রবিবার সকাল ১১টা। ময়ূরেশ্বরের নান্দুলিয়া গ্রামের বাতাস ক্রমে ভারী হয়ে উঠেছিল। কারও গলায়, ‘গোপাল মাড্ডি অমর রহে’ স্লোগান। কেউ দিচ্ছেন ‘ভারতীয় সেনাবাহিনী জিন্দাবাদ’ ধ্বনি। সিকিমে হরপা বানে মৃত গ্রামের ছেলে গোপালের কফিনবন্দি দেহ তখন সবে ফিরেছে। শোকে কাতর গোটা পাড়া। কালীপুজোয় ঘরে ফিরবেন বলে কথা দিয়েছিলেন গোপাল। কিন্তু তাঁর এমন প্রত্যাবর্তন চাননি কেউই।
সকাল থেকেই গুমরে ছিল গোটা গ্রাম। গোপালের দেহ আসতেই ভিড় আছড়ে পড়ল গোপালের বাড়িতে। সকলের চোখেই মেঘ ভাঙা কান্না। প্রিয় গোপালকে শেষ বিদায় জানাতে হাজির ছিলেন তাঁর বন্ধুবান্ধব, গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা। এসেছিলেন পড়শি গ্রামগুলির বহু বাসিন্দা। এ দিন সকাল ১১টা নাগাদ সাঁইথিয়া সংলগ্ন তালতলায় এসে পৌঁছয় সেনাবাহিনীর শকট। জাতীয় পতাকা হাতে মোটরবাইকের কনভয় এগিয়েছে। তার পরে ছিল গাড়িতে কফিনে শায়িত গোপালের নিথর দেহ। গোপাল ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর নামে জয়ধ্বনি দিতে দেখা গিয়েছে হাজির জনতাকে।
গোপালের দেহ যখন তাঁর বাড়ি পৌঁছয়, তখন মহল্লায় পিন পতন নীরবতা। গোপালের জীবনে আচমকা এমন জবনিকাপাত কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বিস্মিত সকলেই। গোপালের বাড়ির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এক জন বলছিলেন, ‘‘কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, আমি যেন এক দুঃস্বপ্ন দেখছি। স্বপ্ন ভেঙে দেখব, সব আগের মতো আছে।’’
বাড়ি ফিরেছে স্বামীর দেহ। টানা তিন দিনের কান্নায় চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছে। গোপালের দেহে মালা দিতে গিয়ে গলা বুজে এসেছিল তাঁর স্ত্রী মাম্পির। বাড়িতে আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রথা অনুযায়ী পারলৌকিক কাজের পরে গ্রাম সংলগ্ন মাঠে তাঁকে 'গার্ড অফ অনার' দেওয়া হয়। পুলিশ প্রশাসনের কর্তাদের পাশাপাশি তাঁর দেহে মালা দেন পরিবারের লোকজনও। শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর সেনাবাহিনী এবং পুলিশ প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ময়ূরাক্ষী শ্মশানঘাটে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
গোপালের কাকা রঘুনাথ মাড্ডি বলছিলেন, ‘‘সেনাবাহিনীতে যাঁরা কাজ করতে যান, তাঁরা জীবন বাজি রাখেন। দেশরক্ষায় যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবিলা করতে গিয়ে মৃত্যু হলে একটা সান্ত্বনা মিলত। কিন্তু দুর্যোগে মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না।’’
২০১৪-এ সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল বিভাগে যোগ দেন গোপাল। জলপাইগুড়ির বিন্নাগুড়িতে কর্মরত ছিলেন তিনি। কয়েক দিন ধরে ডিউটি করছিলেন সিকিমের না থুলা সংলগ্ন হরভজন সিংহ মন্দিরে। মঙ্গলবার ডিউটি সেরে বিন্নাগুড়ি ফেরার পথে দুর্যোগের কবলে পড়ে মৃত্যু হয় তাঁর। শুক্রবার সেই দুঃসংবাদ এসে পৌঁছয় গোপালের বাড়ি।
এ দিন মৃত জওয়ানকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর বাড়িতে হাজির হয়েছিলেন জেলা পরিষদের সভাধিপতি তথা তৃণমূল নেতা কাজল শেখ, সহ-সভাধিপতি স্বর্ণলতা সোরেন, মহকুমাশাসক (রামপুরহাট) সাদ্দাম নাভাস, এসডিপিও (রামপুরহাট) ধীমান মিত্র, বিধায়ক অভিজিৎ রায়, বিডিও দীপাঞ্জন জানা, বিজেপির সাংগঠনিক জেলা (বোলপুর ) সভাপতি সন্ন্যাসীচরণ মণ্ডল, বিজেপির রাজ্য কমিটির সহ-সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি জটিল মণ্ডল প্রমুখ।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)