Advertisement
E-Paper

ভাতা বন্ধ, হাজিরা কমছে শিশুশ্রমিক স্কুলে

কৃষ্ণনগর স্টেশন থেকে বহরমপুরগামী রেললাইনের ধারে মতিসুন্দরী বস্তি। বাড়ির ছেলেরা কাগজ কুড়োন আর মেয়েরা ঠিকা-ঝির কাজ করেন। আগে এই সব কাজে বড়দের সঙ্গ দিত বাড়ির ছোটরাও। স্টেশনের ধারে শিশুশ্রমিক স্কুল শুরু হওয়ার পর সেই ছবি অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। পড়াশোনার ফাঁকে হাতের কাজ, সেলাই শেখা—ভাবনার জগতটাই বদলে গিয়েছিল আচমকা।

সুস্মিত হালদার

শেষ আপডেট: ০৯ জুন ২০১৪ ০০:৩২
বাড়ি-বাড়ি গিয়ে পড়ুয়াদের ডাকছেন শিশুশ্রমিক স্কুলের শিক্ষকরা। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য।

বাড়ি-বাড়ি গিয়ে পড়ুয়াদের ডাকছেন শিশুশ্রমিক স্কুলের শিক্ষকরা। ছবি: সুদীপ ভট্টাচার্য।

কৃষ্ণনগর স্টেশন থেকে বহরমপুরগামী রেললাইনের ধারে মতিসুন্দরী বস্তি। বাড়ির ছেলেরা কাগজ কুড়োন আর মেয়েরা ঠিকা-ঝির কাজ করেন। আগে এই সব কাজে বড়দের সঙ্গ দিত বাড়ির ছোটরাও। স্টেশনের ধারে শিশুশ্রমিক স্কুল শুরু হওয়ার পর সেই ছবি অনেকটাই বদলে গিয়েছিল। পড়াশোনার ফাঁকে হাতের কাজ, সেলাই শেখা—ভাবনার জগতটাই বদলে গিয়েছিল আচমকা। কিন্তু টাকার অভাবে সেই স্কুল আজ ধুঁকছে। মাসের পর মাস বেতন না পেয়ে হতাশ শিক্ষক-শিক্ষিকারা। হাতের কাজ শেখানোর উপকরণ কেনার টাকাটাও নেই তাঁদের কাছে। সবচেয়ে বড় কথা মাসিক ভাতা আর পাচ্ছে না স্কুলে পড়তে আসা ছাত্র-ছাত্রীরা। এই অবস্থায় স্কুলের পড়ুয়া সংখ্যা ক্রমশ কমছে। শুধু এই একটিই নয়, নদিয়া জেলার প্রায় সমস্ত শিশুশ্রমিক স্কুলেই ঢ্যাঁড়া বাড়ছে হাজিরা খাতায়।

২০০৬ সালে নদিয়া জেলায় ‘ন্যাশানাল চাইল্ড লেবার প্রজেক্ট’-এর আওতায় ১২টি স্কুল চালু হয়। ক্রমশ বাড়তে-বাড়তে এখন জেলায় শিশুশ্রমিক স্কুলের সংখ্যা ১০০। নিয়ম মতো, ৫০ জনের বেশি পড়ুয়া ভর্তি নেওয়া যায় না এক-একটা স্কুলে। কিন্তু ৫০ জনও বা স্কুলগুলোতে হচ্ছে কই। কৃষ্ণনগরেরই এক স্কুল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, খাতায়-কলমে তাঁদের স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ৫০ হলেও দিন দিন উপস্থিতির হার ক্রমশ কমছে। স্কুলের অনুমোদন বাতিল হয়ে যাওয়ার ভয়ে সংখ্যাটা অবশ্য বাড়িয়েই রাখছেন তাঁরা। সকলেই চাইছেন স্কুলগুলিকে টিকিয়ে রাখতে। কারণ সকলেরই আশা, আগামী দিনে এই স্কুলের আবার সুদিন ফিরবে।

আপাতত এখন দুর্দিন। প্রতিটি স্কুলে তিন জন করে শিক্ষক-শিক্ষিকা থাকার কথা, বেতন চার হাজার টাকা করে। এক জন ক্লার্ক—যাঁর বেতন তিন হাজার টাকা ও এক জন করে সহকারী—যাঁর বেতন দু’হাজার টাকা। কিন্তু প্রতি মাসে এই বেতন হাতে পাওয়ার সৌভাগ্য হয় না কারও। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘ দিন বকেয়া থাকার পর এই বছর জানুয়ারি মাসে শিক্ষক-শিক্ষিকারা দশ মাসের বেতন পেয়েছেন। এখনও তাঁদের প্রায় ২৪ মাসের বেতন বকেয়া পড়ে আছে। কবে তাঁরা সেই বকেয়া বেতন পাবেন কিংবা আদৌ তাঁরা তা পাবেন কি না জানেন না কেউ। একই সঙ্গে বকেয়া পড়ে আছে স্কুলের বাড়ি ভাড়ার টাকা।

প্রথম দিকে ছাত্র-ছাত্রীদের খাওয়ার জন্য দৈনিক পাঁচ টাকা করে দেওয়া হত। ২০১০ সাল থেকে তার পরিবর্তে মিড ডে মিল চালু হয়েছে। তাতে সমস্যা কিছুটা হলেও সমাধান হয়েছে বলে মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। তাঁদের বক্তব্য, আর কিছু না হোক ছেলে-মেয়েগুলোর দুপুরের খাবারটা অন্তত আমরা নিশ্চিত করতে পারি। শুধু মাত্র দুপুরের খাবার পাবে বলে এখনও অনেক দরিদ্র পরিবারের বাবা-মা তাঁদের ছেলে-মেয়েদের এখনও স্কুলে পাঠান।

কিন্তু দু’বেলার খাবারের চেয়েও এই স্কুলে আসার পিছনে যেটা অনুঘটকের কাজ করত, তা হল পড়ুয়াদের ভাতা। যা এখন আর শিশুশ্রমিক স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা পাচ্ছে না। জেলা প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, সাধারণত সংসারে বাড়তি আয়ের জন্য ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের কাজে লাগিয়ে দেন বাবা-মারা। সেই কারণেই ওই শিশুশ্রমিকদের জন্য সামান্য হলেও মাসে একটা ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রথম দিকে একশো টাকা করে ভাতা দেওয়া হত। পরে সেটা বাড়িয়ে দেড়শো টাকা করা হয়। কিন্তু ২০১১ সাল থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের সেই ভাতার টাকা আর আসেনি।

ভাতা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের লোকেরা ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। যে সব ছেলে-মেয়েরা এক সময় কাজ ফেলে স্কুলে আসতে শুরু করেছিল, তারা আবার ফিরে যাচ্ছে পুরনো পেশায়। কৃষ্ণনগরের বেলেডাঙা রেলগেট সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা সোমা বিশ্বাস কাগজ কুড়োন। দুই ছেলে পাশেরই শিশুশ্রমিক স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। কিন্তু ক্রমশ তাদের স্কুলে যাওয়াটা অনিয়মিত হয়ে পড়ছে। দিন কয়েক আগে স্কুলের দুই শিক্ষক-শিক্ষিকা তাদের বাড়িতে ডাকতে গেলে সোমাদেবী পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘‘তোমরা তো টাকা দেবে বলেছিলে। কিন্তু এখনও এক টাকাও পেলাম না। আমার মেয়েও তোমাদের স্কুলে পড়তে যেত। তার কোনও টাকা এখনও পাইনি। শুধু দুপুরে একবার খেতে দিলে আমাদের সংসার চলবে?’’

এই প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক তৃষিত মৈত্র বলেন, ‘‘এত দিন আমরা ভাতার বিষয়টি আজ না কাল বলে কাটিয়ে দিয়েছি। অভিভাবকরা আমাদের কথা বিশ্বাস করে এসেছেন। কিন্তু বছরের পর বছর টাকা না পেয়ে তাঁরাও হতাশ। ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠানোর উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন তাঁরা।’’

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, জেলার একশোটি স্কুল চালাতে বছরে প্রায় ৩ কোটি ৩২ লক্ষ টাকা প্রয়োজন। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সেখানে মিলেছে প্রায় ১ কোটি ৬৬ লক্ষ টাকা। ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে মাত্র ৭৫ লক্ষ টাকা পাওয়া গিয়েছিল। ফলে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতন বকেয়া হয়ে যায়। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে ২ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা পাওয়ার পর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ১০ মাসের বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। এখনও হাতে যে টাকা আছে তা দিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের আরও দু’মাসের বেতন দেওয়া যাবে বলে জেলা প্রশাসনের এক কর্তা জানিয়েছেন।

কিন্তু যেটুকু টাকা মিলছে, তাতে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শুধু বেতন না দিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের ভাতার টাকা কিছুটা দেওয়া হচ্ছে না কেন? প্রশাসনের বক্তব্য, প্রাপ্ত টাকার মধ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের ভাতাও ধরা আছে কিনা তা পরিষ্কার করে কিছু বলা নেই। বিষয়টি পরিষ্কার করে জানতে কেন্দ্র সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে চিঠি করা হয়েছে। চিঠির উত্তর পেলেই ছাত্র-ছাত্রীদের ভাতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেই কারণেই পুরো টাকা দিয়ে শিক্ষকদের বেতন না দিয়ে দু’মাসের টাকা রেখে দেওয়া হয়েছে। নদিয়ার জেলাশাসক পি বি সালিম বলেন, ‘‘শিশুশ্রমিক স্কুলের জন্য আমরা টাকা পাচ্ছি না। সেই কারণে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের বেতনের পাশাপাশি ছাত্র-ছাত্রীদের ভাতার টাকাও আমরা দিতে পারছি না। আমরা কেন্দ্রকে এই বিষয়ে একাধিকবার চিঠি করেছি।’’

এ দিকে, শিশুশ্রমিক স্কুলে হাতের কাজ শেখানোটা বন্ধ হয়ে যাওয়াও উৎসাহে ভাটার বড় কারণ। স্কুলগুলিতে আগে হাতের কাজ শেখানো হত। তাতে উৎসাহিত হয়ে মেয়েরা কাজের ফাঁকে দু-তিন ঘণ্টার জন্য হলেও নিয়মিত স্কুলে আসত। হাতের কাজ শেখানো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে ওই অংশও স্কুলে আসার উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিটি স্কুলের ‘ভোকেশানাল’ শিক্ষার উপকরণ কেনার জন্য বছরে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা। কিন্তু ২০১২ সালে স্কুলগুলিকে পাঁচ হাজার টাকার উপকরণ কিনে দেওয়া হয়েছিল। তারপরে ২০১৩ সালের জুলাই মাসে দেওয়া হয়েছে আড়াই হাজার টাকা করে। ব্যাস ওই পর্যন্তই।

এক শিশুশ্রমিক স্কুলের শিক্ষিকা লিলি ঘোষ বৈরাগী বলেন, ‘‘আমরা পুঁতির মালা, প্রতিমার গয়না, বাচ্চাদের জামা-প্যান্ট এমনকী পাট দিয়ে নানা রকম জিনিস তৈরি করা শেখাতাম। সে সব শেখার জন্য মেয়েরা নিয়মিত স্কুলে আসত। এখন টাকার অভাবে উপকরণ কিনতে না পারায় সেই সব উদ্যোগ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।” স্কুলের শিশুশ্রমিক ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে একটি নাটকের দলও তৈরি করেছিলেন তৃষিতবাবুরা। আয়োজন করেছিলেন শিশু শ্রমিক নাট্য মেলার। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে তাঁরা একাধিক নাটকও করে এসেছেন। সে সবও বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তৃষিতবাবু বলেন, ‘‘স্কুলেই আসতে চাইছে না কেউ, নাটক করবে কী? অথচ এই নাটকের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা বিরাট মানসিক পরিবর্তন আসছিল। তারা অন্য ভাবে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। সে সব কিছুই আর থাকল না।’’ একই কথা বলেছেন কৃষ্ণনগর শহরের আর একটি শিশুশ্রমিক স্কুলের শিক্ষক অঞ্জন সাহা। তিনি বলেন,‘‘আমরা আমাদের স্কুলে মেশিনে উল বোনা শেখাতাম। মেয়েরা খুবই উৎসাহ নিয়ে স্কুলে আসত। কারণ তারা বুঝতে পেরেছিল যে এই কাজটা ভাল ভাবে শিখতে পারলে একটা সম্মানজনক জীবিকা পাবে। টাকার অভাবে সেই প্রশিক্ষণও বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছি আমরা।

এই ভাবেই একদিন যে স্কুলগুলি বিশাল সম্ভাবনা দেখিয়েছিল আজ তা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সরকার বিভিন্ন সময় নানা প্রকল্প শুরু করে। কিন্তু পরে সেই প্রকল্প চালু রইল কি না, তা দেখারও কেউ থাকে না।

susmit haldar child labour child labour school krishnanagar
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy