×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০২ অগস্ট ২০২১ ই-পেপার

স্বাস্থ্য সঙ্কট আরও জটিল, বিক্ষোভে অনড় ডাক্তাররা, রাতে ইস্তফা এনআরএস অধ্যক্ষেরও

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ১৩ জুন ২০১৯ ১৮:০৬
গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

মুখ্যমন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পার হয়ে গিয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বিন্দুমাত্র। বরং আরও জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। আন্দোলনকারী জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে দাঁড়াচ্ছে চিকিৎসক মহল। এসএসকেএম, বর্ধমান মেডিক্যালের মতো হাতে গোনা দু’-একটি হাসপাতালে নামমাত্র পরিষেবা চালু করা গেলেও পুরোপুরি অচল নীলরতন সরকার (এনআরএস) মেডিক্যাল কলেজ। তারই মধ্যে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজের ইস্তফাপত্র রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তার কাছে পাঠিয়ে দিলেন এনআরএস মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ শৈবাল মুখোপাধ্যায়। ইস্তফা দিয়েছেন সহকারী অধ্যক্ষ সৌরভ চট্টোপাধ্যায়ও।

শহর কলকাতার অন্যান্য হাসপাতালেও পরিষেবা শিকেয়। বর্ধমান মেডিক্যালে পড়ুয়া ডাক্তারদের সঙ্গে ধর্নায় বসেছিলেন সুপার। এই পরিস্থিতির মধ্যেই সিনিয়র চিকিৎসকদের কাছে পরিষেবা দেওয়ার আর্জি জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেই আবেদন উপেক্ষা করে গণ ইস্তফা দিয়েছেন সাগর দত্ত মেডিক্যালের চিকিৎসকরা। অন্যত্রও একই চলছে প্রস্তুতিা। তার মধ্যেই ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের রাজ্য সভাপতি নির্মল মাজির মন্তব্যে বিতর্ক আরও জটিল আকার নেয়। সব মিলিয়ে গোটা রাজ্যেই স্বাস্থ্য পরিষেবা এক ভয়াবহ সঙ্কটের সম্মুখীন।

আন্দোলন শুরু হয়েছিল নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ থেকে। সেখানকার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। পরিষেবা বন্ধের পাশাপাশি হাসপাতালই কার্যত অবরুদ্ধ। আউটডোর জরুরি পরিষেবা তো বন্ধই, ইন্ডোরে ভর্তি রোগীরাও ঠিকমতো পরিষেবা পাচ্ছেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, চার ঘণ্টার মধ্যে কাজে যোগ না দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু তাতে কান না দিয়ে আন্দোলনকারীরা আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী নিঃশর্ত ক্ষমা না চাইলে তাঁরা আন্দোলন তুলবেন না। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পরেও সামান্যতম উন্নতি হয়নি।

Advertisement

এর মধ্যেই বিকেলের দিকে এক দল বহিরাগত হাসপাতালের ভিতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে ইট-পাথর জলের বোতল ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়। পুলিশ বহিরাগতদের হঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও তুমুল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে হাসপাতালের মূল ফটক আটকে তালাবন্ধ করে দেওয়া হয়। সন্ধে পর্যন্ত দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে।

আরও পডু়ন: নিঃশর্ত ক্ষমা চান মুখ্যমন্ত্রী, না হলে আন্দোলন চলবে, ঘোষণা এনআরএস-এর জুনিয়র ডাক্তারদের

এনআরএস-এর এই অচলাবস্থার মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পর সক্রিয় হয় স্বাস্থ্য এবং সাধারণ প্রশাসন। মুখ্যমন্ত্রী এসএসকেএম ছাড়ার পরই জরুরি পরিষেবা চালু করে দেওয়া হয়। অন্যান্য কয়েকটি বিভাগেও পরিষেবা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। যদিও আন্দোলন পুরোপুরি তোলা সম্ভব হয়নি। উল্টে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছেন নার্সরাও। রোগী ও তাঁদের পরিজনদের অভিযোগ, সন্ধের দিকেও পুরোপুরি পরিষেবা পাওয়া যায়নি। এ দিন নবান্ন থেকে জারি করা এক নির্দেশে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে আউটডোর ও জরুরী বিভাগ অবিলম্বে চালু করতে হবে এবং যে বা যারা এতে বাধা দেবে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনে সমর্থন করলেন নার্সরাও। —নিজস্ব চিত্র

তার মধ্যেই বিকেলের দিকে সাংবাদিক বৈঠক করে কার্যত আগুনে ঘৃতাহুতি দিয়েছেন নির্মল মাজি। তিনি জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলন তুলে নিতে হাত জোর করে আবেদন করেন। কিন্তু কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি রাজ্যের মন্ত্রী নির্মল মাজি। তাঁর দাবি, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী বিদ্যাসাগরের মূর্তি উন্মোচনের আগেই জুনিয়র চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলেন এবং তিনি চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে ফোনও করেন। তখন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা এনআরএস-এই ছিলেন। কিন্তু মেডিক্যাল পড়ুয়ারা কথা বলতে রাজি হননি। এর পরেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কোনও মানে হয় না।’’ নির্মল বলেন, ‘‘মেডিক্যাল কাউন্সিলে অনেক অভিযোগ উঠছে। মানবাধিকার কমিশনেও অভিযোগ জমা পড়ছে। ওই রাতের সিসিটিভি ফুটেজও আমাদের হাতে আছে। জুনিয়র ডাক্তাররাও কিন্তু মারধরের ঘটনায় যুক্ত। তদন্ত হলে নিয়ম তো সবার জন্য একই হবে। মুখ্যমন্ত্রী সময়সীমা দেওয়ার পরেও ওরা আন্দোলন তুলল না। সব কিছুর একটা সীমা আছে।’’

নির্মল মাজি সাংবাদিক সম্মলনে আরও বলেন, ‘‘কলকাতার প্রতিটি মেডিক্যাল কলেজের হস্টেলে বহিরাগতরা ঢুকে যায়। এ বিষয়টি সরকার গুরুত্ব সহকারে দেখছে। বিভিন্ন সিনিয়র চিকিৎসক ও মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষদের কাছ থেকেও অভিযোগ আসছে, তাঁদের জোর করে কর্মবিরতিতে সামিল হতে বাধ্য করা হচ্ছে। অভিযোগ জমা পড়লে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হতে পারে।’’

বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে বুধবার ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটেছিল। আন্দোলনকারী জুনিয়র চিকিৎসকদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়ার অভিযোগ উঠেছিল স্থানীয়দের বিরুদ্ধে। পাল্টা জুনিয়র ডাক্তারদের বিরুদ্ধেও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছিল। সেই সঙ্গে মুমূর্ষু রোগীদের ভিতরে ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগ তো ছিলই। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর বৃহস্পতিবারের ঘোষণার পরই সেখানে তালা ভেঙে ভিতরে ঢুকে জরুরি পরিষেবা চালু করে দেওয়া হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফে। বিকেলে হাসপাতালের সুপার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে যান এবং তাঁদের সমর্থন জানিয়ে যান।

আরও পডু়ন: ৪ ঘণ্টার মধ্যে কাজে যোগ না দিলে কঠোর ব্যবস্থা, এসএসকেএম-এ গিয়ে ডাক্তারদের হুঁশিয়ারি মুখ্যমন্ত্রীর

এসএসকেএম বাদ দিলে কলকাতার অন্যান্য হাসপাতালের ছবিটাও প্রায় একই। আউটডোর এবং জরুরি পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়ায় ভোগান্তির শিকার হয়েছেন সাধারণ মানুষ। বহু রোগী ও তাঁদের পরিজনরা ছুটে বেড়িয়েছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। অনেককেই দেখা গিয়েছে, হাসপাতালের বাইরেই হত্যে দিয়ে পড়ে থাকতে। কিন্তু তার চেয়েও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসকদের গণ ইস্তফার ঘটনায়। কার্যত ফুঁসছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মী-আধিকারিকরা। আর জি কর, কলকাতা মেডিক্যাল, ন্যাশনাল মেডিক্যালের মতো প্রায় সব হাসপাতালেই চলছে গণ ইস্তফার প্রস্তুতি। ফলে অবিলম্বে এই পরিস্থিতি বন্ধ না হলে চিকিৎসা ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

Advertisement