পরেই ভিড়, জল্পনা। সাহস করে এগিয়ে যান কেউ কেউ। হাত দেন নীল-বরফে। মুখে নেন। দুপুরে এক গ্রামবাসী বলেন, ‘‘খেলাম বটে। তবে, টেস্টি নয়।’’ এক স্কুলছাত্র বলে, ‘‘আমি খাইনি। মিষ্টি গন্ধ বেরোচ্ছিল বলে হাতে নিয়ে শুঁকেছিলাম।’’ রাতে সেই গ্রামবাসীরই আক্ষেপ, ‘‘ছ্যা, ছ্যা, এ কী করলাম!’’ ওই স্কুলছাত্র ঢোঁক গিলছে, ‘‘আমি বেঁচে গিয়েছি। ভাগ্যিস, মুখে দিইনি।’’

বিমান পরিবহণের ভাষায় এই জমাট বাঁধা নীল রঙের বর্জ্যকে ‘ব্লু-আইস’ বলা হয়। ১৯৭৯ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে আমেরিকায় আকাশ থেকে এ ভাবে ‘ব্লু-আইস’ মাটিতে নেমে আসার ২৭টি ঘটনা রয়েছে। কয়েকটিতে আহতদের ক্ষতিপূরণও দিতে হয় বিমান সংস্থাকে। এমনকী, এই ধরনের ঘটনা জার্মানি ও ইংল্যান্ডেও ঘটেছে। সেই তালিকায় অবশ্য ভারতের নাম নেই।

বিমান ইঞ্জিনিয়ার এবং পাইলটদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, বিমানের প্রতিটি শৌচালয়ের নীচে একটি চেম্বার থাকে। সেখানে বর্জ্য জমা হয়। বিমানবন্দরে বিমান নামার পরে সেই বর্জ্য পরিষ্কার করা হয়। এক পাইলটের কথায়, ‘‘সেই চেম্বার কোনও ভাবে ফুটো হয়ে গেলে সেখান থেকে তরল বেরিয়ে যেতে পারে। তা প্রথমে বিমানের পেটের ভিতরে থাকবে। এর পরে যদি পেটের অংশ (প্যানেল) ফুটো হয়ে যায় বা খুলে যায়, তা হলে সেই তরল সেখান থেকে বেরিয়ে আকাশে চলে যাবে।’’

বিমানের শৌচালয় জীবাণুমুক্ত রাখতে ব্যবহার করা হয় এক ধরনের নীল রঙের কীটনাশক। যা সাধারণ গৃহস্থালিতেও ব্যবহার করা হয়। ফলে, বিমানের পেটের ভিতর থেকে শৌচালয়ের তরল যদি বাইরে আসে, তা হলে তার রং নীল হওয়াই স্বাভাবিক। ৩০-৩৫ হাজার ফুট উপরে সেই তরল জমে বরফ হয়ে যায়। ফলে, সেই বরফ নীল রঙের দেখতে হওয়ার কথা। তবে,বিমান পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরলের মধ্যেই পড়ে।

এক পাইলটের কথায়, ‘‘পুরনো যে বিমান নিয়ে এখনও আমরা উড়ে বেড়াই, সেই সব বিমানের পেটের ওই প্যানেল কোনও ভাবে খুলে যেতেও পারে। সে ক্ষেত্রে ককপিটে বসে আমরা কোনও ধরনের সতর্কবার্তাও পাই না। ওই প্যানেল খুলে গেলেও মাঝ আকাশে বিমানের কোনও বড় ধরনের ক্ষতিরও আশঙ্কা থাকে না।’’

ছাপোষা গ্রাম পাকদহে এই জটিল কথা পৌঁছয়নি। অতি উৎসাহে যাঁরা নীল-বরফের স্বাদ নিতে গিয়েছিলেন, তাঁরা এখন মুখ লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন।

Blue ice Pilot Aeroplane
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy