×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১০ মে ২০২১ ই-পেপার

মমতার ইচ্ছাই মানলেন প্রভু

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ২১ অগস্ট ২০১৫ ০৩:৩৪
মমতা-প্রভু বৈঠক। বৃহস্পতিবার নবান্নে। — নিজস্ব চিত্র।

মমতা-প্রভু বৈঠক। বৃহস্পতিবার নবান্নে। — নিজস্ব চিত্র।

মাতৃভূমির অধিকার মেয়েদেরই রইল।

রেলমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই মেয়েদের জন্য বিশেষ ট্রেন মাতৃভূমি লোকাল চালু করেছিলেন। সেই তিনিই আবার আসরে নামলেন। বৃহস্পতিবার বর্তমান রেলমন্ত্রী সুরেশ প্রভুর সঙ্গে একান্ত বৈঠকে মমতা প্রসঙ্গটি তোলেন। তাঁর অনুরোধ মেনে নিয়ে সন্ধেয় প্রভু জানিয়ে দেন, সব শাখাতেই মাতৃভূমি লোকাল আগের চেহারায় ফিরে যাবে। অর্থাৎ পুরো ট্রেনটাই মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

সোমবার খড়দহে এবং বুধবার বনগাঁ-শিয়ালদহ শাখার বিভিন্ন স্টেশনে মাতৃভূমি লোকালে সাধারণ কামরা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে যে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে, লক্ষণীয় ভাবে মমতা সে বিষয়ে কোনও কথাই বলেননি এ ক’দিন। প্রশাসনিক সূত্রের খবর, মমতা আসলে প্রভুর সঙ্গে বৈঠকটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তিনি ঠিক করেই রেখেছিলেন, মাতৃভূমির প্রসঙ্গটি তিনি রেলমন্ত্রীর সামনে তুলবেন। এ দিন সেটাই হল। মমতার অনুরোধেই যে রেল তাদের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলল, সে কথা স্পষ্টই জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী। মমতার সঙ্গে বৈঠকের পরে তিনি বলেন, ‘‘মাতৃভূমি-র মধ্যে মা-মাটি-মানুষের ‘মা’ আছেন। আমাদের সকলের মা। তাঁর জন্য একটা সম্মান থাকতেই হবে।’’ আর মুখ্যমন্ত্রী নিজে বলেন, ‘‘ওটা তো আমারই ঘোষণা

Advertisement

করা ট্রেন। তাই উনি (প্রভু) রাজি হলেন। মাতৃভূমি লোকাল যে মহিলাদের জন্যই থাকবে, রেল তা জানিয়ে দেবে।’’

২০১০ সালে তৎকালীন রেলমন্ত্রী মমতা শিয়ালদহ ও হাওড়া শাখায় নিত্যযাত্রী মহিলাদের সুবিধার্থে মাতৃভূমি লোকাল চালু করেছিলেন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান যাত্রীসংখ্যার চাপ সামাল দিতে ২০১২ সালে হাওড়া-খড়্গপুর শাখায় মাতৃভূমির মাঝখানের তিনটি কামরায় পুরুষ যাত্রীদের ওঠার অনুমতি দেয় রেল। গত বছর শিয়ালদহ দক্ষিণেও ওই একই নিয়ম চালু হয়। বাকি ছিল শিয়ালদহ মেন ও বনগাঁ লাইনের চারটি মাতৃভূমি ট্রেন। স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন, গত শনিবার ওই চারটি ট্রেনেও তিনটি করে কামরায় পুরুষদের ওঠার অনুমতি দেয় পূর্ব রেল। তার পরেই সোমবার রানাঘাট-শিয়ালদহ মাতৃভূমি লোকাল আটকে খড়দহে বিক্ষোভ দেখান মহিলা যাত্রীরা।

তখন রেল জানায়, শিয়ালদহ মেন ও বনগাঁ লাইনে মাতৃভূমি লোকালে পুরুষদের উঠতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হচ্ছে।

কিন্তু মঙ্গলবার রেলকর্তারা জানান, শিয়ালদহ-রানাঘাটেই কেবল সিদ্ধান্ত স্থগিত থাকছে। বনগাঁ-শিয়ালদহ লাইনের মাতৃভূমি লোকালে তিনটি করে কামরায় পুরুষরা উঠতে পারবেন। বুধবার সকালে এই খবর চাউর হতেই শিয়ালদহ-বনগাঁ শাখার বিভিন্ন স্টেশনে শুরু হয়ে যায় ব্যাপক বিক্ষোভ। মহিলা ও পুরুষ যাত্রীদের বাদানুবাদ রীতিমতো খণ্ডযুদ্ধের আকার নেয়। মহিলাদের লক্ষ্য করে গালিগালাজ-মারধর-শ্লীলতাহানির অভিযোগও ওঠে। পূর্ব রেলের তরফে তখনও বলা হয়েছিল, ‘‘বিজ্ঞপ্তি থেকে সরে আসা হচ্ছে না।’’ কিন্তু এ দিন রেলমন্ত্রী নিজেই সিদ্ধান্ত বদলের কথা ঘোষণা করে দিলেন। যার জেরে হাওড়া-খড়গপুর এবং শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখাতেও মাতৃভূমিতে ওঠার অধিকার হারাতে চলেছেন পুরুষরা। কবে থেকে নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে? রেলমন্ত্রী জানান, সমস্ত শাখায় মাতৃভূমি লোকালকে তার আগের চেহারায় ফিরিয়ে দিতে দু’দিন সময় লাগবে। উপযুক্ত সময়ে নতুন বি়জ্ঞপ্তি জারি করবে রেল।

গত সোমবার থেকে মাতৃভূমি লোকাল নিয়ে গোলমাল শুরু হলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনও রা কাড়েননি। তাঁর চালু করা সিদ্ধান্ত রেল বদলে দেওয়ার পরেও মুখ্যমন্ত্রীর তরফে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি। কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রীর সফরের জন্যই তিনি অপেক্ষা করছিলেন বলে নবান্ন

সূত্রে জানানো হয়েছে। রেলমন্ত্রীর এই সফরের দিকে‌ তাকিয়েই বুধবার মাতৃভূমির বিক্ষোভ সংঘটিত হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে কোনও কোনও মহলে। কারণ, হাওড়া এবং শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখায় মাতৃভূমির সঙ্গে যখন সাধারণ কামরা চালু করা হয়, তখন তা নিয়ে কোনও বিক্ষোভ হয়নি। সোমবার থেকে শিয়ালদহ মেন শাখায় এই ব্যবস্থা কার্যকর করাতেই গোলমালের শুরু।

বৃহস্পতিবার অবশ্য বনগাঁ এবং শিয়ালদহ মেন শাখায় তিনটি সাধারণ কামরা নিয়েই চলেছে মাতৃভূমি লোকাল। প্রতিটি স্টেশনে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন ছিল। কোনও গোলমালের খবর মেলেনি। এ দিন সকাল ৭-৪০ মিনিটে রানাঘাট থেকে ডাউন মাতৃভূমি লোকালে আরপিএফ এবং জিআরপি মিলিয়ে অতিরিক্ত ২০ জন নিরাপত্তা রক্ষী ছিলেন। ছিলেন মহিলা পুলিশকর্মীও। রানাঘাট জিআরপি-র আইসি সুভাষ রায় জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই এমন পদক্ষেপ করা হয়েছে। তবে বনগাঁ শাখায় যে সব মহিলা যাত্রী বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন, তাঁদের বেশির ভাগই এ দিন মাতৃভূমি লোকাল এড়িয়ে গিয়েছেন। এমনই এক মহিলা যাত্রী বলেন, ‘‘যে ভাবে বিভিন্ন বৈদ্যুতিন মাধ্যম বুধবার আমাদের ছবি দেখিয়েছে, তাতে বাড়ির লোকেরা ওই ট্রেনে এ দিন আর উঠতে দেননি। অনেক আগে বেরিয়ে অন্য ট্রেন ধরেছি।’’

আর এক মহিলা যাত্রীকে এ দিন তাঁর স্বামী সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। একা ছাড়তে চাননি স্ত্রীকে। এ দিন সন্ধেয় মাতৃভূমি লোকাল মেয়েদের জন্য ফিরিয়ে দেওয়ার খবরে ওই মহিলাকে কিন্তু উচ্ছ্বসিত বলে মনে হয়নি। বরং তাঁর মন্তব্য, ‘‘এর ফলে রেষারেষির পরিবেশ জিইয়ে রাখা হল। এর চেয়ে ১২ কামরার মাতৃভূমি ট্রেনে তিনটি বা চারটি সাধারণ কামরা জুড়ে দিলে সমস্যার শান্তিপূর্ণ মীমাংসা হতে পারত।’’ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য সুজন চক্রবর্তীর মত হল, ‘‘সব ক’টা ট্রেন ১২ বগি করে সেখানে তিন বা চারটে কামরা মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হলে ভাল হতো, সেটাই যুক্তিসঙ্গত।’’ কংগ্রেসের তরফে মাতৃভূমি লোকাল মেয়েদের জন্য রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানো হলেও এর পিছনে ‘রাজনীতি’ রয়েছে বলে কটাক্ষ করা হয়েছে। প্রদেশ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘বিজেপি-র সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হৃদ্যতা এখন এতই গভীর যে, তিনি যা-ই অনুরোধ করছেন, তা-ই তারা সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিচ্ছে।’’ বিজেপি বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য দাবি করছেন, এর মধ্যে রাজনীতির লাভ-ক্ষতির কোনও অঙ্ক নেই।

তবে সার্বিক ভাবে এ দিনের ঘোষণার পরে যথারীতি মহিলা ও পুরুষ যাত্রীদের মতামত দু’ভাগে ভাগই হয়ে গিয়েছে। হাতিবাগানের একটি কলেজের শিক্ষিকা শিউলি বিশ্বাস বলেন, ‘‘এই সিদ্ধান্তে আমি খুশি। মাতৃভূমি কোনও সাধারণ ট্রেনের বদলে চালু করা হয়নি। তা হলে ওঁদের (পুরুষ) কী অসুবিধা?’’ কলেজছাত্রী দীপিকা বসু বলেন, ‘‘দু’দিন ঝামেলার পরে এই সিদ্ধান্তে স্বস্তি পেলাম।’’ উল্টো দিকে বনগাঁর বাসিন্দা সোমনাথ গঙ্গোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘এই সিদ্ধান্ত মোটেই ঠিক হল না। গোটা ট্রেনের মধ্যে ৩টি কামরা পুরুষদের জন্য থাকলে কী অসুবিধা?’’ বনগাঁরই এক কলেজ ছাত্র কাব্যতীর্থ সাহার কথায়, ‘‘রেলের এই সিদ্ধান্ত মোটেই ঠিক হয়নি। এর ফলে সমস্যা আরও বাড়বে।’’

Advertisement