Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৯ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

স্বাস্থ্যে কাঁপুনি ধরিয়ে খবরদারি মাজিবাবুর

তিনি চান তাবৎ সরকারি চিকিৎসককুল তাঁর বশংবদ থাকুন। এমনকী তাঁর অধীনে থাকুন মেডিক্যাল কলেজগুলির অধ্যক্ষরাও। তিনি যেন অধ্যক্ষদের চেয়ারে বসেই সকল

সোমা মুখোপাধ্যায় ও পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা ০৫ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:০৮
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে অধ্যক্ষের ঘরের চেনা ছবি। অধ্যক্ষ তপনকুমার লাহিড়ি সরে গিয়েছেন টেবিলের এককোণে। তাঁর জায়গায় চেয়ার টেনে বসে পড়েছেন তৃণমূলের চিকিৎসক-নেতা নির্মল মাজি (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র

কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে অধ্যক্ষের ঘরের চেনা ছবি। অধ্যক্ষ তপনকুমার লাহিড়ি সরে গিয়েছেন টেবিলের এককোণে। তাঁর জায়গায় চেয়ার টেনে বসে পড়েছেন তৃণমূলের চিকিৎসক-নেতা নির্মল মাজি (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র

তিনি চান তাবৎ সরকারি চিকিৎসককুল তাঁর বশংবদ থাকুন। এমনকী তাঁর অধীনে থাকুন মেডিক্যাল কলেজগুলির অধ্যক্ষরাও। তিনি যেন অধ্যক্ষদের চেয়ারে বসেই সকলকে ‘শাসন’ করতে পারেন। নির্দেশ দিতে পারেন। কারণ তাঁর নিজের কথাতেই, ‘পদবলে আমি স্বাস্থ্য দফতরের মাথায়।’

তিনি শ্রীযুক্ত নির্মল মাজি। যিনি অবলীলায় অধ্যক্ষের চেয়ার টেনে বসে পড়েন। অবলীলায় কোনও হাসপাতালের সুপার বা অধিকর্তাকে মুড়ি-মিষ্টি নিয়ে আসার ফরমায়েশ করেন। কেউ সামান্য ইতস্তত করলে তাঁকে সকলের সামনে যথেচ্ছ তিরস্কারও করেন। এক কথায়, মেডিক্যাল কলেজগুলিতে সমান্তরাল প্রশাসন চালান তিনি।

মাস কয়েক আগে তাঁর নির্দেশেই এসএসকেএমের নেফ্রোলজি বিভাগে একটি কুকুরের ডায়ালিসিসে সবুজ সঙ্কেত দিতে বাধ্য হয়েছিলেন অধ্যক্ষ। শেষ মুহূর্তে সেই পরিকল্পনা বাতিল হয়। যদিও ক’দিন পরেই নির্মলবাবু ফের আবদার করেছিলেন, তাঁর ডাক্তারি-পড়ুয়া ছেলের পরীক্ষার সময় পরীক্ষাকেন্দ্রের সিসিটিভি ক্যামেরা যেন বন্ধ রাখা হয়। এবং চেয়েছিলেন, ছেলে যাতে নিজের পছন্দমতো জায়গায় বসে পরীক্ষা দিতে পারে!

Advertisement

মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত এই চিকিৎসক নেতার সাম্প্রতিক কীর্তি একটি অলিখিত ফরমান। সম্প্রতি বিভিন্ন হাসপাতালে ফোন করে কিংবা সশরীরে গিয়ে তিনি হুকুম জারি করেছেন, কোন কোন ডাক্তার এখনও তৃণমূলের ইউনিয়নে নাম লেখাননি, তাঁদের তালিকা তৈরি করে তাঁকে দিতে হবে। এক মাসের মধ্যে এই নির্দেশ না মানলে ‘লঙ্কাকাণ্ড’ বাধানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি।

নির্মলবাবুর মুকুটে এই মুহূর্তে অনেক পালক। তিনি তৃণমূল বিধায়ক, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি, চিকিৎসক সংগঠন ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সভাপতি এবং একাধিক মেডিক্যাল কলেজের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান। তাঁর হুমকি শুনে ইতিমধ্যেই তালিকা তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন বহু হাসপাতাল কর্তা। একে তো মুখ্যমন্ত্রীর ‘ফ্রি’ চিকিৎসার ঘোষণার জেরে হাসপাতাল কর্তাদের ভোগান্তির শেষ নেই, তার ওপর এই বাড়তি উপদ্রবে ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা’ অনেকেরই।

কী চাইছেন নির্মল? তাঁর ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, ‘‘দাদার একটাই উদ্দেশ্য। সকলকে এক ইউনিয়নের ছাতার তলায় আনা। না হলে সরকারি হাসপাতালে অন্তর্ঘাত চলতে পারে বলে খবর আছে ওঁর কাছে। দাদা বলেছেন, ‘যাদের খাব-পরব, তাদের অনুগত হব না’— এই মানসিকতা তিনি বরদাস্ত করবেন না।’’

সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ জানাচ্ছেন, এমন অপমানিত তাঁরা আগে কখনও বোধ করেননি। যে ভাবে প্রতি পদে তাঁদের অপদস্থ করা হচ্ছে, তাতে তাঁদের পক্ষে সরকারি চাকরিতে বেশিদিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। এক মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষের কথায়, ‘‘আমাকে ওই তালিকা তৈরি করতে বলায় আমি বলেছিলাম, এটা আমার কাজ নয়। আর আমি ডাক্তারদের কী ভাবেই বা এই প্রশ্ন করতে পারি? তার উত্তরে বলা হল, না পোষালে যেন চাকরি ছেড়ে দিই। স্বাস্থ্য ভবনে সবাই সব জেনেও চুপ। এ ভাবে কত দিন চলবে বুঝতে পারছি না।’’

নির্মলের কোনও হেলদোল নেই। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, ‘‘কেন? এতে অন্যায়ের কী আছে? আর কী করব, তার কৈফিয়ত সকলকে দিতে হবে নাকি? স্বাস্থ্য দফতরে কাজ করতে হলে আমার কথা মেনে চলতে হবে।’’

মেনে যে চলছেন অনেকেই, মেডিক্যাল কলেজগুলিতে ঘুরলেই তার প্রমাণ মেলে। তিনি ঘরে ঢুকলে তাঁকে চেয়ার ছেড়ে দেন বেশির ভাগ অধ্যক্ষই। তিনি সটান বসে পড়েন অধ্যক্ষের চেয়ারে! সব সময় আবার অধ্যক্ষের জন্য বরাদ্দ কাঠের চেয়ার তাঁর পছন্দ হয় না। তাই তাঁর জন্য বিশেষ অর্ডার দিয়ে বানানো লম্বা-কালো গদি আঁটা চেয়ার রয়েছে। অধ্যক্ষকে টেবিলের এককোণে সরিয়ে তিনিই সেই কালো চেয়ারে অধ্যক্ষের জায়গা দখল করে বসেন। হাসপাতালের নানা প্রশাসনিক বিষয়ে তখন তাঁর সঙ্গেই কথা বলতে হয়। তাঁর নির্দেশই বাকি শিক্ষক-চিকিৎসকদের শিরোধার্য করে নিতে হয়। অর্থাৎ সেই সময়টুকু অলিখিত অধ্যক্ষ হিসেবেই বিরাজ করেন তিনি! কিছু কলেজে অধ্যক্ষের ঘরের লাগোয়া অ্যান্টি-চেম্বারটি ‘মাজিবাবুর ঘর’ বলেই পরিচিত। সেখানে যখন তখন তাঁর অবাধ যাতায়াত।

একাধিক অধ্যক্ষের আফশোস, কলেজের যে কোনও অনুষ্ঠানে তাঁকে সভাপতি করতে চাপ দেওয়া, ছাত্রদের সামনে অধ্যক্ষকে কটূ ভাষায় ধমকানো, পাশ-ফেল করানো কিংবা বদলি-পোস্টিং নিয়ে ‘নির্দেশ’ জারি— এ সবই নির্মল করেন অধ্যক্ষের ঘরে বসে। এক অধ্যক্ষের কথায়, ‘‘আমাদের কোনও স্বাধীনতা নেই। কোনও চিকিৎসক কাজে ফাঁকি দিচ্ছেন, কিংবা কোনও পড়ুয়া হয়তো শৃঙ্খলা ভেঙেছে, হয়তো আমরা তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছি, এমন সময় নির্মলবাবুর নির্দেশ আসে, ওই চিকিৎসক তাঁদের সংগঠনের সদস্য। তাই কিচ্ছু করা যাবে না। তিনি সংগঠনের কাজ সামলে যতটুকু সময় হাসপাতালে দেওয়ার, ততটুকুই নাকি দেবেন!’’ আর এক অধ্যক্ষের কথায়, ‘‘ধরা যাক কোনও ডাক্তারের বদলির নির্দেশ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু মাসের পর মাস তাঁকে আমরা ছাড়তে পারি না। কারণ নির্মলবাবুর নির্দেশ আসে, যে করেই হোক ওই ডাক্তারকে ধরে রাখতে হবে। আমরা ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে রয়েছি।’’ স্বাস্থ্য ভবন সূত্র বলছে, নির্মলবাবু প্রতি মুহূর্তে বুঝিয়ে দেন, তাঁকে বাদ দিয়ে স্বাস্থ্য দফতরে কোনও কাজই হবে না। এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ চিকিৎসকেরও অভিযোগ, নির্মলবাবুর অঙ্গুলিহেলন ছাড়া স্বাস্থ্য দফতরে একটি ফাইলও নড়ে না।

অভিযোগ জমতে জমতে প্রায় পাহাড়। কী বলছেন তৃণমূলের চিকিৎসক-নেতা?

নির্মলবাবুর দাবি, ‘‘আমি রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি। তাই পদবলে আমি স্বাস্থ্যসচিব, স্বাস্থ্য অধিকর্তা, স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা এবং সব অধ্যক্ষদের উপরে। আমি তাই যেকোনও মেডিক্যাল কলেজে অধ্যক্ষদের চেয়ারে বসতেই পারি।’’ তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, অধ্যক্ষরা তাঁকে ভালবাসেন বলেই নাকি জায়গা ছেড়ে দেন! আর অধ্যক্ষদের কাজে তাঁর হস্তক্ষেপ নিয়ে নির্মলবাবু বক্তব্য, ‘‘আমি একাধিক মেডিক্যাল কলেজে রোগী কল্যাণ সমিতির প্রধান। সেখানে গিয়ে আমি কলেজ সম্পর্কে খোঁজ নিতেই পারি। ছাত্র, শিক্ষক-চিকিৎসকেরা আমার কাছে তাঁদের সুবিধে-অসুবিধে জানাতেই পারেন। এটা আমার অধিকারের মধ্যেই পড়ে।’’

রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি কোন পদাধিকার বলে স্বাস্থ্যসচিবের উপরে থাকতে পারেন?

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের সঙ্গে একাধিক বার এ ব্যাপারে যোগাযোগের চেষ্টা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএসেরও জবাব দেননি। স্বাস্থ্যসচিব মলয় দে কোনও কথা বলতে চাননি। স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথীর কথায়, ‘‘অধ্যক্ষদের জায়গায় কে, কখন গিয়ে বসছেন বলতে পারব না। তবে, রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের কোনও সিদ্ধান্ত পদাধিকার বলে স্বাস্থ্যসচিব আটকে দিতে পারেন বা পুনর্বিবেচনা করার নির্দেশ দিতে পারেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, পদমর্যাদায় কে কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন।’’ তা হলে নির্মলের বিরুদ্ধে কখনওই কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? এই প্রশ্নের কোনও উত্তর মেলেনি স্বাস্থ্য কর্তার কাছে।

তৃণমূল সংগঠনের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এমন মরিয়া দশা কেন নির্মলের?

স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ১৩ হাজার। এর মধ্যে তৃণমূলের সংগঠনে নাম লিখিয়েছেন ৫৪০০ জন। আর সিপিএম প্রভাবিত সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব হেলথ সার্ভিস ডক্টরস (এএইচএসডি)-এর সদস্য সংখ্যা কমতে কমতে ১৩০০-তে ঠেকেছে। বাকি ডাক্তাররা তা হলে কোন দিকে? বিভিন্ন স্তরে কথা বলে জানা গিয়েছে, ডাক্তারদের একটা বড় অংশই এখন কোনও ইউনিয়নে নাম লেখাতে চাইছেন না। কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি স্তরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়েই এই সিদ্ধান্ত। স্বাস্থ্য কর্তারা জানাচ্ছেন, ডাক্তারদের একাংশের এই একরোখা ভাবটাই স্বস্তি দিচ্ছে না নির্মলকে। তাই তাঁদের নিজের সংগঠনের ছাতার তলায় না আনতে উঠেপড়ে লেগেছেন তিনি।

এএইচএসডি কেন এ ব্যাপারে কোনও পাল্টা কর্মসূচি নিচ্ছে না? সংগঠনের এক নেতার কথায়, ‘‘আমরা আর কী বলব? নির্মলবাবু যে ভাবে ডাক্তারদের তৃণমূলের ইউনিয়নে নাম লেখানোর নির্দেশ দিচ্ছেন, সেটা তো উনি করতে পারেন না। আমরা প্রতিবাদ করছি। কিন্তু সমস্যা হল, বেশির ভাগ ডাক্তারই ওঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।’’ সংগঠনের আর এক নেতা বলেন, ‘‘এটা তো অনেকদিন আগেই শুরু করেছেন। সম্প্রতি আরজিকরে এক অনুষ্ঠানে গিয়েও আমাদের ইউনিয়নের সদস্যদের বদলি করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। যাঁরা মনেপ্রাণে নির্মলকে অপছন্দ করেন, তাঁরাও ভয় পেয়ে ওঁর দলে নাম লেখাচ্ছেন।’’

তৃণমূলের ডাক্তার ইউনিয়নের (প্রোগ্রেসিভ ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন)-এর সম্পাদক শান্তনু সেনের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ‘‘আমার এ বিষয়ে কিছু জানা নেই। তাই মন্তব্য. করতে পারব না।’’ যদিও স্বাস্থ্য দফতরের অন্দরে গুঞ্জন, শান্তনুবাবুর অবস্থাও অধ্যক্ষদের মতোই। কাগজে-কলমে তিনি সংগঠনের প্রধান হলেও সেখানেও ছড়ি ঘোরান নির্মল। স্বাভাবিক ভাবেই এ ব্যাপারে তাঁর পক্ষে কোনও মন্তব্য করা অসম্ভব!

তাই কুকুর-কাণ্ডের পর রাজভবন থেকে চিঠি এলেও তাকে থোড়াই কেয়ার করে অটুট থেকে যায় শ্রীযুক্ত নির্মল মাজির রাজ্যপাট!

আরও পড়ুন

Advertisement